বনী আদম ও আদি অঙ্গীকার: কুরআনের আলোকে ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’

আলম এম.আলম এম.২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কুরআনিক তাদাব্বুর
ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা

বনী আদম ও আদি অঙ্গীকার

কুরআনের আলোকে ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’

লেখক: আলম এম. • ক্যাটাগরি: কুরআনিক ও গবেষণা

ভূমিকা

মানুষের অস্তিত্ব, তার দায়বদ্ধতা এবং তার রবের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কুরআনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য এসেছে সূরা আল-আ‘রাফের ১৭২ নম্বর আয়াতে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ বনী আদমের বংশধরদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেছিলেন:

أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ
Alastu bi-rabbikum (আলাস্তু বিরাব্বিকুম)
“আমি কি তোমাদের রব নই?”

উত্তরে তারা বলেছিল:

بَلَىٰ شَهِدْنَا
Balā shahidnā (বালা শাহিদনা)
“হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”

এই আয়াতকে কেন্দ্র করে ইসলামী ঐতিহ্যে ‘আহদে আলাস্ত’ বা عَهْد (আহদ) এবং ‘মীসাক’ বা مِيثَاق (মীসাক)-এর ধারণা গড়ে উঠেছে। তবে কুরআনভিত্তিক গবেষণায় প্রথমে পৃথক করতে হবে—কুরআন নিজে কী বলছে এবং পরবর্তী ব্যাখ্যায় কী যোগ হয়েছে।


১. মূল আয়াত: সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭২

সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭২

Surah Al-A'raf 7:172

وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا بَلَىٰ شَهِدْنَا ۛ أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ ١٧٢

উচ্চারণ:
Wa-idh akhadha rabbuka min banī Ādama min ẓuhūrihim dhurriyyatahum wa-ashhadahum ‘alā anfusihim alastu bi-rabbikum qālū balā shahidnā an taqūlū yawma al-qiyāmati innā kunnā ‘an hādhā ghāfilīn.
(ওয়া ইয আখাযা রব্বুকা মিম বানী- আ-দামা মিন জুহূরিহিম যুররিইয়্যাতাহুম ওয়া আশহাদাহুম ‘আলা- আনফুসিহিম আলাসতু বিরব্বিকুম, ক্বালূ বালা- শাহিদনা-, আন তাক্বূলূ ইয়াওমাল ক্বিয়া-মাতি ইন্না- কুন্না- ‘আন হা-যা- গাফিলীন।)
অনুবাদ: “আর যখন তোমার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশসমূহ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী করলেন—‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো, ‘আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলাম।’”

গুরুত্বপূর্ণ শব্দসমূহ ও অর্থপরিধি

بَنِي آدَمَ (বনী আদম) — আদমের সন্তানগণ / মানবজাতি
ذُرِّيَّة (যুররিয়্যাহ) — বংশধর / সন্তান-সন্ততি
أَشْهَدَهُمْ (আশহাদাহুম) — তাদের সাক্ষী করলেন
أَنْفُسِهِمْ (আনফুসিহিম) — তাদের নিজেদের / তাদের সত্তাসমূহ
رَبّ (রব) — প্রতিপালন, বিকাশ, পরিচালনা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দ
بَلَىٰ (বালা) — হ্যাঁ, অবশ্যই; বিশেষত নেতিবাচক প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর
شَهِدْنَا (শাহিদনা) — আমরা সাক্ষ্য দিলাম
غَافِلِينَ (গাফিলীন) — অজ্ঞাত / অসচেতন / অনবহিত

২. ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ — ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ (আলাস্তু বিরাব্বিকুম) বাক্যটি তিনটি প্রধান অংশে ব্যাকরণগতভাবে বিশ্লেষণ করা যায়:

أَ (আ)

এটি প্রশ্নসূচক হামযা বা هَمْزَةُ الِاسْتِفْهَام (হামজাতুল ইস্তিফহাম)। অর্থাৎ এটি ভাষাতাত্ত্বিকভাবে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি করে।

لَسْتُ (লাস্তু)

এটি لَيْسَ (লাইসা)-এর প্রথম পুরুষ একবচন রূপ (First person singular)। এর অর্থ: “আমি নই।”

أَلَسْتُ (আলাস্তু) = “আমি কি নই?”

