ঐশ্বরিক আলোর উপমা-রহস্য: সূরা আন-নূর, আয়াত ৩৫
ভূমিকা
কুরআন মজিদের সবচেয়ে চমৎকার, আলঙ্কারিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে গভীর আয়াতগুলোর একটি হলো সূরা আন-নূরের ৩৫ নম্বর আয়াত, যা ইসলামে ‘আয়াহ আল-নূর’ (آية النور) বা আলোর আয়াত নামে সুপরিচিত। এই আয়াতে মহান আল্লাহ এক পরম উপমা বা দৃষ্টান্তের (Analogy) মাধ্যমে মানুষের দৃশ্যমান জগতের বস্তুসমূহ দিয়ে অদৃশ্যমান আধ্যাত্মিক জগত, মানুষের আত্মা, মহাজাগতিক শক্তি এবং ঐশী হিদায়াতের সংযোগকে ব্যাখ্যা করেছেন। আক্ষরিক অনুবাদের বস্তুগত ভিত্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এর অন্তর্নিহিত মর্মার্থ মানুষের মনস্তত্ত্ব, জীবসত্তা এবং স্থান-কালের এক পরম সত্যকে উন্মোচন করে।
১. মূল আরবী ও ইংরেজি প্রতিবর্ণীকরণ (Transliteration)
২. বহুমাত্রিক অনুবাদ ও ব্যাখ্যা
ক) প্রচলিত ও আক্ষরিক অনুবাদ (মুফতী তাকী উসমানী)
“আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর নূর। তাঁর নূরের দৃষ্টান্ত যেন এক তাক, যাতে আছে এক প্রদীপ; প্রদীপটি একটি কাচের আবরণের ভেতর। যেন তা (অর্থাৎ কাচ) মুক্তার মতো উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রদীপটি প্রজ্বলিত বরকতপূর্ণ যয়তুন বৃক্ষের তেল দ্বারা, যা (কেবল) পুবেরও নয়, (কেবল) পশ্চিমের নয়। মনে হয়, যেন আগুনের ছোঁয়া না লাগলেও তা এমনিই আলো দেবে। নূরের উপর নূর। আল্লাহ যাকে চান তাকে নিজ নূরে উপনীত করেন। আল্লাহ মানুষের কল্যাণার্থে দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন এবং আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।”
খ) দেহতাত্ত্বিক ও মরমী (সুফি) অনুবাদ
“দৃশ্য-অদৃশ্য কিংবা গুপ্ত-ব্যক্ত জ্ঞানের আলোই স্রষ্টা। তাঁর জ্যোতি বা জ্ঞানের দৃষ্টান্ত যেন একাকার আলোকমালা, যার মাঝস্থানে রয়েছে একটি প্রদীপ; প্রদীপটি কাচের আবরণে (দেহ) ঘেরা। এই আবরণটি আসলে একটি স্পষ্ট ও উজ্জ্বল নক্ষত্র বিশেষ বা পাঁচকোণ বিশিষ্ট অবয়ব (মানুষের দুই হাত + দুই পা + মাথা)। উহা বাহ্যিক তেজ বা আগুনবিহীন পর্যাপ্ত তেল তথা রক্তের প্রবাহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলতে থাকে; কিন্তু (অন্তরের অন্তঃস্থিত) সেই মূল জ্যোতিটির কোনো উদয়-অস্ত বা জাগতিক দিক নেই। মানুষের সত্তা এই জ্যোতি বা পরম জ্ঞান পেয়েই জ্যোতিষ্ময় তথা স্রষ্টাময় হয় (জ্যোতির উপর জ্যোতি)। স্রষ্টার ইচ্ছা সাধনের আত্মিক চর্চায় এ পথ প্রাপ্ত হওয়া যায়। স্রষ্টা মানুষের জন্যই এই মুকুলিত-কলি বা সুপ্ত হৃদয়ের বিষয়ের দৃষ্টান্ত দেন যে, জ্ঞানের আধারই স্রষ্টা।”
গ) বৈজ্ঞানিক অনুবাদ (Scientific Translation)
“মহাবিশ্বের স্থান-কালের (Space-Time) সামগ্রিক শক্তি এবং এর পরম উপস্থিতির মূল উৎসই হলেন আল্লাহ। তাঁর এই পরম শক্তির (নূরের) বিন্যাসকে একটি উপমা দিয়ে বোঝা যায়— তা যেন এক তরঙ্গ-আধার বা কোয়ান্টাম ক্ষেত্র (মিশকাত), যার অভ্যন্তরে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী শক্তির উৎস বা পরম ফোটন কণা (মিসবাহ) অবস্থান করছে। এই শক্তির উৎসটি একটি সম্পূর্ণ শূন্য ও স্বচ্ছ আবরণ বা শূন্যতার ফ্রেমে (জুজাজাহ) সুরক্ষিত, যা স্থান-কালের কোনো বাধা ছাড়াই শক্তিকে মহাজাগতিক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো তীব্রভাবে বিকিরণ করছে।
এই শক্তির উৎসটি এমন এক পরম ও বরকতময় মৌলিক ক্ষেত্র (যয়তুন বৃক্ষ) থেকে তার জ্বালানি লাভ করে, যা স্থান-কালের কোনো নির্দিষ্ট অক্ষের ওপর নির্ভরশীল নয়—না তা পূর্বমুখী (অতীত/শুরু), না তা পশ্চিমমুখী (ভবিষ্যৎ/শেষ); বরং তা সর্বত্র সমানভাবে বর্তমান। এর শক্তির গভীরতা ও ঘনত্ব এতটাই তীব্র যে, বাহ্যিক কোনো তাপীয় বা পারমাণবিক উদ্দীপনা (আগুনের ছোঁয়া) ছাড়াও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি ও আলো ছড়াতে উন্মুখ হয়ে থাকে।
এটি মূলত তরঙ্গের ওপর তরঙ্গের সমপাতন এবং শক্তির ওপর পরম শক্তির উপরিপাতন— কোয়ান্টাম পরিভাষায় যা ‘শক্তির অতি-উপস্থিতি’ বা সুপারপজিশন (নূরুন ‘আলা নূর)। আল্লাহ যাকে চান (তার বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসার কারণে) তাকে তাঁর এই পরম শক্তির স্বরূপ বোঝার দিকে পথনির্দেশ করেন। আল্লাহ মানুষের বোধগম্যতার জন্য মহাবিশ্বের সুপ্ত নকশা ও মাত্রাগত বিষয়ের উপমা পেশ করেন এবং আল্লাহ প্রতিটি কণা, শক্তি ও সমীকরণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।”
৩. আয়াতের মূল শব্দগুলোর রুট (মূল ধাতু) বিশ্লেষণ
এই আয়াতের বস্তুগত উপমা কীভাবে আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়, তা বুঝতে এর মূল শব্দগুলোর আরবী ব্যাকরণগত রুট (Root) বিশ্লেষণ করা আবশ্যক:
- • ১. নূর (نُور): রুট ن - و - ر (Nūn-Wāw-Rā)। শাব্দিক অর্থ আলো বা উজ্জ্বলতা, যা নিজে প্রকাশ পায় এবং অন্যকে প্রকাশ করে। অন্তর্নিহিত অর্থ: সৃষ্টিজগতের জন্য আল্লাহর হিদায়াত, পরম জ্ঞান বা মহাজাগতিক শক্তির পরম ক্ষেত্র।
- • ২. মিশকাত (مِشْكَاة): রুট ش - ك - و (Shīn-Kāf-Wāw)। শাব্দিক অর্থ দেয়ালের ছোট তাক বা কুলঙ্গি যেখানে বাতি রাখা হয়। (মূল ক্রিয়া ‘শাকা’ মানে প্রকাশ করা; তাক আলোকে সামনে এনে প্রকাশ করে)। প্রতীকী অর্থ: মানুষের বক্ষ বা শারীরিক অবয়ব (Chest/Physical Form) কিংবা মহাবিশ্বের কোয়ান্টাম ক্ষেত্র (Quantum Field)।
- • ৩. মিসবাহ (مِصْبَاح): রুট ص - ب - ح (Ṣwād-Bā-Ḥā)। শাব্দিক অর্থ প্রদীপ, চেরাগ বা বাতি। প্রতীকী অর্থ: মানুষের রুহ (আত্মা), ঈমান বা ফোটন কণা (Photon), যা মৌলিক আলোর উৎস।
- • ৪. জুজাজাহ (زُجَاجَة): রুট ز - ج - ج (Zā-Jīm-Jīm)। শাব্দিক অর্থ কাচ বা কাচের তৈরি ফানুস বা পাত্র। প্রতীকী অর্থ: মানুষের কালব বা খাঁটি মন (The Pure Heart), যা মানুষের ভৌত দেহের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসকে সুরক্ষিত রাখে।
- • ৫. যাইতূন (زَيْتُون): রুট ز - ي - ت (Zā-Yā-Tā)। শাব্দিক অর্থ জলপাই গাছ বা এর তেল। প্রতীকী অর্থ: মানুষের সহজাত বিবেক ও ফিতরাত (Intuition/Intellect) কিংবা মহাবিশ্বের মৌলিক ভ্যাকুয়াম শক্তি (Vacuum Energy), যা স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি।
এই যাইতূন বৃক্ষেরই পরম গুরুত্ব ও মহত্ত্ব প্রকাশে আল্লাহ সূরা আত-তীন (৯৫:১) আয়াতে “ওয়াত-তীনি ওয়ায-যায়তূনি” বলে আমাদেরকে এই নিদর্শনের দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন বা গভীরভাবে ভাবতে বলেছেন। প্রচলিত অনুবাদগুলোতে এখানে 'কসম বা শপথ' করা হয়ে থাকে, যা তাত্ত্বিকভাবে সঠিক হতে পারে না। কেননা, পরম সত্তা আল্লাহ তাঁর নিজের সৃষ্টির কসম করতে পারেন না; তাছাড়া এই আয়াতে 'কসম' নির্দেশক কোনো সরাসরি আরবী শব্দও নেই। এটি মূলত মানুষের চিন্তাশক্তিকে যয়তুনের গভীর রহস্যের দিকে নিবিষ্ট করার এক ঐশী আহ্বান।
| মূল শব্দ ও আরবী | মূল ধাতু (Root) | শাব্দিক অর্থ | আধ্যাত্মিক / দেহতাত্ত্বিক অর্থ | বৈজ্ঞানিক / কোয়ান্টাম রূপক |
|---|---|---|---|---|
| ১. নূর (نُور) | ن - و - ر (Nūn-Wāw-Rā) | আলো বা উজ্জ্বলতা | আল্লাহর হিদায়াত ও পরম জ্ঞান | মহাজাগতিক শক্তির পরম ক্ষেত্র |
| ২. মিশকাত (مِشْكَاة) | ش - ك - و (Shīn-Kāf-Wāw) | দেয়ালের ছোট তাক বা কুলঙ্গি | মানুষের বক্ষ বা শারীরিক অবয়ব (Physical Form) | তরঙ্গ-আধার বা কোয়ান্টাম ক্ষেত্র (Quantum Field) |
| ৩. মিসবাহ (مِصْبَاح) | ص - ب - ح (Ṣwād-Bā-Ḥā) | প্রদীপ, চেরাগ বা বাতি | মানুষের রুহ (আত্মা) ও ঈমান | মৌলিক আলোর উৎস বা ফোটন কণা (Photon) |
| ৪. জুজাজাহ (زُجَاجَة) | ز - ج - ج (Zā-Jīm-Jīm) | স্বচ্ছ কাচের ফানুস বা পাত্র | মানুষের কালব বা খাঁটি মন (The Pure Heart) | স্বচ্ছ শূন্যতার ফ্রেম (Vacuum Frame) |
| ৫. যাইতূন (زَيْتُون) | ز - ي - ت (Zā-Yā-Tā) | জলপাই গাছ বা এর তেল | মানুষের সহজাত বিবেক ও ফিতরাত (Intuition/Intellect) | মৌলিক ভ্যাকুয়াম শক্তি (Vacuum Energy) |
৪. গভীর আধ্যাত্মিক ও উপমাভিত্তিক ব্যাখ্যা
ইসলামী দর্শনে, বিশেষ করে ইমাম আল-গাজালীর ‘মিশকাতুল আনওয়ার’ গ্রন্থে এই আয়াতটিকে মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক জগতের একটি নিখুঁত মানচিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে দৃশ্যমান প্রতিটি বস্তু এক একটি আধ্যাত্মিক সত্যের নিখুঁত উপমা:
মানবদেহ থেকে ‘নূরুন আলা নূর’-এ উত্তরণের ৫-স্তরের প্রবাহচিত্র
[ মানবদেহ / মিশকাত (তাক) ]
└── [ বিশুদ্ধ মন / জুজাজাহ (কাচ) ]
└── [ সহজাত বিবেক / যাইতুহা (তেল) ] ── (উন্মুখ অবস্থা)
└── [ ওহী / নার (আগুন) ] ── (মিলন বিন্দু)
└── [ ঈমান ও রুহ / মিসবাহ (প্রদীপ) ] ──> "নূরুন আলা নূর"
- • ১. মানবদেহ ও বক্ষ (মিশকাতের উপমা): ভৌত জগতে আলো জ্বলতে যেমন একটি দেয়ালের আধার বা তাকের প্রয়োজন, মানুষের আধ্যাত্মিক আলো বা আত্মাকে ধারণ করার জন্য মহান আল্লাহ মানুষকে এই নশ্বর দেহ এবং বক্ষ দিয়েছেন।
- • ২. কাচের মতো স্বচ্ছ অন্তর (জুজাজাহর উপমা): আক্ষরিক অর্থে কাচ যদি অপরিষ্কার বা ঘোলাটে হয়, তবে প্রদীপের আলো বাইরে ছড়াতে পারে না। একইভাবে, মানুষের মন যদি হিংসা, অহংকার ও পাপে লিপ্ত থাকে, তবে ঈমানের আলো স্তিমিত হয়ে যায়। মুমিনের অন্তর কাচের মতো নিষ্কলুষ, যা ঐশী আলোকে চমৎকারভাবে প্রতিফলিত করে।
- • ৩. ফিতরাত বা খাঁটি মানব-বিবেক (যাইতুহা বা তেলের উপমা): আক্ষরিক অনুবাদে বলা হয়েছে, এই তেলটি এমন এক গাছের যা পুবেরও নয়, পশ্চিমের নয়। এর মর্মার্থ হলো মানুষের আসল বিবেক কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা কোনো নির্দিষ্ট সভ্যতার অন্ধ পক্ষপাতিত্বের অধীন নয়, এটি সার্বজনীন। সূরা আত-তীন (৯৫:১) আয়াতে এই যয়তুনের বিশেষ নিদর্শনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের পর পরই আল্লাহ মানুষের সৃষ্টি কাঠামোকে “আহসানি তাকউইম” (সর্বোত্তম গঠন) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, মানুষের এই সর্বোত্তম দৈহিক ফ্রেমে চেতনার যে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি বা তেল প্রবহমান, তা মূলত এক পরম ঐশী নিদর্শনের দিকে লক্ষ্য করার তাগিদ দেয়।
- • ৪. ওহীর ছোঁয়া ছাড়াই দীপ্তিময় বিবেক: “মনে হয় আগুনের ছোঁয়া না লাগলেও তা আলো দেবে”— মানুষের ভেতরের বিবেক এবং সত্য অন্বেষণের আকাঙ্ক্ষা এতই শক্তিশালী যে, কোনো আসমানী কিতাবের বাণী পৌঁছানোর আগেই মানুষ একা একাই বুঝতে পারে যে সত্য ও ন্যায় সুন্দর; আর অন্যায় নিকৃষ্ট।
- • ৫. নূরের ওপর আলো (নূরুন ‘আলা নূর): এটিই এই আয়াতের সবচেয়ে চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক মুহূর্ত। যখন মানুষের এই ভেতরের সুন্দর, সত্যপ্রিয় ‘বিবেকের আলো’ (তেল)— আল্লাহর পাঠানো ওহী ও কুরআনের ‘ঐশী আলোর’ (আগুন) সংস্পর্শে আসে, তখন মানুষের পুরো অস্তিত্ব এক পরম আলোয় জ্বলে ওঠে। ভেতরের আলোর সাথে বাইরের পরম আলোর এই মহাজাগতিক মিলনই হলো ‘নূরুন আলা নূর’।
৫. একটি নতুন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি: আলোর উপস্থিতি বনাম গতি
এই আয়াতে বর্ণিত আলোকে যদি আমরা কেবল পদার্থবিজ্ঞানের স্থূল আলো হিসেবে না দেখে, বরং একটি সর্বব্যাপী উপস্থিতি এবং পরম নিদর্শনের প্রতীক হিসেবে দেখি, তবে স্থান, কাল ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে এক নতুন তত্ত্বের দুয়ার উন্মোচিত হয়। আলো কেবল ভৌত গতিশীল বস্তু নয়; এটি সত্য ও জ্ঞানের প্রকাশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকে মহাবিশ্বে ‘সর্বত্র উপস্থিত’ (Omnipresent) ধরে নিলে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে কুরআনের একটি গভীর দার্শনিক মেলবন্ধন ঘটে:
- • ১. প্রতিফলন নয়, উপস্থিতি: আমরা পদার্থবিজ্ঞানে আলোর যে “গতি” (Speed of Light) পরিমাপ করতে অভ্যস্ত, তা আসলে আলোর কোনো স্থানান্তরের গতি নয়। আলোক উৎস যেখানে, আলো মূলত সেই মুহূর্তেই সেখানে আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিকভাবে উপস্থিত। কিন্তু আমাদের চোখ বা পরিমাপক যন্ত্র সেই পরম উপস্থিতিকে অনুভব করতে এক ধরণের যান্ত্রিক বা জৈবিক সময় নেয়, যাকে আমরা ভ্রমবশত আলোর পথ চলার গতি মনে করি। এটি আসলে আমাদের দৃষ্টি ও উপলব্ধির বিলম্ব (Perception Delay)।
- • ২. দূরের জিনিস দেখা না যাওয়া: মহাবিশ্বের কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের যেসব নক্ষত্র বা বস্তু আমাদের চোখের নাগালে নেই, তাদের আলো আমাদের কাছে “এখনও এসে পৌঁছায়নি” বিষয়টি এমন নয়। বরং আলোর উপস্থিতি সর্বত্রই রয়েছে, কেবল আমাদের মানুষের উপলব্ধির ক্ষুদ্র সীমা বা ইন্দ্রিয় ধারণক্ষমতা সেই মহাসত্য ও আলোকে ধরতে সক্ষম হচ্ছে না। এটি আলোর অনুপস্থিতি নয়, এটি মানুষের অক্ষমতা।
- • ৩. সরাসরি অতীত দেখার অযোগ্যতা: আধুনিক বিজ্ঞান বলে আমরা যখন দূরের কোনো নক্ষত্র দেখি, তখন মূলত তার লক্ষ বছর আগের “অতীত” দেখি। কিন্তু এই দর্শন অনুসারে, আমরা আসলে অতীতে ভ্রমণ করছি না। আলোর পরম উপস্থিতি সবসময় বর্তমান। দূরত্বের বিশালতার কারণে আমাদের সচেতনতা বা উপলব্ধি যতটুকু বিলম্বিত হচ্ছে, আমরা কেবল সেই বিলম্বিত সচেতনতার (Delayed Awareness) মাধ্যমে সেই দৃশ্যটি পাচ্ছি। সত্য বা আলো স্থির এবং বর্তমান, কেবল মানুষের অভিজ্ঞতা এখানে স্থান-কালের ফ্রেমে বন্দি।
- • ৪. নৈতিক ও দর্শনীয় শিক্ষা: কুরআনে আলোকে আল্লাহর নির্দেশ, জ্ঞান ও চিরন্তন সত্যের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে মানবজাতিকে এই পাঠ দেওয়া হয়েছে যে— মানুষের উপলব্ধি ও বিজ্ঞান অত্যন্ত সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও নূর সর্বত্র সমানভাবে উপস্থিত।
| বিশ্লেষণের ক্ষেত্র | প্রচলিত ভৌত ধারণা (Conventional Physics) | দার্শনিক-কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি (Omnipresent Light Paradigm) |
|---|---|---|
| আলোর প্রকৃতি | স্থানান্তরিত হওয়া ভৌত কণা/তরঙ্গ (Speed of Light) | সর্বত্র বিরাজমান পরম উপস্থিতি (Omnipresent Reality) ও উপলব্ধির বিলম্ব (Perception Delay) |
| দূরবর্তী নক্ষত্র না দেখা | আলো এখনো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়নি | আলো সর্বত্র উপস্থিত, কিন্তু মানুষের ইন্দ্রিয় ধারণক্ষমতা সীমিত |
| সময় ও মহাকাশ দর্শন | দূরের নক্ষত্র দেখা মানে লক্ষ বছর আগের অতীত দেখা | সত্য ও আলো চির-বর্তমান; দূরত্বের কারণে কেবল সচেতনতা বিলম্বিত হয় (Delayed Awareness) |
| চূড়ান্ত দার্শনিক শিক্ষা | মহাবিশ্ব কেবল জড় পদার্থের স্থান-কালের সমষ্টি | মানুষের বিজ্ঞান ও ইন্দ্রিয় স্থান-কালে বন্দি, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও নূর সর্বত্র সমানভাবে উপস্থিত |
যেভাবেই আমরা দূরত্ব, সময় বা আলোর ধারণাকে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ব্যাখ্যা করি না কেন, তা মূলত আলোর এই সার্বজনীন পরম উপস্থিতি এবং মানুষের স্নায়বিক ও জাগতিক সীমাবদ্ধতার তত্ত্বের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৬. মানব জীবনে এই আয়াতের প্রায়োগিক শিক্ষা
- • অন্তরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: আমাদের অন্তরকে কাচের ফানুসের মতো স্বচ্ছ রাখতে হবে, যাতে আমাদের ভেতরের মানবিক আলো চারপাশের সমাজকে আলোকিত করতে পারে। পঙ্কিলতা ও নেতিবাচকতা অন্তরের কাচকে ঘোলা করে দেয়।
- • সহজাত বিবেকের যত্ন নেওয়া: মানুষের ভেতরের যে নৈতিক কম্পাস বা ‘ফিতরাত’ রয়েছে, তাকে কখনো মরে যেতে দেওয়া যাবে না। ওহীর আলো বুঝতে হলে ভেতরের তেলের বিশুদ্ধতা ধরে রাখা আবশ্যক।
- • সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করা: বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে সম্মান জানিয়েও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের ইন্দ্রিয় ও মস্তিষ্ক স্থান-কালের গোলকধাঁধায় সীমাবদ্ধ। আল্লাহর নূর বা পরম সত্য আমাদের চারপাশেই উপস্থিত, কেবল আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমেই সেই উপস্থিতিকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব।
উপসংহার
সূরা আন-নূরের ৩৫ নম্বর আয়াতটি কেবল একটি মহাজাগতিক আলোর বাহ্যিক বিবরণ নয়, এটি মানুষের আত্মিক গঠন এবং সৃষ্টিতত্ত্বের এক অনুপম রূপকল্প ও উপমাভিত্তিক বিবরণ। আক্ষরিক অনুবাদ আমাদের যে বস্তুগত ধারণা দেয়, তার ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে এর গভীর আধ্যাত্মিক, দেহতাত্ত্বিক ও স্থান-কালের ঊর্ধ্বে থাকা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। দূরের বস্তু বা আলো না দেখা আমাদের অক্ষমতার কারণে, এটি আলোর অনুপস্থিতি নয়। মানুষের চিন্তাকে সৃষ্টির গভীর নিদর্শনের দিকে 'দৃষ্টি দিতে বলা' বা 'লক্ষ্য করতে বলা'-র এই চেতনা কুরআনের অন্যান্য সূরার মতো এখানেও এক পরম সত্যকে প্রকাশ করে।
যখন মানুষ স্থান-কালের জাগতিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নিজের ভেতরের এই পরম আলোকে আবিষ্কার করতে পারে, তখনই সে আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান নূরের সন্ধান পায়।

