সালাত নষ্ট করা বলতে কী বোঝায়: বনী ইসরাইলের প্রসঙ্গে কুরআন ১৯:৫৯

আলম এম.আলম এম.২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“ধর্মীয় কোনো বিধান বা উপাসনাপদ্ধতির বাহ্যিক কাঠামো এবং তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সবসময় এক বিষয় নয়। একটি ধর্মীয় কর্ম নির্দিষ্ট নিয়ম ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে পরিচালিত হতে পারে, কিন্তু সেই কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি ঘটলে কুরআনের ভাষায় সেটি ‘নষ্ট’ হয়ে যেতে পারে।”

বনী ইসরাইলের প্রসঙ্গে কুরআনের একটি আয়াত এই বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনে। সেটি হলো সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯। আয়াতটির তাৎপর্য বুঝতে হলে এর আগের ও পরের আয়াত এবং বিশেষ করে أَضَاعُوا الصَّلَاةَ (aḍā‘ū aṣ-ṣalāta) বাক্যাংশটি ভাষাগতভাবে দেখা প্রয়োজন।


বনী ইসরাইলের ধর্মীয় জীবনের পরিবর্তন

ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে বর্তমানে প্রার্থনা একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে পালিত হয়। প্রচলিত ইহুদি ব্যবস্থায় প্রতিদিনের প্রার্থনার সঙ্গে তিনটি সময় বিশেষভাবে যুক্ত:

প্রভাতী উপাসনা

শাখারিত (Shacharit)

সকালের নিয়মিত প্রার্থনা

অপরাহ্নিক উপাসনা

মিনহা (Mincha)

দিনের মধ্যভাগের পরের প্রার্থনা

নৈশ উপাসনা

মারিভ (Ma'ariv)

সন্ধ্যা বা রাতের প্রার্থনা

প্রার্থনার ক্ষেত্রে সিদ্দুর (Siddur) নামের প্রার্থনাগ্রন্থ ব্যবহৃত হয়। এতে বিভিন্ন প্রার্থনা, পাঠ ও আশীর্বাদ সংকলিত থাকে।

ঐতিহাসিক হিব্রু ঘোষণা — শেমা ইসরায়েল (Shema Yisrael)

שְׁמַע יִשְׂרָאֵל

উচ্চারণ: Shema Yisrael

অর্থ: “হে ইসরায়েল, শোনো।”

יְהוָה אֱלֹהֵינוּ יְהוָה אֶחָד

উচ্চারণ: Adonai Eloheinu, Adonai Echad

অর্থ: “আমাদের প্রভু এক।”

ইহুদি প্রার্থনার সঙ্গে জেরুজালেমের দিকে মুখ করা, নির্দিষ্ট পাঠ করা, দেহকে সামনের দিকে-পেছনের দিকে দোলানো এবং বিশেষ কিছু দিনে ভূমিতে নত হওয়ার মতো বিভিন্ন আচরণও যুক্ত রয়েছে।

তবে বর্তমান ইহুদি প্রার্থনাপদ্ধতির প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে প্রাচীন বনী ইসরাইলের সময়কার অবিকল পদ্ধতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। ধর্মীয় ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে নানা পরিবর্তন ঘটেছে।

এই পরিবর্তনের প্রসঙ্গেই কুরআনের ১৯:৫৯ আয়াতটি অনন্য এক গভীরতা নিয়ে উপস্থিত হয়।


কুরআনের ১৯:৫৮–৫৯: একটি ধারাবাহিক বক্তব্য

১৯:৫৯-এর আগে কুরআন একদল নবী ও তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা মারইয়াম (১৯:৫৮)

أُولَٰئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّينَ مِن ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِن ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا ۚ إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَٰنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

উচ্চারণ: Ulā'ika alladhīna an‘ama Allāhu ‘alayhim mina an-nabiyyīna min dhurriyyati Ādama wa mimman ḥamalnā ma‘a Nūḥin wa min dhurriyyati Ibrāhīma wa Isrā'īla wa mimman hadaynā wajtabaynā. Idhā tutlā ‘alayhim āyātu ar-Raḥmāni kharrū sujjadan wa bukiyyā.

অনুবাদ: “এরাই তারা, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন নবীদের মধ্য থেকে, আদমের বংশধরদের মধ্য থেকে এবং যাদের আমরা নূহের সঙ্গে বহন করেছিলাম তাদের মধ্য থেকে, আর ইবরাহীম ও ইসরাইলের বংশধরদের মধ্য থেকে এবং যাদের আমরা পথনির্দেশ দিয়েছি ও মনোনীত করেছি তাদের মধ্য থেকে। যখন তাদের সামনে পরম দয়াময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তারা নত হয়ে এবং ক্রন্দন করতে করতে লুটিয়ে পড়ত।”

এর পরেই আসে সেই ঐতিহাসিক ও আত্মিক পরিবর্তনের উল্লেখ:

পবিত্র কুরআন — সূরা মারইয়াম (১৯:৫৯)

فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ ۖ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا

উচ্চারণ: Fa-khalafa min ba‘dihim khalfun aḍā‘ū aṣ-ṣalāta wattaba‘ū ash-shahawāti fa-sawfa yalqawna ghayyan.

অনুবাদ: “অতঃপর তাদের পরে এমন উত্তরসূরি এলো, যারা সালাত নষ্ট করল এবং আকাঙ্ক্ষাগুলোর অনুসরণ করল। ফলে তারা অচিরেই গয়্য (পথভ্রষ্টতার পরিণতি)-এর সম্মুখীন হবে।”

এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো: “সালাত নষ্ট করা” (أَضَاعُوا الصَّلَاةَ)।

أَضَاعُوا الصَّلَاةَ — “তারা সালাত নষ্ট করল”

أَضَاعُوا (aḍā‘ū)
মূল: ض ي ع (ḍa-ya-‘a)

অর্থ: তারা নষ্ট করল / হারিয়ে ফেলল। এই ধাতুর অর্থগত পরিসরে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া, অবহেলায় কোনো কিছুর গুরুত্ব নষ্ট করা বা অপচয় করে বিনষ্ট করা।

* أَضَاعَ (aḍā‘a) হলো চতুর্থ ক্রিয়াপদ-রূপ (Form IV)। আর أَضَاعُوا (aḍā‘ū) তার ৩য় পুরুষ বহুবচন অতীত রূপ।

الصَّلَاةَ (aṣ-ṣalāta)
কুরআনিক পরিভাষা

অর্থ: সালাতকে। এটি আল্লাহর সঙ্গে সুদৃঢ় সংযোগ, আনুগত্য, সার্বক্ষণিক নৈতিক জবাবদিহিতা ও বিনম্র উপাসনার সমগ্র ব্যবস্থা।

ভাষাতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা: ‘ছেড়ে দেওয়া’ বনাম ‘নষ্ট করা’

কুরআন যা বলেনি:

تَرَكُوا الصَّلَاةَ

(tarakū aṣ-ṣalāta)

“তারা সালাত ছেড়ে দিল।”

কুরআন যা বলেছে:

أَضَاعُوا الصَّلَاةَ

(aḍā‘ū aṣ-ṣalāta)

“তারা সালাত নষ্ট করল।”

এই দুই বক্তব্য ভাষাগত ও অর্থগতভাবে কখনোই এক নয়। তারা হয়তো বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা উপাসনার রুটিন বজায় রেখেছিল, কিন্তু সালাতের আসল প্রাণ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা ও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে নষ্ট করে ফেলেছিল!


صَلَاة — সালাত শব্দের দিকে তাকানো

الصَّلَاة (aṣ-ṣalāh) কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। প্রচলিত বাংলা অনুবাদে এটি সাধারণত “নামাজ” বা “প্রার্থনা” হিসেবে অনূদিত হয়।

কিন্তু কুরআনের কোনো শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে হলে শুধু একটি প্রচলিত বাংলা প্রতিশব্দের ওপর নির্ভর না করে কুরআনে শব্দটির বিভিন্ন ব্যবহার দেখতে হয়।

সালাতের মূলধাতু নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা:
১. ص ل و (ṣa-la-wa)

সংযোগ স্থাপন, অনুগমন করা ও সুদৃঢ় সম্পর্ক রক্ষা করা।

২. ص ل ي (ṣa-la-ya)

প্রবিষ্ট হওয়া, উষ্ণতা ও ঘনিষ্ঠ সংযোগের রূপক।

তাই কোনো একটি মাত্র অভিধানগত অর্থকে সব আয়াতে যান্ত্রিকভাবে বসিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রসঙ্গের মধ্যেই শব্দটির অর্থগত পরিসর নির্ধারিত হয়।

১৯:৫৯-এর বিশেষত্ব হলো, الصَّلَاةَ (aṣ-ṣalāta) শব্দটির সঙ্গে সরাসরি أَضَاعُوا (aḍā‘ū) এবং তার ঠিক পরেই اتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ (ittaba‘ū ash-shahawāt) যুক্ত হয়েছে। এই বাক্য-সম্পর্কটি আয়াতটি সঠিকভাবে অনুধাবনের প্রধান চাবিকাঠি।


“তারা আকাঙ্ক্ষাগুলোর অনুসরণ করল”

وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ (Wattaba‘ū ash-shahawāt) “এবং তারা আকাঙ্ক্ষাগুলোর অনুসরণ করল।”
اتَّبَعُوا (ittaba‘ū)
মূল: ت ب ع (ta-ba-‘a)

