কুরআনের আলোকে ‘আকীমুদ্দীন’
আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনের মধ্যে বিভেদ না করার নির্দেশ
কুরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ এসেছে। সূরা আশ-শূরার ১৩ নম্বর আয়াতে এই নির্দেশের সঙ্গে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে: দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং দ্বীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করা।
১. ‘আকীমুদ্দীন’ বলতে কী বোঝায়?
কুরআনে আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ এসেছে। সূরা আশ-শূরার ১৩ নম্বর আয়াতে এই নির্দেশের সঙ্গে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে: দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং দ্বীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করা।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দের রূট ও ব্যাকরণ
রূট: د ي ن (দা-ইয়া-নূন; দা-ইয়া-ন)
শব্দের রূপ: বিশেষ্য।
প্রসঙ্গগত অর্থ: কর্তৃত্বের অধীনে আনুগত্য, দায়বদ্ধতা, প্রতিদান বা বিচারব্যবস্থা। নির্দিষ্ট আয়াতে কোন অর্থ প্রযোজ্য, তা বাক্যের প্রসঙ্গ থেকে নির্ধারিত হয়।
এই আয়াতে দ্বীনের সঙ্গে বিধান প্রতিষ্ঠা এবং বিভেদ পরিহারের নির্দেশ যুক্ত হয়েছে।
রূট: ق و م (ক্বাফ-ওয়াও-মীম; ক্বা-ওয়া-মা)।
মূল ক্রিয়া: أَقَامَ (আক্বামা), চতুর্থ বাবের ক্রিয়া।
রূপ: فعل أمر (ফি‘লু আমর), বহুবচন, দ্বিতীয় পুরুষ।
অর্থ: প্রতিষ্ঠা করো, কার্যকর করো, সুদৃঢ়ভাবে দাঁড় করাও।
أَقِيمُوا الدِّينَ (আকীমুদ্দীন) অর্থ: দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো।
রূট: ف ر ق (ফা-রা-ক্ব; ফা-রা-ক্বা)।
মূল ক্রিয়া: تَفَرَّقَ (তাফাররাকা)।
রূপ: পঞ্চম বাবের ক্রিয়া; এখানে নিষেধসূচক لَا (লা)-এর পরে ব্যবহৃত হয়েছে।
অর্থ: তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ো না, বিভক্ত হয়ো না।
وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ অর্থ: এর মধ্যে বিভক্ত হয়ো না।
রূট: ش ر ع (শীন-রা-‘আইন; শারা‘আ)।
রূপ: অতীতকালের তৃতীয় পুরুষ একবচন ক্রিয়া।
অর্থ: বিধান নির্ধারণ করেছেন, নিয়ম প্রবর্তন করেছেন।
আয়াতের শুরুতে দ্বীনের বিধান নির্ধারণের প্রসঙ্গে শব্দটি এসেছে।
এই আয়াতের বাক্যগঠনে أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ (আন আকীমুদ্দীন) অংশটি পূর্ববর্তী বিধান নির্ধারণের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এরপর وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (ওয়া লা তাতাফাররাকূ ফীহি) দ্বারা একই দ্বীনের মধ্যে বিভেদ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয়াতটিতে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং মুহাম্মদের প্রতি নির্দেশিত দ্বীনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। নির্দেশের দুটি দিক স্পষ্ট: দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা এবং দ্বীনের মধ্যে বিভক্ত না হওয়া।
