সূরা আন-নিসা ২২–২৬: প্রচলিত অনুবাদের বাইরে কিছু প্রশ্ন

আলম এম.আলম এম.২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“কোনো প্রশ্ন যদি শত শত বছর ধরে করা না হয়, তাতে প্রশ্নটির সত্যতা নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কখনো কখনো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি ধুলোর নিচে চাপা পড়ে যায়, আর সেই ধুলোকেই আমরা একসময় সত্য বলে ধরে নিই।”

সূরা আন-নিসার ২২ থেকে ২৬ নম্বর আয়াত এমনই কিছু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক, বিবাহ এবং পারিবারিক বিধান নিয়ে এই আয়াতগুলো দীর্ঘকাল ধরে যে অর্থে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তার পাশাপাশি আরবি শব্দগুলোর মূল অর্থ এবং আয়াতগুলোর সামগ্রিক বক্তব্যও নতুন করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।


পূর্বপুরুষের অনুসরণ নাকি একটি পুরোনো প্রথার অবসান?

সূরা আন-নিসার ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:২২)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۚ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا

উচ্চারণ: Yā ayyuhalladhīna āmanū lā tankiḥū mā nakaḥa ābā’ukum mina an-nisā’i illā mā qad salaf. Innahū kāna fāḥishatan wa-maqtan wa-sā’a sabīlā.

অনুবাদ: হে বিশ্বাসীগণ, তোমাদের পিতৃগণ যে নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, তোমরা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করো না, যা পূর্বে হয়ে গেছে তা ব্যতীত। নিশ্চয়ই এটি ছিল অশ্লীলতা, ঘৃণ্যতা এবং একটি মন্দ পথ।

মূল শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Lexical Breakdown):

آبَاؤُكُمْ (ābā’ukum)
মূল: أ ب (a-ba)

প্রচলিত অর্থ পিতা, কিন্তু শব্দটির মধ্যে সম্মানিত বা পূর্ববর্তী প্রজন্মের ধারণাও যুক্ত হয়ে থাকে।

سَلَف (salaf)
মূল: س ل ف (sa-la-fa)

পূর্বে চলে যাওয়া, অতীত হওয়া বা পূর্ববর্তী হওয়ার অর্থ প্রকাশ করে।

فَاحِشَة (fāḥishah)
মূল: ف ح ش (fa-ḥa-sha)

নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা, নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা বা স্পষ্ট সীমালঙ্ঘন।

مَقْت (maqt)
মূল: م ق ت (ma-qa-ta)

প্রবল ঘৃণা, জঘন্যতা বা অত্যন্ত নিন্দনীয় কোনো বিষয়।

سَبِيل (sabīl)
মূল: س ب ل (sa-bi-la)

চলার পথ, পদ্ধতি বা কোনো সামাজিক প্রথাগত ধারা।

এই শব্দগুলোর সমন্বয়ে আয়াতটি এমন একটি সম্পর্ক বা প্রথার কথা সামনে আনে, যা পূর্ববর্তী সমাজে প্রচলিত ছিল এবং কুরআন সেটিকে ফাহিশাহ (fāḥishah), মাকত (maqt) এবং সাঈয়া সাবিল (sayyi’a sabīl) হিসেবে চিহ্নিত করছে।

অর্থাৎ, এখানে শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ববর্তী সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থানও দৃশ্যমান।


২৩ নম্বর আয়াত: সম্পর্কের সীমারেখা

এর পরের আয়াতে নিষিদ্ধ সম্পর্কগুলোর একটি বিস্তৃত তালিকা দেওয়া হয়েছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:২৩)

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم مِّن نِّسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا

উচ্চারণ: Ḥurrimat ʿalaykum ummahātukum wa-banātukum wa-akhawātukum wa-ʿammātukum wa-khālātukum wa-banātu al-akhī wa-banātu al-ukhti wa-ummahātukum allātī arḍaʿnakum wa-akhawātukum mina ar-raḍāʿati wa-ummahātu nisā’ikum wa-rabā’ibukumu allātī fī ḥujūrikum min nisā’ikum allātī dakhaltum bihinna fa-in lam takūnū dakhaltum bihinna fa-lā junāḥa ʿalaykum wa-ḥalā’ilu abnā’ikumu alladhīna min aṣlābikum wa-an tajmaʿū bayna al-ukhtayni illā mā qad salaf. Innallāha kāna ghafūran raḥīmā.

অনুবাদ: তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তোমাদের মায়েরা, তোমাদের কন্যারা, তোমাদের বোনেরা, তোমাদের ফুফুরা, তোমাদের খালারা, ভাইয়ের কন্যারা, বোনের কন্যারা, তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে, দুধ-সম্পর্কের বোনেরা, তোমাদের স্ত্রীদের মায়েরা এবং তোমাদের স্ত্রীদের সেই কন্যারা যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, তোমাদের সেই নারীদের পক্ষ থেকে যাদের সঙ্গে তোমরা সম্পর্ক স্থাপন করেছ। আর যদি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন না করে থাকো, তাহলে তোমাদের ওপর কোনো অপরাধ নেই। আর তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীগণ এবং দুই বোনকে একত্র করাও নিষিদ্ধ। যা পূর্বে হয়ে গেছে তা ব্যতীত। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

১. রক্ত ও দুগ্ধ সম্পর্কীয় নিষেধাজ্ঞা
  • মায়েরা (أُمَّهَاتُكُمْ) ও কন্যারা (بَنَاتُكُمْ)
  • বোনেরা (أَخَوَاتُكُمْ)
  • ফুফুরা (عَمَّاتُكُمْ) ও খালারা (خَالَاتُكُمْ)
  • ভ্রাতুষ্পুত্রী ও ভাগিনীগণ (বংশের কন্যারা)
  • দুগ্ধদানকারী মা ও দুধ-সম্পর্কের বোন
২. বৈবাহিক ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কীয় নিষেধাজ্ঞা
  • স্ত্রীদের মায়েরা (শ্বাশুড়ি)
  • তত্ত্বাবধানে থাকা সৎকন্যাগণ (শর্তসাপেক্ষ)
  • ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীগণ (পুত্রবধূ)
  • একই সময়ে দুই বোনকে একত্র করা

এই আয়াতের একটি বিশেষ শব্দ হলো دَخَلْتُم بِهِنَّ (dakhaltum bihinna)।

دَخَلَ (dakhala) — মূল: د خ ل (da-kha-la)

মৌলিক অর্থ প্রবেশ করা। স্ক্রিপ্টে এটিকে শারীরিক সম্পর্কের সংকীর্ণ অর্থের পরিবর্তে অভিভাবকত্বে নেওয়া বা কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করার অর্থে বিবেচনা করা হয়েছে।

এই জায়গাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আয়াতের পরের অংশে একই শব্দ পুনরায় এসেছে:

فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ

(fa-in lam takūnū dakhaltum bihinna fa-lā junāḥa ʿalaykum)

অর্থাৎ, তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হলে সংশ্লিষ্ট কন্যাদের বিষয়ে কোনো অপরাধ নেই।

দুই বোনকে একত্র করা

আয়াতের শেষদিকে বলা হয়েছে:

وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ (wa-an tajmaʿū bayna al-ukhtayn)
تَجْمَعُوا মূল: ج م ع একত্র করা, সমবেত করা বা এক জায়গায় আনা
بَيْنَ অর্থ মধ্যে বা দুই পক্ষের মাঝখানে
الأُخْتَيْنِ দ্বিবচন দুই বোন

অর্থাৎ দুই বোনকে একই সঙ্গে একত্র করার বিষয়টি এখানে স্পষ্ট ভাষায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


২৪ নম্বর আয়াত: সম্পর্ক, সুরক্ষা ও প্রতিদান

এরপর আয়াতটি বিশেষ পরিস্থিতিতে থাকা নারীদের প্রসঙ্গে যায়:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:২৪)

وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا بِأَمْوَالِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ ۚ فَمَا اسْتَمْتَعْتُم بِهِ مِنْهُنَّ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةً ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَاضَيْتُم بِهِ مِن بَعْدِ الْفَرِيضَةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا

উচ্চারণ: Wal-muḥṣanātu mina an-nisā’i illā mā malakat aymānukum. Kitāballāhi ʿalaykum. Wa-uḥilla lakum mā warā’a dhālikum an tabtaghū bi-amwālikum muḥṣinīna ghayra musāfiḥīn. Fa-mā istamtaʿtum bihi minhunna fa-ātūhunna ujūrahunna farīḍah. Wa-lā junāḥa ʿalaykum fīmā tarāḍaytum bihi min baʿdi al-farīḍah. Innallāha kāna ʿalīman ḥakīmā.

অনুবাদ: নারীদের মধ্যে যারা সুরক্ষিত, তাদের ব্যাপারে বিধান রয়েছে, তোমাদের অধিকারাধীনদের ব্যতীত। এটি তোমাদের ওপর আল্লাহর বিধান। এগুলো ছাড়া অন্যদের তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, তোমাদের সম্পদ দ্বারা তাদের অনুসন্ধান করার জন্য, পবিত্রতা রক্ষাকারী হিসেবে, অবাধ সম্পর্কে লিপ্ত না হয়ে। অতঃপর তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে তোমরা সম্পর্ক স্থাপন করো, তাদের নির্ধারিত প্রতিদান প্রদান করো। নির্ধারিত প্রতিদানের পর পারস্পরিক সম্মতিতে যা করো, তাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

এখানে কয়েকটি শব্দ বিশেষভাবে লক্ষণীয়:

مُحْصَنَات (muḥṣanāt)
মূল: ح ص ن (ḥa-ṣa-na)

সুরক্ষা, দুর্গ, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার সুদৃঢ় ধারণা যুক্ত।

أُجُور (ujūr)
মূল: أ ج ر (a-ja-ra)

প্রতিদান, পারিতোষিক বা দায়িত্বের বিপরীতে অর্জিত পাওনা।

فَرِيضَة (farīḍah)
মূল: ف ر ض (fa-ra-ḍa)

সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত করা বা আবশ্যিকভাবে স্থির করা।

تَرَاضَيْتُم (tarāḍaytum)
মূল: ر ض و (ra-ḍi-ya)

উভয় পক্ষের পরস্পর সন্তুষ্ট হওয়া বা দ্বিধাহীন সম্মতিতে পৌঁছানো।

مُسَافِحِينَ (musāfiḥīn)
মূল: س ف ح (sa-fa-ḥa)

এখানে এমন অবাধ সম্পর্কের ধারণা রয়েছে যা বৈধ, সামাজিক ও সুরক্ষিত বন্ধনের কাঠামোকে অতিক্রম করে অপব্যয় বা দায়িত্বহীনতায় রূপ নেয়।

এই আয়াতের কেন্দ্রীয় ৪টি স্তম্ভ:

  • সম্পর্কের বৈধতা: নিয়মসিদ্ধ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
  • নৈতিক পবিত্রতা: কেবল লালসা নয়, বরং সুরক্ষা প্রদানকারী (مُحْصِنِينَ) হিসেবে থাকা।
  • পারস্পরিক সম্মতি: উভয় পক্ষের সন্তুষ্টি ও সমঝোতা (تَرَاضَيْتُم)।
  • নির্ধারিত প্রতিদানের অধিকার: প্রাপ্য অধিকার হিসেবে প্রতিদান (أُجُور) নিশ্চিত করা।

২৫ নম্বর আয়াত: পারস্পরিক সম্পর্ক ও দায়িত্ব

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:২৫)

وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ۚ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُم ۚ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ ۚ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ ۚ فَإِذَا أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى الْمُحْصَنَاتِ مِنَ الْعَذَابِ ۚ ذَٰلِكَ لِمَنْ خَشِيَ الْعَنَتَ مِنكُمْ ۚ وَأَن تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

উচ্চারণ: Wa-man lam yastaṭiʿ minkum ṭawlan an yankiḥa al-muḥṣanāti al-mu’mināti fa-mim-mā malakat aymānukum min fatayātikumu al-mu’mināt. Wallāhu aʿlamu bi-īmānikum baʿḍukum min baʿḍ. Fankiḥūhunna bi-idhni ahlihinna wa-ātūhunna ujūrahunna bil-maʿrūfi muḥṣanātin ghayra musāfiḥātin wa-lā muttakhidhāti akhdān. Fa-idhā uḥṣinna fa-in atayna bi-fāḥishatin fa-ʿalayhinna niṣfu mā ʿalā al-muḥṣanāti mina al-ʿadhāb. Dhālika liman khashiya al-ʿanata minkum. Wa-an taṣbirū khayrun lakum. Wallāhu ghafūrun raḥīm.

অনুবাদ: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিশ্বাসী সুরক্ষিত নারীদের সঙ্গে নিকাহ করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারাধীন বিশ্বাসী তরুণীদের মধ্য থেকে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তোমরা পরস্পরেরই অংশ। অতএব তাদের অভিভাবকদের অনুমতিতে তাদের সঙ্গে নিকাহ করো এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের নির্ধারিত প্রতিদান দাও। তারা যেন সুরক্ষিত থাকে, অবাধ সম্পর্কে লিপ্ত না হয় এবং গোপন সঙ্গী গ্রহণ না করে। অতঃপর তারা সুরক্ষিত হওয়ার পর কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে, তাদের ওপর সুরক্ষিত নারীদের ওপর নির্ধারিত শাস্তির অর্ধেক থাকবে। এটি তোমাদের মধ্যে যারা কঠিন পরিস্থিতির আশঙ্কা করে তাদের জন্য। আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করাই তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

يَسْتَطِعْ (yastaṭiʿ)
মূল: ط و ع (ṭa-wa-ʿa)

এর সঙ্গে সামর্থ্য, অনুকূল অবস্থা বা সক্ষমতার ধারণা রয়েছে।

طَوْلًا (ṭawlan)
মূল: ط و ل (ṭa-wa-la)

মূল ধারণা দীর্ঘতা বা ব্যাপ্তি; প্রসঙ্গভেদে আর্থিক ও সামাজিক প্রাচুর্য বা সামর্থ্য প্রকাশ করে।

فَتَيَات (fatayāt)
মূল: ف ت ي (fa-ta-ya)

তরুণী, যুবতী বা সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনযুক্ত নবপ্রজন্মের নারী।

أَخْدَان (akhdān)
শব্দার্থ

গোপন সঙ্গী বা দায়িত্বহীন কোনো গোপন সম্পর্কের ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

এখানে আবারও مُحْصَنَات (muḥṣanāt) এবং مُسَافِحَات (musāfiḥāt)-এর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অর্থগত পার্থক্য দেখা যায়। একদিকে সুরক্ষিত ও বৈধ সম্পর্ক, অন্যদিকে এমন সম্পর্ক যা সেই সুরক্ষিত কাঠামোর বাইরে।

আয়াতটি এরপর বলে:

فَإِذَا أُحْصِنَّ (fa-idhā uḥṣinna) — অর্থাৎ যখন তারা সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে।

এরপর কোনো فَاحِشَة (fāḥishah) সংঘটিত হলে نِصْف (niṣf), অর্থাৎ অর্ধেকের কথা বলা হয়েছে।

نِصْف (niṣf) — মূল ن ص ف (na-ṣa-fa), যার অর্থ অর্ধেক বা দুই সমান অংশের একটি।

শেষে বলা হয়েছে:

وَأَن تَصْبِرُوا خَيْرٌ لَّكُمْ (wa-an taṣbirū khayrun lakum) — অর্থাৎ, ধৈর্য ধারণ করাই তোমাদের জন্য উত্তম।
صَبْر (ṣabr) — মূল ص ب ر (ṣa-ba-ra)। এর মধ্যে স্থির থাকা, সংযম করা এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার গভীর আত্মিক ধারণা রয়েছে।

২৬ নম্বর আয়াত: বিষয়টি স্পষ্ট করার ঘোষণা

এই ধারাবাহিকতার পর ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:২৬)

يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

উচ্চারণ: Yurīdu Allāhu li-yubayyina lakum wa-yahdiyakum sunana alladhīna min qablikum wa-yatūba ʿalaykum. Wallāhu ʿalīmun ḥakīm.

অনুবাদ: আল্লাহ তোমাদের জন্য বিষয়গুলো স্পষ্ট করতে চান, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পথসমূহের দিকে তোমাদের পরিচালিত করতে চান এবং তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে চান। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

لِيُبَيِّنَ (li-yubayyina) — মূল: ب ي ن (ba-ya-na)

অর্থ স্পষ্ট করা, পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা বা কোনো বিষয়কে পৃথক করে দেখানো।

অর্থাৎ, বিধান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিষয়বস্তুকে মানবজাতির কাছে স্পষ্ট করার শাশ্বত ইচ্ছার কথাও আয়াতটি সামনে আনে।


একটি শব্দ, একটি অর্থ, নাকি পুরো কুরআনের বক্তব্য?

এই আয়াতগুলো নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই।

একটি শব্দের একটি প্রচলিত অর্থকে ধরে পুরো আয়াতের অর্থ নির্ধারণ করলে কখনো কখনো আয়াতের সামগ্রিক বক্তব্য অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার কোনো প্রচলিত অর্থ পছন্দ না হলেই শব্দটির সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ নির্ধারণ করাও একই ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তাই কুরআনের শব্দকে তার মূলধাতু, বাক্যগত অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক বক্তব্যের সঙ্গে দেখতে হয়।

دَخَلْتُم تَجْمَعُوا مُحْصَنَات مُسَافِحَات نِصْف فَرِيضَة أُجُور تَرَاضَيْتُم

প্রতিটি শব্দই আয়াতের অর্থ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। এই দৃষ্টিতে সূরা আন-নিসার ২২–২৬ নম্বর আয়াত শুধু কিছু সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার একটি বিচ্ছিন্ন তালিকা নয়। এখানে সম্পর্কের সীমা, পবিত্রতা, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্ব, প্রতিদান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পূর্ববর্তী প্রথা থেকে ভিন্ন একটি সুউচ্চ নৈতিক কাঠামোর কথাও সামনে আসে।

আর এই জায়গাতেই কুরআনের একটি মৌলিক নির্দেশ মনে পড়ে:

পবিত্র কুরআন — সূরা আন-নিসা (৪:৮২)

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

উচ্চারণ: Afalā yatadabbarūna al-Qur’ān? Wa-law kāna min ʿindi ghayri Allāhi la-wajadū fīhi ikhtilāfan kathīrā.

অনুবাদ: তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? আর এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু বৈপরীত্য পেত।

কুরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে তাই শুধু প্রচলিত অনুবাদ মুখস্থ করে থেমে থাকা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি শব্দের দিকে ফিরে তাকানো, তার মূল অনুসন্ধান করা, বাক্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক দেখা এবং সমগ্র কুরআনের বক্তব্যের সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

১. শব্দের গভীরে যাওয়া শব্দের মূলধাতু ও ব্যুৎপত্তি অন্বেষণ
২. প্রশ্ন উত্থাপন করা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত প্রথার চুলচেরা বিচার
৩. সামগ্রিক সামঞ্জস্য একটি আয়াতের সাথে পুরো কুরআনের মেলবন্ধন
৪. কুরআনের বক্তব্যকেই মানদণ্ড মানা পরবর্তী পরিভাষার বদলে ঐশী বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব
“কারণ সত্যকে পুরোনো বলে মেনে নিতে হয় না, আবার নতুন বলেও গ্রহণ করতে হয় না।

শব্দের গভীরে যেতে হয়।
প্রশ্ন করতে হয়।

তারপর কুরআনের নিজের বক্তব্যকেই মানদণ্ড হিসেবে সামনে রাখতে হয়।”

আমাদের এই অনুসন্ধানে যদি কোনো সত্য প্রকাশিত হয়ে থাকে, তবে সেই সত্য আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর কোনো ভুল থেকে থাকলে, সেটি আমাদের সীমাবদ্ধতা। শেষ পর্যন্ত সত্যকে খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব পাঠকেরও নিজের।

কারণ কুরআন নিয়ে চিন্তা করার আহ্বানটি প্রত্যেক মানুষের জন্যই উন্মুক্ত।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত

সম্পর্কিত গবেষণা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ

এই বিষয়ের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গভীর আলোচনা ও কুরআনভিত্তিক অনুসন্ধান

সকল প্রবন্ধ দেখুন

কুরআনে ‘মহর’: প্রচলিত ধারণা, صَدُقَات (ṣaduqāt) এবং ৪:৪-এর ভাষাগত পাঠ

কুরআনে কি ‘মহর’ (مَهْر) শব্দটি আদৌ আছে? সূরা আন-নিসা ৪:৪-এ ব্যবহৃত ছাদুক্বাত (صَدُقَات), নিহলাহ (نِحْلَة), উজূর (أُجُور) ও ফারিদাহ (فَرِيضَة) পরিভাষাসমূহের গভীর শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং ৪:৮২ মূলনীতির আলোকে বিবাহের আর্থিক প্রদানের স্বরূপ অন্বেষণ।

গবেষণা
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

সূরা নিসা ১০১–১০৩: সালাত, কসর ও সিজদার প্রচলিত পাঠের বাইরে একটি ভাষাতাত্ত্বিক পাঠ

সূরা নিসার ১০১ থেকে ১০৩ নম্বর আয়াতে সফর, সালাত কসর, যুদ্ধাবস্থার সালাত ও সিজদা—এগুলো কি কেবল খণ্ডকালীন শারীরিক আচার ও যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য, নাকি বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক সংযোগের এক শাশ্বত রূপরেখা? আলম এম.-এর এক গভীর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

গবেষণা
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

কুরআন, কিতাব ও ‘আরবি’: প্রচলিত ধারণার বাইরে কুরআনিক শব্দতত্ত্বের আলোকে এক গভীর অনুসন্ধান

কুরআন কি কেবল ১১৪ সূরার বাঁধাই করা একটি প্রাচীন আরবি বই, নাকি মানুষের অন্তর্জাগতিক চেতনা ও প্রতিটি জাতির বোধগম্য ভাষায় প্রকাশিত এক জীবন্ত নির্দেশিকা? সূরা ইউসুফ, নাহল, কিয়ামাহ ও ইব্রাহীমের আলোকে ‘আরবি’, ‘আ‘জামী’, ‘কিতাব’ ও ‘কুরআন’-এর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা।

গবেষণা
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

রাসূল, উলিল-আমর এবং আনুগত্য: সূরা আন-নিসা ৪:৫৯-এর ভাষাগত পাঠ

সূরা আন-নিসা ৪:৫৯-এ 'আতীউল্লাহ', 'আতীউর রাসূল' ও 'উলিল-আমর'-এর ব্যাকরণিক গঠন, 'أَطِيعُوا' শব্দের অপুনরাবৃত্তি, 'أُولِي' বনাম 'أَوَّل' শব্দমূলের সংশোধন এবং বিরোধ মীমাংসায় কেন উলিল-আমরের অনুপস্থিতি? শব্দতাত্ত্বিক ও কাঠামোগত গভীর বিশ্লেষণ। আলম এম.-এর নিবন্ধ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

আল্লাহর জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি, আল্লাহর রাগ: অনুবাদের আড়ালে কী হারিয়ে যায়?

কুরআনের প্রচলিত অনুবাদে ‘আল্লাহর জন্য’, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি’ কিংবা ‘আল্লাহর রাগ’ পড়তে গিয়ে কি আমরা আল্লাহকে মানুষের মতো আবেগপ্রবণ ও মুখাপেক্ষী সত্তা ভেবে ভুল করি? ‘আল-গণিয়্য’, ‘রিদওয়ান’, ‘গাদাব’ ও ‘লিল্লাহ’-এর গভীর কুরআনিক শব্দতাত্ত্বিক পাঠ।

গবেষণা
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন