জান্নাতের ‘সারাব’ কি মদ? কুরআনের শব্দ, মূলধাতু ও প্রসঙ্গের আলোকে একটি পাঠ

আলম এম.আলম এম.৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“কুরআনের জান্নাত-বর্ণনা নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, সেখানে নাকি বাস্তব অর্থেই পানির নদী, দুধের নদী, মধুর নদী এবং মদের নদী থাকবে। বিশেষ করে সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫-এর خَمْر (খামর) শব্দটিকে সরাসরি ‘মদ’ এবং شَرَاب (শারাব) শব্দটিকে ‘মদ্যপ পানীয়’ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরআনের ভাষা বিশ্লেষণ করলে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। شَرَاب (শারাব) আর خَمْر (খামর) এক শব্দ নয়। আবার مَثَل (মাসাল) শব্দটিকেও উপেক্ষা করলে ৪৭:১৫-এর বাক্যগত কাঠামো ঠিকভাবে বোঝা যায় না।”

তাই বিষয়টি বোঝার জন্য কোনো একটি অনুবাদের ওপর নির্ভর না করে কুরআনের নিজস্ব শব্দব্যবহার, মূলধাতু, ব্যাকরণ এবং পারস্পরিক প্রসঙ্গ দেখা প্রয়োজন।

১. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫: প্রথম শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ

আয়াতটি শুরু হচ্ছে একটি গভীর অলংকারিক ভিত্তির ওপর:

📖 সূরা মুহাম্মাদ (৪৭:১৫) — প্রথমাংশ উপমার প্রারম্ভিক ঘোষণা

مَّثَلُ ٱلْجَنَّةِ ٱلَّتِى وُعِدَ ٱلْمُتَّقُونَ ۖ

Mathalu al-jannati allatī wu‘ida al-muttaqūn...
উচ্চারণ: মাসালুল জান্নাতিল্লাতী উ‘ইদাল মুত্তাকূন
“যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি মুত্তাকীদের দেওয়া হয়েছে, তার দৃষ্টান্ত হলো...”

এরপর আয়াতে পূর্ণাঙ্গভাবে বলা হয়েছে:

📖 পূর্ণাঙ্গ আয়াত: সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫ চারটি নহর ও চূড়ান্ত বৈপরীত্য

مَّثَلُ ٱلْجَنَّةِ ٱلَّتِى وُعِدَ ٱلْمُتَّقُونَ ۖ فِيهَآ أَنْهَٰرٌ مِّن مَّآءٍ غَيْرِ ءَاسِنٍ وَأَنْهَٰرٌ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُۥ وَأَنْهَٰرٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِّلشَّٰرِبِينَ وَأَنْهَٰرٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّى ۖ وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ ۖ كَمَنْ هُوَ خَٰلِدٌ فِى ٱلنَّارِ وَسُقُوا۟ مَآءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَآءَهُمْ

উচ্চারণ: ফীহা আনহারুম মিন মা-ইন গাইরি আ-সিন, ওয়া আনহারুম মিল্লাবানিল লাম ইয়াতাগাইয়ার ত্বা’মুহু, ওয়া আনহারুম মিন খামরিল লাযযাতিল লিশ-শারিবীন, ওয়া আনহারুম মিন ‘আসালিম মুছাফ্ফা, ওয়া লাহুম ফীহা মিন কুল্লিছ-ছামারাত, ওয়া মাগফিরাতুম মির রব্বিহিম, কামান হুওয়া খালিদুন ফিন-নারি ওয়া সুকু মা-আন হামীমান ফাক্বাত্তা‘আ আম‘আ-আহুম।
“তাতে রয়েছে এমন পানির নহর যা দূষিত হয় না; এমন দুধের নহর যার স্বাদ অপরিবর্তিত থাকে; এমন খামরের নহর যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু; এবং পরিশোধিত মধুর নহর। আর তাদের জন্য সেখানে রয়েছে সব ধরনের ফলমূল এবং তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা। তারা কি তাদের মতো, যারা চিরকাল আগুনে থাকবে এবং যাদের ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে?”
💡

উপমার প্রাথমিক চাবিকাঠি:

এখানে শুরুতেই مَثَل (মাসাল) শব্দটি দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ জান্নাতের এই বর্ণনাটি কোনো পার্থিব ভৌগোলিক বাস্তবতার হুবহু বিবরণ নয়, বরং এটি একটি উপমা, দৃষ্টান্ত বা ধারণাগত উপস্থাপনা।

২. ‘মাসাল’ (مَثَل) শব্দের অর্থ কী?

আরবি ভাষায় م-ث-ل (ম-ছ-ল) মূলধাতুটির অর্থ হলো:

১. সাদৃশ্য Similarity
২. তুলনা Comparison
৩. উপমা Parable / Metaphor
৪. দৃষ্টান্ত Example
৫. রূপক উপস্থাপনা Allegorical Model

কুরআনে এই শব্দটি বহু জায়গায় এমন অর্থে এসেছে যেখানে কোনো গভীর সত্যকে মানুষের পরিচিত বিষয়ের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। যেমন সূরা আল-হাশর ৫৯:২১-এ বলা হয়েছে:

📖 সূরা আল-হাশর (৫৯:২১) দৃষ্টান্তের উদ্দেশ্য

وَتِلْكَ ٱلْأَمْثَٰلُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

“আমি মানুষের জন্য এই সব দৃষ্টান্ত (الأَمْثَال) পেশ করি, যাতে তারা চিন্তা করে।”

সুতরাং সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫-এর শুরুতে যখন বলা হচ্ছে مَثَلُ الْجَنَّةِ (জান্নাতের দৃষ্টান্ত), তখন বাক্যটির কাঠামোই বলে দিচ্ছে যে এর ভেতরের উপাদানগুলো মানুষের চেনা রূপকের মাধ্যমে জান্নাতের পরম কল্যাণ, তৃপ্তি ও নির্মলতাকে বোঝানোর জন্য আনা হয়েছে।

৩. চারটি নহর: পার্থিব উপাদান নাকি গুণবাচক রূপক?

আয়াতে চারটি মৌলিক উপাদানের প্রবাহের কথা বলা হয়েছে:

১. অবিকৃত বিশুদ্ধ পানি مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍ

প্রতীকী অর্থ: জীবন, অস্তিত্ব ও অনন্ত সজীবতার প্রতীক। পার্থিব পানি বদ্ধ হলে দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত হয়, কিন্তু জান্নাতের পানি চিরস্থায়ী নির্মল।

২. স্বাদ অক্ষুণ্ণ দুধ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ

প্রতীকী অর্থ: পুষ্টি, কোমলতা ও সহজাত বিশুদ্ধতার প্রতীক। পার্থিব দুধ দ্রুত টকে যায় বা পচে যায়, কিন্তু জান্নাতের দুধের স্বাদ চির অপরিবর্তনীয়।

৩. আনন্দদায়ক খামর خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ

প্রতীকী অর্থ: অনাবিল আনন্দ, পরমানন্দ ও গভীর তৃপ্তির প্রতীক। এটি বুদ্ধি হরণকারী পার্থিব নেশা নয়, বরং পবিত্র আত্মার নির্মল প্রফুল্লতা।

৪. পরিশোধিত মধু عَسَلٍ مُصَفًّى

প্রতীকী অর্থ: নিরাময়, মিষ্টতা ও সার্বিক কল্যাণের প্রতীক। পার্থিব মধুতে মোম ও আবর্জনা মেশানো থাকে, কিন্তু জান্নাতের মধু সম্পূর্ণ পরিশোধিত ও নিখাদ।

পার্থিব জীবনে এই চারটি উপাদানই মানুষের তৃপ্তি ও পুষ্টির প্রধান মাধ্যম। কিন্তু পার্থিব জগতে পানি দূষিত হয়, দুধ নষ্ট হয়, মদ বুদ্ধি নষ্ট করে এবং মধুতে ভেজাল থাকে। কুরআনে জান্নাতের রূপকে প্রতিটি উপাদানের সাথে এমন বিশেষণ যোগ করা হয়েছে যা তার পার্থিব ত্রুটিকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়।

৪. খামর (خَمْر): কুরআনে এর মূলধাতু ও ব্যবহার

খামর শব্দটি এসেছে خ-م-র (খ-ম-র) মূলধাতু থেকে। এই মূলধাতুর প্রাথমিক অর্থ হলো: ঢেকে ফেলা, আচ্ছন্ন করা, গোপন করা।

ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ: ‘খিমার’ (خِمَار)

সূরা আন-নূর ২৪:৩১

আরবি ভাষায় নারীর ওড়না বা মাথার কাপড়কে বলা হয় خِمَار (খিমার)। সূরা আন-নূর ২৪:৩১-এ এই শব্দটি এসেছে:

وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ

“তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে।” কারণ তা মাথা ও রূপকে আবৃত করে ফেলে।