২. ‘দীন’ শব্দের অর্থ ও রূট বিশ্লেষণ
আরবি دِين (দীন) শব্দের অর্থ কেবল ‘ধর্ম’ বললে এর সব কুরআনিক ব্যবহার প্রকাশ পায় না। একই শব্দ প্রসঙ্গ অনুসারে আনুগত্য, কর্তৃত্ব, প্রতিদান, বিচার এবং দায়বদ্ধতার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
শব্দটির রূট হলো د ي ن (দাল-ইয়া-নূন; দা-ইয়া-ন)। এই রূট থেকে গঠিত বিভিন্ন শব্দের অর্থের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, যদিও প্রতিটি শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ তার বাক্য ও প্রসঙ্গ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দ
- • دِينًا (দীনান): রূট د ي ن (দা-ইয়া-ন)। এখানে দীন শব্দটি منصوب (মানসুব), কারণ এটি أَحْسَنُ (আহসানু)-এর সঙ্গে তুলনামূলক প্রশ্নের বাক্যে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থ: আনুগত্য বা অনুসৃত বিধানগত অবস্থান।
- • أَسْلَمَ (আসলামা): রূট س ل م (সীন-লাম-মীম; সা-লা-মা)। চতুর্থ বাবের অতীতকালের ক্রিয়া। অর্থ: আত্মসমর্পণ করেছে।
- • وَجْهَهُ (ওয়াজহাহু): রূট و ج ه (ওয়াও-জীম-হা; ওয়া-জা-হা)। বিশেষ্য, অর্থ মুখমণ্ডল; প্রসঙ্গ অনুসারে নিজের সত্তা বা অভিমুখও বোঝাতে পারে।
- • مُحْسِنٌ (মুহসিন): রূট ح س ن (হা-সীন-নূন; হা-সা-না)। চতুর্থ বাবের সক্রিয় কর্তৃবাচক বিশেষণ। অর্থ: সৎকর্মকারী, উত্তম কাজ সম্পাদনকারী।
এখানে دِينًا (দীনান) শব্দটি আত্মসমর্পণ ও সৎকর্মের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আয়াতটির বক্তব্যে দীন শুধু কোনো পরিচয় বা নাম নয়; আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ এবং সৎকর্মের প্রসঙ্গও রয়েছে।
রূট বিশ্লেষণ:
- • مَالِكِ (মালিকি): রূট م ل ك (মীম-লাম-কাফ; মা-লা-কা)। অর্থ: অধিকারী, মালিক।
- • يَوْمِ (ইয়াওমি): রূট ي و م (ইয়া-ওয়াও-মীম; ইয়া-ওয়া-মা)। অর্থ: দিন।
- • الدِّينِ (আদ-দীন): রূট د ي ن (দাল-ইয়া-নূন; দা-ইয়া-ন)। এই আয়াতে প্রতিদান, বিচার বা হিসাবের অর্থে ব্যবহৃত।
এখানে ‘দীন’ শব্দটি ‘ধর্ম’ অর্থে নিলে বাক্যের অর্থ দাঁড়ায় ‘ধর্মের দিনের অধিপতি’, যা আয়াতের প্রচলিত বাক্যগত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং প্রতিদান ও বিচার-হিসাবের দিনের অধিপতি অর্থটি প্রসঙ্গের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
সূরা আল-বাকারা ২:২৮২-এ ‘দাইন’
এই আয়াতে ঋণ-লেনদেনের বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে دَيْنٍ (দাইন) শব্দটি ঋণ বোঝায়। এটি د ي ن (দাল-ইয়া-নূন) রূটের শব্দ।
ঋণ, প্রতিদান, হিসাব এবং কর্তব্য পালনের ধারণার মধ্যে ভাষাগত ও ধারণাগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে একই রূট থেকে গঠিত হয়েছে বলেই সব শব্দের অর্থ এক হয়ে যায় না। ‘দীন’ ও ‘দাইন’-এর অর্থ নির্ধারণে তাদের পৃথক শব্দরূপ এবং বাক্যগত ব্যবহার বিবেচ্য।
৩. দ্বীন প্রতিষ্ঠা কি কেবল আনুষ্ঠানিক আচার পালন?
