কুরআনের আয়াতের ভুল অর্থকরণ

আলম এম.আলম এম.২৮ আগস্ট, ২০২৬

 আল্লাহ প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দান করেন – “কবুল করেন” অর্থ ভুল!

আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন পাতা ঝরে না! – “হুকুম ছাড়া” ভুল অর্থকরণ!
অতীব পরিতাপের বিষয় এই যে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম মনমানস দীন ইসলাম সম্পর্কে যে ধারণা সমাজের ধর্মবেত্তা শ্রেণির নিকট থেকে পেয়ে থাকে, তার সিংহভাগ কুরআনের বাইরের গ্রন্থাদি এবং প্রচারকের ব্যক্তিগত রুচি-পছন্দের মর্জির উপর ভিত্তি করে তৈরি।
মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট শ্রেণি সাধারণ মুসলিম জনতাকে কুরআন থেকে যে সামান্য দু’চারটা কথা শোনায়, তারও অনেকগুলো ভুলভাবে ও বিচ্যুত অর্থে বলে থাকে। ফলে কুরআনের বেশ কিছু আয়াত নিয়ে সমাজে বিকৃত অর্থকরণ ও তা থেকে তৈরি সংকট জারি আছে। তেমন দুটি আয়াত নিয়ে আমরা আজকের পোস্টে কথা বলতে চাই।
এক. “আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দেই”
কুরআনে আছে, “উজিবু দা’ওয়াতাত দা’য়ী ইযা দা’য়ান” – মানে, আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দেই, যখনি সে আমাকে আহ্বান করে। এই আয়াত আমাদেরকে সংকটে ফেলে দেয় – বাস্তবে আমরা আমাদের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পাই, জীবনে এমন বহু বহু বিষয়ে আমরা আল্লাহকে ডেকেছি, যার জবাব বা সমাধান আমরা পেয়েছি বলে বিশ্বাস করিনা।
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
আর যখন আমার বান্দারা আমার সন্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন (তুমি বলে দাও)! আমি নিঃসন্দেহ অতি নিকটে। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দেই যখনি সে আমাকে আহ্বান করে। কাজেই তারা আমার আহবানে সাড়া দিক আর আমাতে ঈমান আনুক- যাতে তারা সুপথে চলতে পারে। -২:১৮৬
And when My servants ask you concerning Me, then surely I am very near; I answer the prayer of the suppliant when he calls on Me, so they should answer My call and believe in Me that they may walk in the right way.
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে। -৪০:৬০
প্রথমত, জবাব দেয়া মানে সাড়া দেয়া; কবুল করা নয়। কবুল করা বা গৃহীত অর্থে কুরআনে একাধিক ব্যবহার আছে।
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন অন্বেষণ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। -৩:৮৫
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
তারা কি জানে না যে আল্লাহই তাঁর বান্দাদের থেকে তওবা কবুল করেন আর দান গ্রহণ করেন, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, করুণাময়। -৯:১০৪
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
হে প্রভু! আমাদের থেকে কবুল কর; নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ। -২:১২৭
কোন বিষয় স্রষ্টার কাছে গৃহীত হওয়া অর্থে কুরআনে “কবুল” পদের বহু ব্যবহার আছে। তাই প্রথমেই আমরা এ বিষয়ে সতর্ক থাকব যে, ২:১৮৬ বা ৪০:৬০ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ আমাদের আহবান বা তাঁর কাছে যা কিছু চাইব তা কবুল করে নিবেন, এমন কোন ওয়াদা করেন নি।
আয়াতদ্বয়ে বলা হয়েছে, যদি তোমরা আমাকে ডাক, তবে আল্লাহ সেই ডাকের জবাব দেন বা সাড়া দান করেন। সমস্যা হল, এখানে ‘সাড়া দেওয়ার’ বিষয়টিকে আমরা কবুল করা অর্থে প্রচার করি ও বুঝিয়ে থাকি। ফলে আমজনতা বারবার সংকটে পড়ে যায় – যার যা কিছু ইচ্ছা তাই বলে সে স্রষ্টার অনুগ্রহ লাভের জন্য তাঁকে ডাকতে থাকে। কিন্তু বাস্তবে যখন তা তার কাঙ্খিত সময়ের মধ্যে পূরণ হয় না, তখন সে হতাশায় ভোগে এবং স্রষ্টার প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণে প্রবৃত্ত হয়।
বস্তুত কারও ডাকে (দাওয়াত) সাড়া দেওয়ার (জবাব) সাধারণ অর্থটি কী? একজন সন্তান তার পিতাকে আহবান করে তার জন্য কোন জিনিস চাইল বা আনতে বলল। পিতা জবাবে সম্ভাব্য যতগুলো কথা বলতে পারে – ১) ঠিক আছে এনে দিব; ২) দুদিন পর পাবে; ৩) বছর খানেক বাদে তুমি তা পাবে; ৪) তুমি যখন বড় হবে, তখন কিনে দেব; অথবা ৫) বাবা, এটা দেয়া যাবে না; বরং তোমাকে আমি ভিন্ন কিছু দিব ইত্যাদি। এভাবে বৈচিত্র্যময় জবাব পিতার পক্ষ থেকে সন্তান পেতে পারে। এর প্রতিটিই সন্তানের ডাকে সাড়া দেয়ার সাথে শামিল; নেতিবাচক হলেও সেটি সাড়া বা জবাবদান বলে ধর্তব্য। তবে সন্তানের ডাকের বিপরীতে পিতা যদি শুনেও নিশ্চুপ থাকে, তবে তা হবে ডাক শুনেও তাতে সাড়া না দেয়া বা ভ্রুক্ষেপ না করা।
ঠিক এ বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে আয়াতে যে, স্রষ্টা আল্লাহ আমাদের আহবানে সাড়া দান করেন। এমন নয় যে, আমরা আমাদের প্রয়োজন আর আকুতির কথা তাঁকে বলতে থাকি, আর তিনি নির্বিকার থাকেন বা আমাদেরকে উপেক্ষা করেন বা কোন পাত্তাই দেন না – এমন নয়।
কুরআনের বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে মুহিউদ্দীন খান এই ভুলটি করে গেছেন-
“যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে”। -২:১৮৬
তবে তিনি ৪০:৬০-এর অনুবাদে কবুল শব্দটি পরিহার করেছেন – “তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব”।
ওপার বাংলার অনুবাদক জহুরুল হক যথার্থই লিখেছেন – “আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার জবাব দিই যখনি সে আমাকে আহ্বান করে”। -২:১৮৬
''তোমরা আমাকে আহ্বান করো, আমি তোমাদের প্রতি সাড়া দেব”। -৪০:৬০
উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন “সাড়া দেয়া” অর্থ করেছে।
তাই “ইফতারের সময় রোযাদারের অবশ্যই একটি দোয়া আছে, যা রদ হয় না (কবুল হয়)” মর্মে ইবনে মাজাহ ও বায়হাকির যে বয়ান নবীজির বরাতে শোনানো হয়, তা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া, ভ্রান্ত। এটা তো স্রষ্টাকে অনেকটা “ঠেকিয়ে(?)” দেয়ার প্রচেষ্টায় মানুষকে প্ররোচিত করা, যা আল্লাহ কখনও হতে দিতে পারেন না।
“ক” নামক একজন প্রার্থনা করবে, আল্লাহ আগামীকালের মধ্যে তুমি “খ”-কে গজব বর্ষণ করে হালাক করে দাও; দেয়ালের অপর পার্শ্ব থেকে “খ” এই একই প্রার্থনা “ক”-এর জন্য করবে। এটা হতে পারে না, তাতে করে পুরো সৃষ্টি জগতে বড় বিপর্যয় তৈরি হবে, মানবজীবন অচল, স্থবির হয়ে পড়বে। সেটা কুরআনে সুস্পষ্ট করেই জানানো হয়েছে।
وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ بَلْ أَتَيْنَاهُمْ بِذِكْرِهِمْ فَهُمْ عَنْ ذِكْرِهِمْ مُعْرِضُونَ
আর সত্য যদি তাদের কাছে কামনা-বাসনার অনুসারী হত, তবে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল এবং এগুলোর মধ্যবর্তী যা কিছু আছে, তার সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত। বরং আমি তাদেরকে দান করেছি উপদেশ, কিন্তু তারা তাদের উপদেশ থেকে বিমুখ থাকে। -২৩:৭১
তাহলে আল্লাহ আমাদের ডাকে কীভাবে ও কোন শর্তে সাড়া দান করেন বা চুড়ান্ত বিচারে আমাদের প্রার্থনা কবুল করেন? তার জন্য ২:১৮৬ আয়াতের শেষাংশেই শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যে, আগে আমাদের কুরআনে ঘোষিত তাঁর যত আহবান বা ডাক তথা আদেশ-নিষেধ আছে তা মেনে নিতে হবে। এভাবে কুরআনে বহু শর্ত আছে, আমাদের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত বহু দায়িত্ব-কর্তব্য আছে যা নিষ্পন্ন সাপেক্ষে তা প্রদান করা হবে। এজন্য পুরো কুরআনেই আমাদের জন্য বিস্তৃত পাঠ সাজানো আছে।
দুই. “আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন পাতা ঝরে না”!
দ্বিতীয় যে ভ্রান্ত ধারণাটি জনমানসে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তা অনেকটা এরকম – আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না বা ঝরে না। সূত্র হিসেবে সূরা আন’আমের আয়াতকে উল্লেখ করা হয়। এর দ্বারা যে সংকট ও দ্বিধা মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে দেয়, তা হলো মানুষ তখন বলতে শুরু করে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া যদি কোন কিছু নাই হয়, তাহলে আমি কীভাবে কল্যাণকর্ম করব যদি তিনি তা ইচ্ছা না করেন বা আমার জন্য তা হুকুম না করেন। আবার অন্যদিকে তারা এটাও ধরে নেয় যে, যারা খারাপ কাজ করে, তারাও কি আল্লাহর হুকুমে সেই কাজ করে?
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ
তাঁর কাছেই অদৃশ্য জগতের চাবি রয়েছে। এ গুলো তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা আছে, তিনিই জানেন। কোন পাতা ঝরে না; কিন্তু তিনি তা জানেন। কোন শস্য কণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোন আর্দ্র ও শুস্ক দ্রব্য পতিত হয় না; কিন্তু তা সব প্রকাশ্য গ্রন্থে রয়েছে। -৬:৫৯
বস্তুত, আয়াতে মোটেই আল্লাহর ‘হুকুমের’ কথা বলা হয়নি। বরং সেখানে আছে, অমা তাসকুতু মিন ওয়ারাকতিন ইল্লা ইয়া’লামুহা – মানে তাঁর অজ্ঞাতসারে কোন পাতা ঝরে না বা আরও পরিস্কার করে বললে – কোন ঘটনাই তাঁর জ্ঞানের বাইরে সংঘটিত হয় না। সকল কিছু আল্লাহর বেধে দেয়া নিয়মেই ঘটে, কিন্তু সে সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
এই অর্থ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও এক ধরণের আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে যে, “তোমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অভিপ্রায়ের বাইরে অন্য কিছুই ইচ্ছা করতে পার না (৮১:২৯)”। সূরা তাকভীরসহ আরও বেশ কিছু সূরায় এই একই বক্তব্য এসেছে – ভিন্ন কোন পোস্টে কুরআন থেকে তার উপর আলোকপাত করতে চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।