সৃষ্টির আদি উপাদান ও আরশ: সূরা হূদ ১১:৭-এর একটি কুরআনভিত্তিক ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
কুরআনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত সূরা হূদ-এর ৭ নম্বর আয়াত। এখানে সৃষ্টি, পরীক্ষা, সময়ের পর্যায় এবং ‘আরশ’-এর সঙ্গে ‘পানি’র একটি বিশেষ সম্পর্ক একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতটির একটি বিশেষ অংশ: وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ (ওয়া কানা আরশুহু আলাল-মা-ই)—“আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।”
এখানে প্রথম প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক: “আরশ পানির ওপর ছিল” বলতে কি সত্যিই কোনো বস্তুগত স্থান বোঝানো হয়েছে? নাকি ‘আরশ’ এখানে ঐশী কর্তৃত্ব, মহাজাগতিক ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণের একটি সার্বভৌম প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কোনো বাহ্যিক কল্পকাহিনী বা লোকগাথা নয়; কুরআনের নিজের ভাষা, শব্দের রুট, বাক্যগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াতগুলো পাশাপাশি রেখে তাদাব্বুর করা অপরিহার্য।
📌 মূল ভাষাতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি: ‘আরশ’ বাস্তব একটি কুরআনিক ধারণা; কিন্তু তার প্রকৃতিকে মানুষের বস্তুগত সিংহাসনের সঙ্গে এক করা যাবে না। আর ‘আলা’ (عَلَى) কেবল স্থানিক উচ্চতা নয়—বরং কোনো অবস্থা, দায়িত্ব, ভিত্তি ও কর্তৃত্বের সম্পর্ককেও প্রকাশ করে।
আরশ, পানি ও জীবন: কুরআনের সৃষ্টিতাত্ত্বিক আয়াতসমূহের তুলনামূলক সারণী
| সূরা ও আয়াত | মূল আরবি পাঠ্যাংশ | শব্দমূল ও ব্যাকরণ | সৃষ্টির পর্যায় / স্তর | কুরআনিক শিক্ষা ও তাৎপর্য |
|---|---|---|---|---|
| সূরা হূদ (১১:৭) | وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ | ع-ر-ش (আরশ/কর্তৃত্ব) + عَلَى (প্রতিষ্ঠা) + م-و-ه (পানি) | আদি সৃষ্টিপর্যায় ও সার্বভৌম বিধান | মহাজাগতিক ব্যবস্থার সূচনা; পানির ওপর আরশের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কর্মের পরীক্ষা। |
| সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৩০) | وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ | مِنْ (হতে/উৎস) + ح-ي-ي (জীবিত সত্তা/জীবন) | জীবনের সাধারণ জৈবিক সূচনা | মহাবিশ্ব পৃথকীকরণের (ফাতাক) পর প্রতিটি প্রাণবন্ত অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে পানি নির্ধারণ। |
| সূরা আন-নূর (২৪:৪৫) | وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِنْ مَاءٍ | د-ب-ب (বিচরণশীল প্রাণী) + مِنْ مَاءٍ | জীববৈচিত্র্য ও চলন-পদ্ধতি | পেটে হাঁটা, দুই পায়ে হাঁটা ও চার পায়ে হাঁটা প্রাণীকুলের জলীয় সৃষ্টিগত উৎস। |
| সূরা আল-ফুরকান (২৫:৫৪) | وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا | ب-ش-ر (মানবদেহ) + ن-س-ب (বংশ) + ص-ه-ر (বিবাহ) | মানবসত্তা ও সামাজিক বিস্তার | মানুষের জৈবিক সৃষ্টি এবং পারিবারিক-সামাজিক বংশগতি ও সম্পর্কের বিস্তৃতি। |
| সূরা আশ-শূরা (৪২:১১) | لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ | م-ث-ل (সদৃশ/উপমা) + ش-ي-أ (বস্তু/সত্তা) | স্রষ্টার পরম অতুলনীয়তা (তৌহিদ) | আল্লাহর আরশকে মানুষের চেয়ার বা সিংহাসনের বস্তুগত আকৃতির সাথে মেলানো অসম্ভব। |
সূরা হূদ ১১:৭: আয়াতটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
এখানে একটি গভীর বিষয় লক্ষণীয়। আয়াতটি শুধু মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে নয়। একই আয়াতে তিনটি বিষয় অবিচ্ছেদ্যভাবে পাশাপাশি এসেছে:
আসমানসমূহ ও পৃথিবীর ছয়টি পর্যায়ে সৃষ্টি।
আদি ব্যবস্থার ওপর আল্লাহর কর্তৃত্বের সম্পর্ক।
মানুষের উত্তম কর্ম ও পুনরুত্থানের জবাবদিহিতা।
অতএব, “পানির ওপর আরশ”কে বিচ্ছিন্ন কোনো পৌরাণিক বা স্থানিক দৃশ্য হিসেবে না দেখে পুরো আয়াতের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে পড়তে হবে।
‘আরশ’ শব্দের রুট কী?
আরবিতে عَرْش — আরশ এসেছে রুট ع ر ش — ‘আ-রা-শা’ (ʿa-ra-sha) থেকে।
কুরআনে ‘আরশ’ শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে এসেছে। যেমন সাবা দেশের রানি বিলকিসের প্রসঙ্গে:
وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيمٌ
(Wa lahā ‘arshun ‘aẓīm)
“আর তার একটি মহান আরশ ছিল।” — সূরা আন-নামল ২৭:২৩
এখানে ‘আরশ’ একটি শাসনক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বাস্তব রাজকীয় আসন বা কর্তৃত্বের প্রতীক। একইভাবে ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনায় এসেছে:
وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ
(Wa rafa‘a abawayhi ‘alal-‘arsh)
“এবং সে তার পিতা-মাতাকে আরশের ওপর উন্নীত করল।” — সূরা ইউসুফ ১২:১০০
এখানেও الْعَرْش শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। অতএব, কুরআনের ব্যবহারে ‘আরশ’কে কেবল সাধারণ চেয়ার হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এটি কর্তৃত্বের কেন্দ্র, শাসনক্ষমতা ও সার্বভৌম ব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে এটিও স্মরণীয় যে “আরশ = কেবলই প্রতীক” এমন সরল সমীকরণও কুরআন সরাসরি ঘোষণা করেনি; বিভিন্ন প্রসঙ্গে এর অর্থবহ ব্যবহার দেখতে হবে।
‘আলা’ (عَلَى) কি শুধু ‘ওপর’?
عَلَى — আলা হলো একটি preposition বা حَرْف جَرّ (হারফু জার্র)।
এর মৌলিক অর্থ “ওপর”, “উপর প্রতিষ্ঠিত”, “উর্ধ্বে” বা “কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল/প্রতিষ্ঠিত থাকা”। কিন্তু আরবি ভাষায় এর প্রয়োগ কেবল ত্রিমাত্রিক স্থানিক অবস্থান বোঝায় না।
أُولَٰئِكَ عَلَىٰ هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ
(Ulā’ika ‘alā hudam-mir-rabbihim)
“তারাই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।” — সূরা আল-বাকারা ২:৫
এখানে عَلَىٰ هُدًى-কে কোনো বস্তুগত “ওপর” হিসেবে নেওয়া যায় না। কুরআনে عَلَى বারবার এমন সম্পর্ক প্রকাশ করে যেখানে অর্থ কেবল স্থানিক উচ্চতা নয়, বরং কোনো অবস্থা, দায়িত্ব, ভিত্তি, অধিকার বা সম্পর্কের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
অতএব সূরা হূদ ১১:৭-এর عَلَى الْمَاءِ-কে শুধুমাত্র একটি স্থানিক ছবি হিসেবে ধরে নেওয়া ভাষাতাত্ত্বিকভাবে বাধ্যতামূলক নয়। শব্দটির গভীর তাৎপর্য নির্ধারিত হয় প্রসঙ্গ ও বাক্যগঠনের মাধ্যমে।
পানি: কুরআনে জীবনের সঙ্গে একটি মৌলিক সম্পর্ক
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩০-এ আল্লাহ বলেন:
এখানে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ এসেছে:
রুট: م و ه (মা-ওয়া-হা) — পানি বা জলীয় ধারণার মূল।
রুট: ح ي ي (হা-ইয়া-ইয়া) — জীবিত হওয়া, জীবনধারণ করা।
আয়াতের গঠন وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ-এ ব্যবহৃত হয়েছে مِنْ (মিন)—অর্থাৎ “পানি থেকে” বা “পানি হতে”। এটি জীবনের সাথে পানির এক সৃষ্টিগত মৌলিক সম্পর্ক ঘোষণা করে।
সূরা আন-নূর ২৪:৪৫: জীবজগতের বৈচিত্র্য ও পানি
আল্লাহ বলেন:
এখানে পুনরায় مِنْ مَاءٍ (পানি থেকে) এসেছে এবং এর পরই জীবজগতের বিভিন্ন চলন-পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। কুরআনের বক্তব্যের এই ধারাটি স্পষ্ট:
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫৪: পানি, মানব ও সম্পর্ক
আল্লাহ বলেন:
রুট: ب-ش-ر — মানবসত্তার দৃশ্যমান ও জৈবিক দিক।
রুট: ن-س-ب — বংশ ও রক্তের সম্পর্ক।
রুট: ص-ه-ر — বৈবাহিক ও আত্মীয়তার বন্ধন।
অতএব ২৫:৫৪-এ পানি কেবল সাধারণ জৈব রাসায়নিক উপাদান নয়; মানব সৃষ্টি এবং বংশ ও বিবাহের সামাজিক কাঠামোর সূচনা উপাদান হিসেবে উপস্থিত।
তাহলে ১১:৭-এর ‘আরশ’ এবং পানি কীভাবে যুক্ত?
চারটি সংশ্লিষ্ট আয়াতকে পাশাপাশি সাজালে দেখা যায়:
- ১১:৭: وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ — “আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।”
- ২১:৩০: وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ — “আমরা পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বিষয় সৃষ্টি করেছি।”
- ২৪:৪৫: وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِّن مَّاءٍ — “আল্লাহ প্রত্যেক বিচরণশীল জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।”
- ২৫:৫৪: خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا — “তিনি পানি থেকে মানব সৃষ্টি করেছেন।”
এখানে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক সুস্পষ্ট: পানি ➔ জীবন ➔ জীবজগৎ ➔ মানব। আর ১১:৭-এ বলা হচ্ছে: আরশ ➔ পানি।
এ কারণে ১১:৭-কে জীবনের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর কুরআনিক কাঠামোর মধ্যে পড়া যুক্তিসঙ্গত। তবে সতর্ক থাকতে হবে: কুরআন সরাসরি বলেনি “পানিই ছিল সৃষ্টির একমাত্র আদি কাঁচামাল”; বরং বলেছে “তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর”। এটি ৪:৮২-এর তাদাব্বুরের নীতি অনুযায়ী সতর্ক পাঠের দাবি রাখে।
‘আরশ’কে কি আল্লাহর বসার আসন ভাবতে হবে?
