শাসক ও দায়িত্বশীলদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: কুরআনের আয়নায় অঙ্গীকার, ক্ষমতা ও জবাবদিহি

আলম এম.আলম এম.২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কুরআনিক তাদাব্বুর • সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা

শাসক ও দায়িত্বশীলদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: কুরআনের আয়নায় অঙ্গীকার, ক্ষমতা ও জবাবদিহি

একটি রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠান কেবল আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর টিকে থাকে না। এর ভিত তৈরি হয় বিশ্বাস, অঙ্গীকার, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। বিশেষ করে যারা মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন কিংবা কোনো কর্তৃত্বের অবস্থানে থাকেন, তাদের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কুরআন মানুষের অঙ্গীকার, চুক্তি, শপথ এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছে। অঙ্গীকার করা এবং পরে তা ভঙ্গ করা কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক দুর্বলতা নয়; এর সামাজিক পরিণতিও রয়েছে। কারণ একটি অঙ্গীকার যখন ভঙ্গ করা হয়, তখন শুধু একটি কথা ভঙ্গ হয় না, মানুষের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে অঙ্গীকার ভঙ্গ, শপথকে প্রতারণার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার, স্বার্থের বিনিময়ে অঙ্গীকার বিসর্জন এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তা পালন না করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে।

“কুরআনের বক্তব্য শুধু সাধারণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো দায়িত্ব, কর্তৃত্ব বা সামাজিক প্রভাবের অবস্থানে থাকে, তার অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।”

১. অঙ্গীকারের পর তা ভঙ্গ করা

সূরা আত-তাওবাহতে এমন একটি পরিস্থিতির কথা এসেছে যেখানে অঙ্গীকারের পর শপথ ভঙ্গের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।

সূরা আত-তাওবাহ ৯:১২

وَإِن نَّكَثُوٓاْ أَيۡمَٰنَهُم مِّنۢ بَعۡدِ عَهۡدِهِمۡ وَطَعَنُواْ فِي دِينِكُمۡ فَقَٰتِلُوٓاْ أَئِمَّةَ ٱلۡكُفۡرِ إِنَّهُمۡ لَآ أَيۡمَٰنَ لَهُمۡ لَعَلَّهُمۡ يَنتَهُونَ

উচ্চারণ: Wa in nakathū aymānahum min baʿdi ʿahdihim wa-ṭaʿanū fī dīnikum fa-qātilū a'immata al-kufri innahum lā aymāna lahum laʿallahum yantahūn.
(ওয়া ইন নাকাছূ আইমা-নাহুম মিন বা‘দি ‘আহদিহিম ওয়া ত্বা‘আনূ ফী দীনিকুম ফাক্বা-তিলূ আইম্মাতাল-কুফরি, ইন্নাহুম লা আইমা-না লাহুম লা‘আল্লাহুম ইয়ানতাহূন।)
প্রাসঙ্গিক অনুবাদ: “আর যদি তারা তাদের অঙ্গীকারের পর তাদের শপথ ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দীনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়, তবে কুফরের নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো। নিশ্চয়ই তাদের শপথের কোনো মর্যাদা নেই, যাতে তারা বিরত হয়।”

এখানে আয়াতটির ঐতিহাসিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটকে বর্তমান রাষ্ট্রীয় রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি এক করে ফেলা ঠিক হবে না। তবে অঙ্গীকার ভঙ্গের যে নৈতিক বাস্তবতাটি আয়াতটি প্রকাশ করছে, তা স্পষ্ট।

শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

نَكَثُوا — নাকাছূ

মূল: ن ك ث — na-ka-tha

এই মূলের সঙ্গে অঙ্গীকার বা শপথ ভঙ্গের অর্থগত সম্পর্ক রয়েছে। কুরআনে এর বিপরীতে অঙ্গীকারের দৃঢ়তা এবং তা রক্ষার ধারণাও পাওয়া যায়। অর্থাৎ অঙ্গীকার শুধু উচ্চারিত কিছু শব্দ নয়। তা রক্ষার দায়িত্বও এর সঙ্গে যুক্ত।

أَيْمَان — আইমা-ন

মূল: ي م ن — ya-ma-na

এটি ي م ن মূলের সঙ্গে সম্পর্কিত। يَمِين (yameen) শব্দের একটি অর্থ ডান হাত এবং আরেকটি অর্থ শপথ। আরবি ভাষায় শপথের সঙ্গে হাতের প্রতীকী সম্পর্ক থেকেই এই অর্থগত বিস্তার বোঝা যায়।

أَئِمَّة — আইম্মাহ

মূল: أ م م — a-ma-ma

মূলগতভাবে সামনে থাকা, কোনো দিকে অগ্রসর হওয়া বা নেতৃত্ব দেওয়ার ধারণার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই إمام কেবল ধর্মীয় অর্থে ব্যবহৃত শব্দ নয়; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলে তার ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে।

তবে ৯:১২-এর أَئِمَّةَ الْكُفْرِ-কে বর্তমানের প্রত্যেক রাজনৈতিক শাসকের সমার্থক করে ফেলা আয়াতের নিজস্ব প্রসঙ্গকে সংকুচিত করবে। আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট সংঘাত ও অঙ্গীকারভঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছে।

২. শপথকে প্রতারণার হাতিয়ার বানানো

অঙ্গীকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিকটি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে সূরা আন-নাহলে।

সূরা আন-নাহল ১৬:৯৪

وَلَا تَتَّخِذُوٓاْ أَيۡمَٰنَكُمۡ دَخَلَۢا بَيۡنَكُمۡ فَتَزِلَّ قَدَمُۢ بَعۡدَ ثُبُوتِهَا وَتَذُوقُواْ ٱلسُّوٓءَ بِمَا صَدَدتُّمۡ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَكُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ

উচ্চারণ: Wa-lā tattakhidhū aymānakum dakhalan baynakum fa-tazilla qadamun baʿda thubūtihā wa-tadhūqū as-sū'a bimā ṣadadtum ʿan sabīli Allāhi wa-lakum ʿadhābun ʿaẓīm.
(ওয়া লা তাত্তাখিযূ আইমা-নাকুম দাখালান বাইনাকুম, ফাতাযিল্লা কাদামুম বা‘দা ছুবূতিহা, ওয়া তাযূকুস্-সূআ বিমা সাদাদতুম ‘আন সাবীলিল্লাহি, ওয়া লাকুম ‘আযা-বুন ‘আযীম।)
প্রাসঙ্গিক অনুবাদ: “তোমরা তোমাদের শপথগুলোকে নিজেদের মধ্যে প্রতারণার উপকরণ করো না। তাহলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পদস্খলন ঘটবে এবং তোমরা সেই অকল্যাণের স্বাদ গ্রহণ করবে, কারণ তোমরা আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছ। আর তোমাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।”

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ হলো دَخَلًا — দাখালান।

دَخَلًا — দাখালান

মূল: د خ ل — da-kha-la

প্রাথমিক অর্থ প্রবেশ করা। কিন্তু دَخَل-এর অর্থগত বিস্তারে এমন অন্তর্নিহিত ত্রুটি, কপটতা বা গোপন উদ্দেশ্যের ধারণাও পাওয়া যায়, যা কোনো কিছুর বাহ্যিক অবস্থাকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তাই أَيْمَانَكُمْ دَخَلًا بَيْنَكُمْ-কে শুধু “শপথ ভঙ্গ” হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে এমন অঙ্গীকার বোঝা যায়, যা বাহ্যিকভাবে বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে কিন্তু বাস্তবে প্রতারণার মাধ্যম হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে: কোনো ব্যক্তি যদি জনগণের সামনে একটি অঙ্গীকার করেন, কিন্তু শুরু থেকেই সেটিকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে সেই অঙ্গীকার আর বিশ্বাসের ভিত্তি থাকে না; তা প্রতারণার উপকরণে পরিণত হয়।

৩. “পা পিছলে যাওয়া” — একটি গভীর কুরআনিক উপমা

১৬:৯৪-এর পরের অংশে এসেছে:

فَتَزِلَّ قَدَمٌ بَعْدَ ثُبُوتِهَا

ফাতাযিল্লা কাদামুম বা‘দা ছুবূতিহা

“তখন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর একটি পা পিছলে যাবে।”

زَلَّ — যাল্লা

মূল: ز ل ل — za-la-la

মূলগত অর্থের মধ্যে পিছলে যাওয়া, স্থিরতা হারানো এবং অবস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়ার ধারণা রয়েছে।

এখানে কুরআন একটি শক্তিশালী চিত্র ব্যবহার করছে। যে অবস্থানকে দৃঢ় মনে করা হয়েছিল, সেটিই অঙ্গীকারের অপব্যবহারের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে।

এটি কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা ব্যক্তির পতনের ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং আয়াতের নৈতিক কাঠামো হলো:

ন্যায়ের স্বাভাবিক ধারা

অঙ্গীকার → বিশ্বাস → স্থিতি

প্রতারণার অনিবার্য পরিণতি

প্রতারণা → বিশ্বাসহানি → পদস্খলন

সামাজিক পর্যায়ে এর বাস্তব প্রতিফলন হতে পারে মানুষের আস্থা কমে যাওয়া, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি নষ্ট হওয়া।


৪. অঙ্গীকারকে সামান্য পার্থিব মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করা

পরের আয়াতেই কুরআন অঙ্গীকারকে ব্যক্তিগত বা পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে বিসর্জন দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে।

সূরা আন-নাহল ১৬:৯৫

وَلَا تَشۡتَرُواْ بِعَهۡدِ ٱللَّهِ ثَمَنٗا قَلِيلًا إِنَّمَا عِندَ ٱللَّهِ هُوَ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ

উচ্চারণ: Wa-lā tashtarū bi-ʿahdi Allāhi thamanan qalīlan innamā ʿinda Allāhi huwa khayrun lakum in kuntum taʿlamūn.
(ওয়া লা তাশতারূ বি‘আহদিল্লাহি ছামানান কালীলান, ইন্নামা ‘ইন্দাল্লাহি হুয়া খাইরুল্লাকুম ইন কুনতুম তা‘লামূন।)
প্রাসঙ্গিক অনুবাদ: “তোমরা আল্লাহর অঙ্গীকারকে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করো না। আল্লাহর কাছে যা আছে, তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।”

تَشْتَرُوا — তাশতারূ

মূল: ش ر ي — sha-ra-ya

ক্রয়-বিক্রয়ের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরআনের ভাষায় কোনো মূল্যবান বিষয়কে অন্য কিছুর বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার রূপক প্রকাশ হিসেবেও এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় কাঠামো ব্যবহৃত হয়েছে।

এখানে প্রশ্নটি অত্যন্ত সরল:

অঙ্গীকারের মূল্য কত?

যদি ক্ষমতা, অর্থ, ব্যক্তিগত সুবিধা অথবা সাময়িক রাজনৈতিক লাভের বিনিময়ে একটি অঙ্গীকার বিসর্জন দেওয়া হয়, তাহলে কুরআনের ভাষায় সেটি মূল্যবান বিষয়কে সামান্য মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করার মতো।


৫. ক্ষমতা বা সুবিধা পাওয়ার পর অঙ্গীকার ভুলে যাওয়া

সূরা আত-তাওবাহ ৭৫-৭৬-এ এমন একটি আচরণ তুলে ধরা হয়েছে যেখানে প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব আচরণের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যায়।

সূরা আত-তাওবাহ ৯:৭৫-৭৬

۞ وَمِنۡهُم مَّنۡ عَٰهَدَ ٱللَّهَ لَئِنۡ ءَاتَىٰنَا مِن فَضۡلِهِۦ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ فَلَمَّآ ءَاتَىٰهُم مِّن فَضۡلِهِۦ بَخِلُواْ بِهِۦ وَتَوَلَّواْ وَّهُم مُّعۡرِضُونَ

উচ্চারণ: Wa-minhum man ʿāhada Allāha la-in ātānā min faḍlihi la-naṣṣaddaqanna wa-lanakūnanna mina aṣ-ṣāliḥīn. Falammā ātāhum min faḍlihi bakhilū bihi wa-tawallaw wa-hum muʿriḍūn.
(ওয়া মিনহুম মান ‘আ-হাদাল্লাহা লা-ইন আতা-না মিন ফাদ্বলিহী লানাস্-সাদ্দাকান্না ওয়া লানাকূনান্না মিনাস্-সালিহীন। ফালাম্মা আতা-হুম মিন ফাদ্বলিহী বাখিলূ বিহী ওয়া তাওয়াল্লাও ওয়া হুম মু‘রিদূন।)
প্রাসঙ্গিক অনুবাদ: “তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিল, ‘তিনি যদি তাঁর অনুগ্রহ থেকে আমাদের দান করেন, তবে আমরা অবশ্যই তা থেকে দান করব এবং অবশ্যই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ অতঃপর যখন তিনি তাদের তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করলেন, তারা তাতে কার্পণ্য করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল; তারা ছিল বিমুখ।”

এই আয়াত সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় শাসকের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোচনা করছে না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি এবং প্রাপ্ত সুবিধার পর আচরণের পরিবর্তন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক উদাহরণ দেয়।

عَاهَدَ — ‘আ-হাদা

মূল: ع ه د — ‘a-ha-da

এই মূলের সঙ্গে অঙ্গীকার, চুক্তি, দায়িত্ব এবং প্রতিশ্রুতির ধারণা সম্পর্কিত। عَهْد — ‘আহদ অর্থ এমন একটি অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা, যা গ্রহণ করা হয়েছে।

তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন মানুষের সামনে কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন সেই দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করাই অঙ্গীকারের বাস্তব রূপ।


৬. বঞ্চিত করার মানসিকতা

এই আয়াতে এসেছে:

بَخِلُوا بِهِ

বাখিলূ বিহী

“তারা তাতে কার্পণ্য করল।”

بَخِلَ — বাখিলা

মূল: ب خ ل — ba-khi-la

কার্পণ্য করা, কোনো প্রাপ্য বিষয় আটকে রাখা কিংবা নিজের কাছে ধরে রাখার অর্থে ব্যবহৃত হয়।

এখানে লক্ষ্যণীয়, কুরআন শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি দেখছে না। প্রতিশ্রুতির পর সম্পদ বা সুযোগ পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা হলো কি না, সেটিও দেখছে।

অর্থাৎ:

প্রতিশ্রুতি → সুযোগ লাভ → দায়িত্ব পালন

এই ধারার মাঝখানে যদি স্বার্থপরতা এসে দাঁড়ায়, তখন অঙ্গীকারের নৈতিক মূল্য নষ্ট হয়ে যায়।


৭. মুখ ফিরিয়ে নেওয়া

৯:৭৬-এর শেষাংশ:

وَتَوَلَّوا۟ وَّهُم مُّعۡرِضُونَ

ওয়া তাওয়াল্লাও ওয়া হুম মু‘রিদূন

“তারা মুখ ফিরিয়ে নিল এবং তারা ছিল বিমুখ।”

مُعْرِضُونَ — মু‘রিদূন

মূল: ع ر ض — ‘a-ra-da

কোনো কিছুর সামনে থাকা, উপস্থাপন করা, পাশ কাটানো বা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অর্থগত ক্ষেত্রের সঙ্গে এই মূলের সম্পর্ক রয়েছে। এখানে إعراض — ই‘রাদ অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা কোনো বিষয় থেকে বিমুখ থাকা।

সামাজিক জীবনে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হলো:

“মানুষের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়া, তাদের প্রত্যাশা গ্রহণ করা, কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই মানুষগুলোর প্রয়োজন ও অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।”

৮. কুরআনের বিস্তৃত নীতি: অঙ্গীকার পূরণ

অঙ্গীকার রক্ষার বিষয়টি কুরআনে শুধু সতর্কতার মাধ্যমে নয়, সরাসরি নির্দেশের মাধ্যমেও এসেছে।

সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৪

وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡـُٔولٗا

উচ্চারণ: Wa-awfū bil-ʿahdi inna al-ʿahda kāna mas'ūlā.
(ওয়া আওফূ বিল-‘আহদ। ইন্নাল-‘আহদা কানা মাসঊলা।)
অনুবাদ: “আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

أَوْفُوا — আওফূ

মূল: و ف ي — wa-fa-ya

অর্থ পূর্ণ করা, সম্পূর্ণভাবে প্রদান করা, কোনো দায়িত্ব বা অঙ্গীকারকে তার প্রাপ্য পূর্ণতায় পৌঁছে দেওয়া।

الْعَهْد — আল-‘আহদ

মূল: ع ه د — ‘a-ha-da

অঙ্গীকার, চুক্তি, দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি।

আয়াতের শেষাংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا — “নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

অর্থাৎ অঙ্গীকার শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জবাবদিহিও যুক্ত।


৯. আমানত ও দায়িত্ব যোগ্য ব্যক্তির কাছে দেওয়া

রাষ্ট্র ও সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে আরেকটি মৌলিক কুরআনিক নীতি রয়েছে।

সূরা আন-নিসা ৪:৫৮

۞ إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا وَإِذَا حَكَمۡتُم بَيۡنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحۡكُمُواْ بِٱلۡعَدۡلِۚ إِنَّ ٱللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِۦٓۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ سَمِيعَۢا بَصِيرٗا

উচ্চারণ: Inna Allāha ya'murukum an tu'addū al-amānāti ilā ahlihā wa-idhā ḥakamtum bayna an-nāsi an taḥkumū bil-ʿadli inna Allāha niʿimmā yaʿiẓukum bihi inna Allāha kāna samīʿan baṣīrā.
(ইন্নাল্লাহা ইয়া'মুরুকুম আন তুআদ্দুল-আমানাতি ইলা আহলিহা, ওয়া ইযা হাকামতুম বাইনান-নাসি আন তাহকুমূ বিল-‘আদল। ইন্নাল্লাহা নি‘ইম্মা ইয়া‘িযুকুম বিহী। ইন্নাল্লাহা কানা সামী‘আন বাসীরা।)
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানতসমূহ তাদের উপযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়ে উপদেশ দেন তা কতই না উত্তম। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”

এখানে দুটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে:

যোগ্যতা ও আমানত

আমানত → উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে প্রদান

বিচার ও সিদ্ধান্ত

বিচার/সিদ্ধান্ত → ন্যায়ের সঙ্গে সম্পাদন

অর্থাৎ দায়িত্ব গ্রহণ নিজেই কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। দায়িত্ব একটি আমানত।

১০. প্রতিশ্রুতি ও কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য

কুরআন শুধু অন্যকে দেওয়া অঙ্গীকারের ক্ষেত্রেই সতর্ক করেনি; নিজের কথার সঙ্গে নিজের কাজের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সূরা আস-সাফ ৬১:২-৩

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفۡعَلُونَ كَبُرَ مَقۡتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفۡعَلُونَ

উচ্চারণ: Yā ayyuhā al-ladhīna āmanū lima taqūlūna mā lā tafʿalūn. Kabura maqtan ʿinda Allāhi an taqūlū mā lā tafʿalūn.
(ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানূ লিমা তাকূলূনা মা লা তাফ‘আলূন। কাবুরা মাকতান ‘ইন্দাল্লাহি আন তাকূলূ মা লা তাফ‘আলূন।)
অনুবাদ: “হে যারা বিশ্বাস করেছে, তোমরা কেন এমন কথা বলো যা তোমরা করো না? আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত গুরুতর যে তোমরা এমন কথা বলো যা তোমরা করো না।”

تَقُولُونَ — তাকূলূন

মূল: ق و ل — qa-wa-la

বলা, বক্তব্য দেওয়া, কোনো কথা প্রকাশ করা।

تَفْعَلُونَ — তাফ‘আলূন

মূল: ف ع ل — fa-‘a-la

করা, কার্য সম্পাদন করা।

কুরআন এখানে কথার বিপরীতে কাজকে দাঁড় করিয়েছে:

تَقُولُونَ (তোমরা বলো) বনাম تَفْعَلُونَ (তোমরা করো)

এই দুইয়ের মধ্যে যখন ধারাবাহিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তখন সমস্যা শুধু একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্যে থাকে না; কথার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।


রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কুরআনিক শিক্ষা

উপরের আয়াতগুলো একত্রে পড়লে একটি সুস্পষ্ট নৈতিক কাঠামো পাওয়া যায়:

  • অঙ্গীকার করা হলে তা রক্ষা করতে হবে।
  • শপথকে প্রতারণার উপকরণ বানানো যাবে না।
  • পার্থিব সামান্য লাভের বিনিময়ে অঙ্গীকার বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
  • দায়িত্বকে আমানত হিসেবে দেখতে হবে।
  • মানুষের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ন্যায় বজায় রাখতে হবে।
  • কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে।

• আর কোনো অঙ্গীকার বা দায়িত্ব গ্রহণ করা হলে তার জন্য জবাবদিহির বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

কুরআনিক মূলনীতি মূলধাতু ও পরিভাষা প্রাসঙ্গিক আয়াত সামাজিক ও শাসনতান্ত্রিক তাৎপর্য
১. অঙ্গীকার রক্ষা ع ه د — عَهْد ('আহদ) ১৭:৩৪, ৯:১২ ঘোষিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা আবশ্যক; চুক্তি লঙ্ঘন সামাজিক আস্থার ভিত্তি ভেঙে দেয়।
২. প্রতারণা পরিহার د خ ل — دَخَلًا (দাখালান) ১৬:৯৪ শপথ বা প্রতিশ্রুতিকে স্বার্থসিদ্ধির কৌশল বা প্রতারণার ফাঁদ বানানো নিষিদ্ধ।
৩. স্বার্থের ঊর্ধ্বে অবস্থান ش ر ي — ثَمَنًا قَلِيلًا ১৬:৯৫ ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি বিসর্জন দেওয়া অমার্জনীয়।
৪. সুবিধাবাদের অবসান ب خ ل ও ع ر ض ৯:৭৫-৭৬ ক্ষমতা ও সুযোগ পাওয়ার পর কার্পণ্য করা বা জনগণের অধিকার থেকে বিমুখ হওয়া মারাত্মক অপরাধ।
৫. আমানত ও যোগ্যতা أ م ن — أَمَانَات (আমানাত) ৪:৫৮ যেকোনো দায়িত্ব বা পদমর্যাদাকে ব্যক্তিগত সম্পদ না ভেবে উপযুক্ত যোগ্য ব্যক্তির কাছে অর্পণ করা।
৬. কথা ও কাজের মিল ق و ل বনাম ف ع ل ৬১:২-৩ কথায় এক আর কাজে ভিন্ন হলে নেতৃত্ব তার গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণ হারায়।
৭. চূড়ান্ত জবাবদিহিতা س أ ل — مَسْئُولًا (মাসঊল) ১৭:৩৪ প্রতিটি কথা, গৃহীত চুক্তি ও প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির সামনে জবাবদিহি দিতে হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা প্রয়োজন। কুরআনের আয়াতগুলোকে সরাসরি আধুনিক নির্বাচন, রাজনৈতিক দল কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সরকারের ওপর বসিয়ে দেওয়া কুরআনের বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত করতে পারে। বরং আয়াতগুলোর নীতিকে প্রথমে বোঝা প্রয়োজন, তারপর সমসাময়িক কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য আছে কি না তা যাচাই করা যেতে পারে।

শেষ কথা

ক্ষমতা মানুষের জন্য শুধু সুযোগ নয়; এটি দায়িত্বও।

কেউ যখন জনগণের আস্থা গ্রহণ করেন, কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করেন, কোনো চুক্তিতে প্রবেশ করেন কিংবা কোনো অঙ্গীকার করেন, তখন তার কথার সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়।

কুরআনের ভাষায় অঙ্গীকার এমন কোনো বিষয় নয় যা প্রয়োজনমতো গ্রহণ ও পরিত্যাগ করা যায়।

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ

ওয়া আওফূ বিল-‘আহদ

“অঙ্গীকার পূর্ণ করো।”

আর সঙ্গে সঙ্গে কুরআন মনে করিয়ে দেয়:

إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

ইন্নাল-‘আহদা কানা মাসঊলা

“নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হোক, সামাজিক দায়িত্ব হোক কিংবা ব্যক্তিগত অঙ্গীকার—কুরআনের এই নীতি সর্বত্র প্রযোজ্য:

কুরআনিক শাসনের মূলভিত্তি

“কথা শুধু উচ্চারণ নয়। অঙ্গীকার শুধু ঘোষণা নয়। দায়িত্ব শুধু ক্ষমতা নয়। প্রত্যেকটির সঙ্গে জবাবদিহি যুক্ত।”

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।