মৃত্যুর পর কি সবকিছু শেষ? কুরআনের আলোকে পুনরুত্থান, বিচার ও ইয়াওমুল ফাসল

এম. লিয়াকতএম. লিয়াকত১৮ অক্টোবর, ২০২৬

১. মৃত্যুই যদি সবকিছুর সমাপ্তি হয়, তাহলে বিচারের দিন কোনটি?

কেউ কেউ মনে করেন, মানুষের মৃত্যু হলেই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর পর আর কোনো পুনরুত্থান নেই, বিচার নেই, জান্নাত-জাহান্নাম নেই। তাঁদের মতে, দুনিয়াতেই জান্নাত ও জাহান্নামের সব অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ।

কিন্তু কুরআনে এমন এক দিনের কথা বলা হয়েছে, যেদিন পৃথিবী তার রবের নূরে আলোকিত হবে, কিতাব উপস্থিত করা হবে, নবী ও সাক্ষীদের আনা হবে এবং ন্যায়সংগত ফয়সালা করা হবে।

❓ একটি মৌলিক জিজ্ঞাস্য

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনে বর্ণিত এই দিনটি কোন দিন? মৃত্যুই যদি সবকিছুর শেষ হয়, তাহলে এই সমাবেশ, ফয়সালা ও বিচার কখন সংঘটিত হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো একত্রে পড়তে হবে। সূরা আন-নিসা ৪:৮২ আয়াতের আলোকে কুরআনের বক্তব্যের মধ্যে কোনো প্রকৃত অসংগতি থাকার কথা নয়। তাই একটি আয়াতের অর্থ নির্ধারণের সময় অন্য আয়াতের বক্তব্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

২. সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯: পৃথিবী আলোকিত হবে, কিতাব উপস্থিত করা হবে, বিচার সম্পন্ন হবে

সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯ আল-কুরআন

وَأَشْرَقَتِ الْأَرْضُ بِنُورِ رَبِّهَا وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِيءَ بِالنَّبِيِّينَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُم بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

Transliteration: Wa ashraqati al-ardu bi-noori rabbihaa, wa wudi‘a al-kitaabu, wa jee’a bin-nabiyyeena wash-shuhadaa’i, wa qudiya baynahum bil-haqqi wa hum laa yuzlamoon.

অর্থ: “পৃথিবী তার রবের নূরে আলোকিত হবে, কিতাব উপস্থিত করা হবে, নবীগণ ও সাক্ষীদের আনা হবে এবং তাদের মধ্যে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ফয়সালা করা হবে; আর তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।”

আয়াতটিতে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:

  1. পৃথিবী তার রবের নূরে আলোকিত হবে।
  2. কিতাব উপস্থিত করা হবে।
  3. নবীগণ ও সাক্ষীদের আনা হবে।
  4. সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ন্যায়সংগত ফয়সালা করা হবে।
  5. কারও প্রতি জুলুম করা হবে না।

এখানে কিতাব, নবী, সাক্ষী ও ফয়সালার উল্লেখ একটি বিচারিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কেবল মৃত্যুর মুহূর্তের বিবরণ নয়। তবে পৃথিবীর আলোকিত হওয়ার প্রকৃতি কিংবা কিতাবের পূর্ণ পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে অন্য আয়াতের সঙ্গে তুলনা করতে হবে।

🔍 বিশেষ শব্দের রুট বিশ্লেষণ (সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯)

أَشْرَقَتْ ashraqat

রুট: ش ر ق (sh-r-q)

মূল ক্ষেত্র: সূর্যোদয়, আলো প্রকাশ পাওয়া, উদ্ভাসিত হওয়া

সরফ ও নাহু: ৪র্থ রূপের অতীতকাল; الْأَرْضُ কর্তা

প্রসঙ্গ: পৃথিবী আলোকিত হলো বা হবে

الْأَرْضُ al-ardu

রুট: أ ر ض (a-r-d)

অর্থ: পৃথিবী, ভূমি বা জমিন

নাহু: বাক্যের কর্তা (فاعل)

نُورِ noori

রুট: ن و ر (n-w-r)

অর্থের ক্ষেত্র: আলো, আলোকিত হওয়া, প্রকাশ ও স্পষ্টতা

গঠন: بِ (দ্বারা) + نُور (নূর)

رَبِّهَا rabbihaa

রুট: ر ب ب (r-b-b)

অর্থের ক্ষেত্র: প্রতিপালন, বিকাশ ও পরিচালনা

গঠন: رَبّ (রব) + هَا (তার)

الْكِتَابُ al-kitaabu

রুট: ك ت ب (k-t-b)

মূল ক্ষেত্র: লেখা, লিপিবদ্ধ করা ও সংরক্ষণ

অর্থ: কিতাব, লিখিত নথি বা রেকর্ড

الشُّهَدَاءُ ash-shuhadaa’u

রুট: ش ه د (sh-h-d)

মূল অর্থ: উপস্থিত থাকা, প্রত্যক্ষ করা, সাক্ষ্য দেওয়া

সরফ: شَاهِد (সাক্ষী)-এর বহুবচন

قُضِيَ qudiya

রুট: ق ض ي (q-ḍ-y)

মূল ক্ষেত্র: সিদ্ধান্ত দেওয়া, মীমাংসা করা, ফয়সালা করা

সরফ: অতীতকালীন কর্মবাচ্য (مجهول)

بِالْحَقِّ bil-haqqi

রুট: ح ق ق (ḥ-q-q)

অর্থের ক্ষেত্র: সত্য, যথার্থতা, প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা ও ন্যায্যতা

অর্থ: সত্যের ভিত্তিতে, ন্যায়সংগতভাবে

لَا يُظْلَمُونَ laa yuzlamoon

রুট: ظ ل م (ẓ-l-m)

অর্থের ক্ষেত্র: অন্যায় করা, অধিকারবঞ্চিত করা, সীমালঙ্ঘন

সরফ: কর্মবাচ্য অসমাপিকা ক্রিয়া; বহুবচন

অর্থ: তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না

৩. ইয়াওমুল ফাসল: ফয়সালার দিন

সূরা আন-নাবা ৭৮:১৭

إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ كَانَ مِيقَاتًا

Transliteration: Inna yawmal-fasli kaana meeqaataa.

অর্থ: “নিশ্চয়ই ফয়সালার দিন একটি নির্ধারিত সময়।”

শব্দ বিশ্লেষণ (সূরা আন-নাবা ৭৮:১৭):

  • يَوْم (yawm): দিন বা সময়কাল।
  • الْفَصْل (al-fasl): রুট ف ص ل (f-ṣ-l)। পৃথক করা, পার্থক্য নির্ধারণ করা, মীমাংসা করা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া। অর্থ: ফয়সালা বা পৃথকীকরণ।
  • مِيقَات (meeqaat): রুট و ق ت (w-q-t)। নির্ধারিত সময় বা সময়সীমা।

এখানে ইয়াওমুল ফাসলকে একটি নির্ধারিত সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফাসল শব্দটি কেবল কোনো ঘটনা শেষ হওয়া বোঝায় না; এর মধ্যে পৃথকীকরণ, মীমাংসা ও সিদ্ধান্তের অর্থও রয়েছে।

সূরা আল-মুরসালাত ৭৭:১২-১৪

لِأَيِّ يَوْمٍ أُجِّلَتْ ۝ لِيَوْمِ الْفَصْلِ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الْفَصْلِ

Transliteration: Li-ayyi yawmin ujjilat. Li-yawmi al-fasli. Wa maa adraaka maa yawmul-fasl.

অর্থ: “কোন দিনের জন্য তা স্থগিত রাখা হয়েছে? ফয়সালার দিনের জন্য। আর কীসে তোমাকে জানাবে, ফয়সালার দিন কী?”

এখানে ফয়সালার দিনকে একটি স্বতন্ত্র ও নির্ধারিত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই ইয়াওমুল ফাসলকে সাধারণ মৃত্যুর সমার্থক ধরে নিতে হলে আয়াতের এই বিশেষ বক্তব্যেরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

৪. ইয়াওমুল কিয়ামাহ: পুনরুত্থান ও দাঁড়ানোর দিন

সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:১-৪

لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ ۝ وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ ۝ أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّنْ نَجْمَعَ عِظَامَهُ ۝ بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَنْ نُسَوِّيَ بَنَانَهُ

Transliteration: Laa uqsimu bi-yawmi al-qiyaamah. Wa laa uqsimu bin-nafsi al-lawwaamah. A-yahsabu al-insaanu allan najma‘a ‘izaamah? Balaa qaadireena ‘alaa an nusawwiya banaanah.

অর্থ: “আমি শপথ করছি কিয়ামতের দিনের। আর শপথ করছি আত্মসমালোচনাকারী সত্তার। মানুষ কি মনে করে, আমরা তার অস্থিগুলো একত্র করব না? অবশ্যই, আমরা তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত যথাযথভাবে গঠন করতে সক্ষম।”

শব্দমূল ও ব্যাকরণ বিশ্লেষণ (সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:১-৪):

  • الْقِيَامَة (al-qiyaamah): রুট ق و م (q-w-m)। মূল অর্থ: দাঁড়ানো, উঠে দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিয়ামত, পুনরুত্থান ও জবাবদিহির দিন।
  • نَجْمَعَ (najma‘a): রুট ج م ع (j-m-‘)। অর্থ: একত্র করা বা সমবেত করা। ১ম রূপের অসমাপিকা ক্রিয়া।
  • عِظَامَهُ (‘izaamahu): একবচন عَظْم (‘aẓm)। অর্থ: অস্থি বা হাড়। গঠন: عِظَام (অস্থিসমূহ) + هُ (তার)।
  • نُسَوِّيَ (nusawwiya): রুট س و ي (s-w-y)। সমান করা, সুষম করা, যথাযথভাবে গঠন করা। ২য় রূপ। আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত যথাযথ পুনর্গঠন।

আয়াতগুলোর বক্তব্য হলো, মানুষের অস্থি একত্র করা এবং তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত পুনর্গঠন করা সম্ভব। অর্থাৎ কিয়ামতের প্রসঙ্গে কেবল মৃত্যুর উল্লেখ নেই; পুনর্গঠনের বিষয়টিও রয়েছে।

৫. ইয়াওমুল জাম‘: সমবেত হওয়ার দিন

সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯

يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ ذَٰلِكَ يَوْمُ التَّغَابُنِ

Transliteration: Yawma yajma‘ukum li-yawmi al-jam‘i, dhaalika yawmut-taghaabun.

অর্থ: “যেদিন তিনি তোমাদের সমবেত হওয়ার দিনের জন্য তোমাদের একত্র করবেন, সেটিই হবে পারস্পরিক লাভ-ক্ষতি প্রকাশিত হওয়ার দিন।”

শব্দ বিশ্লেষণ (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯):

  • يَجْمَعُكُمْ (yajma‘ukum): রুট ج م ع (j-m-‘)। অর্থ: তোমাদের একত্র করবেন।
  • الْجَمْع (al-jam‘): রুট ج م ع (j-m-‘)। অর্থ: একত্রকরণ বা সমাবেশ।
  • التَّغَابُن (at-taghaabun): রুট غ ب ن (gh-b-n)। লাভ-ক্ষতি, মূল্যায়ন এবং পারস্পরিক বঞ্চনা প্রকাশিত হওয়া।

এখানে একত্র করা এবং সমবেত হওয়ার দিনের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। এই বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মৃত্যুর সমার্থক ধরে নিলে “তোমাদের একত্র করবেন” কথাটির অর্থও ব্যাখ্যা করতে হবে।

৬. ইয়াওমুদ দীন: প্রতিদান ও জবাবদিহির দিন

সূরা আল-ফাতিহা ১:৪

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

Transliteration: Maaliki yawmid-deen.

অর্থ: “প্রতিদান ও জবাবদিহির দিনের অধিপতি।”

শব্দ বিশ্লেষণ (সূরা আল-ফাতিহা ১:৪):

  • الدِّين (ad-deen): রুট د ي ن (d-y-n)। দায়বদ্ধতা, প্রতিদান, বিচার, আনুগত্য এবং পাওনা বা ঋণ-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা। প্রসঙ্গগত অর্থ: প্রতিদান ও জবাবদিহি।

দীন শব্দের অর্থ সব প্রসঙ্গে একই নয়। তবে ইয়াওমুদ দীন প্রসঙ্গে প্রতিদান, বিচার ও জবাবদিহির অর্থ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

সূরা আল-ইনফিতার ৮২:১৭-১৯

وَمَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ ۝ ثُمَّ مَا أَدْرَاكَ مَا يَوْمُ الدِّينِ ۝ يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِنَفْسٍ شَيْئًا وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ

Transliteration: Wa maa adraaka maa yawmud-deen? Thumma maa adraaka maa yawmud-deen? Yawma laa tamliku nafsun li-nafsin shay’an, wal-amru yawma’idhin lillaah.

অর্থ: “আর কীসে তোমাকে জানাবে, প্রতিদানের দিন কী? আবারও, কীসে তোমাকে জানাবে, প্রতিদানের দিন কী? সেদিন কোনো সত্তা অন্য কোনো সত্তার জন্য কোনো কিছুর কর্তৃত্ব রাখবে না; সেদিনের সমস্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর।”

এখানে ইয়াওমুদ দীনকে এমন একটি দিন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেদিন কোনো সত্তা অন্য সত্তার জন্য নিজ ক্ষমতায় কিছু করার কর্তৃত্ব রাখবে না। সেদিনের সমস্ত কর্তৃত্ব আল্লাহর।

আয়াতটির বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এটিকে কেবল ব্যক্তিগত মৃত্যুর মুহূর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে হলে এই বৈশিষ্ট্যগুলোরও যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

৭. মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি কি কুরআনে স্পষ্ট?

সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১৫-১৬

ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَٰلِكَ لَمَيِّتُونَ ۝ ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ

Transliteration: Thumma innakum ba‘da dhaalika la-mayyitoon. Thumma innakum yawmal-qiyaamati tub‘athoon.

অর্থ: “এরপর নিশ্চয়ই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। তারপর নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিনে তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে।”

এই দুটি আয়াতের বাক্যগঠন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, لَمَيِّتُونَ (la-mayyitoon), অর্থাৎ তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে।

পরের আয়াতে বলা হয়েছে, تُبْعَثُونَ (tub‘athoon), অর্থাৎ তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে।

দুটি বক্তব্যের মধ্যে ثُمَّ (thumma) ব্যবহৃত হয়েছে। এই অব্যয় সাধারণত পরবর্তী ধাপ বা ক্রম নির্দেশ করে এবং প্রসঙ্গ অনুযায়ী সময়গত ব্যবধানও বোঝাতে পারে।

ثُمَّ thumma

পদ: অব্যয় (حرف عطف)

অর্থ: তারপর, অতঃপর

ভূমিকা: বক্তব্যের দুটি পর্যায়ের মধ্যে ক্রম ও সময়গত ব্যবধান নির্দেশ করছে

تُبْعَثُونَ tub‘athoon

রুট: ب ع ث (b-‘-th)

মূল ক্ষেত্র: পাঠানো, জাগিয়ে তোলা, উত্থিত বা পুনরুত্থিত করা

সরফ: কর্মবাচ্য অসমাপিকা ক্রিয়া; ২য় পুরুষ বহুবচন

অর্থ: তোমাদের পুনরুত্থিত করা হবে

এখানে মৃত্যু এবং কিয়ামতের দিনে পুনরুত্থানকে একই বক্তব্যে এক করে দেওয়া হয়নি। বরং দুটি পর্যায়ের কথা আলাদাভাবে বলা হয়েছে। অতএব, “মৃত্যুই কিয়ামত এবং মৃত্যুর পর আর কিছু নেই” এমন দাবি এই আয়াতের সরাসরি বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৮. পুনরুত্থান, সমাবেশ ও বিচারের মধ্যে সম্পর্ক

এখন সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো পাশাপাশি রাখি:

•

সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১৫-১৬: মৃত্যু ও পরবর্তী পুনরুত্থানের কথা বলা হয়েছে।

•

সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯: সমবেত হওয়ার দিনের কথা বলা হয়েছে।

•

সূরা আন-নাবা ৭৮:১৭: ফয়সালার দিনকে নির্ধারিত সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

•

সূরা আল-ইনফিতার ৮২:১৭-১৯: প্রতিদান ও জবাবদিহির দিনের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে।

•

সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯: কিতাব উপস্থিত করা, নবী ও সাক্ষীদের আনা এবং ন্যায়সংগত ফয়সালার কথা বলা হয়েছে।

এই আয়াতগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে মৃত্যু, পুনরুত্থান, সমাবেশ ও বিচারের একটি সুসংগত চিত্র পাওয়া যায়।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯ একাই পুনরুত্থানের প্রতিটি ধাপের সময়ক্রম নির্ধারণ করে না। সেই ক্রম বুঝতে অন্য আয়াতগুলোও প্রয়োজন। একইভাবে সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১৫-১৬ পুনরুত্থানের কথা বললেও বিচার কীভাবে সম্পন্ন হবে, তার পূর্ণ বিবরণ দেয় না।

কুরআনের বক্তব্যগুলো একত্রে পড়লে বোঝা যায়, মৃত্যুর পরের বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত মৃত্যুর মুহূর্তে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন পুনরুত্থান, সমাবেশ ও বিচার সম্পর্কেও স্বতন্ত্র বক্তব্য দিয়েছে।

৯. সূরা আন-নিসা ৪:৮২: কুরআনের বক্তব্য যাচাইয়ের মূলনীতি

সূরা আন-নিসা ৪:৮২

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

Transliteration: Afalaa yatadabbaroona al-Qur’aana, wa law kaana min ‘indi ghayri Allahi la-wajadoo feehi ikhtilaafan katheeraa.

অর্থ: “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক অসংগতি পেত।”

يَتَدَبَّرُونَ yatadabbaroon

রুট: د ب ر (d-b-r)

অর্থের ক্ষেত্র: কোনো বিষয়ের পরিণতি, অন্তর্নিহিত দিক ও ধারাবাহিকতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা

সরফ: ৫ম রূপের বহুবচন ক্রিয়া

অর্থ: তারা গভীরভাবে চিন্তা করে বা পর্যালোচনা করে

اخْتِلَافًا ikhtilaafan

রুট: خ ل ف (kh-l-f)

অর্থের ক্ষেত্র: ভিন্নতা, পার্থক্য বা পরস্পরবিরোধী অবস্থান

সরফ: ৮ম রূপের মাসদার

প্রসঙ্গগত অর্থ: অসংগতি বা বিরোধ

এই আয়াতের আলোকে কুরআনের একটি বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে ধরে অন্য আয়াতের বক্তব্য অস্বীকার করা যথাযথ পদ্ধতি নয়। বরং একই বিষয়-সম্পর্কিত আয়াতগুলোর শব্দার্থ, বাক্যগঠন ও প্রসঙ্গ মিলিয়ে দেখতে হবে।

মৃত্যু, পুনরুত্থান, সমাবেশ এবং বিচার সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্যগুলো একত্রে পাঠ করলে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং সম্পর্কযুক্ত একটি ধারাই পাওয়া যায়।

১০. চূড়ান্ত বক্তব্য: মৃত্যুর পরের দিনটি কোন দিন?

কুরআনে ইয়াওমুল ফাসল, ইয়াওমুল কিয়ামাহ, ইয়াওমুল জাম‘ এবং ইয়াওমুদ দীনের উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি পরিভাষার নিজস্ব অর্থগত দিক আছে:

কুরআনিক পরিভাষা উচ্চারণ মৌলিক অর্থগত তাৎপর্য
يَوْمُ الْفَصْلِ Yawmul-Fasl ফয়সালা ও পৃথকীকরণের দিন।
يَوْمُ الْقِيَامَةِ Yawmul-Qiyaamah কিয়ামত ও পুনরুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত দিন (দাঁড়ানোর দিন)।
يَوْمُ الْجَمْعِ Yawmul-Jam‘ সমবেত হওয়ার দিন (সার্বজনীন সমাবেশ)।
يَوْمُ الدِّينِ Yawmud-Deen প্রতিদান ও জবাবদিহির দিন।

এসব পরিভাষার অর্থ পুরোপুরি অভিন্ন নয়। তবে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এগুলো যে বৃহত্তর বিচারিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তা স্পষ্ট।

বিশেষ করে সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১৫-১৬ আয়াতে মৃত্যু এবং পরবর্তী পুনরুত্থানকে পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯-এ কিতাব, নবী, সাক্ষী ও ন্যায়বিচারের কথা রয়েছে। সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯-এ সমাবেশ এবং সূরা আল-ইনফিতার ৮২:১৭-১৯-এ প্রতিদান ও কর্তৃত্বের দিনের কথা বলা হয়েছে।

তাই মৃত্যুর পর কোনো পুনরুত্থান, সমাবেশ বা বিচার নেই, এমন দাবি কুরআনের এই আয়াতগুলোর সরাসরি বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়:

“মৃত্যুই যদি সবকিছুর শেষ হয়, তাহলে কুরআনে বর্ণিত সেই দিনটি কোন দিন, যেদিন কিতাব উপস্থিত করা হবে, নবী ও সাক্ষীদের আনা হবে এবং সবার মধ্যে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ফয়সালা করা হবে?”

সূরা আয-যুমার ৩৯:৬৯-কে সূরা আল-মুমিনুন ২৩:১৫-১৬, সূরা আন-নাবা ৭৮:১৭, সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯ এবং সূরা আল-ইনফিতার ৮২:১৭-১৯-এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে কুরআনের বক্তব্য স্পষ্ট: মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, সমাবেশ ও বিচারকে কুরআন স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
এম. লিয়াকত

পার্থিব জীবনে কর্মব্যস্ত আর আত্মিক জীবনে 'মুফলিহুন' বা সফলতার সন্ধানী। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাতের নীরবতায় মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য ও প্রার্থনায় প্রশান্তি খোঁজার এক সাধারণ পথিক।