পার্থিব মদকে খামর বলা হয় এই কারণেই যে, তা মানুষের বিবেক বা বুদ্ধিকে ঢেকে ফেলে (مَا خَامَرَ الْعَقْلَ)।

পার্থিব খামর সম্পর্কে কুরআনের অবস্থান:

📖 সূরা আল-বাকারাহ (২:২১৯) পাপ ও ক্ষতি উপকারের চেয়ে বড়

“তারা তোমাকে খামর ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, এ দুটোর মধ্যে বড় পাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও রয়েছে, কিন্তু এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে অনেক বড়।”

📖 সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৯০) শয়তানের অপবিত্র কাজ

“নিশ্চয়ই খামর, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীর—এসবই ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ; সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন কর।”

এখানে স্পষ্ট যে, পার্থিব খামর বর্জনীয় কারণ তা মানুষের চেতনা ও বিবেককে আচ্ছন্ন করে শয়তানের পথ সুগম করে।

৫. জান্নাতের খামর কি পার্থিব মদ?

জান্নাতের খামর সম্পর্কে কুরআন নিজেই অন্য আয়াতে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৪৫-৪৭-এ বলা হয়েছে:

📖 সূরা আস-সাফফাত (৩৭:৪৫–৪৭) নেশামুক্ত জান্নাতী পানপাত্র

يُطَافُ عَلَيْهِم بِكَأْسٍ مِّن مَّعِينٍۭ بَيْضَآءَ لَذَّةٍ لِّلشَّٰرِبِينَ لَا فِيهَا غَوْلٌ وَلَا هُمْ عَنْهَا يُنزَفُونَ

“তাদের চারদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে প্রবহমান ঝর্ণার পানপাত্র—শুভ্র, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু। তাতে থাকবে না কোনো ক্ষতিকর প্রভাব (غَوْل) এবং তারা তাতে মাতালও হবে না (يُنْزَفُونَ)।”
غَوْل (গাওল)

শারীরিক বা মানসিক বিষক্রিয়া নেই

মাথা ধরা, পেটে অস্বস্তি, বুক জ্বালাপোড়া, চেতনা লোপ বা কোনো ধরনের শারীরিক-মানসিক ক্ষতি।

يُنْزَفُونَ (ইউনযাফূন)

নেশাগ্রস্ত বা বুদ্ধিভ্রষ্ট হওয়া নেই

মাতাল হওয়া, প্রলাপ বকা, বুদ্ধিভ্রষ্ট হওয়া বা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মমর্যাদা হারানো।

একইভাবে সূরা আল-ওয়াকি‘আহ ৫৬:১৯-এ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে:

📖 সূরা আল-ওয়াকি‘আহ (৫৬:১৯) মাথাব্যথা ও নেশার পূর্ণ অস্বীকৃতি

لَّا يُصَدَّعُونَ عَنْهَا وَلَا يُنزِفُونَ

“তা পান করে তাদের মাথা ব্যথা করবে না এবং তারা জ্ঞানও হারাবে না।”

তাহলে দেখা যাচ্ছে, জান্নাতের খামর থেকে মদের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্যই কুরআন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে: নেশা এবং ক্ষতিকর প্রভাব। পার্থিব যে কারণে মদ নিষিদ্ধ—বুদ্ধি লোপ পাওয়া এবং ক্ষতি হওয়া—জান্নাতের খামরে তার কোনোটিই নেই। তাহলে এটি কেমন খামর? এটি এমন এক পবিত্র ও নির্মল আত্মিক আনন্দ যা পার্থিব কলুষমুক্ত।

৬. শরাব (شَرَاب) শব্দের মূলধাতু ও কুরআনিক অর্থ

অনেকে মনে করেন ‘শরাব’ মানেই বুঝি মদ। কিন্তু আরবি ভাষায় শরাব শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। শরাব এসেছে ش-ر-ب (শীন-রা-বা) মূলধাতু থেকে। এর সাধারণ অর্থ: পান করা, তরল পদার্থ গ্রহণ করা।

কুরআনে এই মূলধাতুর বিভিন্ন ব্যবহার:

•
সূরা আন-নাহল ১৬:১০: “তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, যার মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে শরাব (পানীয়)...” — এখানে সাধারণ মিষ্টি পানিকে شَرَاب বলা হয়েছে।
•
সূরা আন-নাহল ১৬:৬৯: মৌমাছির পেট থেকে মধু বের হওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে: “তার পেট থেকে নির্গত হয় বিভিন্ন রঙের শরাব (পানীয়), যাতে মানুষের জন্য রয়েছে নিরাময়।” — এখানে মধুকে شَرَاب বলা হয়েছে।
•
সূরা ফাতির ৩৫:১২: সুপেয় মিঠা পানি সম্পর্কে বলা হয়েছে: “এটি সুমিষ্ট, তৃষ্ণা নিবারক, এর শরাব (পান) সহজসাধ্য...”
•
সূরা আল-ইনসান ৭৬:২১: “এবং তাদের প্রতিপালক তাদের পান করাবেন পরম পবিত্র পানীয় (شَرَابًا طَهُورًا - শারাবান ত্বহূরা)।”

সুতরাং কুরআনের পরিভাষায় شَرَاب (শারাব) মানে মদ নয়; শারাব মানে যেকোনো পানীয়। আর জান্নাতের শারাব হলো ‘ত্বহূর’ (পরম পবিত্র ও পরিশুদ্ধ পানীয়)।

৭. শব্দ দুটির মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা

খামর ও শারাব: শব্দার্থ ও কুরআনিক প্রয়োগ

Semantic Comparison
শব্দ (Arabic) মূলধাতু মৌলিক ভাষাতাত্ত্বিক অর্থ কুরআনে জান্নাতের ক্ষেত্রে অর্থ কুরআনে পার্থিব ক্ষেত্রে অর্থ
خَمْر (খামর) خ م ر ঢেকে ফেলা, আচ্ছন্ন করা অনাবিল আনন্দ ও তৃপ্তিময় রূপক পানীয় (নেশা ও ক্ষতিমুক্ত) বুদ্ধি আচ্ছন্নকারী নিষিদ্ধ মদ (সূরা ২:২১৯, ৫:৯০)
شَرَاب (শারাব) ش ر ب পান করা, সাধারণ তরল পানীয় পরম পবিত্র পানীয় (شَرَابًا طَهُورًا) বৃষ্টির সুপেয় পানি (১৬:১০), প্রাকৃতিক মধু (১৬:৬৯), সাধারণ তরল

৮. নহরের বিপরীত চিত্র: জাহান্নামের পানীয়

সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫-এর গঠন গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে জান্নাতের চার নহরের বিপরীতে জাহান্নামীদের জন্য একটি পানীয়ের উল্লেখ রয়েছে:

🔥 সূরা মুহাম্মাদ (৪৭:১৫) — শেষাংশ জাহান্নামের বিপরীত বাস্তবতা

وَسُقُوا۟ مَآءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَآءَهُمْ

“...এবং যাদের ফুটন্ত পানি পান করানো হবে, যা তাদের নাড়িভুঁড়ি ছিন্নভিন্ন করে দেবে।”

🌿 জান্নাতের চার নহর (পরম শান্তি)

অবিকৃত পানি, অক্ষুণ্ণ দুধ, আনন্দদায়ক খামর ও পরিশোধিত মধু — যা অনন্ত তৃপ্তি, সুস্বাস্থ্য, সজীবতা ও পরম আত্মিক শান্তির প্রতীক।

🔥 জাহান্নামের তরল (চরম শাস্তি)

ফুটন্ত বিষাক্ত পানি (مَاءً حَمِيمًا) — যা অন্তরের অবর্ণনীয় দহন ও নাড়িভুঁড়ি ছিন্নকারী সর্বগ্রাসী যন্ত্রণার প্রতীক।

৯. উপসংহার: জান্নাতের শারাব পার্থিব মদের লাইসেন্স নয়

কুরআনের পাঠ থেকে এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও সংশয়াতীত:

১

উপমার অলংকারিক কাঠামো:

সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৫-এর বর্ণনাটি শুরু হয়েছে مَثَل (দৃষ্টান্ত/উপমা) শব্দ দিয়ে। এটি মানুষের উপলব্ধিযোগ্য পার্থিব রূপকের মাধ্যমে পরকালীন চূড়ান্ত কল্যাণকে তুলে ধরার একটি অনন্য ঐশী ভাষা।

২

ক্ষতি ও নেশার প্রত্যক্ষ অস্বীকৃতি:

কুরআনে ‘খামর’ শব্দটি পার্থিব ক্ষেত্রে বুদ্ধি আচ্ছন্নকারী মদের জন্য ব্যবহৃত হলেও জান্নাতের ক্ষেত্রে তার সমস্ত ক্ষতিকর উপাদান ও নেশা সরাসরি নাকচ করা হয়েছে (সূরা আস-সাফফাত ৩৭:৪৭, সূরা আল-ওয়াকি‘আহ ৫৬:১৯)।

