কুরআনের কিছু শব্দ প্রচলিত অনুবাদের কারণে এমন একটি নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে যে, মূল আরবি শব্দটির অর্থগত পরিসর নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন করার সুযোগ অনেক সময় থাকে না। مَلَائِكَة (মালায়িকা) এবং عَرْش (আরশ) তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সূরা আয-যুমার ৩৯:৭৫ আয়াতটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে মালায়িকা, আরশ, তাসবীহ, হামদ এবং আলামীনের রব একই বাক্যকাঠামোর মধ্যে এসেছে। ফলে একটি শব্দকে প্রচলিত অর্থে গ্রহণ করার আগে অন্য শব্দগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থকে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং আরবি শব্দমূল, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং কুরআনের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের আলোকে আয়াতটি পাঠ করা।
✦ সূরা আয-যুমার ৩৯:৭৫ — মূল পাঠ ও শব্দ-সংরক্ষণকারী অনুবাদ
وَتَرَى ٱلْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ ٱلْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْۖ وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّۚ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“আর তুমি মালায়িকাকে আরশের চারপাশে পরিবেষ্টনকারী অবস্থায় দেখতে পাবে; তারা তাদের রবের হামদের মাধ্যমে তাসবীহ করে। আর তাদের মধ্যে সত্যের ভিত্তিতে ফয়সালা সম্পন্ন করা হবে। এবং বলা হবে, ‘সমস্ত হামদ আল্লাহরই, যিনি সমস্ত আলামীনের রব।’”
১ ‘মালায়িকা’ — প্রচলিত ‘ফেরেশতা’ অর্থের পুনর্বিবেচনা
আয়াতের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: ٱلْمَلَائِكَةَ (আল-মালায়িকাতা)। এটি مَلَك (মালাক)-এর বহুবচন। প্রচলিত অনুবাদে مَلَائِكَة-কে ‘ফেরেশতা’ বলা হয়। কিন্তু ‘ফেরেশতা’ আসলে একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় পরিভাষা, সরাসরি আরবি শব্দের অনুবাদ নয়। তাই শব্দটির নিজস্ব আরবি অর্থপরিসর পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
مَلَك (মালাক) এবং مَلَائِكَة (মালায়িকা)-এর সঙ্গে م ل ك root-এর সম্পর্ক বিবেচনা করা হয়। এই শব্দমূলের অর্থক্ষেত্রে রয়েছে:
একই শব্দমূলের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান শব্দসমূহ:
- مَلِك (মালিক): অধিপতি, কর্তৃত্বশালী
- مُلْك (মুলক): কর্তৃত্ব, রাজত্ব, সার্বভৌম ক্ষমতা
- مَالِك (মালিক): অধিকারী, মালিক
- مَلَكُوت (মালাকূত): ব্যাপক বা গভীর কর্তৃত্বের ক্ষেত্র
فَسُبْحَانَ ٱلَّذِي بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ
“অতএব মহিমান্বিত তিনি, যার হাতে প্রত্যেক বিষয়ের মালাকূত।” — সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮৩
এখানে একই root-এর মধ্যে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ধারণাটি স্পষ্ট। তবে শুধু root-এর অর্থ থেকেই مَلَائِكَة-এর চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণ করা যাবে না। কোনো শব্দের অর্থ নির্ধারণে তার কুরআনিক ব্যবহার, বাক্যগত অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক শব্দগুলোকেও বিবেচনা করতে হয়।
প্রচলিত ধর্মীয় ধারণায় ‘ফেরেশতা’ বলতে সাধারণত মানুষের মতো কিন্তু অদৃশ্য এক ধরনের অতিপ্রাকৃত সত্তাকে বোঝানো হয়। কিন্তু ৩৯:৭৫ আয়াত নিজে এমন কোনো শারীরিক বর্ণনা দেয় না। এখানে বলা হচ্ছে:
(আল-মালায়িকাতা হাফ্ফীনা মিন হাওলিল-আরশ) — অর্থাৎ মালায়িকাকে আরশের চারপাশে পরিবেষ্টনকারী অবস্থায় দেখা যাবে। অতএব এই আয়াত থেকে সরাসরি ‘ডানাওয়ালা আকাশীয় প্রাণী’ ধারণাটি পাওয়া যায় না। অন্য আয়াতে ব্যবহৃত أَجْنِحَة (আজনিহাহ) শব্দটির অর্থ ও প্রয়োগও আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
২ ‘আরশ’ — সিংহাসন, নাকি কর্তৃত্বের কাঠামো?
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ: ٱلْعَرْشِ (আল-আরশ)। عَرْش (আরশ) শব্দটির সঙ্গে ع ر ش (আইন-রা-শীন: ‘আ-র-শ) root-এর সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থক্ষেত্রে উঁচু বা উত্থিত কাঠামো, নির্মিত উচ্চ কাঠামো এবং কর্তৃত্বের আসনের ধারণা রয়েছে।
মানবিক প্রসঙ্গে ‘আরশ’ কোনো শাসকের ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের আসন নির্দেশ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এটিকে সরাসরি একটি বিশাল বসার চেয়ার হিসেবে কল্পনা করা কুরআন থেকে বাধ্যতামূলক নয়।
رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
(রব্বুল-আরশিল-আযীম) — অর্থাৎ ‘মহান আরশের রব’ — সূরা আন-নামল, ২৭:২৬।
আল্লাহর ক্ষেত্রে আরশকে শারীরিক সিংহাসন হিসেবে কল্পনা না করে আল্লাহর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের একটি উত্থিত বা সর্বোচ্চ কাঠামোগত ধারণা হিসেবে পাঠ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন। ‘সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কাঠামো’ সরাসরি অভিধানগত অনুবাদ নয়; এটি একটি ব্যাখ্যাগত rendering। তাই গবেষণামূলক অনুবাদে মূল শব্দ আরশ সংরক্ষণ করা অধিক স্বচ্ছ।
৩ শব্দভিত্তিক রূপতাত্ত্বিক ও বাক্যতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
حَافِّينَ (হাফ্ফীনা) এসেছে ح ف ف (হা-ফা-ফা) root থেকে। এর মধ্যে কোনো কিছুকে ঘিরে থাকা, চারপাশে অবস্থান করা বা পরিবেষ্টনের ধারণা রয়েছে।
এর সঙ্গে পরবর্তী শব্দ مِنْ حَوْلِ (মিন হাওলি) এসেছে ح و ل (হা-ওয়াও-লাম) root থেকে, যার মধ্যে চারপাশ, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং অবস্থানগত পরিসর নির্দেশিত।
يُسَبِّحُونَ (ইউসাব্বিহূনা) এসেছে س ب ح (সীন-বা-হা) root থেকে। এর মৌলিক অর্থক্ষেত্রে রয়েছে মুক্তভাবে চলা, অগ্রসর হওয়া এবং কোনো কিছুর ঊর্ধ্বে থাকা।
سَبَّحَ (সাব্বাহা) ক্রিয়ার মধ্যে কোনো কিছুকে অপূর্ণতা বা অশুদ্ধতা থেকে মুক্ত ঘোষণা করার ধারণাও রয়েছে। তাই ‘তাসবীহ’কে শুধু একটি নির্দিষ্ট মুখস্থ বাক্য পাঠ করার অর্থে সীমাবদ্ধ করা প্রয়োজন নেই।
حَمْد (হামদ) এসেছে ح م د (হা-মীম-দাল) root থেকে। এর মধ্যে প্রশংসা, গুণের স্বীকৃতি এবং যোগ্যতার স্বীকৃতির ধারণা রয়েছে। একে শুধু ‘তাদের রবের প্রশংসা করে’ বললে অর্থ সংকুচিত হয়; এখানে আল্লাহর গুণ, মহিমা ও পরিপূর্ণতার স্বীকৃতিও রয়েছে।
رَبّ (রব্ব) এসেছে ر ب ب (রা-বা-বা) root থেকে—যার অর্থ প্রতিপালন, বিকাশ ঘটানো, ধাপে ধাপে পরিচালনা করা এবং পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া।
وَقُضِيَ (ওয়া কুদিয়া) এসেছে ق ض ي (ক্বাফ-দাদ-ইয়া) root থেকে। এর মধ্যে কোনো বিষয় সম্পন্ন করা, সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এবং ফয়সালা করার অর্থ রয়েছে।
بِالْحَقِّ (বিল-হাক্ক)-এ রয়েছে ح ق ق (হা-ক্বাফ-ক্বাফ) root। এর অর্থক্ষেত্রে সত্য, বাস্তবতা, যথার্থতা এবং প্রতিষ্ঠিত অধিকারের ধারণা রয়েছে।
قِيلَ (কীলা) এসেছে ق ও ল (ক্বাফ-ওয়াও-লাম) root থেকে। এখানে passive form ব্যবহৃত হয়েছে: وَقِيلَ — “এবং বলা হলো/বলা হবে।” কে বলবে তা আয়াতে নির্দিষ্ট করা হয়নি।
الْحَمْدُ لِلَّهِ (আল-হামদু লিল্লাহি): لِـ (লি) অব্যয়টি ‘জন্য’, ‘উদ্দেশে’ বা ‘অধিকারভুক্ত’ অর্থ প্রকাশ করতে পারে।
الْعَالَمِينَ (আল-আলামীন) এসেছে عَالَم (আলাম) শব্দ থেকে, যা ع ل م (আইন-লাম-মীম) root-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
عَالَم বলতে জগত, realm, world বা একটি স্বতন্ত্র domain বোঝানো যেতে পারে। তাই ‘সৃষ্টিকুলের রব’ ছাড়াও এর নিরপেক্ষ অর্থ: “সমস্ত আলামীনের রব”।
৪ তুলনামূলক ব্যাখ্যাগত অনুবাদ ও মূল অনুবাদের স্তরবিন্যাস
“আর তুমি আল্লাহর কর্তৃত্ব-কার্যকরী শক্তিসমূহকে তাঁর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কাঠামোকে ঘিরে পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখতে পাবে; তারা তাদের রবের গুণ ও মহিমার স্বীকৃতির মাধ্যমে তাঁর পরিপূর্ণতা ঘোষণা করে। আর তাদের মধ্যে সত্যের ভিত্তিতে ফয়সালা সম্পন্ন করা হবে। এবং বলা হবে, ‘সমস্ত যথার্থ গুণস্বীকৃতি আল্লাহরই, যিনি সকল জগত ও ব্যবস্থার রব।’”
এখানে مَلَائِكَة-কে ‘কর্তৃত্ব-কার্যকরী শক্তিসমূহ’ এবং عَرْش-কে ‘সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কাঠামো’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
“আর তুমি দেখতে পাবে আল্লাহর কর্তৃত্বের কার্যকরী ব্যবস্থাগুলো তাঁর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের পরিসরকে ঘিরে রয়েছে; তারা তাদের রবের মহিমা ও গুণের স্বীকৃতির মাধ্যমে তাঁর পরিপূর্ণতা ঘোষণা করছে। আর তাদের মধ্যে সত্যের ভিত্তিতে ফয়সালা সম্পন্ন হবে। এবং বলা হবে, ‘সমস্ত যথার্থ প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি সকল জগত ও ব্যবস্থার রব।’”
আরও স্বাভাবিক ও সাবলীল ভাষায় অন্তর্নিহিত ব্যবস্থাগত ধারণাটিকে প্রকাশ করা হয়েছে।
শব্দ-সংরক্ষণকারী গবেষণামূলক অনুবাদে আমরা বলছি: “আর তুমি মালায়িকাকে আরশের চারপাশে পরিবেষ্টনকারী অবস্থায় দেখতে পাবে...” — এটি পাঠককে মূল আরবি শব্দগুলোর কাছাকাছি রাখে।
অন্যদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় অনুবাদ হলো ব্যাখ্যাগত অনুবাদ (Semantic interpretation)। সেখানে সম্ভাব্য অন্তর্নিহিত ধারণাগুলোকে পাঠকের সামনে সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। এই দুটি স্তর আলাদা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা এক হয়ে গেলে পাঠক বুঝতে পারেন না কোনটি আরবি শব্দের প্রত্যক্ষ অর্থ এবং কোনটি গবেষকের ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ।
🌿 কুরআনকেন্দ্রিক সতর্ক অবস্থান ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
- প্রথমত: مَلَائِكَة (মালায়িকা) এমন একটি শব্দ, যার অর্থকে কেবল প্রচলিত ‘ফেরেশতা’ শব্দ দিয়ে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দেওয়ার আগে তার root এবং কুরআনিক ব্যবহার পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
- দ্বিতীয়ত: عَرْش (আরশ)-কে আল্লাহর ক্ষেত্রে মানুষের বসার সিংহাসনের মতো কল্পনা করা এই আয়াত থেকে বাধ্যতামূলক নয়। শব্দটির উচ্চতা, কাঠামো ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থও পরীক্ষা করা যায়।
- তৃতীয়ত: حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ (হাফ্ফীনা মিন হাওলিল-আরশ) একটি পরিবেষ্টিত বিন্যাসের কথা বলে। ফলে আয়াতের দৃশ্যটিকে কেবল মানুষের মতো কোনো শারীরিক সত্তার দৃশ্য হিসেবে সীমাবদ্ধ না করেও পড়া সম্ভব।
আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদ পাঠকের সামনে এমন একটি দৃশ্য হাজির করে যেখানে ‘ফেরেশতারা’ আল্লাহর ‘সিংহাসন’ ঘিরে রয়েছে। কিন্তু আরবি পাঠের শব্দগুলো পুনরায় পরীক্ষা করলে একটি ভিন্ন semantic possibility সামনে আসে। مَلَائِكَة-এর সঙ্গে কর্তৃত্ব ও কার্যকরী ক্ষমতার শব্দমূলগত সম্পর্ক, عَرْش-এর সঙ্গে উচ্চতর কাঠামো ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক এবং حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ-এর পরিবেষ্টনমূলক বাক্যগঠন একত্রে একটি ব্যবস্থাগত পাঠের সুযোগ দেয়।
সেই পাঠে আয়াতটি এমন একটি দৃশ্য উপস্থাপন করতে পারে যেখানে আল্লাহর কর্তৃত্বের কার্যকরী শক্তি বা ব্যবস্থা তাঁর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের কাঠামোকে কেন্দ্র করে সংগঠিত, তাঁর রব্বীয় গুণ ও পরিপূর্ণতার স্বীকৃতি দেয়, এবং সত্যের ভিত্তিতে ফয়সালা সম্পন্ন হওয়ার পর সমস্ত হামদের উৎস হিসেবে আল্লাহকেই ঘোষণা করা হয়।
তবে এটিকে একটি গবেষণামূলক ব্যাখ্যা হিসেবেই রাখা উচিত। চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণের জন্য কুরআনে مَلَك, مَلَائِكَة, عَرْش, مَلَكُوت এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শব্দের সকল ব্যবহার একত্রে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

