“কুরআন পাঠ করতে গেলে আমরা এমন বহু শব্দের মুখোমুখি হই, যেগুলোকে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। আসমান, জমিন, সৃষ্টি, মালাইকা, জান্নাত, জাহান্নাম, শয়তান, অন্তর, নফস, নূর, অন্ধকার কিংবা নৈকট্য—প্রতিটি শব্দেরই কুরআনের ভেতরে নিজস্ব ব্যবহার ও প্রসঙ্গ রয়েছে। কোনো একটি শব্দের অর্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু প্রচলিত অর্থের ওপর নির্ভর না করে কুরআনে শব্দটি কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি দেখা জরুরি।”
কুরআন কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুশাসনের সমষ্টি নয়; এটি সচেতন সত্তার প্রতি আল্লাহর এক সার্বক্ষণিক আহ্বান। কুরআন নিজেই মানুষকে পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ও অন্তর্দৃষ্টির (তাদাব্বুর) নির্দেশ দেয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো: কুরআনের এই পরিভাষাগুলো কি কেবল চোখে দেখা বস্তুজগতের রূপরেখা আঁকে, নাকি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্তর্জগতেরও এক নিখুঁত দর্পণ?
শব্দের আক্ষরিক বাহ্যিক কাঠামো এবং তার অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করতে হয়—কুরআনিক পরিভাষার বহুস্তরীয় ব্যবহারের আলোকেই এখানে তার ভাষাতাত্ত্বিক ও চিন্তামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে।
১. সৃষ্টি বোঝাতে কুরআনের ভাষা: خَلَقَ (খালাকা) ও جَعَلَ (জা‘আলা)
আরবি ভাষায় কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনা, সৃষ্টি করা বা রূপান্তরের ধারণা প্রকাশের জন্য একাধিক ক্রিয়ামূলক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মৌলিক এবং অতি-ব্যবহৃত শব্দ হলো خَلَقَ (খালাকা) এবং جَعَلَ (জা‘আলা)। প্রচলিত অনুবাদে প্রায়শ উভয় শব্দকেই নির্বিচারে “সৃষ্টি করেছেন” হিসেবে অনুবাদ করা হয়, যা তাদের মধ্যকার সূক্ষ্ম ও অর্থপূর্ণ ব্যবধানকে আবৃত করে ফেলে।
خ ل ق ধাতুর মৌলিক ভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্যের সঙ্গে পরিমাপ করা, সুষম অনুপাত নির্ধারণ করা, সুবিন্যস্ত গঠন দেওয়া এবং অস্তিত্বে আনার ধারণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ
উচ্চারণ: Khalaqa al-insāna min ‘alaq.
অনুবাদ: তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ (সংলগ্ন ঝুলন্ত বস্তু) থেকে।
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে خَلَقَ (খালাকা) কোনো পূর্ববর্তী উপাদান বা ধারাবাহিক জৈবিক অবস্থা থেকে সৃষ্টির প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা আবশ্যক—এখান থেকে এমন কোনো একপাক্ষিক নিয়ম তৈরি করা যায় না যে খালাকা কেবল পূর্বে বিদ্যমান বস্তু থেকেই সৃষ্টি বোঝাবে। কুরআনের সামগ্রিক ব্যবহারের পরিসর আরও সুবিস্তৃত ও সার্বিক।
جَعَلَ-এর মূল ধাতু ج ع ل। এর মৌলিক ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে কোনো কিছুকে কোনো অবস্থায় স্থাপন করা, সুনির্দিষ্ট কার্যপ্রণালীতে রূপান্তর করা, কার্যকর ভূমিকা দেওয়া কিংবা কোনো ব্যবস্থায় নির্ধারিত করা।
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا
উচ্চারণ: Wa huwa alladhī ja‘ala al-layla wan-nahāra khilfatan liman arāda an yadhdhakkara aw arāda shukūrā.
অনুবাদ: আর তিনিই রাত ও দিনকে পরস্পরের পরিবর্তনশীল করেছেন, তার জন্য যে স্মরণ করতে চায় অথবা কৃতজ্ঞ হতে চায়।
এখানে جَعَلَ (জা‘আলা) সরাসরি “শূন্য থেকে সৃষ্টি করা” নয়; বরং রাত ও দিনকে এমন একটি ধারাবাহিক ও ভারসাম্যপূর্ণ আবর্তনশীল ব্যবস্থার মধ্যে স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে।
وَلَقَدْ جَعَلْنَا فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَزَيَّنَّاهَا لِلنَّاظِرِينَ
উচ্চারণ: Wa laqad ja‘alnā fī as-samā’i burūjan wa zayyannāhā lin-nāẓirīn.
অনুবাদ: আর অবশ্যই আমরা আসমানে বুরুজসমূহ স্থাপন করেছি এবং দর্শনকারীদের জন্য তাকে সুশোভিত করেছি।
এখানেও جَعَلْنَا (জা‘আলনা) অর্থকে শুধু অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন হিসেবে সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। আয়াতের স্পষ্ট বক্তব্য হলো আসমানের মধ্যে بُرُوجًا (বুরুজসমূহ) স্থাপন বা একটি সুসংবদ্ধ কাঠামোরূপে নির্ধারণ করা।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: খালাকা বনাম জা‘আলা
- মৌলিক গঠন, পরিমিত আকার ও রূপদানের উপর জোর দেয়।
- কোনো কিছুকে অস্তিত্বে আনা বা প্রাথমিক উপাদান থেকে রূপায়নের প্রেক্ষাপট নির্দেশ করে।
- সৃষ্টির সত্তাগত ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তি তৈরি করে।
- অবস্থা, ভূমিকা, উপযোগিতা ও কার্যকারিতা নির্ধারণের উপর জোর দেয়।
- একটি সত্তাকে অন্য ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বা কার্যোপযোগী করায় ব্যবহৃত হয়।
- মহাজাগতিক ও নৈতিক বিধানের পারম্পর্য ও অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে।
অতএব, خَلَقَ (খালাকা) এবং جَعَلَ (জা‘আলা)-কে নির্বিচারে একটি মাত্র বাঁধাধরা সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা কুরআনের সামগ্রিক ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
২. কুরআনের বাস্তবতা কি শুধু চোখে দেখা জগত? — গায়েবের বিস্তৃতি
কুরআনে এমন বহু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে যেগুলো মানুষের প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু কোনো বিষয় চোখে দেখা যায় না বলেই সেটিকে কেবল রূপক বা কেবল মনের ভেতরের প্রতীকী অবস্থা বলে নির্ধারণ করাও কুরআনের নিজস্ব নীতি থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ
উচ্চারণ: Alladhīna yu’minūna bil-ghayb.
অনুবাদ: যারা গায়েবে (অদৃশ্যে) বিশ্বাস করে।
এই ধাতুর সঙ্গে যা কিছু মানুষের চাক্ষুষ প্রত্যক্ষতার বাইরে, অপ্রকাশ্য, অনুপস্থিত বা ইন্দ্রিয়ের নাগালের বাইরে থাকে—তার ধারণা সম্পর্কিত। অতএব, কুরআনের দৃষ্টিতে বাস্তবতার পরিধি কেবল মানবচক্ষুর দৃশ্যমানতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তবে এর বিপরীত প্রান্তিকতাও সমান বিভ্রান্তিকর:
এর অর্থ এই নয় যে কুরআনে উল্লিখিত প্রত্যেকটি অদৃশ্য বিষয়কে মানুষের অন্তর্জগতের কোনো প্রতীক হিসেবেই জোরপূর্বক ব্যাখ্যা করতে হবে। কোনো শব্দের এমন বিমূর্ত অর্থ নির্ধারণ করতে হলে কুরআনের সামগ্রিক ব্যবহারের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থাকতে হবে।
৩. আল্লাহর নৈকট্য: দূরত্বের মাপ নয়
কুরআনে আল্লাহর নৈকট্য বর্ণনায় যে অনন্য রূপক ব্যবহৃত হয়েছে, তা মানুষের অস্তিত্বের বাহ্যিক অঙ্গসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ ভাবনার মেলবন্ধনকে স্পষ্ট করে।
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۖ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
উচ্চারণ: Wa laqad khalaqnā al-insāna wa na‘lamu mā tuwaswisu bihi nafsuhu wa naḥnu aqrabu ilayhi min ḥabli al-warīd.
অনুবাদ: আর অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার নফস তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমরা জানি; আর আমরা তার প্রতি তার শিরার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী।
নৈকট্য ও সান্নিধ্য
দূরত্বের সংকোচন, পরম সান্নিধ্য এবং অবিচ্ছেদ্য সংযোগের ধারণা।
গ্রীবাস্থ জীবনরক্তের শিরা
মানুষের দৈহিক অস্তিত্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল শিরা, যার বিচ্ছিন্নতা মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটায়।
আয়াতটির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও সুর:
আল্লাহর নৈকট্যের কথা বলার অব্যবহিত পূর্বেই বলা হয়েছে:
“তার নফস তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, আমরা তা জানি।”
অর্থাৎ আয়াতটি মানুষের অন্তর্গত মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, গোপন আবেগ ও ভাবনার প্রতি আল্লাহর নিখুঁত জ্ঞানের প্রসঙ্গের ভেতরেই তাঁর এই পরম নৈকট্যের কথা ঘোষণা করছে।
এখানে নৈকট্যকে কেবল বাহ্যিক স্থানগত বা ভৌগোলিক দূরত্ব হিসেবে পাঠ করা কুরআনের গভীর আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বক্তব্যকে চরমভাবে সংকুচিত করে দেয়।
৪. ‘জমিনে ফাসাদ’ বলতে কী বোঝায়?
সূরা আল-বাকারার শুরুতেই মুনাফিক চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে যে দ্বৈত পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা নৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্যকে নির্দেশ করে:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ
উচ্চারণ: Wa idhā qīla lahum lā tufsidū fī al-arḍi qālū innamā naḥnu muṣliḥūn.
অনুবাদ: আর যখন তাদের বলা হয়, “তোমরা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না”, তারা বলে, “আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।”
أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِن لَّا يَشْعُرُونَ
উচ্চারণ: Alā innahum humu al-mufsidūna wa lākin lā yash‘urūn.
অনুবাদ: সাবধান, তারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী; কিন্তু তারা উপলব্ধি করে না।
ফাসাদ (فساد): বিনষ্ট হওয়া, ভারসাম্যের অপমৃত্যু, বিকৃত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা চূর্ণ করা। এটি কেবল তরবারি চালিয়ে যুদ্ধ বা ভৌত অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইসলাহ (إصلاح): সংশোধন, সঠিকতা, ন্যায়সঙ্গত শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন ও ভারসাম্যের সুরক্ষা।
এখানে الْمُفْسِدُونَ (আল-মুফসিদূন) এবং مُصْلِحُونَ (মুসলিহূন) পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াতের মূল সতর্কবাণী নিহিত রয়েছে لَّا يَشْعُرُونَ (“তারা উপলব্ধি করে না”) বাক্যাংশের ভেতর।
সুতরাং فَسَاد (ফাসাদ) যেমন শুধু অস্ত্র হাতে দৃশ্যমান রক্তপাত নয়, তেমনি একে শুধুমাত্র “নিজের মনের অভ্যন্তরীণ ফাসাদ” হিসেবে সংকুচিত করে সামাজিক বা বস্তুগত বাস্তবতাকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। কুরআনে এর ব্যবহার প্রেক্ষাপটভেদে দৃশ্যমান অন্যায় ও অন্তর্গত কপটতা—উভয় রূপকেই উন্মোচিত করে।
৫. ‘মসজিদুল হারাম’-এর প্রসঙ্গ: ভৌগোলিক আদেশ ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা
সূরা আত-তাওবায় একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অনুশাসন বর্ণিত হয়েছে:
إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَٰذَا
উচ্চারণ: Innamā al-mushrikūna najasun fa-lā yaqrabū al-masjida al-ḥarāma ba‘da ‘āmihim hādhā.
অনুবাদ: মুশরিকরা অপবিত্র; অতএব এই বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়।
ভৌগোলিক সীমানায় নৈকট্য বা পদার্পণ না করার নির্দেশ।
সিজদা, বিনম্র প্রণিপাত ও সত্তার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের স্থান।
মর্যাদাপ্রাপ্ত, সুরক্ষিত, অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র ঘোষিত পরিমণ্ডল।
আয়াতটি স্পষ্টভাবে একটি বাহ্যিক ভৌগোলিক অবস্থানের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় বিধান বহন করে। একই সঙ্গে مُشْرِكُونَ (মুশরিকূন), نَجَس (নাজাস) এবং الْمَسْجِدِ الْحَرَام (আল-মাসজিদিল-হারাম)-এর পারস্পরিক সম্পর্ক আয়াতের সুদৃঢ় নৈতিক ও আইনগত দিক বিনির্মাণ করে।
তাই এই আয়াতকে কেবল একটি অন্তর্জাগতিক রূপক বানিয়ে ভৌগোলিক আদেশকে গৌণ করার কোনো সুযোগ নেই; এর প্রত্যক্ষ বাহ্যিক বাস্তবতাকে পূর্ণ মর্যাদায় বিবেচনায় রেখেই তার আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা উপলব্ধি করতে হয়।
৬. ‘তিন’ ও ‘যাইতুন’: শব্দের আক্ষরিকতার বাইরে কি আরও কিছু আছে?
