কুরআনের আয়াতে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ইঙ্গিত?
মাত্র একশ বছর আগেও ভিডিও কল, মহাদেশ পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টায় যাতায়াত, আগুন-প্রতিরোধী পোশাক, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান কিংবা জটিল চিকিৎসা প্রযুক্তির অনেক কিছুই মানুষের কল্পনার বাইরে ছিল। আজ সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, কুরআনে কি এমন কোনো ইঙ্গিত আছে, যা মানুষের ভবিষ্যৎ জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিকে চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেয়?
💡 সতর্ক অবস্থান: কুরআন কোনো সাধারণ বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির পাঠ্যপুস্তক নয়। এর মূল আলোচ্য তাওহিদ, মানবজীবনের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, জবাবদিহি, নবুওয়াত, ন্যায় এবং আল্লাহর নিদর্শন। কিন্তু এর বর্ণিত ঘটনা ও নিদর্শন মানুষের চিন্তা, অনুসন্ধান ও জ্ঞানার্জনের জন্য গভীর দিগন্ত উন্মোচন করে।
“সবকিছু কিতাবে”—এর অর্থ কী?
সূরা আল-আন‘আমে বলা হয়েছে:
وَعِندَهُۥ مَفَاتِحُ ٱلْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَآ إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍۢ فِى ظُلُمَـٰتِ ٱلْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍۢ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِى كِتَـٰبٍۢ مُّبِينٍۢ
অর্থের দিক থেকে আয়াতটি বলছে, গায়েবের চাবিগুলো আল্লাহর কাছে; স্থল ও সমুদ্রের সবকিছু তাঁর জ্ঞানের মধ্যে, এমনকি একটি পাতা ঝরাও তাঁর অজানা নয়। পৃথিবীর অন্ধকারে একটি বীজ কিংবা সিক্ত-শুষ্ক কোনো বস্তুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। আয়াতটি সরাসরি বলছে না যে, ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রযুক্তির ব্লুপ্রিন্ট বা নকশা কুরআনের মধ্যে লুকানো রয়েছে। বরং এটি আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞান ও সৃষ্টিজগতের পূর্ণতার কথা বলে।
তবে কুরআনে বর্ণিত নবীদের কিছু ঘটনা এমন কিছু মৌলিক ধারণার সামনে আমাদের দাঁড় করায়, যা আধুনিক মানুষ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে নতুনভাবে অনুসন্ধান করতে পারে।
এক পলকে দূরবর্তী বস্তু উপস্থিত হওয়া
সূরা আন-নামলে সুলাইমানের একটি অসাধারণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি সাবার রাণীর সিংহাসন তাঁর কাছে নিয়ে আসতে বলেন। প্রথমে এক শক্তিশালী জিন বলে:
قَالَ عِفْرِيتٌ مِّنَ ٱلْجِنِّ أَنَا۠ ءَاتِيكَ بِهِۦ قَبْلَ أَن تَقُومَ مِن مَّقَامِكَ ۖ وَإِنِّى عَلَيْهِ لَقَوِىٌّ أَمِينٌ
“জিনদের মধ্য থেকে এক শক্তিশালী সত্তা বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার আগেই আমি তা আপনার কাছে এনে দেব; আর এ কাজে আমি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।”
এরপর আরও অবিশ্বাস্য দ্রুততার দাবি আসে:
قَالَ ٱلَّذِى عِندَهُۥ عِلْمٌ مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ أَنَا۠ ءَاتِيكَ بِهِۦ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ ۚ فَلَمَّا رَءَاهُ مُسْتَقِرًّا عِندَهُۥ قَالَ هَٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّى لِيَبْلُوَنِىٓ ءَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ ۖ وَمَن شَكَرَ فَإِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهِۦ ۖ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ رَبِّى غَنِىٌّ كَرِيمٌ
অর্থাৎ, কিতাবের জ্ঞান যার কাছে ছিল, সে বলল, সুলাইমানের চোখের পলক ফিরে আসার আগেই সে সিংহাসন নিয়ে আসবে। এরপর সুলাইমান যখন সেটিকে নিজের সামনে স্থির অবস্থায় দেখতে পেলেন, তখন তিনি এটিকে নিজের ক্ষমতার কৃতিত্ব না দিয়ে তাঁর রবের অনুগ্রহ হিসেবে স্বীকার করলেন।
এই ঘটনাকে আধুনিক ভিডিও কল, television, হোলোগ্রাম কিংবা ইন্টারনেটের সরাসরি পূর্বাভাস বলা কুরআনের ভাষা থেকে সরাসরি প্রমাণ করা যায় না।
🔍 তবে ঘটনাটি একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে:
দূরত্ব কি সবসময় তথ্য, দৃশ্য বা কোনো বস্তুর মানুষের কাছে উপস্থিত হওয়ার চিরস্থায়ী সীমা হয়ে থাকবে?
আজ মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের দৃশ্য অন্য প্রান্তে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে ও শুনতে পারে। বস্তু স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও টেলিপোর্টেশন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে, যদিও মানুষের ধারণার “এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বস্তু পাঠানো” এবং কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন এক বিষয় নয়।
অতএব ২৭:৪০-কে সরাসরি “ভিডিও কলের ভবিষ্যদ্বাণী” না বলে দূরত্ব ও উপস্থিতি সম্পর্কে একটি চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে দেখা অধিক সতর্ক পদ্ধতি।
প্রাণীদের ভাষা বোঝার সম্ভাবনা
সুলাইমানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাণীদের বক্তব্য বোঝার ক্ষমতা। তিনি বলেন:
وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُودَ وَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِن كُلِّ شَيْءٍ ۖ إِنَّ هَٰذَا لَهُوَ الْفَضْلُ الْمُبِينُ
সূরা আন-নামল ২৭:১৬: অর্থাৎ, সুলাইমান বলেন, তাদের পাখিদের “মন্তিক” বা বক্তব্য/যোগাযোগের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এর পরেই পিঁপড়ার একটি সচেতন বক্তব্যের ঘটনা এসেছে:
حَتَّىٰ إِذَا أَتَوْا عَلَىٰ وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَا أَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسَاكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
সূরা আন-নামল ২৭:১৮: এখানে শুধু সুলাইমানের প্রাণীদের বোঝার ক্ষমতা নয়, বরং একটি পিঁপড়ার যোগাযোগ ও সামাজিক সংকেত বিনিময়ের ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে।
আজ মানুষ প্রাণীদের যোগাযোগ নিয়ে গভীর গবেষণা করছে। পাখির ডাক, তিমির শব্দ, ডলফিনের সংকেত, হাতির নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির যোগাযোগ, কুকুরের ঘ্রাণক্ষমতা কিংবা বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ করে মানুষ তাদের জগত সম্পর্কে ক্রমেই বেশি জানতে পারছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ভবিষ্যতে প্রাণীদের জটিল যোগাযোগের ধরন বিশ্লেষণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সুলাইমানের “মন্তিকুত-তাইর”কে আধুনিক কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী না বলে মানুষ ও অন্যান্য জীবের যোগাযোগজগতকে বোঝার সম্ভাবনার প্রতি একটি গভীর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ভ্রমণ
সুলাইমানের ক্ষেত্রে বাতাসের একটি বিশেষ ব্যবহারের কথা কুরআনে এসেছে:
وَلِسُلَيْمَانَ ٱلرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌۭ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌۭ ۖ وَأَسَلْنَا لَهُۥ عَيْنَ ٱلْقِطْرِ ۖ وَمِنَ ٱلْجِنِّ مَن يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِۦ ۖ وَمَن يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ ٱلسَّعِيرِ
সূরা সাবা ৩৪:১২: অর্থাৎ, সুলাইমানের জন্য বাতাসকে অধীন করা হয়েছিল; তার সকালবেলার গতি ছিল এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যার গতিও ছিল এক মাসের পথ। একই আয়াতে তাঁর জন্য গলিত তামার প্রবাহ এবং তাঁর অধীনে কাজ করা জিনদের কথাও এসেছে।
আর সূরা সাদে বলা হয়েছে:
فَسَخَّرْنَا لَهُ ٱلرِّيحَ تَجْرِى بِأَمْرِهِۦ رُخَآءً حَيْثُ أَصَابَ
সূরা সাদ ৩৮:৩৬: অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর জন্য বাতাসকে অধীন করেছিলেন, যা তাঁর নির্দেশে তিনি যে দিকে চাইতেন সেদিকে চলত।
আজ বিমান প্রযুক্তি মানুষকে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় এমন বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করতে দেয়, যা একসময় সপ্তাহ বা মাসের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ছিল।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আয়াতটি সরাসরি “বিমান আবিষ্কার হবে” বলেনি। বরং এটি মানুষের সামনে বাতাস, গতি এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমের একটি অসাধারণ ধারণা তুলে ধরে।
