কুরআনকে আধুনিক বিজ্ঞানের পাঠ্যবই হিসেবে পড়লে কিছু আয়াত প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। সৃষ্টি কি ছয় দিনে সম্পন্ন হয়েছিল? “সাত আসমান” বলতে কী বোঝানো হয়েছে? যুলকারনাইনের অভিযানে সূর্যকে কি সত্যিই কাদাময় কোনো জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখা গিয়েছিল?
কুরআনের কোনো একটি শব্দ বা আয়াতকে বিচ্ছিন্ন করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
কুরআন নিজেই তার বক্তব্য নিয়ে চিন্তা করতে বলে এবং তার মধ্যে বৈপরীত্য খুঁজে না পাওয়ার জন্য সমগ্র বক্তব্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে বলে:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
তাই কোনো আয়াত আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে আপাতভাবে সাংঘর্ষিক মনে হলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, “কুরআন ভুল কি না?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা আয়াতটির ভাষা, শব্দ, ব্যাকরণ ও প্রসঙ্গ সঠিকভাবে বুঝেছি কি না।
১ ছয় দিন, নাকি ছয় পর্যায়?
কুরআনে একাধিক স্থানে বলা হয়েছে যে আসমানসমূহ, পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী বিষয়সমূহ নির্দিষ্ট أَيَّامٍ (ayyām)-এর মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। সূরা ক্বাফে বলা হয়েছে:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ
এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো يَوْم (yawm) এবং এর বহুবচন أَيَّام (ayyām)। সাধারণ ভাষায় yawm বলতে দিন বোঝানো হতে পারে। কিন্তু কুরআনের ভেতরেই এমন ব্যবহার রয়েছে যেখানে yawm-কে মানুষের ২৪ ঘণ্টার দিনের সঙ্গে সরাসরি সমান করা যায় না। যেমন:
تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
অর্থ: “মালাইকা ও রূহ তাঁর দিকে আরোহণ করে এমন এক ইয়াওমে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।”
وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ
অর্থ: “আর নিশ্চয়ই তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান এক ইয়াওম তোমার প্রতিপালকের কাছে।”
প্রধান অর্থক্ষেত্র: সময়ের একটি নির্দিষ্ট পরিসর, দিন, নির্দিষ্ট সময়কাল।
অতএব কুরআনের নিজস্ব ব্যবহারে yawm = মানুষের ঘড়ির ২৪ ঘণ্টা এই সমীকরণ সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। তাই ৫০:৩৮-এর سِتَّةِ أَيَّامٍ — sittati ayyām-কে সরাসরি “ছয়টি ২৪ ঘণ্টার দিন” হিসেবে অনুবাদ করা ভাষাগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। বরং প্রসঙ্গ অনুসারে এটিকে ছয়টি পর্যায়, ধাপ বা নির্ধারিত সময়পর্ব হিসেবে বোঝার সম্ভাবনা থাকে।
⚠️ এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা অবশ্যই রাখতে হবে। কুরআন কোথাও বলেনি যে এই ছয় পর্যায় আধুনিক বিজ্ঞানের নির্ধারিত কোনো ছয়টি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক যুগ। তাই “কুরআনের ছয় আয়্যাম = বিজ্ঞানের অমুক ছয় ধাপ” এমন নির্দিষ্ট সমীকরণও কুরআন থেকে সরাসরি প্রমাণ করা যায় না। কুরআন যতটুকু বলেছে, আমাদের সিদ্ধান্তও ততটুকুই হওয়া উচিত।
২ কুরআন কি বিজ্ঞানের পাঠ্যবই?
কুরআনের উদ্দেশ্য মহাবিশ্বের পদার্থবিদ্যার পাঠ দেওয়া নয়। তার বক্তব্যের কেন্দ্র মানুষ, তার চিন্তা, তার আচরণ এবং সৃষ্টিজগতের নিদর্শনের মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি। তাই কুরআন যখন সৃষ্টি সম্পর্কে কথা বলে, তখন প্রতিটি বৈজ্ঞানিক সূত্র, পরিমাপ বা প্রযুক্তিগত পরিভাষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে বলে:
قُلِ انظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
এখানে انظُرُوا (unẓurū) এসেছে ن ظ ر (na-ẓa-ra) মূল থেকে। এর সঙ্গে দেখা, পর্যবেক্ষণ, লক্ষ্য করা এবং চিন্তা করে উপলব্ধির অর্থক্ষেত্র যুক্ত। অর্থাৎ কুরআন প্রকৃতিকে মানুষের সামনে একটি নিদর্শনক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে।
৩ “সাত আসমান” বলতে কী বোঝায়?
কুরআনের অন্যতম আলোচিত অভিব্যক্তি সূরা আল-মুলকে এসেছে:
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا ۖ مَّا تَرَىٰ فِي خَلْقِ الرَّحْمَٰنِ مِن تَفَاوُتٍ ۖ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ
পরের আয়াতেই পুনরায় গভীর পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئًا وَهُوَ حَسِيرٌ
এখানে سَبْع (sabʿ) অর্থ সাত এবং سَمَاوَات (samāwāt) হলো سَمَاء (samāʾ)-এর বহুবচন।
سَمَاء — samāʾ (মূল: س م و — sa-ma-wa): অর্থক্ষেত্র হলো ঊর্ধ্বতা, উপরের দিক, ঊর্ধ্বস্থিত পরিসর।
কুরআনের ব্যবহারে samāʾ কেবল আমাদের আধুনিক অর্থের “sky” হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তাই “সাত আসমান”কে আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট সাতটি দৃশ্যমান স্তরের সঙ্গে জোর করে মিলিয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি এটিকে কেবল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সাতটি স্তর বলাও কুরআন দ্বারা নিশ্চিত নয়।
৪ সাত আসমান ও পৃথিবী: একটি গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিক সম্পর্ক
আরেকটি আয়াত বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ
এই আয়াতটি দেখায় যে sabʿ samāwāt-কে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে। কারণ কুরআন শুধু “সাত আসমান” বলেই থেমে যায়নি; পৃথিবীর সঙ্গেও একটি সমান্তরাল সম্পর্ক উল্লেখ করেছে। অতএব আধুনিক কোনো একটি মহাজাগতিক মডেলকে ধরে নিয়ে “এটাই সাত আসমান” ঘোষণা করা কুরআনের বক্তব্যের চেয়ে বেশি কিছু বলা হয়ে যায়।
৫ আসমান কি স্থির?
কুরআন মহাজাগতিক গতিশীলতার কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে:
وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
অর্থ: “প্রত্যেকেই নিজ নিজ ফালাক-এর মধ্যে সাঁতার কাটে।”
لَا الشَّمْسُ يَنبَغِي لَهَا أَن تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ ۚ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
অর্থ: “সূর্যের পক্ষে চাঁদকে ধরে ফেলা সম্ভব নয়, রাতও দিনের আগে এগিয়ে যেতে পারে না; আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ ফালাক-এর মধ্যে সাঁতার কাটে।”
এখানে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ فَلَك — falak (মূল: ف ل ك — fa-la-ka): এর অর্থক্ষেত্রে বৃত্তাকার পথ, কক্ষপথ বা আবর্তনশীল গতিপথের ধারণা পাওয়া যায়।
আর يَسْبَحُونَ — yasbaḥūn এসেছে س ب ح — sa-ba-ḥa থেকে, যার অর্থ: সাঁতার কাটা, প্রবাহের মধ্যে চলা, অবাধে গমন করা।
কুরআন তাই মহাজাগতিক বস্তুকে স্থির বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে না; বরং গতিশীলতার ভাষা ব্যবহার করে।
৬ যুলকারনাইন ও “সূর্যের অস্ত যাওয়া”
এবার সবচেয়ে আলোচিত আয়াতগুলোর একটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক:
حَتَّىٰ إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَوَجَدَ عِندَهَا قَوْمًا
- وَجَدَ — wajada: সে পেল / দেখতে পেল / উপলব্ধি করল
- تَغْرُبُ — taghrubu: অস্ত যেতে / অস্তগামী হতে
এখানে কুরআন সরাসরি বলেনি: “সূর্য একটি কাদাময় ঝরনায় প্রবেশ করল।” বরং বলেছে, সে সূর্যকে অস্ত যেতে দেখল/পেল একটি নির্দিষ্ট স্থানে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আজও বলি: “সূর্য ডুবে গেছে।” কেউ সাধারণ কথোপকথনে এটাকে পৃথিবীর চারদিকে সূর্যের বাস্তব ভ্রমণ হিসেবে ধরে নেয় না। এটি পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহৃত ভাষা। কুরআনের আয়াতটিও যুলকারনাইনের দৃষ্টিতে পাওয়া দৃশ্য বর্ণনা করছে।
৭ “হামি'আহ” শব্দটির প্রশ্ন
এখানে আরও একটি ভাষাগত বিষয় রয়েছে। কুরআনের পাঠে: عَيْنٍ حَمِئَةٍ — ʿaynin ḥamiʾatin
এর অর্থ হতে পারে চোখ, ঝরনা, প্রস্রবণ, উৎস ইত্যাদি। প্রসঙ্গ অনুসারে অর্থ নির্ধারিত হয়।
এর সঙ্গে কালো কাদা, কাদাময় পদার্থ ইত্যাদির অর্থক্ষেত্র যুক্ত।
অতএব দৃশ্যটি এমন একটি কাদাময়/গাঢ় জলাশয় বা প্রস্রবণ, যেখানে পর্যবেক্ষকের কাছে সূর্যের অস্তগমন দৃশ্যমান হয়েছিল। কুরআনের বক্তব্যকে পৃথিবীর ভৌত কাঠামো সম্পর্কে একটি সরাসরি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দাবি বানিয়ে ফেলা প্রয়োজন নেই।
৮ একই কুরআনে সূর্যের নিজস্ব গতি
আরও একটি আয়াত এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا ۚ ذَٰلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ
এখানে ব্যবহৃত تَجْرِي — tajrī এসেছে ج ر ي — ja-ra-ya থেকে, যার অর্থ: প্রবাহিত হওয়া, চলা, গমন করা। অর্থাৎ ১৮:৮৬-এর পর্যবেক্ষণমূলক ভাষাকে ৩৬:৩৮-এর গতিশীলতার বক্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
৯ কুরআনের ভাষাকে কুরআনের ভেতরেই যাচাই করা
এখানেই সূরা নিসার ৪:৮২-এর নীতি কার্যকর হয়। একটি আয়াতের একটি শব্দ নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়। বরং:
শব্দ → বাক্য → প্রসঙ্গ → একই শব্দের অন্যান্য ব্যবহার → একই বিষয়ের অন্যান্য আয়াত → সামগ্রিক কুরআনিক অর্থ।
এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে “কুরআন বনাম বিজ্ঞান” প্রশ্নটি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে কুরআনের বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা সম্ভব। আবার কিছু ক্ষেত্রে আয়াতটি বৈজ্ঞানিক দাবিই করছে না। আর কিছু ক্ষেত্রে আয়াতের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণে আমাদের জ্ঞান সীমিত থাকতে পারে। সেখানে জোর করে “বৈজ্ঞানিক মিরাকল” প্রমাণ করাও যেমন ভুল, তেমনি একটি প্রচলিত অনুবাদকে ধরে “কুরআন বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল” বলাও একই ধরনের তাড়াহুড়া।
১০ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: কুরআন বনাম অনুবাদ
আরবি একটি শব্দের বিপরীতে বাংলা বা ইংরেজিতে সবসময় একটি মাত্র শব্দ পাওয়া যায় না। যেমন:
এই কারণেই কুরআনের গবেষণায় মূল আরবি শব্দ, তার ধাতু, ব্যাকরণ এবং কুরআনিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুবাদ হলো বোঝার একটি মাধ্যম; মূল পাঠ নয়।
১১ তাহলে কি কুরআন ও বিজ্ঞান একই কথা বলে?
এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান জরুরি। কুরআনকে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কারের পূর্বাভাস হিসেবে উপস্থাপন করা কুরআনের প্রয়োজন নেই। আবার বিজ্ঞানের বর্তমান কোনো মডেলের সঙ্গে কোনো অনুবাদ মেলেনি বলেই কুরআনকে ভুল ঘোষণা করাও যথেষ্ট নয়। কারণ দুটির কাজ এক নয়:
বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ, পরীক্ষা এবং মডেলের মাধ্যমে প্রকৃতির কার্যপ্রণালী অনুসন্ধান করে।
কুরআন মানুষকে সেই প্রকৃতির নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করে বৃহত্তর অর্থ, জ্ঞান, দায়িত্ব এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করে।
তাই কুরআনের কোনো বক্তব্যের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সম্পর্ক নির্ণয় করতে হলে আগে ৩টি মৌলিক প্রশ্ন দেখতে হবে:
কুরআন আসলে কী দাবি করছে?
আমরা যে অনুবাদ বা ব্যাখ্যাটি ব্যবহার করছি, সেটি কি আরবি পাঠের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করছে?
বিজ্ঞানের যে দাবিটির সঙ্গে তুলনা করছি, সেটি প্রতিষ্ঠিত পর্যবেক্ষণ, নাকি পরিবর্তনশীল কোনো মডেল বা ব্যাখ্যা?
এই তিনটি প্রশ্ন বাদ দিলে বিতর্কটি সহজেই “কুরআন বনাম বিজ্ঞান”-এর অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে পরিণত হয়।
১২ কুরআন পাঠের কয়েকটি মৌলিক নীতি
কুরআনের বৈজ্ঞানিক বা মহাজাগতিক আয়াত বোঝার ক্ষেত্রে কয়েকটি নীতি বিশেষভাবে কার্যকর:
একই বিষয়ের অন্যান্য আয়াত অবশ্যই দেখতে হবে।
মূল শব্দের অর্থক্ষেত্র বিশ্লেষণ করতে হবে।
৫০:৩৮-এর “ছয় আয়্যাম”কে ২৪ ঘণ্টার ছয় দিন হিসেবে গ্রহণ করার আগে ২২:৪৭ ও ৭০:৪-এর ব্যবহারও বিবেচনা করতে হবে।
১৮:৮৬-এ যুলকারনাইন কী দেখতে পেয়েছিলেন, সেটিই বর্ণিত হয়েছে।
কোনো প্রাচীন ব্যাখ্যা ভুল প্রমাণিত হলে সেটি কুরআনের ভুল প্রমাণ করে না।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ “সাত আসমান” প্রসঙ্গে। কুরআন সাত বলেছে। কিন্তু সেই সাতের ভৌত কাঠামো কী, তার সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক মানচিত্র কুরআন দেয়নি।
১৩ শেষ কথা
কুরআন ও বিজ্ঞানকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোর আগে আমাদের একটি সহজ প্রশ্ন করা দরকার:
আমরা কি সত্যিই কুরআনের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করছি, নাকি কোনো অনুবাদ, প্রাচীন ব্যাখ্যা কিংবা আধুনিক কল্পনাকে কুরআনের বক্তব্য ধরে নিচ্ছি?
- “ছয় দিন” বললেই ২৪ ঘণ্টার ছয় দিন হয়ে যায় না।
- “সাত আসমান” বললেই আধুনিক বিজ্ঞানের সাতটি দৃশ্যমান স্তর হয়ে যায় না।
- “সূর্য অস্ত যায়” বললেই সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, এমন দাবি হয়ে যায় না।
- আর কোনো একটি মানবিক ব্যাখ্যা ভুল প্রমাণিত হলেই কুরআনের বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয় না।
কুরআনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো তার নিজের ভাষাকে তার নিজের ভেতর দিয়ে পরীক্ষা করা। কারণ কুরআন নিজেই আমাদের সেই পদ্ধতির দিকে নির্দেশ করেছে:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
সুতরাং কোনো আপাত বৈপরীত্য দেখা দিলে সেটিকে শেষ কথা না ধরে ভাষা, ব্যাকরণ, প্রসঙ্গ এবং সমগ্র কুরআনের পারস্পরিক সামঞ্জস্যের আলোকে পুনরায় পরীক্ষা করাই অধিক যথার্থ পদ্ধতি।

