“আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় ‘দুনিয়া’ বলতে সাধারণত পৃথিবী, এই জগত, পার্থিব জীবন এবং আমরা যে গ্রহে বাস করি—সবকিছুকেই ঢালাওভাবে বোঝানো হয়। ফলে ‘দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে’ বললে সাধারণত মনে হয় মানুষ একদিন পৃথিবী গ্রহটি ত্যাগ করবে। কিন্তু কুরআনের শব্দব্যবহারকে সরাসরি ও নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এক অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষাগত ও অস্তিত্বমূলক পার্থক্য উন্মোচিত হয়। কুরআনে ভৌত পৃথিবী বা মাটির ভূমণ্ডলের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ হলো الْأَرْضُ (আল-আরদ); আর الدُّنْيَا (আদ্-দুনইয়া) মূলত একটি অবস্থানগত বা গুণবাচক শব্দ, যা বিশেষভাবে الْحَيَاةُ الدُّنْيَا (আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া) অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট কালিক ও মানসিক জীবনপর্যায়কে নির্দেশ করে। এই দুই শব্দকে সমার্থক মনে করলে কুরআনের মহাজাগতিক ও দার্শনিক বার্তার এক বিশাল দিগন্ত আড়াল হয়ে যায়।”
কুরআনের নিজস্ব পাঠে ফিরে গেলে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবী (الْأَرْض) আল্লাহর অপার সৃষ্টি ও নিদর্শনের আধার, যা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য মানুষকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে, ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’ (الْحَيَاةُ الدُّنْيَا) সম্পর্কে দেওয়া হয়েছে গভীর সতর্কতা—যাতে মানুষ সাময়িক মোহে পড়ে তার চিরস্থায়ী গন্তব্যকে ভুলে না যায়। অতএব, কুরআনে ‘দুনিয়া’ কি কেবলই আমাদের গ্রহ পৃথিবী? নাকি এর পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে বিশেষ ভাষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকরণ? এই গবেষণাপত্রে আমরা কুরআনের শব্দমূল, ব্যাকরণ ও তুলনামূলক আয়াতের মাধ্যমে সেই সত্যটি উন্মোচন করব।
📊 সারণি ১: মূলশব্দ ও ব্যুৎপত্তিগত ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Root & Etymological Framework)
কুরআনিক শব্দমূল| মূলধাতু (Root) | কুরআনিক মূলশব্দ | প্রাথমিক ব্যুৎপত্তিগত অর্থ | কুরআনিক প্রয়োগ ও গভীর তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| أ ر ض | الْأَرْض (আল-আরদ) | তলদেশ, ভিত্তি, ভূমি, বিস্তীর্ণ সমতল ক্ষেত্র, মহাজাগতিক মাটি। | কুরআনে ৪৬১ বার এসেছে। এটি ভৌত পৃথিবী, ভূখণ্ড, শস্যভূমি ও মহাজাগতিক ক্ষেত্রকে নির্দেশ করে। |
| د ن و | الدُّنْيَا / أَدْنَىٰ (আদ্-দুনইয়া / আদনা) | কাছে আসা, নিকটবর্তী হওয়া, নিচে অবস্থান করা, প্রাথমিক বা নিম্নতর পর্যায়। | কুরআনে ১৩৩ বার ব্যবহৃত হয়েছে। স্থানিক, কালিক ও মর্যাদাগত নৈকট্য ও নিম্ন অবস্থান বোঝায়। |
| أ خ ر | الْآخِرَة (আল-আখিরাহ) | পেছনে থাকা, পরবর্তী হওয়া, পরে আসা, চূড়ান্ত সমাপ্তি বা পরিণতি। | কুরআনে ১১৫ বার এসেছে। সর্বদা ‘দুনইয়া’র ক্ষণস্থায়ী পর্বের বিপরীতে চিরন্তন ও চূড়ান্ত পর্ব হিসেবে চিত্রিত। |
| غ ر ر | الْغُرُور / مَتَاعُ الْغُرُور | অসতর্ক করা, মোহাচ্ছন্ন করা, মরীচিকার ন্যায় বিভ্রান্ত করা। | পার্থিব জীবনের অস্থায়ী চটক যখন মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য আড়াল করে ফেলে (৩:১৮৫, ৩১:৩৩)। |
| س ي ر | سِيرُوا (সীরূ) | গতিশীল পরিভ্রমণ, অনুসন্ধানমূলক চলাফেরা, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান। | আল-আরদে বিচরণ করে সৃষ্টির সূচনা ও অতীত জাতির পরিণতি প্রত্যক্ষ করার ঐশী আহ্বান (২৯:২০)। |
| ن ظ ر | فَانظُرُوا (ফানযুরূ) | তাকানো, গভীর চিন্তা সহকারে পর্যবেক্ষণ করা, কারণ অনুসন্ধান। | কেবল চর্মচক্ষে দেখা নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও অনুধাবনের নির্দেশ (২৯:২০, ৩:১৩৭)। |
| آ ث ر | تُؤْثِرُونَ (তুথিরূন) | অগ্রাধিকার দেওয়া, অন্য কিছুর ওপর বাছাই করে বেছে নেওয়া। | স্থায়ী আখিরাতের চেয়ে ক্ষণস্থায়ী নিকটবর্তী জীবনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিক রোগ (৮৭:১৬)। |
| م ت ع | مَتَاع (মাতা‘) | সীমিত সময়ের ব্যবহার্য আসবাবপত্র, সাময়িক ভোগসামগ্রী। | পার্থিব সুযোগ-সুবিধা যা গন্তব্য নয়, বরং পথের ক্ষণস্থায়ী উপকরণ (২৮:৬০, ৫৭:২০)। |
১ ‘আল-আরদ’ (الْأَرْض) কী? কুরআনে ভৌত পৃথিবী ও মহাজাগতিক পরিসর
পবিত্র কুরআনে الْأَرْض (আল-আরদ) শব্দটি ভূমি, মাটি, ভূখণ্ড এবং সামগ্রিক মহাজাগতিক গ্রহ হিসেবে পৃথিবী নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে। যখনই আল্লাহ তায়ালা জড় সৃষ্টি, মহাকাশ, বৃষ্টিপাত, নদ-নদী কিংবা উদ্ভিদজগতের আলোচনা করেছেন, তখন প্রায় সর্বত্রই ‘আল-আরদ’ শব্দটিকে আকাশমণ্ডল (السَّمَاوَات)-এর সমান্তরালে উপস্থাপন করেছেন।
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّن نَّبَاتٍ شَتَّىٰ
অনুবাদ: “যিনি তোমাদের জন্য আল-আরদকে বিস্তৃত আবাসস্থল করেছেন, তাতে তোমাদের চলাচলের পথসমূহ স্থাপন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন; অতঃপর তা দ্বারা আমরা বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।”
এই আয়াতে লক্ষ্য করুন: الْأَرْضَ (আল-আরদ)-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে রাস্তাঘাট (سُبُلًا), আকাশ থেকে পতিত বৃষ্টি এবং বিচিত্র জাতের উদ্ভিদ (نَبَاتٍ شَتَّىٰ)। অর্থাৎ এখানে ‘আল-আরদ’ কোনো রূপক বা ধারণাগত বিষয় নয়, বরং সম্পূর্ণ বাস্তব, স্পর্শযোগ্য এক ভৌত গ্রহ বা ভূমণ্ডল।
একইভাবে মহাজাগতিক উৎপত্তির বর্ণনায় কুরআনে আকাশসমূহ এবং পৃথিবীর সংযোগ ও পৃথকীকরণের কথা এসেছে:
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ
অনুবাদ: “যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে তারা কি দেখেনি যে, আকাশসমূহ ও আল-আরদ ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত অবস্থায় ছিল, অতঃপর আমরা উভয়কে পৃথক করেছি? এবং পানি থেকে আমরা প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি। তবুও কি তারা উপলব্ধি ও বিশ্বাস স্থাপন করবে না?”
এখানেও আস্-সামাওয়াত (আকাশসমূহ) এবং আল-আরদ (পৃথিবী) একটি মহাজাগতিক ও পদার্থবিজ্ঞানের বাস্তব বর্ণনায় এসেছে। কুরআন কোথাও বলেনি যে ‘আকাশসমূহ এবং দুনইয়া সংযুক্ত ছিল’। বরং বলা হয়েছে ‘আকাশসমূহ ও আল-আরদ’। অতএব, অস্তিত্বমূলক অর্থে পৃথিবী হলো ‘আল-আরদ’।
২ তাহলে ‘আদ্-দুনইয়া’ (الدُّنْيَا) কী? রুটগত ব্যুৎপত্তি ও অবস্থানগত অর্থ
আরবি ভাষায় الدُّنْيَا (আদ্-দুনইয়া) কোনো গ্রহের ভৌগোলিক নাম নয়। শব্দটির মূল ধাতু হলো:
কাছে আসা • নিকটবর্তী হওয়া • নিম্নবর্তী হওয়া • হাতের নাগালে থাকা
এই মূলধাতু থেকে নির্গত অন্যান্য রূপগুলোর দিকে তাকালে অর্থ আরও পরিষ্কার হয়:
- دَنَا (দানা): সে কাছে এলো, নিকটবর্তী হলো (যেমন সূরা আন-নাজম ৫৩:৮: ছুম্মা দানা ফাতাদাল্লা — অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন)।
- أَدْنَىٰ (আদনা): অধিকতর নিকটবর্তী, নিম্নতর বা ক্ষুদ্রতর (যেমন সূরা আল-বাকারা ২:৬১: আতাসতাবদিলূনাল্লাযী হুয়া আদনা — তোমরা কি উৎকৃষ্টের বিনিময়ে নিকৃষ্ট/নিম্নতর বস্তু গ্রহণ করতে চাও?)।
- دَانِيَةٌ (দানিয়াহ): ফলভারে অবনত বা হাতের কাছে থাকা (যেমন সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:২৩: কুতূফুহা দানিয়াহ — যার ফলসমূহ অতি নিকটে অবনত)।
- الدُّنْيَا (আদ্-দুনইয়া): এটি ব্যাকরণগতভাবে ‘আদনা’ (أَدْنَىٰ)-এর স্ত্রীলিঙ্গ রূপ (Superlative Feminine Noun), যার অর্থ ‘সর্বাধিক নিকটবর্তী’ বা ‘নিম্নতম’।
এর অকাট্য প্রমাণ রয়েছে সূরা আল-আনফালের একটি ঐতিহাসিক আয়াতে, যেখানে যুদ্ধের ময়দানে ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘দুনইয়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে:
إِذْ أَنتُم بِالْعُدْوَةِ الدُّنْيَا وَهُم بِالْعُدْوَةِ الْقُصْوَىٰ وَالرَّكْبُ أَسْفَلَ مِنكُمْ
অনুবাদ: “স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে উপত্যকার নিকটবর্তী প্রান্তে (বিল-‘উদওয়াতিদ্-দুনইয়া) এবং তারা ছিল দূরবর্তী প্রান্তে (বিল-‘উদওয়াতিল-কুসওয়া), আর কাফেলাটি ছিল তোমাদের চেয়েও নিম্নভূমিতে।”
এই আয়াতে الْعُدْوَةِ الدُّنْيَا-কে কোনোভাবেই “পৃথিবী উপত্যকা” বলা অসম্ভব! এখানে এর অর্থ শতভাগ সুস্পষ্ট: “নিকটতম প্রান্ত”। কারণ তার বিপরীতে রয়েছে الْعُدْوَةِ الْقُصْوَىٰ অর্থাৎ “সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্ত”। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ‘দুনইয়া’ শব্দের ভেতরে মূলত নিকটবর্তী হওয়া ও নিম্নবর্তী থাকা-র দ্যোতনা কাজ করে।
৩ ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’: এক বিশেষ অস্তিত্বগত ও কালিক পর্যায়
কুরআন যখন জীবন বোঝাতে চায়, তখন শুধু ‘দুনইয়া’ বলে না; বরং প্রায় সর্বত্র শব্দবন্ধটি আসে এভাবে:
কুরআন এই নিকটবর্তী জীবনকে সর্বদা الْآخِرَة (আল-আখিরাহ) অর্থাৎ ‘পরবর্তী বা চূড়ান্ত জীবনপর্যায়ের’ মুখোমুখি স্থাপন করেছে। যেমন সূরা আল-বাকারায় বলা হয়েছে:
أُولَٰئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا بِالْآخِرَةِ ۖ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ الْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ
অনুবাদ: “তারাই তারা, যারা আল-আখিরাহর (পরবর্তী জীবনের) বিনিময়ে আল-হায়াতুদ্-দুনইয়াকে (নিকটবর্তী জীবনকে) খরিদ করেছে; অতএব তাদের থেকে শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোনো সাহায্যও পাবে না।”
একই তুলনামূলক সমীকরণ ধ্বনিত হয়েছে সূরা আল-আ‘লা-তে:
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
অনুবাদ: “বরং তোমরা আল-হায়াতুদ্-দুনইয়াকেই (নিকটবর্তী পার্থিব জীবনকে) অগ্রাধিকার দিয়ে থাকো; অথচ আল-আখিরাহই হলো সর্বোত্তম এবং অধিকতর স্থায়ী।”
এখানে أَبْقَىٰ (আবকা) শব্দের অর্থ ‘অধিক স্থায়ী’। এর বিপরীত মেরুতে থাকা ‘দুনইয়া’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘ক্ষণস্থায়ী, প্রাথমিক ও দ্রুত বিলীন হয়ে যাওয়া নিকটবর্তী অবস্থা’। অর্থাৎ এটি কোনো ভূগোলের নাম নয়, মানুষের আয়ুষ্কালের বর্তমান অধ্যায়।
৪ ‘দুনিয়া’ কি পৃথিবীর নাম? ‘আস-সামা-আদ্-দুনইয়া’ বা নিকটবর্তী মহাকাশের সাক্ষ্য
আমাদের প্রচলিত ধারণার সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো:
কুরআন নিজেই এই সরল সমীকরণকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। কুরআন বহু স্থানে মহাকাশ ও আকাশমণ্ডলের বর্ণনায় ‘দুনইয়া’ শব্দ ব্যবহার করেছে:
إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةٍ الْكَوَاكِبِ
অনুবাদ: “নিশ্চয় আমরা নিকটবর্তী আকাশকে (আস্-সামা-আদ্-দুনইয়া) গ্রহ-নক্ষত্রের শোভা দ্বারা সুসজ্জিত করেছি।”
অনুরূপ আয়াত রয়েছে সূরা আল-মুলকেও:
وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُومًا لِّلشَّيَاطِينِ ۖ وَأَعْتَدْنَا لَهُمْ عَذَابَ السَّعِيرِ
অনুবাদ: “এবং আমরা নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা (উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক) দ্বারা শোভিত করেছি এবং সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ করেছি...”
যদি ‘দুনইয়া’ অর্থ পৃথিবী হতো, তবে السَّمَاءَ الدُّنْيَا-র অনুবাদ কী হতো? “পৃথিবী আকাশ”? যা একেবারেই অর্থহীন! এখানে ‘দুনইয়া’ শব্দটি السَّمَاء (আকাশ)-এর গুণবাচক বিশেষণ (Adjective) হিসেবে বসেছে, যার অর্থ: “মানুষের দৃষ্টির সর্বাধিক নিকটবর্তী আকাশ বা দৃশ্যমান মহাজাগতিক দিগন্ত”। এটি প্রমাণ করে যে, ‘দুনইয়া’ কোনো বস্তুর নিজস্ব নাম নয়; বরং পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে নৈকট্য নির্দেশক একটি আপেক্ষিক শব্দ।
⚖️ সারণি ২: ‘আল-আরদ’ (الْأَرْض) বনাম ‘আদ্-দুনইয়া’ (الدُّنْيَا) — কুরআনিক তুলনামূলক পার্থক্য
কাঠামোগত তুলনা| তুলনার ক্ষেত্র | ‘আল-আরদ’ (الْأَرْض) | ‘আদ্-দুনইয়া’ (الدُّنْيَا) |
|---|---|---|
| শব্দতাত্ত্বিক পরিচয় | নির্দিষ্ট বিশেষ্য (Proper Noun / Substance); ভৌত গ্রহ ও ভূমণ্ডলের নাম। | গুণবাচক বিশেষণ (Superlative Adjective); নিকটবর্তী বা নিম্নতর অবস্থান নির্দেশক। |
| মূলধাতু ও রূপ | أ ر ض | د ن و |
| কুরআনিক নির্দেশনার ধরন | সৃষ্টি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ: سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا (বিচরণ করো ও গবেষণা করো)। | মোহ ও আসক্তি বর্জন: فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا (নিকট জীবনের মোহে প্রতারিত হয়ো না)। |
| মহাজাগতিক সম্পর্ক | আকাশমণ্ডলের ভৌত জোড়: السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ (আকাশসমূহ ও পৃথিবী)। | আকাশের স্থানিক নৈকট্য: السَّمَاءِ الدُّنْيَا (নিকটবর্তী আকাশ/দিগন্ত)। |
| কুরআনে পুনরাবৃত্তির সংখ্যা | ৪৬১ বার | ১৩৩ বার (রুট d-n-w) / ১১৫ বার (দুনইয়া বিশেষ্য) |
| চূড়ান্ত পরিণতি | ভৌগোলিক পুনর্গঠন: কিয়ামতের দিন এই জমিন অন্য জমিনে রূপান্তরিত হবে (১৪:৪৮)। | কালিক অবসান: এই সাময়িক অধ্যায় সমাপ্ত হয়ে স্থায়ী আখিরাত পর্ব উন্মোচিত হবে। |
| মানুষের সাপেক্ষে অবস্থান | যেখানে মানুষ শারীরিকভাবে বাস করে, খাদ্য ফলায় ও বিজ্ঞান চর্চা করে। | মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, অগ্রাধিকার, লোভ, ভোগ ও অহংকারের প্রতিযোগিতা। |
৫ ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’ নিয়ে এত সতর্কতা কেন? মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা ও ফসলের রূপক
সূরা আল-হাদীদে আল্লাহ তায়ালা ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’র এক অবিস্মরণীয় সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ উপস্থাপন করেছেন:
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا ۖ وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ ۚ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অনুবাদ: “তোমরা জেনে রাখো, আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া তো কেবল খেলাধুলা, অনর্থক আমোদ-প্রমোদ, চাকচিক্যময় সাজসজ্জা, তোমাদের পরস্পরের মাঝে অহংকার প্রদর্শন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা। এর দৃষ্টান্ত এক বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন শস্য কৃষকদের মুগ্ধ করে; অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তাকে বিবর্ণ হলুদ দেখতে পাও, তারপর তা শুষ্ক খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর আল-আখিরাতে রয়েছে কঠোর শাস্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও পরম সন্তুষ্টি। আর আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া তো প্রতারণাময় সাময়িক ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
এই অসাধারণ আয়াতে লক্ষ্য করুন: আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী, বাতাস, মাটি, খনিজ সম্পদ বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে ‘প্রতারণা’ বলেননি। বরং তিনি মানুষের ৬টি নির্দিষ্ট মানসিক ও আচরণিক ফাঁদকে ‘দুনইয়া’ জীবনের লক্ষণ বলে চিহ্নিত করেছেন:
উদ্দেশ্যহীন ক্রীড়া-কৌতুক ও জীবনের মূল লক্ষ্য ভুলিয়ে দেওয়া সময়ক্ষেপণ।
অনর্থক বিনোদন যা মানবমনকে গুরুতর দায়িত্ব ও চেতনা থেকে অসতর্ক রাখে।
বাহ্যিক মেকি চাকচিক্য ও লোকদেখানো প্রদর্শনে মত্ত থাকা।
বংশমর্যাদা, ক্ষমতা ও আভিজাত্যের পারস্পরিক অহমিকা ও বড়াই।
অধিক ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত করে অন্যের চেয়ে ধনী হওয়ার উন্মাদনা।
লোকবল ও বংশধর সংখ্যা নিয়ে শক্তিমত্তা জাহির করা।
অতএব, কুরআনিক সতর্কবার্তাটি পৃথিবীর মাটির বিরুদ্ধে নয়; এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি ও লক্ষ্যভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে।
৬ প্রকৃতি ও সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ কি নিষিদ্ধ? ‘আল-আরদে’ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রত্যক্ষ ঐশী নির্দেশ
কেউ যদি মনে করে “দুনিয়া ত্যাগ করা মানেই পৃথিবীর প্রকৃতি ও বিজ্ঞান ত্যাগ করা”, তবে সে কুরআনের চরম বিরুদ্ধাচরণ করে। কারণ কুরআন সরাসরি মানুষের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পরিভ্রমণ করে সৃষ্টির সূচনালগ্ন আবিষ্কার করতে:
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ۚ ثُمَّ اللَّهُ يُنشِئُ النَّشْأَةَ الْآخِرَةَ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অনুবাদ: “বলুন: তোমরা আল-আরদে (পৃথিবীতে) বিচরণ করো এবং গভীর অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করো—কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছেন! অতঃপর আল্লাহ পরবর্তী সৃষ্টি-পর্যায় (আখিরাত) উদ্ভূত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।”
এই একটি আয়াতই পুরো বিষয়টি স্ফটিকের মতো পরিষ্কার করে দেয়:
- এখানে ব্যবহৃত শব্দ হলো فِي الْأَرْضِ (ফিল-আরদ) — অর্থাৎ এই ভৌত পৃথিবীতে।
- নির্দেশ হলো سِيرُوا (সীরূ) — পরিভ্রমণ ও অনুসন্ধান করো।
- উদ্দেশ্য হলো فَانظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ — কসমোলজি, ভূতত্ত্ব, জীবাশ্মবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের মাধ্যমে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার সূচনা আবিষ্কার ও পাঠ করো।
যদি পৃথিবী বা জড়জগতই ‘প্রতারণা’ বা অপবিত্র হতো, তবে আল্লাহ তায়ালা এর মাটি ও সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার আদেশ দিতেন না। স্পষ্টতই, ‘আল-আরদ’ হলো গবেষণার গবেষণাগার, আর ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’ হলো সতর্কতার মনস্তাত্ত্বিক আঙিনা।
৭ পার্থিব রিযিক ও সৌন্দর্য কি হারাম? মুমিনদের জন্য বৈধ অনুগ্রহ
কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বৈরাগ্যবাদী বা সন্ন্যাসবাদী (monastic) দর্শন নয়। সূরা আল-আ‘রাফে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সেই সব সংকীর্ণমনা মনোভাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন যারা আল্লাহর সৃষ্টি ও সৌন্দর্যকে পরিহার করতে বলে:
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ ۚ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদ: “বলুন: আল্লাহর সেই সৌন্দর্য ও অলংকারকে কে হারাম করেছে যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য উদ্ভাবন করেছেন, এবং পবিত্র উত্তম রিযিকসমূহকে কে নিষিদ্ধ করেছে? বলুন: এগুলো আল-হায়াতুদ্-দুনইয়াতেও (বর্তমান পার্থিব জীবনেও) ঈমানদারদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে তা বিশেষভাবে কেবল তাদেরই জন্য নির্ধারিত হবে।”
এই আয়াতটি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেয়: পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য ও রিযিক ভোগ করা কোনো অপরাধ নয়। সমস্যা ঘটে তখন, যখন এই সাময়িক উপকরণকে মানুষ চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে এবং এর মোহে পড়ে আল্লাহর স্মরণ ও আখিরাতকে বিস্মৃত হয়।
⚖️ সারণি ৩: ‘আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া’ বনাম ‘আল-আখিরাহ’ — অস্তিত্বগত ও কাঠামোগত সম্পর্ক
দুই অস্তিত্বগত স্তর| বৈশিষ্ট্যের মাত্রা | আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া (الْحَيَاةُ الدُّنْيَا) | আল-আখিরাহ (الْآخِرَة) |
|---|---|---|
| ব্যুৎপত্তিগত অবস্থান | নিকটবর্তী, নিম্নতর, প্রাথমিক স্তর (রুট: د ن و)। | পরবর্তী, চূড়ান্ত, অন্তিম স্থায়ী স্তর (রুট: أ خ ر)। |
| কালের স্থায়িত্ব | ক্ষণস্থায়ী; শুকিয়ে যাওয়া খড়কুটো বা আবর্জনার মতো ভঙ্গুর (حُطَامًا)। | অনন্তকাল ও চিরস্থায়ী; যা উত্তম ও অক্ষয় (خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ)। |
| কার্যগত ভূমিকা | পরীক্ষাক্ষেত্র (دَارُ الِابْتِلَاء); কর্ম ও পাথেয় অর্জনের মঞ্চ। | প্রতিফলের ক্ষেত্র (دَارُ الْجَزَاء); চূড়ান্ত ফসল তোলার নিবাস। |
| ভোগের স্বরূপ | মাতা‘ (مَتَاع); সীমিত ও ক্ষণস্থায়ী আসবাব, যা শেষ হয়ে যায়। | দারুল কারার (دَارُ الْقَرَار); চিরন্তন শান্তি, সন্তুষ্টি ও পরম সাফল্য। |
| কুরআনিক ভারসাম্য বিধান | পার্থিব বৈধ অংশ গ্রহণ করো, মোহে আত্মহারা হয়ো না (২৮:৭৭)। | আখিরাতকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও একমাত্র অভীষ্ট বানাও। |
৮ ‘দুনইয়া’ ও ‘আখিরাহ’: দুটি পরপর অস্তিত্বগত ধাপ (২৮:৬০)
কুরআনে الدُّنْيَا এবং الْآخِرَة-কে সময়ের একটি অবিচ্ছিন্ন রেখার দুটি ধাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে:
وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا ۚ وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
অনুবাদ: “তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো কেবল আল-হায়াতুদ্-দুনইয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগসামগ্রী ও তার বাহ্যিক চাকচিক্য মাত্র; আর আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা বহুগুণে উত্তম এবং অধিকতর স্থায়ী। তবুও কি তোমরা তোমাদের বুদ্ধি-বিবেক প্রয়োগ করবে না?”
এখানে আল্লাহ বিবেকবানদের প্রশ্ন করেছেন: أَفَلَا تَعْقِلُونَ — তোমরা কি বোধশক্তি প্রয়োগ করবে না? একজন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ কোনোদিন একটি ক্ষণস্থায়ী আসবাবের বিনিময়ে তার অনন্তকালের সৌভাগ্য বিসর্জন দিতে পারে না।
৯ ‘দুনইয়া’ মানে কেবল পাপ বা পঙ্কিলতা নয়: ইউসুফ (আ.)-এর দোয়া ও উভয় জগতে অভিভাবকত্ব
অনেকে ভুলবশত মনে করেন ‘দুনইয়া’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়াই যেন কোনো মন্দ বা অভিশপ্ত বিষয়ের ইঙ্গিত। কিন্তু কুরআন এই ভ্রান্তিকেও চূর্ণ করেছে। আল্লাহর সম্মানিত নবী ইউসুফ (আ.) স্বয়ং দোয়া করেছেন এই শব্দ ব্যবহার করে:
رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
অনুবাদ: “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে রাষ্ট্রশাসনের ক্ষমতা দিয়েছেন এবং আমাকে বিষয়সমূহের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার জ্ঞান শিখিয়েছেন। হে আকাশসমূহ ও আল-আরদের আদি স্রষ্টা! আপনিই আদ্-দুনইয়া (বর্তমান জীবন) এবং আল-আখিরাতে (পরবর্তী জীবনে) আমার অভিভাবক ও বন্ধু। আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের দলভুক্ত করুন।”
এই দোয়ার বাক্যবিন্যাসটি গভীর অনুধ্যানের দাবি রাখে:
- এখানে ভৌত মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে: فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ (আকাশসমূহ ও আল-আরদের স্রষ্টা)।
- আর অস্তিত্ব ও সময়ের দুই পর্বের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে: فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ (দুনইয়া ও আখিরাতে)।
যদি ‘দুনইয়া’ অপবিত্র বা পরিত্যাজ্য কোনো বিষয় হতো, তবে নবী ইউসুফ (আ.) বলতেন না যে “আপনি দুনইয়াতেও আমার ওলী বা অভিভাবক”। অতএব, ‘দুনইয়া’ হলো মানব অভিযাত্রার বর্তমান পর্যায়—যার মধ্যে আল্লাহর অভিভাবকত্ব কামনা করা এক মহান নববী আদর্শ।
১০ ‘দুনিয়ার মোহ’ বনাম ‘পৃথিবী’: غ ر ر শব্দমূল এবং সতর্কতার প্রকৃত কেন্দ্র
কুরআন যখন বলে مَتَاعُ الْغُرُورِ, তখন প্রশ্ন ওঠে: ‘আল-গুরূর’ (الْغُرُور) শব্দটির তাৎপর্য কী?
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۖ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ ۗ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অনুবাদ: “প্রতিটি প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কেবল কিয়ামতের দিনই তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। অতএব যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই প্রকৃত সফলকাম হলো। আর আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া প্রতারণাপূর্ণ সাময়িক ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
الْغُرُور (আল-গুরূর) শব্দটি এসেছে غ-ر-ر মূল থেকে। এর মূল অর্থ হলো অসতর্কতার সুযোগে কাউকে ভ্রান্তিতে নিপতিত করা, এমন কিছুর প্রতি চিত্তাকর্ষণ যা দেখতে চমৎকার মনে হলেও বাস্তবে ক্ষণস্থায়ী ও অসার।
সূরা লুকমানেও একই সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে দ্বৈত শক্তির বিরুদ্ধে:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لَّا يَجْزِي وَالِدٌ عَن وَلَدِهِ وَلَا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَن وَالِدِهِ شَيْئًا ۚ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ ۖ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
অনুবাদ: “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো এবং সেই দিনকে ভয় করো, যেদিন কোনো পিতা তার সন্তানের পক্ষ থেকে কোনো উপকারে আসবে না এবং কোনো সন্তানও তার পিতার পক্ষ থেকে সামান্যতম কিছু লাঘব করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; অতএব আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে, এবং সেই মহাপ্রবঞ্চক (ইবলিস শয়তান) যেন আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের বিভ্রান্ত না করে।”
এখানে লক্ষ্য করুন: মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে দুটি বিষয় থেকে—এক, নিকটবর্তী জীবনের মোহাবিষ্টতা; দুই, শয়তানের প্রতারণা। পৃথিবী নামক গ্রহটিকে কোথাও প্রতারক বলা হয়নি। প্রতারক হলো মানুষের অন্তরের ভুল মূল্যায়ন ও অগ্রাধিকারের ভ্রষ্টতা।
১১ পৃথিবী ছেড়ে নয়, মোহের দাসত্ব থেকে মুক্তি: পরম ভারসাম্য ও ‘নাসীবাকা মিনাদ্-দুনইয়া’
কুরআনের সার্বিক দর্শনের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও বিস্ময়কর রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে সূরা আল-কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে। এখানে কারূনের ঘটনার মাধ্যমে পুরো মানবজাতিকে একটি স্বর্গীয় মূলনীতি দান করা হয়েছে:
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
অনুবাদ: “আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দান করেছেন তার মাধ্যমে তুমি আল-আখিরাহর আবাস অনুসন্ধান করো; এবং দুনিয়া থেকে তোমার বৈধ অংশটুকু ভুলে যেয়ো না। আর মানুষের প্রতি সেরূপ সদাচরণ ও অনুগ্রহ করো যেরূপ আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন; এবং আল-আরদে (পৃথিবীতে) বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।”
এই একটি আয়াতের ভেতরেই চারটি চতুর্মুখী কুরআনিক মূলনীতি সন্নিবেশিত হয়েছে:
- চূড়ান্ত লক্ষ্য:
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ— সমস্ত মেধা, সম্পদ ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে আখিরাতের মুক্তি অর্জন করা। - বাস্তববাদী ভারসাম্য:
وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا— দুনিয়ার বৈধ প্রয়োজন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, জ্ঞানার্জন ও জীবনধারণের অংশ অবহেলা না করা। - সামাজিক পরোপকার:
وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ— আল্লাহর রহমতের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সৃষ্টির কল্যাণে নিয়োজিত থাকা। - পৃথিবী সংরক্ষণ:
وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ— ভৌত পৃথিবী বা সমাজে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক ফ্যাসাদ না ছড়ানো।
এখানে লক্ষ্য করুন: ফ্যাসাদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে فِي الْأَرْضِ (ফিল-আরদ) অর্থাৎ ভৌত পৃথিবীতে। আর নিজের অংশ ভুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছে مِنَ الدُّنْيَا (মিনাদ্-দুনইয়া) অর্থাৎ পার্থিব জীবন থেকে। শব্দদ্বয়ের এমন নিখুঁত ও ওজনদার প্রয়োগ কুরআনের অলৌকিক ভাষাতত্ত্বেরই পরিচায়ক।
📑 সারণি ৪: কুরআনে ‘দুনইয়া’ (الدُّنْيَا) শব্দের বহুমুখী প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপট
অর্থের বৈচিত্র্য| প্রয়োগের প্রেক্ষাপট | কুরআনিক শব্দবন্ধ | আয়াত রেফারেন্স | প্রসঙ্গ ও তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| স্থানিক নৈকট্য (Spatial Proximity) | الْعُدْوَةِ الدُّنْيَا | ৮:৪২ | বদর যুদ্ধের উপত্যকার ‘নিকটবর্তী প্রান্ত’; এখানে গ্রহ বা পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক নেই। |
| মহাজাগতিক স্তর (Cosmic Horizon) | السَّمَاءَ الدُّنْيَا | ৩৭:৬, ৬৭:৫ | পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টির সবচেয়ে কাছের আকাশ বা দৃশ্যমান সৌর-মহাজাগতিক স্তর। |
| জীবনপর্যায় (Life Stage) | الْحَيَاةَ الدُّنْيَا | ২:৮৬, ৮৭:১৬ | মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী বর্তমান পরীক্ষামূলক প্রাথমিক জীবনপর্ব। |
| ঐশী অভিভাবকত্ব (Divine Guardianship) | فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ | ১২:১০১ | বর্তমান ও পরবর্তী উভয় জগতে আল্লাহর অভিভাবকত্ব কামনা (ইউসুফ আ.-এর দোয়া)। |
| বৈধ অংশ ও উপভোগ (Legitimate Provision) | نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا | ২৮:৭৭, ৭:৩২ | পার্থিব জীবনের প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান ও রিযিকের স্বাভাবিক অধিকার। |
| মানসিক ফাঁদ ও মোহ (Cognitive Delusion) | مَتَاعُ الْغُرُورِ | ৩:১৮৫, ৫৭:২০ | আখিরাত ভুলে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও অহমিকাকেই জীবনের পরম সত্য মনে করার মানসিক ভ্রান্তি। |
১২ সামগ্রিক সংশ্লেষ ও রূপরেখা: শব্দগুলোর সম্পর্ক ও চূড়ান্ত পাঠ
কুরআনিক শব্দব্যবহারের এই গভীর পাঠ আমাদের একটি মৌলিক উপলব্ধি এনে দেয়:
الْأَرْض (আল-আরদ) ➔ ভৌত মঞ্চ
এটি মাটি, পর্বতমালা, মহাসমুদ্র ও গ্রহমণ্ডল। এর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টিতত্ত্বের আদি নিদর্শন। একে পর্যবেক্ষণ, অন্বেষণ ও গবেষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا)।
الدُّنْيَا (আদ্-দুনইয়া) ➔ অবস্থানগত নৈকট্য ও কালিক অধ্যায়
এটি د ن و মূল থেকে আগত এমন একটি স্তর যা মানুষের হাতের নাগালে ও বর্তমানে বিরাজমান। আকাশের ক্ষেত্রে এটি ‘নিকটবর্তী আকাশ’ (السَّمَاءَ الدُّنْيَا), উপত্যকার ক্ষেত্রে ‘নিকটবর্তী প্রান্ত’ (الْعُدْوَةِ الدُّنْيَا)।
الْحَيَاةُ الدُّنْيَا (আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া) ➔ পরীক্ষার মানসিক পর্যায়
এটি মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ক্ষণস্থায়ী জীবনপর্যায়। এর সাথে জড়িয়ে আছে অহংকার, সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ ও সন্তান-সন্ততির প্রতিযোগিতা। একেই বলা হয়েছে সাময়িক উপকরণ (مَتَاع) এবং এতে মোহাচ্ছন্ন না হওয়ার চূড়ান্ত সতর্কতা এসেছে (فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ)।
الْآخِرَة (আল-আখিরাহ) ➔ চূড়ান্ত পরিণতি ও স্থায়ী আবাস
এটি أ خ ر মূল থেকে আগত পরবর্তী ও অন্তিম জীবনপর্যায়, যা উত্তম এবং চিরস্থায়ী (خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ)।
এই কারণে “পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া” এবং “দুনিয়ার মোহের অবসান” এক বিষয় নয়। একজন মানুষ যদি ভবিষ্যতে রকেটে চড়ে মঙ্গল গ্রহে বা অন্য কোনো নক্ষত্রমণ্ডলে বসতি গড়ে, তবুও সে আল-হায়াতুদ্-দুনইয়া থেকে মুক্তি পাবে না! কারণ ‘দুনইয়া’ কোনো ভূগোলের নাম নয়, বরং মানুষের বর্তমান আয়ুষ্কালের অস্তিত্বগত সীমানা।
“কুরআনের ভাষায় মানুষের লক্ষ্য পৃথিবী ত্যাগ করা নয়, বরং পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বশীলভাবে অবস্থান করে অন্তরের মোহ, অহমিকা ও অন্ধ বস্তুবাদ থেকে মুক্ত হওয়া। পৃথিবী আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনের উন্মুক্ত কিতাব, আর ‘দুনইয়া’ হলো সতর্কতার সাথে পাড়ি দেওয়ার এক ক্ষণস্থায়ী সাকো—যার ওপারে অপেক্ষা করছে চিরস্থায়ী আল-আখিরাহ।”
— গবেষণা ও পর্যালোচনা: আলম এম. (Alam M.)

