মানবদেহের অন্তিম শয়ান — কুরআন-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অপচয় পরিহারের আহ্বান
মানবদেহের অন্তিম শয়ান নিয়ে সামাজিক অপচয় ও বাহ্যিক আড়ম্বর বনাম কুরআনের মৌলিক শিক্ষা: ৫:৩১ ও ২০:৫৫ আয়াতের আলোকে মাটিতে স্বাভাবিক ও নির্ভার প্রত্যাবর্তন।
মানবদেহের অন্তিম শয়ান
কুরআন-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অপচয় পরিহারের আহ্বান
মানবজীবনের অবসান এবং মৃত্যুর পর তার দেহের শেষ পরিণতি নিয়ে পবিত্র কুরআন আমাদের অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, সহজ এবং প্রাকৃতিক এক দিকনির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমান সমাজে দাফন-কাফন এবং কবরস্থ করার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত সামাজিক প্রথা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সৃষ্টি হয়েছে, কুরআনের আক্ষরিক ও তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোেক তা গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
মৃতদেহ লুকানো: কুরআনের আদিম ও মৌলিক নির্দেশ
পবিত্র কুরআনে মানবদেহের শেষ বিদায়ের প্রক্রিয়াটি কোনো জটিল ধর্মীয় আচার বা ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে আসেনি। মানব ইতিহাসের প্রথম মৃত্যুর ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা সুরা আল-মায়েদার ৩১ নম্বর আয়াতে বলেন:
"অতঃপর আল্লাহ এক কাক পাঠালেন, যে মাটি খুঁড়ছিল যাতে তাকে দেখাতে পারে কিভাবে সে তার ভাইয়ের মৃতদেহ ঢাকবে (يُوَارِيْ)। সে বলে উঠল, ‘হায় আমার দুর্ভাগা! আমি কি এই কাকের মতোও হতে পারলাম না, যেন আমার ভাইয়ের মৃতদেহ ঢাকতে পারি?’ অতঃপর সে লজ্জিত হলো।"
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, মৃত্যুর পর মানুষের দেহের জন্য প্রধান এবং মৌলিক দায়িত্ব হলো একটিই - তাকে মাটির নিচে গোপন বা আড়াল করা। আরবি 'ইউওয়ারি' (يُوَارِيْ) শব্দের অর্থ হলো আড়াল করা বা ঢেকে দেওয়া। মাটি খুঁড়ে লাশটিকে প্রকৃতির অংশ করে দেওয়া এবং চোখের আড়াল করাই এখানে মূল উদ্দেশ্য, যা মানুষের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করে।
অপচয় বর্জন: কুরআনের অন্যতম অর্থনৈতিক মূলনীতি
কুরআন মাজিদ মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, তা জীবদ্দশায় হোক কিংবা মৃত্যুর পর, যেকোনো ধরনের অপচয় বা সম্পদের অনর্থক বিনষ্টকরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
- সুরা আল-ইসরা, আয়াত ২৭: "নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।"
- সুরা আল-আরাফ, আয়াত ৩১: "তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।"
কুরআনের এই সর্বজনীন মূলনীতিটি যখন অন্তিম শয়ানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন এক সুতা পরিমাণ অনর্থক খরচ বা সম্পদের বিনাশও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসে।
পোশাক ও লাশের সুরক্ষায় কাঠামোগত অপচয়ের বিশ্লেষণ
বর্তমান যুগের প্রথা অনুযায়ী মৃতদেহের জন্য আলাদা নতুন সুতি কাপড় (কাফন) ক্রয় করা এবং কবরের ভেতর বাঁশ, কাঠ বা ইট-পাথরের সাহায্যে কৃত্রিম ছাদ বা ঘর তৈরি করার এক ব্যাপক সামাজিক প্রচলন রয়েছে। কুরআনের বিশুদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রক্রিয়াগুলোর অর্থনৈতিক দিকটি লক্ষ্য করলে কিছু সূক্ষ্ম অপচয় দৃশ্যমান হয়:
- আলাদা কাপড়ের ব্যবহার: কুরআনে মৃতদেহের জন্য কোনো বিশেষ নতুন পোশাক বা কাফন ক্রয় করার কোনো নির্দেশ নেই। কুরআনের মূল লক্ষ্য হলো দেহকে আড়াল করা। একজন মানুষ যে পোশাকে মৃত্যুবরণ করেছেন বা তার কাছে ইতিমধ্যে যে পুরোনো পোশাক রয়েছে, তা দিয়েই যদি দেহ আড়াল করা সম্ভব হয়, তবে সম্পূর্ণ নতুন কাপড় কিনে তা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা এক ধরনের অলক্ষিত সম্পদের অপচয়। কারণ, যে নতুন কাপড়টি বা কাপড় কেনার টাকা জীবিত মানুষের উপকারে আসতে পারত, তা মাটির নিচে পচিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে।
- কবরে বাঁশ ও কৃত্রিম কাঠামো: মাটিচাপা দেওয়ার সময় কবরের ভেতরে বাঁশের চাটাই বা কাঠের তক্তা দিয়ে ঘর বানানোর যে ব্যয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী মাটির দেহ মাটিতে মিশে যাবে। সেখানে অতিরিক্ত বাঁশ বা কাঠ ব্যবহার করে যে স্থায়ী বা সাময়িক কাঠামো তৈরি করা হয়, তা মূলত মাটির নিচে প্রাকৃতিক সম্পদের এক ধরনের অনর্থক বিনষ্টকরণ।
উত্তরাধিকার ও পরিত্যক্ত সম্পত্তির ভারসাম্য
কুরআনের আইন অনুযায়ী, মানুষের মৃত্যুর পর তার সমস্ত বৈধ মালিকানাধীন বস্তু উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য। সুরা আন-নিসার ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
"পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; তা অল্প হোক কিংবা বেশি হোক, এ অংশ নির্ধারিত।"
যখন একটি মৃতদেহের পেছনে অনর্থক নতুন কাপড় বা বাঁশ-কাঠের পেছনে অর্থ ব্যয় করা হয়, তখন তা প্রকারান্তরে জীবিত ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের হক থেকে কেটে নেওয়া হয়। একটি সুতা পরিমাণ সম্পদও যদি অনর্থক মাটির নিচে নষ্ট করা হয়, তবে তা কুরআনের 'অপচয় না করার' এবং 'সম্পদের সুষম বণ্টন' - উভয় নীতিকেই ক্ষুণ্ন করে।
পবিত্র কুরআনের সহজ ও সাবলীল দর্শন অনুযায়ী, মানুষের শেষ বিদায় হওয়া উচিত সম্পূর্ণ আড়ম্বরহীন, প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে চাপমুক্ত। মৃতদেহকে সম্মানজনকভাবে মাটিতে আড়াল করাই একমাত্র লক্ষ্য। এর বাইরে সামাজিক সম্মানের নামে বা প্রথার দোহাই দিয়ে নতুন কাপড়, বাঁশ বা অন্য কোনো উপকরণের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা কুরআনের অপচয়বিরোধী অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক। মানবদেহের অন্তিম শয়ানকে যত বেশি প্রাকৃতিক ও সরল রাখা যাবে, সমাজের সম্পদ অপচয়ের হাত থেকে তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
The current local time is: 2026-09-10T01:04:43+06:00.