সূরা আত-তীনের প্রারম্ভে একটি অনন্য শপথের অবতারণা করা হয়েছে:
وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ
উচ্চারণ: Wat-tīni waz-zaytūn.
অনুবাদ: শপথ ডুমুরের (তীন) এবং জলপাইয়ের (যাইতুন)।
وَطُورِ سِينِينَ
উচ্চারণ: Wa ṭūri sīnīn.
অনুবাদ: এবং সিনীন পর্বতের।
এখানে কুরআন التِّين (আত-তীন) এবং الزَّيْتُون (আয-যাইতুন) শব্দ ব্যবহার করেছে। উভয়ই চেনা উদ্ভিদ ও সুপরিচিত ফলের নাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে طُورِ سِينِينَ (তূর সিনীন)—যা সরাসরি মুসা (আ.)-এর ওহীপ্রাপ্তির ঐতিহাসিক পাহাড়ি উপত্যকাকে নির্দেশ করে।
পদ্ধতিগত ভারসাম্য: আক্ষরিকতা ও প্রতীকের দ্বন্দ্ব
কুরআনে এগুলোর প্রতীকী তাৎপর্য (যেমন বিশেষ অঞ্চলের নবুওয়াতী ধারাবাহিকতা বা পুষ্টিকর আশীর্বাদ) আছে কি না, তা নিয়ে চিন্তা করা সম্পূর্ণ বৈধ ও যৌক্তিক। কিন্তু কেবল শপথের উপস্থিতি থেকেই নিশ্চিত কোনো গোপন রূপককে চূড়ান্ত অর্থ হিসেবে ঘোষণা করা সমীচীন নয়।
কুরআনের বক্তব্যের একটি প্রধান নীতি হলো: আক্ষরিক অর্থ এবং গভীর অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা সব সময় একই কাঠামোর অধীন হয় না। কোনো শব্দের অতিরিক্ত তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কুরআনিক আয়াতের পারস্পরিক সম্পর্ক (তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন) প্রমাণ হিসেবে থাকা আবশ্যক।
৭. কুরআনের ভাষা কি সম্পূর্ণ আক্ষরিক? — তাদাব্বুরের ডাক
কুরআনে বাস্তব জগতের দৃশ্য, মানুষের মনোজগত, নৈতিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক এবং অদৃশ্য জগত—সবকিছুর সুনিপুণ সমন্বয় ঘটেছে। এই কারণে কুরআনের ভাষাকে এক কথায় “শুধুই আক্ষরিক” বা “শুধুই প্রতীকী” বলে কোনো একটি চরম প্রান্তে ঠেলে দেওয়া যায় না।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
উচ্চারণ: Afalā yatadabbarūna al-Qur’āna.
অনুবাদ: তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা (তাদাব্বুর) করে না?
د ب ر ধাতুর অর্থ কোনো বিষয়ের পশ্চাৎস্থিত দিক, পরিণতি, গভীর কার্যকারণ এবং সমগ্রতাকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা।
তাদাব্বুরের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ:
শব্দ উচ্চারণের ঊর্ধ্বে অনুধাবন: কুরআন পাঠ কেবল ব্যাকরণগত ধ্বনি উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়; আয়াতের মূল লক্ষ্য মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলা।
পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান (Intertextuality): একটি আয়াতের মর্মোদ্ধারে সমগ্র কুরআনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আয়াতকে পাশাপাশি রেখে দেখা।
চরমপন্থা বর্জন: অতিরিক্ত আক্ষরিকতা যেমন অর্থকে কাঠখোট্টা করে, তেমনি অতিরিক্ত রূপকায়ন মূল বিধানকে বিলুপ্ত করে। তাদাব্বুর এই দুইয়ের ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
৮. বিচ্ছিন্ন অক্ষর: আলিফ-লাম-মীম ও মানব জ্ঞানের বিনম্রতা
কুরআনের কয়েকটি সূরার শুরুতে এমন কিছু স্বতন্ত্র অক্ষর এসেছে, যেগুলোকে ঐতিহ্যগতভাবে الحروف المقطعات (আল-হুরূফুল-মুকাত্তা‘আত) বা বিচ্ছিন্ন অক্ষর বলা হয়।
الم ۚ ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ
উচ্চারণ: Alif-Lām-Mīm. Dhālika al-kitābu lā rayba fīhi hudan lil-muttaqīn.