بِرَبِّكُمْ (বিরাব্বিকুম)

رَبّ (রব) শব্দটির সঙ্গে র-ব-ব (ر-ب-ب) মূল ধাতু সম্পর্কিত। এই মূলের মধ্যে প্রতিপালন, ধাপে ধাপে পূর্ণতা দান, বিকাশ, পরিচালনা ও সার্বভৌমিক কর্তৃত্বের ধারণা নিহিত।

رَبِّي (রব্বি) — আমার রব
رَبُّكَ (রব্বুকা) — তোমার রব
رَبُّكُمْ (রব্বুকুম) — তোমাদের রব
أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ (আলাস্তু বিরাব্বিকুম) এর সরল অর্থ: “আমি কি তোমাদের রব নই?”

৩. ‘বালা’ কেন?

بَلَىٰ (বালা)

৭:১৭২-এ প্রশ্নের উত্তর এসেছে: قَالُوا بَلَىٰ شَهِدْنَا (কালূ বালা শাহিদনা) — “তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”

এখানে بَلَىٰ (বালা)-এর ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আরবি ব্যাকরণে نَعَمْ (না‘আম) এবং بَلَىٰ (বালা) একই ধরনের ‘হ্যাঁ’ নয়:

نَعَمْ (না‘আম)

হাঁ-বোধক প্রশ্নের উত্তরে সম্মতি জানাতে ব্যবহৃত হয়। কোনো নেতিবাচক প্রশ্নের উত্তরে ‘না‘আম’ বললে পূর্বের নেতিবাচক অবস্থাকেই সমর্থন করা হয়ে যায় (যেমন: ‘আমি কি নই?’ এর উত্তরে না‘আম বললে বোঝাত ‘হ্যাঁ, আপনি নন’)।

بَلَىٰ (বালা)

কোনো নেতিবাচক প্রশ্নের উত্তরে পূর্বের নেতিবাচক বক্তব্যকে সরাসরি খণ্ডন বা অস্বীকার করে ইতিবাচক পরম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবহৃত হয়।

প্রশ্ন: أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ؟ (আলাস্তু বিরাব্বিকুম?) — “আমি কি তোমাদের রব নই?”
উত্তর: بَلَىٰ (বালা) — “অবশ্যই / কেন নন!”
এরপর দৃঢ় ঘোষণা: شَهِدْنَا (শাহিদনা) — “আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”

৪. ‘শাহিদনা’ — আমরা সাক্ষ্য দিলাম

شَهِدْنَا (শাহিদনা) শব্দটির মূল ধাতু:

  • মূল ধাতু: শ-হ-দ (ش-ه-د) — উচ্চারণ: শ-হ-দ
  • এই মূলের সঙ্গে সাক্ষ্য দেওয়া, উপস্থিত থাকা, স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা এবং কোনো বিষয়ে পূর্ণ অবগত থাকার ধারণা সম্পর্কিত।
شَهِدَ (শাহিদা) — সে সাক্ষ্য দিল
شَهِدْنَا (শাহিদনা) — আমরা সাক্ষ্য দিলাম

এখানে কুরআন শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানের কথা বলছে না; বরং সরাসরি সাক্ষ্য বা شَهَادَة (শাহাদাহ)-এর সুনির্দিষ্ট আইনগত ও চেতনাগত ভাষা ব্যবহার করছে।


৫. ‘আহদ’ এবং বনী আদম

সূরা ইয়াসীনের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬০–৬১

Surah Ya-Sin 36:60–61

أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ يَا بَنِي آدَمَ أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ ۖ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ ۝ وَأَنِ اعْبُدُونِي ۚ هَٰذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ

উচ্চারণ:
Alam a‘had ilaykum yā banī Ādama an lā ta‘budū ash-shayṭān, innahu lakum ‘aduwwun mubīn. Wa-ani ‘budūnī, hādhā ṣirāṭun mustaqīm.
(আলাম আ‘হাদ ইলাইকুম ইয়া- বানী- আ-দামা আল্লা- তা‘বুদুশ শাইত্বা-ন, ইন্নাহূ লাকুম ‘আদুউয়্যুম মুবীন। ওয়া আনি‘বুদূনী, হা-যা- ছিরা-ত্বুম মুসতাক্বীম।)
অনুবাদ:
“হে বনী আদম, আমি কি তোমাদের প্রতি অঙ্গীকার অর্পণ করিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।”
“আর আমারই ইবাদত করো, এটাই সরল-সঠিক পথ।”
  • এখানে عَهْد (আহদ) শব্দটি এসেছে। এর মূল: আয়ন-হা-দাল (ع-ه-د)।
  • এই মূলের মধ্যে অঙ্গীকার, পবিত্র প্রতিশ্রুতি, অর্পিত দায়িত্ব বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশের ধারণা রয়েছে।
  • একই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে: أَنْ لَا تَعْبُدُوا الشَّيْطَانَ — “তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না।” এবং وَأَنِ اعْبُدُونِي — “আর আমারই ইবাদত করো।”

অতএব ৩৬:৬০–৬১-এ عَهْد (আহদ) ধারণাটি মানুষের বর্তমান পার্থিব জীবনের দায়িত্ব ও নৈতিক পছন্দের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়েছে।


৬. ‘ফিতরাত’ এবং ৭:১৭২

সূরা আর-রূম ৩০:৩০-এ বলা হয়েছে:

সূরা আর-রূম ৩০:৩০

Surah Ar-Rum 30:30

فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا

উচ্চারণ: Fiṭrata Allāhi allatī faṭara an-nāsa ‘alayhā.
(ফিত্বরাতাল্লা-হিল্লাতী ফাত্বারান না-সা ‘আলাইহা-।)
অনুবাদ: “আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।”
  • فِطْرَة (ফিতরাত) শব্দটির মূল ধাতু: ফা-ত্বা-রা (ف-ط-ر)।
  • فَطَرَ (ফাতারা) — সৃষ্টি করা, উদ্ভব ঘটানো, প্রাথমিক নিখুঁত বিন্যাসে প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার:

কুরআন সরাসরি বলেনি: “ফিতরাত হলো ৭:১৭২-এর সেই সাক্ষ্যের স্মৃতি।” এটি একটি পরবর্তী তাফসিরি ও ব্যাখ্যাগত সংযোগ।

তবে ৭:১৭২-এর شَهِدْنَا (শাহিদনা) এবং ৩০:৩০-এর فِطْرَة (ফিতরাত)-কে পাশাপাশি রেখে মানুষের রব-সম্পর্কিত মৌলিক অবস্থান ও অন্তর্নিহিত সত্যসন্ধানী প্রবণতা নিয়ে একটি সুসংগত কুরআনিক গবেষণা করা যায়।


৭. ‘রূহের জগতের মহাসমাবেশ’ — কুরআনের বক্তব্য বনাম ব্যাখ্যা

প্রচলিত ইসলামী তাফসিরে ৭:১৭২-কে প্রায়শই এমন একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয় যেখানে আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে ভবিষ্যৎ সমগ্র বংশধরদের বের করে তাদের কাছ থেকে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ‘আলামে আরওয়াহ’ বা عَالَمُ الْأَرْوَاح (আলামুল আরওয়াহ)-এর ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে।

কিন্তু কুরআনের ৭:১৭২ আয়াত নিজে عَالَمُ الْأَرْوَاح (আলামুল আরওয়াহ) শব্দবন্ধটি কোথাও ব্যবহার করেনি।

কুরআনে আমরা সুস্পষ্টভাবে পাই:

بَنِي آدَمَ (বনী আদম) ➔ আদমের বংশধর
ظُهُورِهِمْ (জুহূরিহিম) ➔ তাদের পৃষ্ঠদেশসমূহ
ذُرِّيَّتَهُمْ (যুররিয়্যাতাহুম) ➔ তাদের বংশধরগণ
أَشْهَدَهُمْ (আশহাদাহুম) ➔ তাদের সাক্ষী করলেন
أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ (আলাস্তু বিরাব্বিকুম) ➔ আমি কি তোমাদের রব নই?
بَلَىٰ شَهِدْنَا (বালা শাহিদনা) ➔ হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম

অতএব নির্মোহ গবেষণার ক্ষেত্রে দুটি স্তরকে স্পষ্টত আলাদা রাখা অধিক নির্ভুল:

কুরআনের সরাসরি বক্তব্য (Direct Quranic Statement) পরবর্তী তাফসিরি ব্যাখ্যা (Subsequent Exegesis)
বনী আদমের বংশধরদের সঙ্গে একটি সাক্ষ্য-সম্পর্কিত বাস্তবতা ঘটেছে এবং সেখানে আল্লাহর রবত্বের প্রশ্ন ও স্বীকৃতি এসেছে। এটি সৃষ্টির সূচনালগ্নে রূহসমূহের একটি পৃথক অলৌকিক জগতে সংঘটিত বিশাল সম্মেলন বা মহাসমাবেশ ছিল।

দ্বিতীয় বক্তব্যটি ইসলামী ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেটিকে প্রথম বক্তব্যের (কুরআনের প্রত্যক্ষ ভাষ্যের) সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা পদ্ধতিগতভাবে সংগত নয়।


৮. আদি অঙ্গীকারের উদ্দেশ্য

৭:১৭২-এর শেষাংশে বলা হয়েছে:

أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَافِلِينَ
An taqūlū yawma al-qiyāmati innā kunnā ‘an hādhā ghāfilīn

“যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো, ‘আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলাম।’”

এর পরের আয়াত ৭:১৭৩-এ আরেকটি সম্ভাব্য মানবীয় অজুহাত তুলে ধরা হয়েছে:

أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِنْ بَعْدِهِمْ ۖ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ
Aw taqūlū innamā ashraka ābā’unā min qablu...

“কিংবা তোমরা বলতে পারো, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো আগে শিরক করেছিল, আর আমরা তাদের পরবর্তী বংশধর ছিলাম...’”

অতএব ৭:১৭২–১৭৩-এর ধারাবাহিক বক্তব্যে মানুষের দুটি সর্বজনীন অজুহাতকে পূর্বাহ্ণেই খণ্ডন করা হয়েছে:

  1. غَفْلَة (গাফলাহ) — “আমরা জানতাম না / আমরা তো অনবহিত ছিলাম।”
  2. পূর্বপুরুষকে দায়ী করা — “আমাদের পূর্বপুরুষরাই তো এমন করেছিল, আমরা কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে তা পেয়েছি।”

কুরআনের বক্তব্যের কেন্দ্র তাই শুধু কোনো অতিপ্রাকৃত অতীত ঘটনার স্মরণ নয়; বরং মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও নৈতিক জবাবদিহিতা।


৯. কুরআনিক সমন্বয়

আয়াতসমূহের তুলনামূলক সমন্বয়:

  • ৭:১৭২: serif] text-base text-primary">شَهِدْنَا (শাহিদনা) — আমরা সাক্ষ্য দিলাম।
  • ৭:১৭৩: পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণ বা অন্ধ অনুসরণকে অজুহাত বানানোর প্রশ্ন।
  • ৩৬:৬০: serif] text-base text-primary">أَلَمْ أَعْهَدْ إِلَيْكُمْ (আলাম আ‘হাদ ইলাইকুম) — আমি কি তোমাদের প্রতি অঙ্গীকার অর্পণ করিনি?
  • ৩৬:৬১: serif] text-base text-primary">وَأَنِ اعْبُدُونِي (ওয়া আনি‘বুদূনী) — আর আমারই ইবাদত করো।
  • ৩০:৩০: serif] text-base text-primary">فِطْرَتَ اللَّهِ (ফিতরাতাল্লাহ) — আল্লাহর ফিতরাত।

এই আয়াতগুলোকে পাশাপাশি রাখলে একটি অর্থগত ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্যপূর্ণ দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

সাক্ষ্য (Shahadah) ➔ আহদ (Ahd / অঙ্গীকার) ➔ দায়িত্ব (Responsibility) ➔ জবাবদিহিতা (Accountability)

তবে এই ধারাবাহিকতার প্রতিটি স্তরকে একই নির্দিষ্ট ঘটনার সরাসরি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে ঘোষণা না করে, কুরআনের বিভিন্ন বক্তব্যের পারস্পরিক সুসংগত সম্পর্ক হিসেবে দেখাই অধিক সতর্ক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।


উপসংহার

أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۝ قَالُوا بَلَىٰ شَهِدْنَا
“আমি কি তোমাদের রব নই?” — “হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”

এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তরের পরই কুরআন কিয়ামতের দিনের জবাবদিহিতার কথা উল্লেখ করেছে। ফলে ৭:১৭২-এর তাৎপর্য কেবল কোনো অতীত ঘটনার বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের রবের সঙ্গে সম্পর্ক, সাক্ষ্য এবং দায়বদ্ধতাকে একই শাশ্বত কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে।

কুরআন সরাসরি ‘রূহের জগত’ নামে কোনো পৃথক জগতের বর্ণনা দেয় না। এই ধারণাটি মূলত পরবর্তী তাফসিরি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছে। একইভাবে فِطْرَة (ফিতরাত)-কে ৭:১৭২-এর সাক্ষ্যের স্মৃতি হিসেবে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করাও কুরআনের ভাষা নয়।

তবে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত একত্রে পাঠ করলে স্পষ্ট হয় যে মানুষকে তার রবের সঙ্গে সম্পর্কহীন, দায়িত্বহীন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

“৭:১৭২-এর সাক্ষ্যকে কুরআন কিয়ামতের দিনের জবাবদিহিতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুতরাং এর মূল শিক্ষা হলো—মানুষ তার অস্তিত্ব, রবের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং নিজের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন থেকে নিজেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।”
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।