“সাধারণভাবে সমাজে একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, ‘কুরআন’ মানে ১১৪টি সূরায় সন্নিবেশিত মলাটবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভাষার ধর্মীয় পুস্তক; আর ‘আরবি’ বলতে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী জাতিগত ভাষাকেই বোঝায়। কিন্তু স্বয়ং কুরআনের আয়াতগুলো যখন গভীর পর্যবেক্ষণ ও ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন এই ধারণার সামনে মৌলিক কিছু প্রশ্ন উন্মোচিত হয়। কুরআন কি কেবল একটি অক্ষরের সমষ্টি, নাকি মানুষের অন্তর্জাগতিক চেতনা ও বোধের এক জীবন্ত প্রকাশ?”
কোনো ধর্মীয় টেক্সটকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তার নিজস্ব পরিভাষাগুলোকে তার নিজস্ব ব্যবহারের আলোকেই বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। কুরআনে ব্যবহৃত ‘আল-কিতাব’ (Al-Kitāb), ‘আল-কুরআন’ (Al-Qur’ān), ‘আরবি’ (‘Arabiyy) এবং ‘আ‘জামী’ (A‘jamiyy) শব্দগুলোর মূল ধাতু ও কুরআনিক প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই ধারণাগুলো কেবল একটি আঞ্চলিক সীমারেখা বা কাগজের বাঁধাই করা অবয়বের চেয়ে বহুগুণে গভীর, সর্বজনীন ও জ্ঞানতাত্ত্বিক।
এই নিবন্ধে কোনো মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, আরবি মূলধাতু (Roots) এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ‘কিতাব’, ‘কুরআন’ ও ‘আরবি’র প্রকৃত স্বরূপ অনুসন্ধান করা হয়েছে।
১. ‘কিতাবুল মুবীন’ (Kitābul Mubīn) কী এবং কার জন্য স্পষ্ট?
সূরা ইউসুফের প্রথম আয়াতেই আল্লাহ তাআলা এই কিতাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন:
الر ۚ تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ
উচ্চারণ: Alif-Lām-Rā. Tilka āyātu al-kitābi al-mubīn.
অনুবাদ: আলিফ-লাম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।
ب ي ن ধাতুর অর্থ হলো এমন কিছু যা স্বয়ং পরিষ্কার, দ্ব্যর্থহীন, প্রকাশিত এবং যা অন্য বিষয়কে স্পষ্ট ও সহজবোধ্য করে তোলে। অর্থাৎ ‘কিতাবুল মুবীন’ (Kitābul Mubīn) হলো এমন কিতাব বা বার্তা যা প্রত্যেকের নিকট স্পষ্ট ও সহজে বোধগম্য।
বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন:
এখন প্রশ্ন হলো—একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষার ১১৪ সূরার মলাটবদ্ধ গ্রন্থ কি পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে সরাসরি সহজবোধ্য? একজন বাংলা, চীনা, স্প্যানিশ বা সোয়াহিলি ভাষাভাষী মানুষের কাছে কি অনুবাদ ও নিজস্ব ভাষা ব্যতিরেকে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মুবীন’ বা সুস্পষ্ট হতে পারে? এই প্রশ্নটিই পরবর্তী আয়াতের গভীর তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
২. ‘আরবি কুরআন’ (Qur’ānan ‘Arabiyyan) এবং বুদ্ধি (আকল)-এর সম্পর্ক
সূরা ইউসুফের দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে:
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
উচ্চারণ: Innā anzalnāhu qur’ānan ‘arabiyyan la‘allakum ta‘qilūn.
অনুবাদ: নিশ্চয়ই আমরা এটি নাযিল করেছি ‘আরবি কুরআন’ রূপে, যাতে তোমরা বুদ্ধি ব্যবহার করতে পারো (আকল খাটাও)।
প্রচলিত ব্যাখ্যার অসঙ্গতি:
পরম্পরাগত সাধারণ ব্যাখ্যা বলে—যেহেতু এটি মধ্যপ্রাচ্যের আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে, তাই মানুষ বুদ্ধি ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু এই যুক্তি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়:
- তবে কি মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক ভাষা না জানলে কোনো মানুষ আকল বা বুদ্ধি খাটাতে অক্ষম?
- পৃথিবীর কোটি কোটি বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি কিংবা মান্দারিন ভাষাভাষী মানুষ কি বুদ্ধিহীন?
- সৃষ্টিকর্তা কি এমন কোনো শর্ত আরোপ করবেন যা বিশ্বের সিংহভাগ মানুষের পক্ষে তার মাতৃভাষার বাইরে সরাসরি পালন করা অসম্ভব?
এই আপাত দ্বন্দ্ব নিরসনের একমাত্র উপায় হলো—কুরআনে স্বয়ং ‘আরবি’ (‘Arabiyy) শব্দটিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা অনুসন্ধান করা।
৩. ‘আরবি’র বিপরীত শব্দ কী? — কুরআনিক বৈপরীত্যের মানদণ্ড
কুরআনের যেকোনো শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য উন্মোচিত হয় তার বিপরীত শব্দের (Antonym) ব্যবহারের মাধ্যমে। কুরআন স্বয়ং ‘আরবি’র বিপরীতে যে শব্দটি স্থাপন করেছে তা হলো ‘আ‘জামী’ (أَعْجَمِيّ / A‘jamiyy)।
لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَٰذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
উচ্চারণ: Lisānu alladhī yulḥidūna ilayhi a‘jamiyyun wa-hādhā lisānun ‘arabiyyun mubīn.
অনুবাদ: তারা যার প্রতি ইঙ্গিত করে তার ভাষা আ‘জামী (অস্পষ্ট/দুর্বোধ্য), আর এটি হলো সুস্পষ্ট আরবি ভাষা।
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَّقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ ۖ أَأَعْجَمِيٌّ وَعَرَبِيٌّ
উচ্চারণ: Wa-law ja‘alnāhu qur’ānan a‘jamiyyan la-qālū lawlā fuṣṣilat āyātuhu, a-a‘jamiyyun wa-‘arabiyy.
অনুবাদ: আর যদি আমরা একে আ‘জামী (দুর্বোধ্য/অস্পষ্ট) কুরআন করতাম, তবে তারা বলত, “এর আয়াতসমূহ বিশদভাবে বলা হলো না কেন? বার্তা কি আ‘জামী (দুর্বোধ্য), আর সম্বোধিত ব্যক্তি কি আরবি (স্পষ্টভাষী)?”
ভাষাতাত্ত্বিক ধাতু বিশ্লেষণ: ع ر ب বনাম ع ج م
ع ر ب (ʿa-ra-ba): প্রকাশ করা, স্পষ্ট করা, প্রাঞ্জল ও সহজে বোধগম্য করে তোলা। আরবি ব্যাকরণে ‘ই‘রাব’ (الإعرাব) বলা হয় কারণ তা বাক্যের অন্তর্গত ভাব ও অর্থকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। অতএব, ‘আরবি’ মানে যা স্বয়ং প্রকাশমান, প্রাঞ্জল ও পরিষ্কার।
ع ج م (ʿa-ja-ma): অস্পষ্ট হওয়া, দুর্বোধ্য হওয়া, জিহ্বায় জড়তা থাকা বা যা বোঝা যায় না। মুখে খাদ্য থাকলে কথা অস্পষ্ট হওয়াকে আরবিতে ‘আজমা’ বলা হয়। অতএব, ‘আ‘জামী’ মানে যা অচেনা, দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট।
কুরআনিক সিদ্ধান্ত:
কুরআনের নিজস্ব প্রয়োগে ‘আরবি’ হলো যা মানুষের কাছে সুস্পষ্ট, সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল; আর ‘আ‘জামী’ হলো যা মানুষের কাছে অস্পষ্ট, দুর্বোধ্য ও অচেনা। একজন বাংলাভাষীর কাছে যখন তার নিজের ভাষায় বার্তা স্পষ্ট হয়, তখন সেই ভাষাই তার জন্য ‘আরবি’ (প্রাঞ্জল ও বোধগম্য)। বিপরীতে, যে ভাষা সে বোঝে না (হোক তা চীনা, রুশ বা হিব্রু), তা-ই তার নিকট ‘আ‘জামী’।
৪. ‘কুরআন’ (Qur’ān) শব্দের অর্থ: নিশ্চল বই নাকি জীবন্ত সংকলন ও প্রকাশ?
সূরা আল-কিয়ামাহ-তে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ‘কুরআন’-এর সংজ্ঞা ও প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযাত্রা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন:
إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ
উচ্চারণ: Innā ‘alaynā jam‘ahu wa-qur’ānah. Fa-idhā qara’nāhu fattabi‘ qur’ānah. Thumma innā ‘alaynā bayānah.
১৭: নিশ্চয়ই একে একত্রিত (সংকলন) করা এবং প্রকাশ/পাঠ করা আমাদেরই দায়িত্ব।
১৮: সুতরাং যখন তা প্রকাশিত/পাঠ করা হয়, তখন সেই সংকলন ও প্রকাশের অনুসরণ করো।
১৯: তারপর নিশ্চয়ই এর বিশদ ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব আমাদের।
ق ر أ ধাতুর মৌলিক অর্থ হলো কোনো কিছুকে একত্রিত করা, সুসংহতভাবে সংকলন করা এবং ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করা। এখানে কুরআন কোনো মলাটবদ্ধ জড় কাগজের বই নয়; বরং এটি হলো সত্যের সংকলন, প্রকাশের প্রক্রিয়া এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জীবন্ত ব্যাখ্যা।
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ
উচ্চারণ: Wa-laqad yassarnā al-qur’āna lidh-dhikri fahal min muddakir.
অনুবাদ: আর আমরা নিশ্চয়ই কুরআনকে স্মরণের জন্য সহজ করে দিয়েছি; অতএব কোনো শিক্ষা গ্রহণকারী আছে কি?
যদি কুরআন কেবল একটি বিশেষ আঞ্চলিক ভাষায় সীমাবদ্ধ হতো, তবে বিশ্বের ৯৫% অ-আরবিভাষী মানুষের জন্য তা স্মরণে ‘সহজ’ হতো না। কুরআন সহজ তখনই, যখন তা মানুষের নিজস্ব ভাষা ও চেতনার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
৫. ‘হাযাল কুরআন’ (Hādhā al-Qur’ān): সমস্ত উদাহরণের কুরআনিক দাবি
কুরআনে বারবার ‘হাযাল কুরআন’ (هَٰذَا الْقُرْآن — এই কুরআন) শব্দযুগল ব্যবহার করে একটি যুগান্তকারী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে:
وَلَقَدْ صَرَّفْنَا لِلنَّاسِ فِي هَٰذَا الْقُرْآنِ مِن كُلِّ مَثَلٍ
উচ্চারণ: Wa-laqad ṣarrafnā lin-nāsi fī hādhā al-qur’āni min kulli mathal.
অনুবাদ: আর অবশ্যই আমরা মানুষের জন্য এই কুরআনে সব ধরনের উদাহরণ বিশদভাবে বর্ণনা করেছি।
(অনুরূপ ঘোষণা এসেছে সূরা আল-কাহাফ ১৮:৫৪, সূরা আর-রূম ৩০:৫৮ এবং সূরা আয-যুমার ৩৯:২৭ আয়াতে)।
এই ঘোষণার দার্শনিক ও প্রায়োগিক তাৎপর্য:
এখন প্রশ্ন হলো—একটি ১১৪ সূরার বাঁধাই করা পুস্তকে কি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, মহাকাশ প্রকৌশল ইত্যাদির বাস্তব উদাহরণ সরাসরি লেখা আছে? নিশ্চয়ই তা নেই।
তাহলে “আমরা সব রকম উদাহরণ বিশদ করেছি” এই ঐশী দাবি কীভাবে সত্য হয়? এর উত্তর হলো—কুরআন কোনো পার্থিব বিষয়ের ডেটাবেজ নয়; বরং এটি মানুষের চেতনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি মৌলিক মানবিক, নৈতিক ও অস্তিত্বিক সংকটের সার্বিক সূত্র ও নীতিমালার এক জীবন্ত আধার।
৬. ‘আল-কিতাব’ (Al-Kitāb): মানুষের ভেতরে নিহিত সহজাত লিপি
কুরআনে ‘কিতাব’ শব্দটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা মানুষের মন, বিবেক ও সহজাত ফিতরাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمُ
Alladhīna ātaynāhumu al-kitāba ya‘rifūnahu kamā ya‘rifūna abnā’ahum.
“যাদেরকে আমরা কিতাব দিয়েছি, তারা তা চেনে যেভাবে নিজেদের সন্তানকে চেনে।”
মানসিক পরিচিতি: একজন পিতা বা মাতা যেভাবে বিনা দ্বিধায় নিজের সন্তানকে চেনে, কিতাবের সত্যতাও অন্তরের ভেতরে তেমনই স্বতস্ফূর্তভাবে পরিচিত।
اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا
Iqra’ kitābaka kafā binafsika al-yawma ‘alayka ḥasībā.
“পাঠ করো তোমার কিতাব; আজ তোমার নিজের হিসাবের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।”
সহজাত আমলনামা ও লিপি: প্রত্যেকের নিজের কর্মকাণ্ড, অনুভূতি ও বিবেকের সংকলনই তার নিজের কিতাব।
لَقَدْ أَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ ۖ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
Laqad anzalnā ilaykum kitāban fīhi dhikrukum afalā ta‘qilūn.
“আমরা তোমাদের কাছে এমন এক কিতাব নাযিল করেছি যাতে রয়েছে তোমাদেরই আলোচনা/স্মরণ; তবে কি তোমরা বুদ্ধি খাটাবে না?”
অতএব, الْكِتَاب (আল-কিতাব) কেবল বাহিরের কোনো বস্তু নয়; এটি আমাদের মনের গভীরে প্রোথিত সচেতনতা, অস্তিত্বের বিধিবিধান এবং স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের অন্তর্গত সহজাত লিপি।
৭. সবার জন্য নিজ নিজ ভাষায় ঐশী বার্তা
ঐশী বার্তার প্রচার ও অনুধাবনে ভাষার ভূমিকা কী—সূরা ইব্রাহীমে আল্লাহ তাআলা তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ
উচ্চারণ: Wa-mā arsalnā mir-rasūlin illā bi-lisāni qawmihī li-yubayyina lahum.
অনুবাদ: আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকেই কেবল তার জাতির নিজস্ব ভাষায় পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
فَإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
উচ্চারণ: Fa-innamā yassarnāhu bi-lisānika la‘allahum yatadhakkarūn.
অনুবাদ: আমরা তো তোমার ভাষায় একে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ করতে ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
যদি আল্লাহর অপরিবর্তনীয় নীতিই হয় যে প্রতিটি বার্তা মানুষের নিজস্ব ভাষায় পৌঁছাতে হবে যাতে তা স্পষ্ট হয়—তাহলে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বজনীন বার্তা কেন শুধু একটি বিশেষ আঞ্চলিক ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে?
বাস্তবতা হলো: ওহীর বাণী সব যুগেই মানুষের বোধগম্য ভাষায় নেমে আসে। যখন একজন মানুষ তার নিজের মাতৃভাষায় সত্যকে গভীরভাবে অনুধাবন করে, তখনই ওহীর প্রকৃত লক্ষ্য অর্জিত হয়।
৮. আল-কিতাবের অসীম ব্যাপ্তি ও ‘উম্মুল কিতাব’
আল্লাহর বাণীর বিশালতা কোনো জাগতিক খাতা বা বাঁধাই করা গ্রন্থে কখনোই সমাপ্ত হতে পারে না। কুরআন নিজেই সেই অসীমতাকে রূপক ও প্রত্যক্ষতায় বর্ণনা করেছে:
قُل لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِّكَلِمَاتِ رَبِّي لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَن تَنفَدَ كَلِمَاتُ رَبِّي
Qul law kāna al-baḥru midādan li-kalimāti rabbī lanafida al-baḥru qabla an tanfada kalimātu rabbī...
“বল, সমুদ্র যদি আমার রবের বাণী লেখার কালি হতো, তবে আমার রবের বাণী নিঃশেষ হওয়ার আগেই সমুদ্র নিঃশেষ হয়ে যেত...”
وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِن شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِن بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ
Wa-law annamā fī al-arḍi min shajaratin aqlāmun wal-baḥru yamudduhu mim-ba‘dihī sab‘atu abḥurin mā nafidat kalimātu Allāh.
“পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হতো আর সাত সমুদ্র কালি হতো, তবুও আল্লাহর বাণী শেষ হতো না।”
وَإِنَّهُ فِي أُمِّ الْكِتَابِ لَدَيْنَا لَعَلِيٌّ حَكِيمٌ
উচ্চারণ: Wa-innahu fī ummi al-kitābi ladaynā la-‘aliyyun ḥakīm.