সূরা আশ-শূরা ৪২:১৩-এ أَقِيمُوا الدِّينَ (আকীমুদ্দীন) নির্দেশের সঙ্গে وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (ওয়া লা তাতাফাররাকূ ফীহি) যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তার মধ্যে বিভক্ত না হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এই বাক্যগঠন অনুযায়ী, দ্বীন প্রতিষ্ঠার ধারণাকে শুধু একটি পোশাক, বাহ্যিক পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। আয়াতের ভাষায় নির্দেশটি দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য; তার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করার নির্দেশও একই বাক্যে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে দ্বীন পূর্ণতার কথা এসেছে।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দের রূট বিশ্লেষণ:
- • أَكْمَلْتُ (আকমালতু): রূট ك م ل (কাফ-মীম-লাম; কা-মা-লা)। চতুর্থ বাবের অতীতকাল, প্রথম পুরুষ একবচন। অর্থ: আমি পূর্ণ করেছি।
- • دِينَكُمْ (দীনাকুম): রূট د ي ن (দাল-ইয়া-নূন; দা-ইয়া-ন)। অর্থ: তোমাদের দ্বীন।
- • أَتْمَمْتُ (আতমামতু): রূট ت م م (তা-মীম-মীম; তা-মা-মা)। চতুর্থ বাবের অতীতকাল, প্রথম পুরুষ একবচন। অর্থ: আমি সম্পূর্ণ করেছি।
- • رَضِيتُ (রাদীতু): রূট ر ض و (রা-দাদ-ওয়াও; রা-দি-য়া)। অতীতকাল, প্রথম পুরুষ একবচন। অর্থ: আমি গ্রহণ করেছি, সন্তুষ্ট হয়েছি।
- • الْإِسْلَامَ (আল-ইসলাম): রূট س ل م (সীন-লাম-মীম; সা-লা-মা)। চতুর্থ বাবের ক্রিয়ামূলক বিশেষ্য। অর্থ: আত্মসমর্পণ।
আয়াতটিতে দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করা, নিয়ামত সম্পূর্ণ করা এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করার বক্তব্য রয়েছে। এখানে دِينًا (দীনা) শব্দটি الْإِسْلَامَ (আল-ইসলাম)-এর অবস্থা বা পরিচয় নির্দেশক হিসেবে এসেছে।
এই আয়াতের আলোচনায় দ্বীনের পূর্ণতা এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশকে পাশাপাশি রাখা যায়। তবে আয়াতটি একাই পরবর্তী সময়ে রচিত কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ, ব্যাখ্যা বা বিধান সম্পর্কে আলাদা করে কী সিদ্ধান্ত দেয়, তা এখানে সরাসরি বলা হয়নি।
৪. আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন
গুরুত্বপূর্ণ শব্দের রূট ও ব্যাকরণ
- • إِنَّ (ইন্না): জোর প্রদানকারী অব্যয়। পরবর্তী বিশেষ্যকে منصوب করে।
- • الدِّينَ (আদ-দীনা): রূট د ي ن (দাল-ইয়া-নূন; দা-ইয়া-ন)। এখানে إِنَّ-এর اسم বা ইসম; অর্থ দ্বীন।
- • عِندَ (ইন্দা): স্থান বা অবস্থান নির্দেশক অব্যয়জাত বিশেষ্য; অর্থ কাছে, নিকটে।
- • الْإِسْلَامُ (আল-ইসলামু): রূট س ل م (সীন-লাম-মীম; সা-লা-মা)। এখানে إِنَّ-এর خبر বা খবর; অর্থ আত্মসমর্পণ।
- • اخْتَلَفَ (ইখতালাফা): রূট خ ل ف (খা-লাম-ফা; খা-লা-ফা)। অষ্টম বাবের অতীতকালীন ক্রিয়া; অর্থ মতভেদ করেছে।
- • الْعِلْمُ (আল-ইলম): রূট ع ل م (‘আইন-লাম-মীম; ‘আ-লা-মা)। অর্থ জ্ঞান।