এর মূল ধারণা হলো: অনুসরণ করা, পেছনে পেছনে চলা, কারও বা কোনো কিছুর পথ ধরে পদচিহ্ন অনুকরণ করা।

الشَّهَوَاتِ (ash-shahawāt)
মূল: ش ه و (sha-ha-wa)

একবচন: شَهْوَة (shahwah) — অর্থ তীব্র আকাঙ্ক্ষা, কামনা বা প্রবল ইচ্ছা। বহুবচন: شَهَوَات (shahawāt) = আকাঙ্ক্ষাসমূহ বা প্রবৃত্তির তাড়না।

আয়াতের দুটি অংশের যুগপৎ পাঠ:

أَضَاعُوا الصَّلَاةَ “তারা সালাত নষ্ট করল”
وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ “এবং তারা আকাঙ্ক্ষাগুলোর অনুসরণ করল”

কুরআন এই দুটি বিষয়কে একই বাক্যে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করেছে—একটি ঘটলে অবধারিতভাবে অন্যটি ঘটে।


“গয়্য” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا (Fa-sawfa yalqawna ghayyan) “ফলে তারা অচিরেই গয়্য (পথভ্রষ্টতার পরিণতি)-এর সম্মুখীন হবে।”
فَ (fa) ফলে / অতঃপর
سَوْفَ (sawfa) অচিরে / ভবিষ্যতে
يَلْقَوْنَ (yalqawna) সাক্ষাৎ / সম্মুখীন হবে
غَيًّا (ghayyan) গয়্য / বিপথগামিতা

غَيّ (ghayy) এসেছে غ و ي (gha-wa-ya) ধাতু থেকে। এর অর্থগত পরিসরে রয়েছে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতি, বিপথগামিতা ও পথভ্রষ্টতা।

তাই غَيًّا শব্দটিকে শুধু “গয়্য” বলে রেখে দিলে বাংলা পাঠকের কাছে অর্থটি অস্পষ্ট হতে পারে। আবার একে কোনো নির্দিষ্ট পৌরাণিক শাস্তির নাম হিসেবে রূপান্তর করাও অনুচিত, যার অর্থ আয়াত নিজে নির্ধারণ করেনি।

এখানে “গয়্য”কে কোনো কাল্পনিক স্থান বা বস্তু হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। শব্দটির নিজস্ব অর্থগত ক্ষেত্র হলো পথভ্রষ্টতা ও সত্য পথ থেকে বিচ্যুতির অনিবার্য প্রতিফল।


পরবর্তী আয়াত: ফিরে আসার পথ

১৯:৫৯-এর কঠোর সতর্কবাণীর পর কুরআন ১৯:৬০-এ একটি অসাধারণ ব্যতিক্রম ও আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা মারইয়াম (১৯:৬০)

إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا

উচ্চারণ: Illā man tāba wa āmana wa ‘amila ṣāliḥan fa-ulā'ika yadkhulūna al-jannata wa lā yuẓlamūna shay'ā.

অনুবাদ: “তবে যে তওবা করল, ঈমান আনল এবং সৎকর্ম করল, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”

تَابَ (tāba) ১. তওবা করল

ভুল উপলব্ধি করে ফিরে এলো

آمَنَ (āmana) ২. ঈমান আনল

একত্ববাদ ও আনুগত্যে অবিচল হলো

عَمِلَ صَالِحًا (‘amila ṣāliḥan) ৩. সৎকর্ম করল

ন্যায্য ও সংশোধনমূলক কাজে লিপ্ত হলো

অর্থাৎ ১৯:৫৯-এর অধঃপতনের বিবরণের পরেই কুরআন সংশোধনের জীবন্ত ও ব্যবহারিক পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে।


কুরবানি এবং বাহ্যিক আচারের প্রশ্ন

বনী ইসরাইলের ধর্মীয় ইতিহাসে পশুবলি ও মন্দিরকেন্দ্রিক উপাসনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরবর্তী সময়ে মন্দির ধ্বংসের ফলে সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে।

তবে ধর্মীয় আচারের বাহ্যিক রূপের সঙ্গে তার উদ্দেশ্যের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে কুরআনের কুরবানি-সংক্রান্ত একটি আয়াত বিশেষভাবে দিকনির্দেশনামূলক:

পবিত্র কুরআন — সূরা আল-হাজ্জ (২২:৩৭)

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ

উচ্চারণ: Lan yanāla Allāha luḥūmuhā wa lā dimā'uhā wa lākin yanāluhu at-taqwā minkum.

অনুবাদ: “আল্লাহর কাছে তাদের মাংস এবং তাদের রক্ত পৌঁছায় না; বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তাকওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে।”

لُحُوم (luḥūm)

لَحْم (laḥm)-এর বহুবচন

অর্থ: রক্তমাংস বা বাহ্যিক উৎসর্গীকৃত উপাদান।

دِمَاء (dimā’)

دَم (dam)-এর বহুবচন

অর্থ: রক্ত বা আনুষ্ঠানিক তরল বলিদান।

التَّقْوَىٰ (at-taqwā) মূল: و ق ي (wa-qa-ya)

নিজেকে রক্ষা করা, সচেতন থাকা ও আল্লাহর প্রতি দায়িত্বশীলতা।

এই আয়াতের সুস্পষ্ট বার্তা হলো: যে কোনো ধর্মীয় বিধানের বাহ্যিক উপাদানের চেয়ে মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আন্তরিকতাই আল্লাহর কাছে আসল বিচার্য।


৭০ খ্রিস্টাব্দের পর পরিবর্তন

ইহুদি ইতিহাসে ৭০ খ্রিস্টাব্দ একটি সুদূরপ্রসারী ঘটনা। রোমান বাহিনীর হাতে জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস হওয়ার পর মন্দিরকেন্দ্রিক বলিদানব্যবস্থা আর আগের অবস্থায় থাকেনি।

এরপর ইহুদি ধর্মীয় জীবনে সিনাগগ, ধর্মীয় পাঠ এবং প্রার্থনার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে প্রার্থনাগুলো সংকলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং সিদ্দুরের মতো প্রার্থনাগ্রন্থের ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইতিহাস বনাম কুরআনিক বক্তব্যের সীমারেখা:

৭০ খ্রিস্টাব্দের মন্দির ধ্বংসের ইতিহাস এক বিষয়। আর সূরা মারইয়াম ১৯:৫৯-এ “সালাত নষ্ট করা” বলতে ঠিক কোন ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে বোঝানো হয়েছে, সেটি আরেক বিষয়।

কুরআন ১৯:৫৯-এ ৭০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা উল্লেখ করেনি এবং বর্তমান ইহুদি তিন সময়ের প্রার্থনাকে সরাসরি সেই আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবেও নির্ধারণ করেনি।

তাই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে আলোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দুটিকে এক ও অভিন্ন বক্তব্য হিসেবে গুলিয়ে ফেলা যায় না।


সালাত নষ্ট করার সামগ্রিক তাৎপর্য

সূরা মারইয়াম ১৯:৫৮–৬০ একসঙ্গে পাঠ করলে ঐশী বাণীর এক অবিচ্ছেদ্য কার্যকারণ শৃঙ্খল উন্মোচিত হয়:

১. আদি আদর্শ

আয়াত পাঠে ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় লুটিয়ে পড়া

خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
২. ঐতিহাসিক বিচ্যুতি

সালাতের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট করা

أَضَاعُوا الصَّلَاةَ
৩. অধঃপতনের কারণ

প্রবৃত্তি ও জৈবিক আকাঙ্ক্ষার অন্ধ অনুসরণ

وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ
৪. অনিবার্য পরিণতি

বিপথগামিতার প্রতিফল (গয়্য)-এর সম্মুখীন হওয়া

فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا
৫. চিরন্তন মুক্তির পথ

তওবা, দৃঢ় ঈমান এবং বাস্তবমুখী সৎকর্ম

إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا

এই ধারাবাহিকতায় কুরআন যে বিষয়টি স্পষ্ট করে তা হলো: সালাতের সঙ্গে মানুষের জীবনাচরণ এবং প্রবৃত্তির অনুসরণের সরাসরি সংঘাত রয়েছে।

তাই ১৯:৫৯-এর أَضَاعُوا الصَّلَاةَ (aḍā‘ū aṣ-ṣalāta) কেবল কোনো একটি বাহ্যিক প্রার্থনাপদ্ধতি পরিত্যাগ করার সমার্থক নয়। আয়াতের ভাষা হলো “সালাতকে নষ্ট করা”, আর তার অব্যবহিত পরেই এসেছে “আকাঙ্ক্ষাগুলোর অনুসরণ”।

“কুরআনের নিজস্ব শব্দ ও বাক্য-সম্পর্কের আলোকে ১৯:৫৯-এর বক্তব্য তাই বাহ্যিক আচার কতবার সম্পন্ন করা হলো, তার চেয়ে বৃহত্তর একটি বিষয়কে সামনে রাখে: সালাতের সঙ্গে যে আনুগত্য, নৈতিকতা ও সঠিক পথের সম্পর্ক রয়েছে, সেটি হারিয়ে ফেলা।

এবং এই কারণেই ১৯:৫৯-এর পরবর্তী আয়াত ১৯:৬০-এ ফিরে আসার পথ হিসেবে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করে:
তওবা, ঈমান এবং সৎকর্ম।”
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।