“আল্লাহর নির্ধারিত বারো মাসের হিসাব ও চারটি সম্মানিত মাসকে মানুষের নিজস্ব সুবিধা ও গোত্রীয় খেয়ালখুশি অনুযায়ী পেছানো বা পরিবর্তন করা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, বরং তা ‘কুফরির বৃদ্ধি’ (زِيَادَةࣱ فِي ٱلۡكُفۡرِ)। সূরা আত-তাওবাহ (৯:৩৭) এর শব্দভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ সেই গূঢ় সত্যকেই উন্মোচিত করে।”
পবিত্র কুরআনে সময়, কালপঞ্জি ও মহাজাগতিক পরিমাপ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় বিধানের অংশ। সূরা আত-তাওবাহর ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছেন যে, আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি, যার মধ্যে চারটি সম্মানিত বা নিষিদ্ধ (حُرُم)। কিন্তু জাহেলি যুগের আরবরা নিজেদের যুদ্ধ, গোত্রীয় সংঘাত কিংবা বাণিজ্যের স্বার্থে এই নিষিদ্ধ মাসগুলোর হিসাবকে এলোমেলো করে দিত। এই অপকৌশলকেই কুরআনে 'নাসি' (ٱلنَّسِيٓءُ) আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
পদ্ধতিগত মূলনীতি (৪:৮২ লজিক্যাল কনসিস্টেন্সি): কুরআনের কোনো শব্দ আকস্মিক বা অপ্রাসঙ্গিক নয়। 'নাসি' শব্দের মূল ধাতু (ن س ء) থেকে ব্যুৎপত্তি হওয়া পদগুলোর অর্থ ও পারমুটেশন কীভাবে একটি নির্ভুল ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক কাঠামো নির্দেশ করে, তা এই গবেষণায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উদ্ঘাটন করা হয়েছে।
إِنَّمَا ٱلنَّسِيٓءُ زِيَادَةࣱ فِي ٱلۡكُفۡرِۖ يُضَلُّ بِهِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ يُحِلُّونَهُۥ عَامࣰا وَيُحَرِّمُونَهُۥ عَامࣰا لِّيُوَاطِئُواْ عِدَّةَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ فَيُحِلُّواْ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُۚ زُيِّنَ لَهُمۡ سُوٓءُ أَعۡمَٰلِهِمۡۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡमَ ٱلۡكَٰفِرِينَ
১. 'নাসি' শব্দের তিন ভিন্ন অর্থ ও পারমুটেশনভিত্তিক অনুবাদ
আরবি ভাষাতত্ত্ব ও শব্দমূলের গভীর গবেষণায় দেখা যায়, 'নাসি' (ن س ء) শব্দটির তিনটি প্রধান প্রয়োগ রয়েছে: (১) পুনঃস্থাপন বা সংযোজন, (২) সময় বা স্থান স্থানান্তর করা, এবং (৩) পিছিয়ে দেওয়া বা পিছনে ধরা। নিচে এই তিনটি ভিন্ন মাত্রার আলোকে আয়াতের পূর্ণ অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো:
পুনঃস্থাপন (Intercalation)
“নিশ্চয়ই পুনঃস্থাপন (নাসি) অবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। এর দ্বারা কাফিররা পথভ্রষ্ট হয়, তারা এক বছর হালাল করে এবং আরেক বছর হারাম করে, যাতে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার সংখ্যা মেলাতে পারে। ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা তারা হালাল করে। তাদের মন্দ আমলসমূহ তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আল্লাহ কাফির কওমকে হিদায়ত দেন না।”
সময় স্থানান্তর (Translocation)
“নিশ্চয়ই সময় স্থানান্তর (নাসি) অবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। এর দ্বারা কাফিররা পথভ্রষ্ট হয়, তারা এক বছর হালাল করে এবং আরেক বছর হারাম করে, যাতে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার সংখ্যা মেলাতে পারে। ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা তারা হালাল করে। তাদের মন্দ আমলসমূহ তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আল্লাহ কাফির কওমকে হিদায়ত দেন না।”
পিছনে ধরা (Postponement)
“নিশ্চয়ই পিছনে ধরা (নাসি) অবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। এর দ্বারা কাফিররা পথভ্রষ্ট হয়, তারা এক বছর হালাল করে এবং আরেক বছর হারাম করে, যাতে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার সংখ্যা মেলাতে পারে। ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা তারা হালাল করে। তাদের মন্দ আমলসমূহ তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আল্লাহ কাফির কওমকে হিদায়ত দেন না।”
২. মূল আয়াতের শব্দভিত্তিক ব্যুৎপত্তি ও বিশ্লেষণ (৩৩টি শব্দ ও রুট)
সূরা তাওবার ৩৭ নম্বর আয়াতটি মোট ৩৩টি মৌলিক শব্দ ও ব্যাকরণগত এককের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি শব্দের মূল ধাতু (Root) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুরআনের বাক্য গঠন কতটা নিখুঁত এবং গাণিতিকভাবে সুবিন্যস্ত:
৩ সূরা আত-তাওবাহ (৯:৩৭) এর ৩৩টি পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ শব্দার্থ ও শব্দমূল
| # | আরবি পদ | উচ্চারণ | শব্দমূল (Root) | শব্দার্থ ও প্রাঞ্জল অর্থ |
|---|---|---|---|---|
| 1 | إِنَّمَا | Innamā | أ ن م | শুধুমাত্র, অবশ্যই |
| 2 | ٱلنَّسِيٓءُ | an-nasīʾu | ن س ء | পুনঃস্থাপন / সময় স্থানান্তর / পিছনে ধরা |
| 3 | زِيَادَةࣱ | ziyādah | ز ي د | বৃদ্ধি, বৃদ্ধি করা |
| 4 | فِي | fī | ف ي | মধ্যে |
| 5 | ٱلْكُفْرِ | al-kufri | ك ف ر | অবিশ্বাস, কুফর |
| 6 | يُضَلُّ | yuḍallu | ض ل ل | পথভ্রষ্ট করা, বিভ্রান্ত করা |
| 7 | بِهِ | bihi | ب ه | তার দ্বারা |
| 8 | ٱلَّذِينَ | alladhīna | ذ ي ن | যারা |
| 9 | كَفَرُواْ | kafarū | ك ف ر | অবিশ্বাসী হয়েছে |
| 10 | يُحِلُّونَهُۥ | yuḥillūnahu | ح ل ل | তারা হালাল করে |
| 11 | عَامࣰا | ʿāman | ع و م | একটি বছর, সময়কাল |
| 12 | وَ | wa | و | এবং |
| 13 | يُحَرِّمُونَهُۥ | yuḥarrimūnahu | ح ر م | তারা হারাম করে |
| 14 | عَامࣰا | ʿāman | ع و م | একটি বছর, সময়কাল |
| 15 | لِّيُوَاطِئُواْ | li-yuwāṭiʾū | و ط ئ | মিলে রাখতে, মিলিয়ে চলতে |
| 16 | عِدَّةَ | ʿiddata | ع د د | সংখ্যা, পরিমাণ |
| 17 | مَا | mā | م ا | যা |
| 18 | حَرَّمَ | ḥarrama | ح ر م | হারাম করেছে |
| 19 | ٱللَّهُ | Allāhu | أ ل ه | আল্লাহ |
| 20 | فَيُحِلُّواْ | fa-yuḥillū | ح ل ل | তারা হালাল করে |
| 21 | مَا | mā | م ا | যা |
| 22 | حَرَّمَ | ḥarrama | ح ر م | হারাম করেছে |
| 23 | ٱللَّهُ | Allāhu | أ ل ه | আল্লাহ |
| 24 | زُيِّنَ | zuyyina | ز ي ن | সুশোভিত করা হয়েছে, আলোকিত করা হয়েছে |
| 25 | لَهُمۡ | lahum | ل ه م | তাদের জন্য |
| 26 | سُوٓءُ | sūʾu | س و ء | মন্দ, খারাপ |
| 27 | أَعۡمَٰلِهِمۡ | aʿmālihimu | ع م ل | তাদের কাজ, তাদের কর্ম |
| 28 | وَ | wa | و | এবং |
| 29 | ٱللَّهُ | Allāhu | أ ل ه | আল্লাহ |
| 30 | لَا | lā | ل ا | না |
| 31 | يَهۡدِي | yahdī | ه د ي | হিদায়ত দেন |
| 32 | ٱلۡقَوۡمَ | al-qawma | ق و م | জনগণ, কওম |
| 33 | ٱلۡكَٰفِرِينَ | al-kāfirīn | ك ف ر | অবিশ্বাসীরা |
৩. তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন 'নাসি' কুফরির বৃদ্ধি (زِيَادَةࣱ فِي ٱلۡكُفۡرِ)?
আল্লাহ সাধারণ গুনাহ বা ভুলত্রুটিকে সরাসরি ‘কুফরির বৃদ্ধি’ বলেননি। কিন্তু নাসি প্রথাকে কেন এত কঠোর ভাষায় তীব্র নিন্দা করা হলো? এর পেছনে চারটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ নিহিত রয়েছে:
-
১
ঐশী সার্বভৌমত্বের ওপর মানুষের আইন প্রণয়ন:
আল্লাহ মহাবিশ্বের গতিপ্রকৃতি ও সময়ের পরিমাপক নির্ধারণ করেছেন। মানুষ যখন নিজস্ব খেয়ালখুশিমতো কোনো মাসকে হারাম থেকে হালাল অথবা হালাল থেকে হারামে রূপান্তর করে, তখন সে কার্যত নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ আইনপ্রণেতা হিসেবে দাঁড় করায়।
-
২
সংখ্যার বাহানা দিয়ে মূল বিধান লঙ্ঘন (لِّيُوَاطِئُواْ عِدَّةَ):
জাহেলি আরবরা বলত, “আল্লাহ ৪টি মাস সম্মানিত করেছেন, আমরাও তো বছরে মোট ৪টি মাসই যুদ্ধ বন্ধ রাখছি!” কিন্তু তারা মুহাররমের বদলে সফর মাসকে নিষিদ্ধ বানিয়ে নিজেদের সুবিধামতো সময়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেত। বাহ্যিক সংখ্যা মিল রাখলেও তারা বিধানের প্রাণ ও উদ্দেশ্যকে হত্যা করত।
-
৩
হজ্জ ও ইবাদতের সার্বজনীন সময় বিভ্রান্ত করা:
ক্যালেন্ডারে অতিরিক্ত মাস (Intercalation) বা মাস পেছানোর ফলে গোটা উপদ্বীপের মানুষের কাছে যুল-হিজ্জাহ মাসের প্রকৃত অবস্থান হারিয়ে যেত। ফলে বিভিন্ন গোত্র ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হজ্জ করত, যা ঐশী ইবাদতের ঐক্যে বিভেদ সৃষ্টি করত।
-
৪
স্বার্থান্ধ অপকর্মকে যুক্তি দিয়ে সুশোভিত করা (زُيِّنَ لَهُمۡ):
পাপ করার চেয়ে মারাত্মক হলো পাপকে ধার্মিকতার চাদরে ঢেকে দেওয়া। তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাত যে এটি সময়ের সুবিধার্থে করা হচ্ছে। কুরআন এই আত্মপ্রবঞ্চনাকেই বলেছে—তাদের মন্দ কাজ তাদের কাছে সুশোভিত করা হয়েছে।
৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ঐশী কালপঞ্জি বনাম মানবীয় কারসাজি
আল্লাহর শাশ্বত কালপঞ্জি (সূরা ৯:৩৬)
- মহাবিশ্ব সৃষ্টির দিন থেকেই বছরের মাসের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট বারোটি।
- এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত ও যুদ্ধমুক্ত (মুহাররম, রজব, যুল-ক্বাদাহ, যুল-হিজ্জাহ)।
- প্রাকৃতিক ও অপরিবর্তনীয় চান্দ্র চক্র—যেখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলে না।
- উদ্দেশ্য: সমাজের রক্তপাত রোধ, বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শান্তি।
জাহেলি আরবের 'নাসি' প্রথা (সূরা ৯:৩৭)
- নিজেদের পছন্দমতো সময়ে যুদ্ধ ও লুটতরাজ চালাতে মাস পেছানো বা আগানো।
- এক বছর মুহাররমকে হালাল বানিয়ে পরের বছরকে হারাম ঘোষণা করা।
- কেবল হিসাবের সংখ্যা (৪ মাস) ঠিক রেখে বিধানের মূল চেতনা ধূলিসাৎ করা।
- ফলাফল: আল্লাহর হারামকৃতকে হালাল করা এবং কুফরিতে নিমজ্জিত হওয়া।
৫. গবেষকের উপসংহার ও সমকালীন শিক্ষা
আলম এম.-এর গবেষণায় স্পষ্ট হয় যে, 'নাসি' কেবলমাত্র প্রাচীন আরবের একটি ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডার সমস্যা নয়; এটি একটি শাশ্বত চারিত্রিক ব্যাধি। যখনই মানুষ ধর্মের বাহ্যিক আচার বা সংখ্যা ঠিক রেখে নিজস্ব পার্থিব বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে মূল বিধানকে স্থানান্তর বা স্থগিত করে, তখনই সেখানে 'নাসি'র পুনরাবৃত্তি ঘটে।
- প্রাকৃতিক সময়ের পবিত্রতা: আল্লাহর সৃষ্টি নিয়মে সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবহমান; একে মানবীয় স্বার্থে বিকৃত করার কোনো এখতিয়ার কারো নেই।
- আইনি চাতুরীর অসারতা: শব্দের ফাঁদ ফেলে কিংবা সংখ্যার সমতা দেখিয়ে আল্লাহর চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞাকে শিথিল করার চেষ্টা কুফরিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
- কুরআনের শব্দমূলভিত্তিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা: 'নাসি'র মতো জটিল পরিভাষা বুঝতে বাইরের কাল্পনিক গল্পের প্রয়োজন নেই; কুরআনের নিজস্ব শব্দমূল (ن س ء) ও পারমুটেশনই এর অকাট্য প্রমাণ দেয়।