- • بَغْيًا (বাগইয়ান): রূট ب غ ي (বা-গাইন-ইয়া; বা-গা-ইয়া)। অর্থ সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা, অন্যায় আকাঙ্ক্ষা বা বিদ্বেষমূলক আচরণ।
- • الْحِسَابِ (আল-হিসাব): রূট ح س ب (হা-সীন-বা; হা-সা-বা)। অর্থ হিসাব।
এ আয়াতে إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ (ইন্নাদ্দীনা ‘ইন্দাল্লাহিল ইসলাম) বাক্যটি দ্বীন ও ইসলামের সম্পর্ক সরাসরি প্রকাশ করে। পরের অংশে কিতাবপ্রাপ্তদের জ্ঞান আসার পর মতবিরোধে লিপ্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সূরা আশ-শূরা ৪২:১৩-এর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও বিভক্ত না হওয়ার নির্দেশের সঙ্গে এই আয়াতের মতবিরোধ-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়গত সম্পর্ক রয়েছে।
৫. দ্বীনের মধ্যে বিভক্তি ও মতবিরোধ
সূরা আশ-শূরা ৪২:১৩-এ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ (ওয়া লা তাতাফাররাকূ ফীহি) নির্দেশের অর্থ দ্বীনের মধ্যে বিভক্ত না হওয়া। সূরা আলে ইমরান ৩:১৯-এ কিতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে জ্ঞান আসার পর মতবিরোধের কথা বলা হয়েছে।
দুটি আয়াতের বক্তব্যে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে: দ্বীনের বিষয়ে বিভক্তি ও মতবিরোধ। তবে প্রতিটি আয়াতের নিজস্ব বাক্য ও প্রসঙ্গ অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দের রূট বিশ্লেষণ
রূট: د خ ل (দাল-খা-লাম; দা-খা-লা)।
রূপ: প্রথম বাবের বহুবচন আদেশবাচক ক্রিয়া।
অর্থ: প্রবেশ করো।
রূট: س ل م (সীন-লাম-মীম; সা-লা-মা)।
অর্থ: শান্তি, সন্ধি বা আত্মসমর্পণ; কোন অর্থ প্রযোজ্য, তা প্রসঙ্গনির্ভর।
আয়াতের كَافَّةً (কাফ্ফাতান) শব্দটির কারণে নির্দেশটির পূর্ণতা বা সামগ্রিকতার দিকটি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থ: সম্পূর্ণভাবে, সামগ্রিকভাবে।
ব্যাকরণ: منصوب অবস্থায় ব্যবহৃত শব্দ; বাক্যে সামগ্রিকতা বা পূর্ণতার অর্থ প্রকাশ করে।
রূট: ت ب ع (তা-বা-‘আইন; তা-বা-‘আ)।
রূপ: অষ্টম বাবের ক্রিয়া; নিষেধসূচক لَا (লা)-এর পরে ব্যবহৃত হয়েছে।
অর্থ: অনুসরণ করো না।
একবচন: خُطْوَة (খুতওয়াহ)।
অর্থ: পদক্ষেপসমূহ। خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ (খুতুওয়াতিশ শাইতান) অর্থ শয়তানের পদাঙ্ক বা পদক্ষেপসমূহ।
এই আয়াতে সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করার নির্দেশের বিপরীতে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। স্ক্রিপ্টে এই আয়াতকে দ্বীনের কিছু অংশ গ্রহণ এবং কিছু অংশ বাদ দেওয়ার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
৬. কিতাবের কিছু অংশ গ্রহণ, কিছু অংশ বর্জন
গুরুত্বপূর্ণ শব্দের রূট ও ব্যাকরণ
- • تُؤْمِنُونَ (তু’মিনূনা): রূট أ م ن (হামজা-মীম-নূন; আ-মি-না)। চতুর্থ বাবের বর্তমানকালীন ক্রিয়া, বহুবচন। অর্থ: তোমরা বিশ্বাস করো।
- • بَعْضِ (বা‘দি): অর্থ কিছু অংশ। এখানে কিতাবের অংশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
- • الْكِتَابِ (আল-কিতাব): রূট ك ت ب (কাফ-তা-বা; কা-তা-বা)। অর্থ: লিখিত বিষয়, কিতাব।
- • تَكْفُرُونَ (তাকফুরূনা): রূট ك ف ر (কাফ-ফা-রা; কা-ফা-রা)। প্রথম বাবের বর্তমানকালীন ক্রিয়া, বহুবচন। অর্থ: অস্বীকার করো।
- • جَزَاءُ (জাযাউ): রূট ج ز ي (জীম-যা-ইয়া; জা-যা-ইয়া)। অর্থ: প্রতিদান, পরিণাম।
- • خِزْيٌ (খিযইউন): রূট خ ز ي (খা-যা-ইয়া; খা-জা-ইয়া)। অর্থ: লাঞ্ছনা, অপমান।
- • الْعَذَابِ (আল-‘আযাব): রূট ع ذ ب (‘আইন-যাল-বা; ‘আ-যা-বা)। অর্থ: শাস্তি।
- • بِغَافِلٍ (বিগাফিল): রূট غ ف ل (গাইন-ফা-লাম; গা-ফা-লা)। অর্থ: অসচেতন, অনবহিত।
আয়াতটির শুরুতে প্রশ্নবোধক أَ (আ) অব্যয় রয়েছে। بِبَعْضِ الْكِتَابِ (বিবা‘দিল কিতাব) অর্থ কিতাবের কিছু অংশে এবং وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ (ওয়া তাকফুরূনা বিবা‘দ) অর্থ কিছু অংশ অস্বীকার করো।
এখানে কিতাবের অংশবিশেষ গ্রহণ এবং অংশবিশেষ অস্বীকার করার বিষয়টি সরাসরি প্রশ্নের আকারে এসেছে। পরবর্তী অংশে এর পরিণামের কথা বলা হয়েছে।
৭. ‘আকীমুদ্দীন’-এর সামগ্রিক কুরআনিক বক্তব্য
উল্লিখিত আয়াতগুলোর আলোচনায় কয়েকটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রথমত, সূরা আশ-শূরা ৪২:১৩-এ দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশ রয়েছে। একই আয়াতে দ্বীনের মধ্যে বিভক্ত না হওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সূরা আন-নিসা ৪:১২৫-এ আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ এবং সৎকর্মের সঙ্গে উত্তম দ্বীনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
তৃতীয়ত, সূরা আল-ফাতিহা ১:৪-এ দীন শব্দটি প্রতিদান ও বিচার-হিসাবের প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। সূরা আল-বাকারা ২:২৮২-এ একই রূটের দাইন শব্দটি ঋণ বোঝায়। এ থেকে বোঝা যায়, আরবি রূটের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও শব্দের অর্থ নির্ধারণে প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, সূরা আল-মায়িদা ৫:৩-এ দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করা এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে গ্রহণের বক্তব্য রয়েছে। সূরা আলে ইমরান ৩:১৯-এ বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে দ্বীন হলো ইসলাম।
পঞ্চমত, সূরা আল-বাকারা ২:২০৮-এ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের মধ্যে প্রবেশ করার নির্দেশ রয়েছে। আর ২:৮৫-এ কিতাবের কিছু অংশ গ্রহণ এবং কিছু অংশ অস্বীকার করার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই আয়াতগুলোর সম্মিলিত আলোচনায় أَقِيمُوا الدِّينَ (আকীমুদ্দীন) অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশটি দ্বীন, আনুগত্য, পূর্ণতা এবং বিভেদ পরিহারের বিষয়গুলোর সঙ্গে যুক্ত। কুরআনের আলোচ্য আয়াতগুলোতে দ্বীন প্রতিষ্ঠার নির্দেশকে শুধু একটি বাহ্যিক পরিচয় বা একক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে প্রকাশ করা হয়নি।