আগুনের মধ্যেও নিরাপদ থাকা
ইবরাহিমের ঘটনায় কুরআনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বাক্য এসেছে:
قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৬৯: “আমরা বললাম, হে আগুন! ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।”
এটি নিঃসন্দেহে কুরআনের বর্ণনায় একটি বিশেষ ঘটনা। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে আয়াতটি ফায়ার-প্রুফ পোশাকের ভবিষ্যদ্বাণী।
🛡️ চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক:
আগুনের শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার না করে তার মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষকে কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়?
আজ অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের জন্য তাপ ও আগুন প্রতিরোধী পোশাক তৈরি হয়েছে। আধুনিক উপকরণবিজ্ঞান (Material Science) তাপপ্রতিরোধী ফাইবার ও সুরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করেছে।
অর্থাৎ, একটি নবী-ঘটনা আধুনিক মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করতে পারে: আগুনের বিরুদ্ধে মানবদেহকে কীভাবে আরও নিরাপদ করা যায়?
পাথর থেকে পানির প্রবাহ
মূসার ঘটনায় কুরআন বলে:
وَإِذِ ٱسْتَسْقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِۦ فَقُلْنَا ٱضْرِب بِّعَصَاكَ ٱلْحَجَرَ ۖ فَٱنفَجَرَتْ مِنْهُ ٱثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍۢ مَّشْرَبَهُمْ ۖ كُلُواْ وَٱشْرَبُواْ مِن رِّزْقِ ٱللَّهِ وَلَا تَعْثَوْاْ فِى ٱلْأَرْضِ مُفْسِدِينَ
সূরা আল-বাকারা ২:৬০: অর্থাৎ, মূসা তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য পানি চাইলে আল্লাহ তাঁকে পাথরে আঘাত করতে বলেন। এরপর সেখান থেকে বারোটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হয় এবং প্রত্যেক দল তাদের পান করার স্থান জেনে নেয়।
এই ঘটনাকে আধুনিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বা ড্রিলিং প্রযুক্তির সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী বলা কঠিন।
তবে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে: পৃথিবীর কঠিন আবরণ বা পাথুরে স্তরের নিচেও পানির অস্তিত্ব থাকতে পারে এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পানি আহরণ করা সম্ভব।
আজ গভীর নলকূপ, সিসমিক সার্ভে এবং বিভিন্ন ভূগর্ভস্থ পানি অনুসন্ধান প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ শুষ্ক ভূমির গভীর থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সম্ভাবনা
ঈসার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে:
وَرَسُولًا إِلَىٰ বَنِيٓ إِسْرَٰٓءِيلَ أَنِّى قَدْ جِئْتُكُم بِـَٔايَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ أَنِّىٓ أَخْلُقُ لَكُم مِّنَ ٱلطِّينِ كَهَيْـَٔةِ ٱلطَّيْرِ فَأَنفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًۢا بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۖ وَأُبْرِئُ ٱلْأَكْمَهَ وَٱلْأَبْرَصَ وَأُحْىِ ٱلْمَوْتَىٰ بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۖ وَأُنَبِّئُكُم بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِى بُيُوتِكُمْ ۚ إِنَّ فِى ذَٰلِكَ لَـَٔايَةً لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
সূরা আলে ইমরান ৩:৪৯: এখানে ঈসার কয়েকটি নিদর্শনের কথা এসেছে: মাটির আকৃতি থেকে পাখির রূপ তৈরি করা, আল্লাহর অনুমতিতে তা পাখিতে পরিণত হওয়া, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করা এবং মৃতকে জীবিত করা।
এগুলো ঈসার বিশেষ অলৌকিক নিদর্শন। এগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সরাসরি পূর্বাভাস হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
🧬 শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষা:
আজ যে রোগের চিকিৎসা অসম্ভব মনে হচ্ছে, আগামীকাল কি সেটির সমাধান সম্ভব হতে পারে?