৩

শারাব মদের সমার্থক নয়:

‘শারাব’ শব্দটি কোনোভাবেই মদের সমার্থক নয়। কুরআনে পানি এবং মধুকেও ‘শারাব’ বলা হয়েছে। জান্নাতের শারাব হলো পরম পবিত্র পানীয় (شَرَابًا طَهُورًا)।

৪

পার্থিব নিষিদ্ধ বস্তুর ন্যায্যতা নয়:

জান্নাতের এই আত্মিক ও পরম পবিত্র আনন্দের রূপককে পার্থিব জীবনের নিষিদ্ধ মাদক বা মদের সাথে গুলিয়ে ফেলা কুরআনের ভাষার সাথে চরম অবিচার।

“কুরআনকে তার নিজস্ব মূলধাতু, ব্যাকরণ ও তুলনামূলক আয়াতের আলোকেই পড়তে হবে। তখনই তার শব্দের আসল গভীরতা ও সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়।”

✍️ লেখক: আলম এম.
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত

সম্পর্কিত গবেষণা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ

এই বিষয়ের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গভীর আলোচনা ও কুরআনভিত্তিক অনুসন্ধান

সকল প্রবন্ধ দেখুন

জান্নাতের নহর, খামর ও শরাব: কুরআনের ভাষায় রূপক ও শব্দার্থের অনুসন্ধান

কুরআনের জান্নাতের বর্ণনা, সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৫-এর ৪টি নহর (পানি, দুধ, খামর, মধু), এবং ‘মাছাল’, ‘খামর’, ‘শরাব’ ও ‘মাগফিরাত’ শব্দের মূলধাতুভিত্তিক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। আলম এম.-এর বিশেষ গবেষণামূলক নিবন্ধ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

কুরআন, কিতাব ও ‘আরবি’: প্রচলিত ধারণার বাইরে কুরআনিক শব্দতত্ত্বের আলোকে এক গভীর অনুসন্ধান

কুরআন কি কেবল ১১৪ সূরার বাঁধাই করা একটি প্রাচীন আরবি বই, নাকি মানুষের অন্তর্জাগতিক চেতনা ও প্রতিটি জাতির বোধগম্য ভাষায় প্রকাশিত এক জীবন্ত নির্দেশিকা? সূরা ইউসুফ, নাহল, কিয়ামাহ ও ইব্রাহীমের আলোকে ‘আরবি’, ‘আ‘জামী’, ‘কিতাব’ ও ‘কুরআন’-এর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা।

গবেষণা
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

ইবাদত: কুরআনের আলোকে শব্দটির অর্থ ও প্রকৃত তাৎপর্য

কুরআনে ‘ইবাদত’ কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার, গভীর তাদাব্বুর, তাফাক্কুর এবং সত্যের (হক) প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক সামগ্রিক জীবনপদ্ধতি। এম. লিয়াকত-এর মৌলিক গবেষণা নিবন্ধ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

দরুদ ও সালাত: ৪:৮২ আয়াতের কষ্টিপাথরে 'মালাইকা' শব্দের তাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়ন

সূরা আন-নিসার ৪:৮২ আয়াতের কষ্টিপাথরে সালাত (صَلَاة), ইউসাল্লু (يُصَلِّي) এবং মালাইকা (مَلَائِكَة) শব্দের আরবী শব্দমূলভিত্তিক গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪৩ ও ৩৩:৫৬-এর তুলনামূলক পাঠ, অনারবী ফার্সি 'দরুদ' ধারণার উৎস এবং কুরআনিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্বরূপ নিয়ে আলম এম.-এর মৌলিক গবেষণা।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

মহাজাগতিক নির্বাহী শক্তি ও ঐশ্বরিক বার্তা: আরবী শব্দমূলের আলোয় 'মালাক' ও 'মালাইকা'

'মালাক' ও 'মালাইকা' শব্দের প্রচলিত অনুবাদ 'ফেরেশতা' বা ডানাওয়ালা অদৃশ্য স্বর্গীয় জীব হলেও আরবী শব্দমূল (أ-ل-ك ও م-ل-ك) প্রমাণ করে এরা মহাবিশ্বের নির্বাহী চালিকাশক্তি ও ঐশ্বরিক বার্তাবাহক। সূরা ফাতির ৩৫:১, আল-বাকারা ২:৩৪ ও আন-নাহল ১৬:২-এর শব্দার্থতাত্ত্বিক ও তুলনামূলক গবেষণা।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন