কুরআন হেফাজত, না যিকর হেফাজত?

এম. লিয়াকতএম. লিয়াকত২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“কুরআন সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, আল্লাহ কুরআনকে সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কুরআনের নিজের ভাষাটি একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, সূরা আল-হিজর ১৫:৯-এ ‘কুরআন’ শব্দটি নয়, এসেছে আয-যিকর (ٱلذِّكْرَ)। এই যিকর কি শুধুই একটি বাঁধাইকৃত কিতাব, নাকি সমগ্র মহাবিশ্ব, প্রাকৃতিক বিধান, মানব ফিতরাহ ও চেতনার গভীরে প্রোথিত এক জীবন্ত স্মরণিকা? কুরআনের ভাষাকে কুরআনের ভেতরেই পরীক্ষা করলে যিকরের হেফাজতের এক অভূতপূর্ব মহাজাগতিক পরিসর উন্মোচিত হয়।”

কুরআন সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, আল্লাহ কুরআনকে সংরক্ষণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কুরআনের নিজের ভাষাটি একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, সূরা আল-হিজর ১৫:৯-এ “কুরআন” শব্দটি নয়, এসেছে আয-যিকর (ٱلذِّكْرَ)।

📖 সূরা আল-হিজর (১৫:৯) আয-যিকরের হেফাজত

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا ٱلذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ

Innā naḥnu nazzalnā adh-dhikra wa-innā lahu la-ḥāfiẓūn.
“নিশ্চয়ই আমরাই যিকর অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমরাই এর হেফাজতকারী।”
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Root Analysis) ذ ك ر

এখানে ذِكْر (যিকর) শব্দটি এসেছে ذ ك ر (ধা-কা-রা) মূল থেকে। এই মূলের মৌলিক অর্থের মধ্যে রয়েছে:

স্মরণ করা Remembrance
মনে রাখা Retention
স্মরণ করিয়ে দেওয়া Reminder / Warning
স্মারক ও উপদেশ Chronicle / Admonition

ফলে যিকরকে শুধু একটি লিখিত গ্রন্থের নাম হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে শব্দটির পূর্ণ অর্থগত পরিসর ধরা পড়ে না।

কুরআন নিজেই এই সম্পর্কটি একাধিক আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করেছে:

সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৫০) ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ

هَٰذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ

Hādhā dhikrun mubārakun anzalnāhu.

“এটি এক বরকতময় যিকর, যা আমরা অবতীর্ণ করেছি।”

সূরা সাদ (৩৮:৮৭) ذِكْرٌ لِّلْعَٰلَمِينَ

إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَٰلَمِينَ

In huwa illā dhikrun lil-ʿālamīn.

“এটি তো সমগ্র জগতের জন্য একটি যিকর ছাড়া আর কিছু নয়।”

⚖️

সমন্বয়মূলক সিদ্ধান্ত: অতএব কুরআন এবং যিকরকে দুটি পৃথক বিষয় হিসেবে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। কুরআন নিজেই যিকর। ফলে ১৫:৯-এ যিকরের হেফাজতের ঘোষণা কুরআনের হেফাজতের ধারণার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে না। বরং কুরআনের একটি মৌলিক পরিচয় হিসেবেই যিকরকে সামনে আনে।

১. যিকর শুধু পাঠযোগ্য বাণী নয়

কুরআনের যিকর-ধারণা মানুষের স্মৃতি, চিন্তা, উপলব্ধি এবং জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

📖 সূরা আল-কামার (৫৪:১৭) লিল-যিকরি ও মুদ্দাকির

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا ٱلْقُرْءَانَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

Wa laqad yassarnā al-qurʾāna li-dh-dhikri fa-hal min muddakir.
“নিশ্চয়ই আমরা কুরআনকে যিকরের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব কোনো স্মরণকারী আছে কি?”

এখানে لِلذِّكْرِ (লিয্-যিকর) এবং مُدَّكِر (মুদ্দাকির) একই অর্থক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। কুরআনকে যিকরের জন্য সহজ করা হয়েছে, যাতে মানুষ তা গ্রহণ করে স্মরণ করে এবং সেই স্মরণের আলোকে জীবনকে পরিচালিত করে।

সুতরাং যিকর কেবল উচ্চারণ নয়। এটি এমন একটি স্মরণযোগ্য সত্য, যা মানুষের চিন্তা ও কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২. মহাবিশ্বও কি আল্লাহর একটি উন্মুক্ত কিতাব?

কুরআন মানুষকে শুধু লিখিত বাণীর দিকে তাকাতে বলেনি। আসমান, পৃথিবী, রাত, দিন, জীবন, মৃত্যু এবং মানুষের নিজের অস্তিত্বের মধ্যেও আল্লাহর আয়াত দেখতে বলেছে।

📖 সূরা আলে ইমরান (৩:১৯০-১৯১) মহাজাগতিক আয়াত

إِنَّ فِي خَلْقِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَٱخْتِلَٰفِ ٱلَّيْلِ وَٱلنَّهَارِ لَآيَٰتٍ لِّأُولِي ٱلْأَلْبَٰبِ ۝ ٱلَّذِينَ يَذْكُرُونَ ٱللَّهَ قِيَٰمًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ

Inna fī khalqi as-samāwāti wal-arḍi wakhtilāfi al-layli wan-nahāri la-āyātin li-ulī al-albāb... Wa yatafakkarūna fī khalqi as-samāwāti wal-arḍ.

“নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধসম্পন্নদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (৩:১৯০)

“...এবং তারা আসমানসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করে।” (৩:১৯১)

এখানে آيَات (আয়াত) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আয়াত অর্থ নিদর্শন, চিহ্ন, প্রমাণ। কুরআনের লিখিত বাক্য যেমন আয়াত, তেমনি সৃষ্টিজগতের বাস্তব ঘটনাবলি ও নিয়মতান্ত্রিকতাও আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন। অর্থাৎ সৃষ্টিজগত মানুষের পাঠযোগ্য। প্রকৃতির নিয়ম, জীবনের বিন্যাস এবং মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা মানুষের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।

📖 সূরা ফুসসিলাত (৪১:৫৩) দিগন্ত ও সত্তা

سَنُرِيهِمْ ءَايَٰتِنَا فِي ٱلْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ ٱلْحَقُّ

Sanurīhim āyātinā fī al-āfāqi wa-fī anfusihim ḥattā yatabayyana lahum annahu al-ḥaqq.
“আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনসমূহ দিগন্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে দেখাব, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটিই পরম সত্য।”
🌌 الْآفَاق (আল-আফাক)

দিগন্তসমূহ, মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি, নক্ষত্রপুঞ্জ, গ্রহমণ্ডল, প্রকৃতির পদার্থ ও রাসায়নিক নিয়ম—অর্থাৎ সমগ্র বহির্বিশ্ব।

🧬 أَنفُس (আনফুস)

নিজেদের সত্তা, কোষীয় কাঠামো, জেনেটিক তথ্যপ্রবাহ, স্নায়ুতন্ত্র, আত্মোপলব্ধি এবং নৈতিক মনস্তত্ত্ব—অর্থাৎ সমগ্র অন্তর্জগৎ।

তাহলে কুরআনের বাইরের জগতকে কুরআন-বিচ্ছিন্ন কোনো বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সৃষ্টিজগতও আল্লাহর নিদর্শনে পরিপূর্ণ।

৩. কদর: সৃষ্টিজগতের নির্ধারিত পরিমাপ

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ঘোষণা করেন:

সূরা আল-কামার (৫৪:৪৯) بِقَدَرٍ

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَٰهُ بِقَدَرٍ

Innā kulla shayʾin khalaqnāhu bi-qadar.

“নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেক বিষয়কে কদর (সুনির্দিষ্ট পরিমাপ) অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।”

সূরা আল-ফুরকান (২৫:২) فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا

وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا

Wa khalaqa kulla shayʾin fa-qaddarahu taqdīrā.

“তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেকটির জন্য যথাযথ পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।”

শব্দমূল ব্যবচ্ছেদ ق د ر

قَدَر (কদর) এসেছে ق د ر (ক্বা-দা-রা) মূল থেকে। এর অর্থক্ষেত্রে রয়েছে পরিমাপ, সুনির্দিষ্ট নির্ধারণ, সামর্থ্য, পরিমাণ এবং নির্দিষ্ট সীমা। ২৫:২ আয়াতে فَقَدَّرَهُ (ফাকাদ্দারাহু) এবং تَقْدِيرًا (তাকদীরান) একই শব্দমূল থেকে এসেছে। সৃষ্টি এবং পরিমিত গাণিতিক বিন্যাস এখানে পাশাপাশি সংযুক্ত।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মহাবিশ্বকে একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মাধীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায়। বস্তুজগতের ক্ষুদ্রতম কোয়ান্টাম স্তর থেকে জীবদেহের জটিলতম জৈব-রাসায়নিক কার্যপ্রণালী পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনতা লক্ষ্য করা যায়।

⚠️

তাত্ত্বিক সতর্কতা: কুরআন সরাসরি DNA-এর নাম উল্লেখ করেনি। তাই আধুনিক DNA-কে সরাসরি কুরআনের “কদর” বলে ঘোষণা করা কুরআনের বক্তব্যের অতিরিক্ত দাবি হবে। তবে জীবনের সুনির্দিষ্ট তথ্যনির্ভর (Information-based) ও নিয়মবদ্ধ বিন্যাসকে কদর এবং তাকদীর-এর ধারণার আলোকে পর্যবেক্ষণ করা যুক্তিযুক্ত।

৪. আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থায় অভিন্নতা: ফিতরাহ ও সুন্নাতুল্লাহ

কুরআন আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত সৃষ্টিব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধারাবাহিকতা ও অপরিবর্তনীয়তার কথা বলে:

📖 সূরা আর-রূম (৩০:৩০) ফিতরাতুল্লাহ

فِطْرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ ٱللَّهِ

Fiṭrata Allāhi allatī faṭara an-nāsa ʿalayhā, lā tabdīla li-khalqi Allāh.
“আল্লাহর সেই ফিতরাহ, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন নেই।”

এখানে فِطْرَة (ফিতরাহ) এসেছে ف ط ر (ফা-ত্বা-রা) মূল থেকে, যার সঙ্গে সৃষ্টি করা, আদি প্রকৃতি বা স্বভাবজাত সৃষ্টিগত বিন্যাসের ধারণা যুক্ত। এবং لَا تَبْدِيلَ (লা তাবদীল) এসেছে ب د ل (বা-দা-লা) মূল থেকে, যার মধ্যে পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপনের অর্থ রয়েছে।

📖 সূরা ফাতির (৩৫:৪৩) সুন্নাতুল্লাহ

فَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ ٱللَّهِ تَبْدِيلًا ۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ ٱللَّهِ تَحْوِيلًا

Fa-lan tajida li-sunnati Allāhi tabdīlā, wa-lan tajida li-sunnati Allāhi taḥwīlā.
“তুমি আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবে না এবং আল্লাহর বিধানে কোনো রূপান্তরও পাবে না।”

এখানে سُنَّة (সুন্নাহ) বলতে আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত কার্যপদ্ধতি বা শাশ্বত প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিধানের ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিজগত কোনো খামখেয়ালিপূর্ণ বা এলোমেলো ব্যবস্থা নয়। এর মধ্যে অটল নিয়ম আছে, সুনির্দিষ্ট পরিমাপ আছে, ধারাবাহিকতা আছে এবং কারণ-ফল (Cause and Effect) সম্পর্ক রয়েছে।

৫. মানুষও একটি নির্ধারিত ব্যবস্থার অংশ

মানুষ নিজেকে যত স্বাধীনই ভাবুক, তার জন্ম, জৈবিক গঠন, শ্বাস-প্রশ্বাস, বিপাক, কোষীয় কার্যক্রম, বার্ধক্য এবং মৃত্যু তার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় বা সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না।

📖 সূরা আল-আ'লা (৮৭:২-৩) সৃষ্টি ও হেদায়াত

ٱلَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ ۝ وَٱلَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ

Alladhī khalaqa fa-sawwā, walladhī qaddara fa-hadā.
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সুবিন্যস্ত করেছেন; এবং যিনি পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন, অতঃপর পথনির্দেশ দিয়েছেন।”

এখানে সৃষ্টি (খলাক্বা) → সুবিন্যস্তকরণ (সাওওয়া) → পরিমাপ নির্ধারণ (ক্বাদ্দারা) → পথনির্দেশ (হাদা) একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারায় এসেছে।

এ কারণেই আধুনিক ভাষায় “প্রোগ্রামড” শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করলে এর সঙ্গে কুরআনের কদর, তাকদীর, ফিতরাহ এবং হিদায়াহ-এর কিছু ধারণাগত সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে আধুনিক কম্পিউটার প্রোগ্রাম এবং কুরআনিক কদরকে আক্ষরিক অর্থে এক করে ফেলা সমীচীন নয়।

৬. কোনো সমাজ কি যিকরের কিছু অংশ বাস্তবে ধারণ করতে পারে?

একটি সমাজ কুরআনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ না করেও বাস্তব জগতের কিছু মৌলিক প্রাকৃতিক ও নৈতিক নিয়ম সফলভাবে অনুসরণ করতে পারে:

⚙️ কার্যকরী পার্থিব মূল্যবোধ

  • সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ
  • বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততা
  • সময়ের মূল্যায়ন ও নিয়মের সমপ্রয়োগ
  • ন্যায়বিচার ও প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতা
  • কারণ-ফলভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত

🌍 সার্বজনীন বাস্তবতার প্রভাব

সৃষ্টিজগতের নিয়ম কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। আগুনের তাপ যেমন একজন মুমিনের জন্য যা, অন্য সবার জন্যও তা-ই। মাধ্যাকর্ষণ ধর্মবিশ্বাস দেখে কাজ করে না। এই অর্থে কোনো সমাজ আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি মেনে উপকৃত হতে পারে, যদিও তারা সেই নিয়মের স্রষ্টাকে স্বীকার না-ও করতে পারে।

“কোনো সত্য অনুযায়ী কাজ করা এবং সেই সত্যের উৎসকে জেনে বিশ্বাস করা এক বিষয় নয়।”

৭. ঈমানের বিচার মানুষের হাতে নয়

কুরআন মানুষকে অন্যের অন্তরের অবস্থা বা পারলৌকিক গন্তব্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অনুমতি দেয় না:

📖 সূরা আল-ইসরা (১৭:৮৪) শাকিলাহ ও রব্ব

قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَىٰ شَاكِلَتِهِۦ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَىٰ سَبِيلًا

Qul kullun yaʿmalu ʿalā shākilatihi fa-rabbukum aʿlamu bi-man huwa ahdā sabīlā.
“বলুন, প্রত্যেকেই তার নিজস্ব গঠন ও পদ্ধতি অনুযায়ী কাজ করে। অতএব তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন কে অধিক সঠিক পথে আছে।”

এখানে شَاكِلَة (শাকিলাহ) এসেছে ش ك ل (শা-কা-লা) মূল থেকে, যার মধ্যে গঠন, প্রকৃতি, ধরন, পদ্ধতি বা কার্যধারার ধারণা রয়েছে। আয়াতটি একটি গভীর সীমারেখা তৈরি করে: মানুষ মানুষের কেবল বাহ্যিক আচরণ দেখতে পারে। কিন্তু কার অন্তরে সত্য কতটা প্রতিষ্ঠিত, তা মানুষের জানা সম্ভব নয়।

সূরা আল-ফাতহ (৪৮:১৮) / সূরা আল-বাকারাহ অন্তরের জ্ঞান

وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ أَعْلَمُ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ

“কিন্তু তাদের অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহই সম্যক অবগত।”

সুতরাং কোনো সমাজের বাহ্যিক উন্নয়ন দেখে তাদের প্রত্যেক ব্যক্তির ঈমান ঘোষণা করা যায় না। আবার কোনো সমাজের ধর্মীয় বাহ্যিক পরিচয় দেখে তার প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরের ঈমানও নিশ্চিত করা যায় না।

فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ

Fa-rabbukum aʿlam — “তোমাদের প্রতিপালকই অধিক জ্ঞানী।”

৮. যিকরের হেফাজত কোথায়?

যিকরের হেফাজতকে শুধু একটি গ্রন্থের কাগজ, মুদ্রণ বা মুখস্থ পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে কুরআনের বৃহত্তর যিকর-ধারণাটি আড়ালে পড়ে যায়। কুরআনের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী:

📜 বাণীর সংরক্ষণ

কুরআনের মূল পাঠ ও অপরিবর্তনীয় শব্দমালার অটুট নিরাপত্তা।

🧠 চেতনার স্মরণ

মানুষের বিবেক, অনুশোচনা ও স্মৃতির গভীরে সত্যের স্থায়ী উপস্থিতি।

🌱 ফিতরাতের নিরাপত্তা

সৃষ্টিগত মানবপ্রকৃতি ও ন্যায়বোধে তাওহীদের শাশ্বত ছাপ।

🌌 দিগন্তের আয়াত

বহির্জগতের দৃশ্যমান নিয়মতান্ত্রিকতা ও অটল বৈজ্ঞানিক নিদর্শন।

⚖️ সুন্নাতুল্লাহর স্থায়িত্ব

আল্লাহর প্রতিষ্ঠিত কার্যপদ্ধতি ও কার্যকারণ বিধির অপরিবর্তনীয়তা।

💡 জীবন্ত আহ্বান

যুগে যুগে সত্যকে চিনতে পেরে মুক্তির পথে মানুষের পুনর্জাগরণ।

এই হেফাজতকে কেবল একটি গ্রন্থের অক্ষর সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ না করে, আল্লাহর অবতীর্ণ যিকরের সত্য, স্মরণীয়তা, প্রাসঙ্গিকতা এবং কার্যকর নির্দেশনাকে মানবজগত ও সৃষ্টিজগতের মধ্যে অটুট রাখার বৃহত্তর ব্যবস্থার আলোকে দেখা যায়।

💎 উপসংহার ও পরম বিনয়

কুরআন তাই শুধু হাতে ধরা একটি কাগুজে কিতাব নয়। এর আয়াত পড়তে হয় কিতাবের ভাষায়, আবার এর নিদর্শন পড়তে হয় সৃষ্টিজগত ও নিজেদের অস্তিত্বের গভীরেও। তবে চূড়ান্ত কুরআনিক দাবি হিসেবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে সরাসরি আরোপ করার ক্ষেত্রে সতকর্তা জরুরি। আর মানুষের জ্ঞানের সীমা যেখানে শেষ হয়, সেখানে কুরআনের শাশ্বত ঘোষণাটি থেকেই যায়:

وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ ٱلْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا

Wa-mā ūtītum mina al-ʿilmi illā qalīlā.

“তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে অতি সামান্য।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৮৫)

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
এম. লিয়াকত

পার্থিব জীবনে কর্মব্যস্ত আর আত্মিক জীবনে 'মুফলিহুন' বা সফলতার সন্ধানী। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাতের নীরবতায় মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য ও প্রার্থনায় প্রশান্তি খোঁজার এক সাধারণ পথিক।