জেনেটিক চিকিৎসা, স্টেম-সেল গবেষণা, অঙ্গ পুনর্গঠন, কৃত্রিম বায়োনিক অঙ্গ, রেটিনাল প্রতিস্থাপন এবং পুনর্জন্মমূলক চিকিৎসা (Regenerative Medicine) ইতোমধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাকে অকল্পনীয় দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছে।
অতএব কুরআনের এই ঘটনাগুলো মানুষকে চিকিৎসার সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধানী হতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
বুদ্ধিমান সিস্টেম: নির্মাণ ও ডুবুরি হিসেবে কাজ
সুলাইমানের প্রসঙ্গে কুরআন আরও বলে:
وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاءٍ وَغَوَّاصٍ ۖ وَءَاخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِى ٱلْأَصْفَادِ
সূরা সাদ ৩৮:৩৭-৩৮: অর্থাৎ, তাঁর জন্য এমন শয়তানদের অধীন করা হয়েছিল যারা নির্মাণকাজ ও ডুবুরির কাজ করত; আর অন্যদের শৃঙ্খলিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল। সূরা সাবাতেও সুলাইমানের অধীনে জিনদের কাজ করার কথা এসেছে।
এখানে একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন উঠতে পারে: ভবিষ্যতে মানুষ কি এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে, যার মাধ্যমে মানুষের পরিবর্তে বা মানুষের সহায়ক হিসেবে অন্য কোনো বুদ্ধিমান সিস্টেম কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করবে?
আজ রোবট, স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্র, ড্রোন, গভীর সমুদ্রের রোবটিক সাবমারসিবল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের হয়ে এমন কাজ করছে, যা আগে মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা অসম্ভব ছিল।
তবে জিনকে আধুনিক রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সরাসরি অভিন্ন করে ফেলা কুরআনের বক্তব্য নয়। এটি কেবল একটি তুলনামূলক চিন্তার ক্ষেত্র হতে পারে।
তাহলে কি কুরআন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ভবিষ্যদ্বাণী করেছে?
এখানে আমাদের ভাষা খুব সতর্ক হওয়া দরকার। কুরআনের আয়াতগুলোতে সরাসরি “বিমান”, “ইন্টারনেট”, “ভিডিও কল”, “ড্রিলিং মেশিন”, “ফায়ার-প্রুফ পোশাক” বা “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” শব্দ নেই।
তাই প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে কোনো আয়াতের সরাসরি পূর্বাভাস হিসেবে ঘোষণা করা কুরআনের ভাষার ওপর অতিরিক্ত অর্থ চাপিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বরং কুরআনের ঘটনাগুলো আমাদের সামনে কিছু মৌলিক ধারণা উন্মুক্ত করে:
এই মৌলিক ধারণাগুলো থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসংখ্য অনুসন্ধানের জন্ম হতে পারে।
কুরআন কেন সবকিছু স্পষ্ট করে বলেনি?
কারণ কুরআনের উদ্দেশ্য কোনো প্রযুক্তির ক্যাটালগ তৈরি করা নয়। কুরআন মানুষকে প্রযুক্তির তালিকা দেয়নি; বরং মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নিদর্শন থেকে জ্ঞান আহরণ করতে আহ্বান করেছে।
যদি কুরআনে ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রযুক্তির নাম ও প্রকৌশল সরাসরি লেখা থাকত, তাহলে সেটি সপ্তম শতাব্দীর মানুষের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন হয়ে যেত।
একটি সর্বজনীন গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হলো, তার বক্তব্য বিভিন্ন যুগে মানুষের বোধের গভীরতার সাথে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চিন্তার দরজা খুলতে পারে।
এক শতাব্দী আগে ভিডিও কল সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় কল্পনাতীত ছিল। আজ পৃথিবীর দুই প্রান্তের মানুষ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মুখোমুখি কথা বলতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তির অস্তিত্বই কুরআনের কোনো একটি আয়াতকে “ভিডিও কলের আয়াত” বানিয়ে দেয় না। বরং কুরআন যে চিন্তার জগৎ তৈরি করে, তার মধ্যে মানুষ নিজের যুগের জ্ঞান দিয়ে নতুন নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে পারে।
নিদর্শন (آية) আর ভবিষ্যদ্বাণীর পার্থক্য
কুরআনে বারবার آية (আয়াহ) শব্দটি এসেছে। এর মৌলিক অর্থের মধ্যে রয়েছে নিদর্শন, চিহ্ন, নির্দেশক প্রমাণ। তাই কুরআনের কোনো ঘটনা থেকে আধুনিক কোনো প্রযুক্তির সঙ্গে সাদৃশ্য পাওয়া গেলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত:
এটি কি সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী, নাকি এমন একটি নিদর্শন যা আমাদের নতুনভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে?
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। আজকের বৈজ্ঞানিক মডেল আগামীকাল সংশোধিত বা বাতিল হতে পারে। কিন্তু কুরআনের বক্তব্যকে কোনো সাময়িক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে দেওয়া ঠিক নয় যে তত্ত্বটি পরিবর্তিত হলে আয়াতের সত্যতার ওপর প্রশ্ন এসে যায়।
বরং কুরআনকে তার নিজস্ব ভাষা, প্রসঙ্গ ও সামগ্রিক বক্তব্যের মধ্যে রেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সংলাপ তৈরি করাই সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি।
ভবিষ্যতের জন্য কুরআনের বড় বার্তা
এই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তি নয়। বরং আসল শিক্ষা হলো:
- • যে মানুষ একসময় আকাশে উড়তে পারত না, সে আজ মহাকাশে যান পাঠিয়েছে।
- • যে মানুষ দূরবর্তী মানুষের কণ্ঠ শুনতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করত, সে আজ পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে কথা বলে।
- • যে মানুষ অনেক রোগের সামনে অসহায় ছিল, সে আজ কোষ, জিন ও অণুর স্তরে রোগের কারণ অনুসন্ধান করছে।
আর এই অগ্রগতি আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়: মানুষ যত জানে, তার অজানার পরিমাণও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কুরআন হয়তো প্রতিটি প্রযুক্তির নাম বলেনি। বরং মানুষের সামনে এমন এক বিশ্ব উন্মুক্ত করেছে, যেখানে নিদর্শন দেখা যায়, প্রশ্ন জন্ম নেয়, জ্ঞান অনুসন্ধান করা যায় এবং অজানার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।
আর এই অনুসন্ধানের শেষ প্রান্তে মানুষ যখন নিজের জ্ঞানের সীমা উপলব্ধি করে, তখন কুরআনের একটি পরম সত্য আরও গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়:
وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ
“প্রত্যেক জ্ঞানীর ঊর্ধ্বে রয়েছেন আরও অধিক জ্ঞানসম্পন্ন সত্তা।”
সূরা ইউসুফ ১২:৭৬আয়াতকে তার ভাষায় বুঝি, প্রসঙ্গে বুঝি, কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, তারপর প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করি এবং নতুন জ্ঞান অনুসন্ধান করি। তখন কুরআন কেবল অতীতের একটি গ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং মানুষের চিন্তা ও অনুসন্ধানকে ক্রমাগত গভীর করার একটি জীবন্ত আহ্বান হিসেবে সামনে আসে।