যদি ‘আরশ’কে মানুষের পরিচিত অর্থে সাধারণ কোনো আসন মনে করা হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে: কে বসছেন? কোথায় বসছেন? কীভাবে বসছেন? কিন্তু কুরআন আল্লাহকে সৃষ্ট জগতের কোনো কিছুর সঙ্গে সাদৃশ্য করার অনুমতি দেয় না।
এখানে مِثْل (মিছল) অর্থ সদৃশ বা সমতুল্য রূপ, এবং شَيْء (শাই’) কোনো বস্তু বা সত্তা। অতএব আল্লাহকে সৃষ্ট কোনো বস্তুর অনুরূপ কল্পনা করা অসম্ভব। নিরাপদ অবস্থান হলো: আরশ বাস্তব একটি কুরআনিক ধারণা; কিন্তু তার প্রকৃতিকে মানুষের বস্তুগত সিংহাসনের সাথে মেলানো যায় না।
‘আরশ’ ও ‘রব্ব’ ধারণার সম্পর্ক
কুরআনে ‘আরশ’ বহুবার আল্লাহর রব্ব হওয়ার পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে:
رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
(Rabbul-‘arshil-‘aẓīm)
“মহান আরশের রব।” — সূরা আন-নামল ২৭:২৬
رَبّ — রব্ব এসেছে রুট ر ب ب (রা-বা-বা) থেকে। এর অর্থ লালন-পালন করা, ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটানো, পরিচালনা করা এবং সার্বভৌম ব্যবস্থাপনা ও কর্তৃত্ব কার্যকর রাখা।
অতএব আরশ কেবল বসার স্থান নয়, বরং সৃষ্টিজগতের সুবিন্যস্ত পরিচালনা, কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র।
‘আলা’ এবং কর্তৃত্বের ধারণা
কুরআনে যখন বলা হয় عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (“তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান”)—তখন ‘আলা’ কোনো স্থানিক অর্থে নয়; বরং সার্বভৌম ক্ষমতা ও সর্বময় কর্তৃত্বের সম্পর্ককে নির্দেশ করে।
সুতরাং عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ-এ ‘আলা’কে স্থানিক সীমাবদ্ধতায় না রেখে সম্পর্ক, সার্বভৌম ভিত্তি ও কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা হিসেবে পড়ার জোরালো ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি রয়েছে।
‘পানির ওপর আরশ’ কি তাহলে কর্তৃত্বের রূপক?
এখানে দুটি স্তর আলাদা রাখা আবশ্যক:
“তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।” এটি আয়াতের প্রত্যক্ষ টেক্সট।
সৃষ্টিজগতের জীবনের মৌলিক উপাদানের সঙ্গে পানি জড়িত, এবং সেই বাস্তবতার ওপর আল্লাহর সার্বভৌম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত।
দ্বিতীয় স্তরটি কুরআন-সমর্থিত একটি গভীর ব্যাখ্যামূলক পাঠ, তবে এটিকে একমাত্র একচেটিয়া অনুবাদ বানিয়ে ফেলা উচিত নয়।
‘পানি’ কি আধুনিক বিজ্ঞানের H₂O-ই?
এখানেও একাডেমিক সতর্কতা দরকার। কুরআনের مَاء (মা’) শব্দকে সরাসরি আধুনিক রাসায়নিক সূত্র H₂O-এর সমার্থক ঘোষণা করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
কুরআন সপ্তম শতাব্দীর ক্লাসিক্যাল আরবি ভাষায় অবতীর্ণ, যেখানে ‘মা’ মূলত পানি ও তরল জলীয় ধারণাকে প্রকাশ করে। জীববিজ্ঞানে পানির অপরিহার্য ভূমিকা অনস্বীকার্য, কিন্তু কুরআনের আয়াতকে বিজ্ঞানের সূত্র বানিয়ে ফেলা এবং আয়াত থেকে নির্ভেজাল হিদায়াত গ্রহণ করা দুটি ভিন্ন বিষয়।
“ছয় দিন” নাকি ছয় পর্যায়?
১১:৭-এর আরেকটি শব্দ হলো فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ (ছয়টি দিনে/পর্যায়ে)।
রুট ي و م (ইয়া-ওয়া-মীম) থেকে ইয়াওম (বহুবচনে আইয়াম) অর্থ শুধু ২৪ ঘণ্টার পার্থিব দিন নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট সময়কাল বা পর্যায়।
وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ
(Wa inna yawman ‘inda rabbika ka’alfi sanatim-mimmā ta‘uddūn)
“আর তোমার রবের কাছে একটি দিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।” — সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৭
অতএব সৃষ্টিতাত্ত্বিক ছয় দিনকে পৃথিবীর ২৪ ঘণ্টার দিন না ধরে মহাজাগতিক সৃষ্টির ছয়টি বিশাল পর্যায় বা সময়পর্ব হিসেবে বোঝা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আয়াতটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাঠনিক বৈশিষ্ট্য
১১:৭-এর বাক্যপ্রবাহটি আবার অনুধাবন করি:
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
এখানে সৃষ্টি ➔ আরশ ➔ পানি ➔ মানব পরীক্ষা—এই অমোঘ ধারাটি এসেছে। এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো:
“যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে অধিক উত্তম।”
بَلَا / بَلَوْ (রুট: ب-ل-و) অর্থ পরীক্ষা করা, যাচাই করা ও আত্মিক সত্য প্রকাশ করা। আয়াতটির চরম পরিণতি কেবল মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞান বর্ণনা করা নয়; বরং মানুষকে তার নৈতিক কর্ম ও দায়বদ্ধতার মুখোমুখি দাঁড় করানো।
কুরআনের অভ্যন্তরীণ মহাজাগতিক সমীকরণ
পুরো আলোচনার ধাপগুলোকে একটি সুসংগত প্রবাহে সাজানো যায়:
এখানে ১১:৭, ২১:৩০, ২৪:৪৫ এবং ২৫:৫৪ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং তারা একই সত্যের বিভিন্ন সৃষ্টিগত স্তরকে সমন্বিতভাবে উন্মোচিত করে।
তাহলে ১১:৭-এর একটি গবেষণামূলক অনুবাদ কী হতে পারে?
“আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।” (সবচেয়ে সরল ও প্রত্যক্ষ পাঠ)
“আর তাঁর আরশ পানির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।” (এখানে ‘আলা’-এর প্রতিষ্ঠা ও ভিত্তিগত অর্থ স্পষ্ট হয়)
“সৃষ্টির সেই প্রাথমিক জলীয় অবস্থার ওপর তাঁর সার্বভৌম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল।” (এটি অনুবাদ নয়, তাদাব্বুরভিত্তিক ব্যাখ্যামূলক পাঠ)
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
সূরা হূদ ১১:৭-এ “আরশ পানির ওপর” থাকার বক্তব্যকে কোনো বস্তুগত সিংহাসন পানির ওপর ভাসমান থাকার পৌরাণিক দৃশ্য হিসেবে কল্পনা করা কুরআনের সামগ্রিক ভাষা ও তৌহিদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
- • ১. সৃষ্টির অতুলনীয়তা: আল্লাহ কোনো সৃষ্টির সদৃশ নন (لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ, ৪২:১১)।
- • ২. ‘আলা’-এর গভীরতা: عَلَى কেবল স্থানিক নয়; কর্তৃত্ব, প্রতিষ্ঠা ও অধিকারের সম্পর্ক প্রকাশ করে।
- • ৩. পানির সাথে জীবনের যোগসূত্র: পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত সত্তা সৃষ্টি (مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ, ২১:৩০)।
- • ৪. প্রাণিকুলের জলীয় মূল: প্রত্যেক বিচরণশীল প্রাণী পানি থেকে সৃষ্টি (كُلَّ دَابَّةٍ مِّن مَّاءٍ, ২৪:৪৫)।
- • ৫. মানবসত্তার বিস্তার: পানি থেকে বাশার সৃষ্টি ও সম্পর্কের বিস্তার (خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا, ২৫:৫৪)।
পানি কুরআনে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক সৃষ্টিগত উপাদান, আর ‘আরশ’ হলো আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও সৃষ্টিব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ধারণা। এই সৃষ্টিগত বাস্তবতার ওপর আরশের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
“যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে অধিক উত্তম।”
সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে যত গভীর কৌতূহলই থাকুক, কুরআনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার সচেতন কর্ম, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা এবং পরকালীন পরিণতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
“অনুবাদ আমাদের প্রয়াস, কুরআনই আমাদের মানদণ্ড।”