অনুবাদ: আলিফ-লাম-মীম। এই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।
এখানে الم (আলিফ-লাম-মীম)-এর পরপরই কিতাবের স্পষ্টতার ঘোষণা এসেছে। এই অক্ষরগুলোর সুনির্দিষ্ট অর্থ কুরআন নিজে কোথাও সরাসরি ব্যক্ত করেনি।
এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ওহীর এমন কিছু দিক রয়েছে যা চূড়ান্তভাবে আল্লাহর জ্ঞানের অধীন। তাই এগুলোর ওপর মনগড়া রূপক আরোপ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়।
৯. কুরআনের শব্দ: বাহির ও ভিতরের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
কুরআনের দৃষ্টিতে বাহ্যিক মহাবিশ্ব এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ মনোজগৎ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুটি রাজ্য নয়; বরং তারা একই পরম সত্যের দুটি সমান্তরাল আয়না।
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ
সূরা আলে ইমরান ৩:১৯০
“নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে...”
কুরআন মানুষকে প্রথমে তাকিয়ে দেখতে বলে মহাশূন্যের সুবিশাল শৃঙ্খলা ও ভৌত সৃষ্টির দিকে।
وَفِي أَنفُسِكُمْ ۚ أَفَلَا تُبْصِرُونَ
সূরা আয-যারিয়াত ৫১:২১
“এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও; তবে কি তোমরা দেখতে পাও না?”
أَنفُس (আনফুস) এসেছে نَفْس (নাফস) ধাতু থেকে (ন-ফ-স), যা মানুষের আত্মপরিচয়, ব্যক্তিসত্তা ও বিবেকের স্তর নির্দেশ করে।
ফলে কুরআনের দৃষ্টিতে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র কেবল বাইরের ভূগোল বা গ্রহ-নক্ষত্র নয়; মানুষের নিজের অন্তঃসত্তা ও মনস্তত্ত্বও সেই অনুসন্ধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১০. শেষ কথা: দিগন্ত ও নিজের আয়নায় কুরআনিক উপলব্ধি
কুরআনের শব্দগুলোকে বোঝার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় পাশাপাশি রাখা অত্যন্ত জরুরি:
শব্দটির মূল ধাতু, ব্যাকরণগত অবস্থান এবং যে ঐতিহ্যে তা অবতীর্ণ হয়েছে তার সুস্পষ্ট প্রকাশ।
শব্দটি পুরো কুরআনে কীভাবে বিন্যস্ত হয়েছে এবং মানুষের চিন্তা ও আচরণের সঙ্গে তার যোগসূত্র।
خَلَقَ (খালাকা), جَعَلَ (জা‘আলা), قَرُبَ (কারুবা), فَسَدَ (ফাসাদা), صَلَحَ (সালাহা), نَفْس (নাফস)—প্রতিটি শব্দের নিজস্ব ধাতু, নির্দিষ্ট ব্যাকরণ এবং বহুমাত্রিক কুরআনিক ব্যবহার রয়েছে। তাই কুরআনের কোনো একটি শব্দকে প্রচলিত অনুবাদের একটি সংকীর্ণ শব্দ দিয়ে চূড়ান্তভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি প্রতিটি শব্দের আড়ালে ইচ্ছামাফিক রূপক চাপিয়ে দেওয়াও কুরআনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ
উচ্চারণ: Sanurīhim āyātinā fī al-āfāqi wa fī anfusihim ḥattā yatabayyana lahum annahu al-ḥaqq.
অনুবাদ: অচিরেই আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনসমূহ দেখাব দিগন্তসমূহে (মহাবিশ্বে) এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটিই সত্য।
এখানে الْآفَاق (আল-আফাক — দিগন্তসমূহ) এবং أَنفُس (আনফুস — আত্মসত্তা) এক সূত্রে গাঁথা। কুরআনের অনুসন্ধানে বাহ্যিক জগত এবং মানুষের নিজস্ব সত্তা—উভয় ক্ষেত্রই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
প্রশ্ন তাই শুধু এই নয় যে আমরা কুরআনের পৃষ্ঠায় কী শব্দ পড়ছি। মূল প্রশ্ন হলো—কুরআনের দেখানো মহাজাগতিক ও অভ্যন্তরীণ জগতকে আমরা কতটা সততার সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারছি এবং সেই উপলব্ধি আমাদের নিজেদের পরিচয় ও স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা রূপান্তরিত করছে।