অনুবাদ: আর নিশ্চয়ই তা আমাদের কাছে ‘উম্মুল কিতাবে’ (মূল গ্রন্থে) রয়েছে সমুচ্চ ও প্রজ্ঞাময়।
أُمِّ الْكِتَابِ (উম্মুল কিতাব): সৃষ্টির আদি উৎস ও সর্বজনীন প্রজ্ঞার মূল কেন্দ্র। এই অসীম জ্ঞানকে ১১৪ সূরার সীমিত পৃষ্ঠায় আবদ্ধ মনে করা আল্লাহর কালিমাত ও কিতাবের ব্যাপ্তিকে খর্ব করার শামিল।
৯. কুরআন তিলাওয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য: মুখস্থ আবৃত্তি বনাম আকল ও আমল
কিতাব তিলাওয়াত নিয়ে কুরআনে এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা এসেছে সূরা আল-বাকারায়:
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
উচ্চারণ: A-ta’murūna an-nāsa bil-birri wa tansawna anfusakum wa antum tatlūna al-kitāba afalā ta‘qilūn.
অনুবাদ: তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও আর নিজেদের ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো? তবে কি তোমরা বুদ্ধি খাটাবে না (আকল ব্যবহার করবে না)?
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের বাস্তব দৃষ্টান্ত:
একজন জটিল রোগী যদি চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনটির একটি শব্দও না বুঝে কেবল সকাল-সন্ধ্যা সুর করে মুখস্থ পাঠ করে যায়—সে কি কখনো আরোগ্য লাভ করবে? কখনোই না। প্রেসক্রিপশনের সার্থকতা তার নির্দেশ অনুযায়ী ঔষধ সেবন ও পথ্য গ্রহণের মধ্যে।
অনুরূপভাবে, কুরআন হলো মানুষের আত্মিক ও সামাজিক ব্যাধির নিরাময়। না বুঝে শুধু ধ্বনি আবৃত্তির মধ্যে কুরআন অবতীর্ণ হয়নি; এর উদ্দেশ্য হলো বুদ্ধি (আকল) দিয়ে এর নির্দেশ উপলব্ধি করা এবং জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো।
১০. সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
কুরআনিক শব্দতত্ত্ব ও আয়াতসমূহের সামগ্রিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে যে মূল সত্য উন্মোচিত হয়, তা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
আল-কিতাব (الْكِتَاب)
আমাদের ভেতরের সহজাত লিপি, বিবেক ও সৃষ্টিগত সার্বিক বিধান—যা আমাদের মন ও অস্তিত্বের চেতনায় আল্লাহ নিহিত রেখেছেন।
আল-কুরআন (الْقُرْآن)
সেই অভ্যন্তরীণ কিতাব ও ওহীর সত্যের গতিশীল সংকলন ও প্রকাশ—যা জীবন্ত বাণীরূপে মানুষের বোধগম্য ভাষায় কথা বলে ও পথ দেখায়।
আরবি (عَرَبِيّ)
ভাষাতাত্ত্বিক অর্থে ‘স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল বোধগম্য প্রকাশ’। এটি কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ডের একচেটিয়া ভাষা নয়; যে ভাষায় সত্য স্পষ্ট হয়, সেটাই শ্রোতার নিকট আরবি।
আ‘জামী (أَعْجَمِيّ)
যা মানুষের নিকট অচেনা, দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট। বোধহীন ধ্বনি মানুষের জন্য হেদায়াত হতে পারে না।
কুরআন শুধু একটি দূরবর্তী মরুভূমির অতীতের ঐতিহাসিক গ্রন্থে সীমাবদ্ধ কোনো ঐতিহ্য নয়। কুরআন হলো আপনার এবং আমার ভেতরের সেই বিবেক ও চেতনার জীবন্ত রূপ যা প্রতিটি মানুষকে সৎপথ দেখায়, ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য করতে উদ্বুদ্ধ করে।
সূরা ইব্রাহীমের সেই চিরন্তন মূলনীতি সর্বদা স্মর্তব্য: “আমরা প্রত্যেক বার্তাবাহককে তার জাতির নিজস্ব ভাষায় পাঠিয়েছি...”। আপনার রব আপনার সাথে আপনারই বোধগম্য ভাষায় কথা বলেন। মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই বার্তা উপলব্ধি করার জন্য প্রস্তুত?

