মৃত্যের গোসল

আলম এম.আলম এম.১ অক্টোবর, ২০২৬
“মানুষ জীবিত অবস্থায় যেমন মর্যাদার অধিকারী, মৃত্যুর পর তার দেহের প্রতিও তেমনই সম্মান, শালীনতা ও সংযম প্রদর্শন করা মানবিক বিবেকের দাবি। জীবিত মানুষ নিজের দেহ, বিশেষ করে তার আবৃত ও ব্যক্তিগত অংশ অন্যের দৃষ্টি ও স্পর্শ থেকে রক্ষা করে। এটি কেবল সামাজিক রীতি নয়, মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও আত্মমর্যাদারও প্রকাশ। কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ নিজের দেহ সম্পর্কে আর কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারে না। তখন তার দেহ সম্পূর্ণভাবে জীবিত মানুষের দায়িত্বে চলে যায়। ফলে মৃতদেহের পরিচর্যার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: মৃত ব্যক্তির দেহের মর্যাদা ও গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে?”

মানুষ জীবিত অবস্থায় যেমন মর্যাদার অধিকারী, মৃত্যুর পর তার দেহের প্রতিও তেমনই সম্মান, শালীনতা ও সংযম প্রদর্শন করা মানবিক বিবেকের দাবি। জীবিত মানুষ নিজের দেহ, বিশেষ করে তার আবৃত ও ব্যক্তিগত অংশ অন্যের দৃষ্টি ও স্পর্শ থেকে রক্ষা করে। এটি কেবল সামাজিক রীতি নয়, মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাবোধ ও আত্মমর্যাদারও প্রকাশ।

কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ নিজের দেহ সম্পর্কে আর কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারে না। তখন তার দেহ সম্পূর্ণভাবে জীবিত মানুষের দায়িত্বে চলে যায়। ফলে মৃতদেহের পরিচর্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: মৃত ব্যক্তির দেহের মর্যাদা ও গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই কুরআনের বক্তব্য এবং পরবর্তী প্রচলিত প্রথার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে।

💡

কুরআনের মূল অবস্থান:

কুরআনে মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানোর কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি, ধাপ, পানি ব্যবহারের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ম, অথবা গোসলের সময় মৃতের গোপন অঙ্গ স্পর্শ করার কোনো সরাসরি নির্দেশনা নেই। প্রচলিত মৃতদেহ গোসলের বিস্তারিত নিয়মও কুরআনে বর্ণিত হয়নি। তাই কোনো প্রচলিত পদ্ধতিকে কুরআনের সরাসরি বিধান হিসেবে দাবি করার আগে তার কুরআনিক ভিত্তি যাচাই করা আবশ্যক।

১. মানুষের দেহের আবৃত অংশ সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশ

কুরআন মানুষের দেহের আবৃত অংশের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে:

📖 সূরা আল-আ‘রাফ (৭:২৬) লজ্জাস্থান আবৃত করার মূলবিধান

يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَٰرِى سَوْءَٰتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ

উচ্চারণ: ইয়া বানী আদামা ক্বদ আনযালনা আলাইকুম লিবাসাঁই ইউওয়ারী সাওআতিকুম ওয়া রীশা, ওয়া লিবাসুত তাকওয়া যালিকা খাইর; যালিকা মিন আয়াতিল্লাহি লা‘আল্লাহুম ইয়াযযাক্কারূন।
“হে আদমসন্তান, আমরা তোমাদের জন্য এমন পোশাক প্রদান করেছি, যা তোমাদের সাওআহ (سَوْآت) আবৃত করে এবং সৌন্দর্যও প্রকাশ করে। আর তাকওয়ার পোশাক, সেটিই উত্তম। এগুলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যাতে তারা স্মরণ করে।”

এখানে দুটি শব্দ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য:

سَوْآتِكُمْ (সাওআতিকুম) س و أ

سَوْأَة (সাওআহ) এসেছে س و أ (সীন-ওয়াও-হামযা) মূল থেকে। শব্দটির অর্থক্ষেত্রে এমন বিষয় রয়েছে যা প্রকাশিত হলে লজ্জা, অস্বস্তি বা অপছন্দের কারণ হয়। মানুষের দেহের যে অংশ আবৃত রাখা হয়, কুরআনের ব্যবহারে সেই অর্থও এতে গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত।

يُوَارِي (ইউওয়ারী) و ر ي

يُوَارِي এসেছে و ر ي (ওয়া-রা-ইয়া) মূল থেকে। এর অর্থ আড়াল করা, আবৃত করা, দৃষ্টির আড়ালে রাখা বা গোপন করা।

অর্থাৎ আয়াতের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যে পোশাকের অন্যতম মৌলিক কাজ হচ্ছে মানুষের সাওআহকে ইউওয়ারী করা—অর্থাৎ দেহের এমন অংশকে আড়াল ও আবৃত রাখা যা প্রকাশযোগ্য নয়।

২. দৃষ্টি সংযম ও গোপন অঙ্গ সংরক্ষণ

কুরআন শুধু পোশাকের বাহ্যিক আবরণের কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি; মানুষের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং গোপন অঙ্গ সংরক্ষণ করার সুস্পষ্ট বিধানও দিয়েছে:

📖 সূরা আন-নূর (২৪:৩০) দৃষ্টির সংযম ও আত্মমর্যাদা

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا۟ مِنْ أَبْصَٰرِهِمْ وَيَحْفَظُوا۟ فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا يَصْنَعُونَ

উচ্চারণ: কুল লিল-মু’মিনীনা ইয়াগুদ্দূ মিন আবছ্বরিহিম ওয়া ইয়াহফাযূ ফুরূজাহুম; যালিকা আযকা লাহুম; ইন্নাল্লাহা খাবীরুম বিমা ইয়াসনা‘ঊন।
“বিশ্বাসীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের গোপন অঙ্গ সংরক্ষণ করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। তারা যা করে, আল্লাহ তা সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।”

এখানে فُرُوج (ফুরূজ)—একবচনে فَرْج (ফারজ)। এটি মানুষের যৌনাঙ্গ বা অতি গোপনীয় অঙ্গ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

আর يَحْفَظُوا (ইয়াহফাযূ) এসেছে ح-ف-ظ (হা-ফা-যা) মূল থেকে, যার অর্থ সংরক্ষণ করা, পাহারা দেওয়া, হেফাজত করা ও অন্যের অযাচিত স্পর্শ বা দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। অর্থাৎ কুরআনের ভাষায় মানুষের গোপন অঙ্গের ব্যাপারে সংরক্ষণ ও সুরক্ষার নীতি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত।

৩. মানবসত্তার সহজাত মর্যাদা

মানুষের সার্বিক মর্যাদা সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা অত্যন্ত মহিমান্বিত:

📖 সূরা আত-তীন (৯৫:৪) সৃষ্টির সেরা অবয়ব

لَقَدْ خَلَقْنَا ٱلْإِنسَٰنَ فِىٓ أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ

উচ্চারণ: লাক্বাদ খালাক্বনাল ইনসানা ফী আহছানি তাক্বওয়ীম।
“নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি।”
📖 সূরা আল-ইসরা (১৭:৭০) আদমসন্তানের সার্বজনীন সম্মান

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِىٓ ءَادَمَ

উচ্চারণ: ওয়া লাক্বাদ কাররামনা বানী আদাম...
“নিশ্চয়ই আমরা আদমসন্তানকে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।”

এখানে كَرَّمْنَا (কাররামনা) এসেছে ك-ر-م (কা-রা-মীম) মূল থেকে, যার অর্থ সম্মানিত করা, মর্যাদা দেওয়া, অপদস্থতা থেকে রক্ষা করা। কুরআন তাই মানুষকে কেবল একটি জৈবিক দেহ হিসেবে দেখে না, বরং এক পরম মর্যাদাবান সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে।

৪. সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩১: মৃতদেহ সম্পর্কে কুরআনিক দৃষ্টান্ত

মৃত মানুষের দেহের গোপন অংশ আড়াল করার প্রসঙ্গে কুরআনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষ আয়াত হলো সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩১। এখানে প্রথম হত্যাকাণ্ডের পর মানবদেহের সৎকার সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে:

📖 সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩১) মৃতের সাওআহ আড়াল করার ঐশী দৃষ্টান্ত

فَبَعَثَ ٱللَّهُ غُرَابًا يَبْحَثُ فِى ٱلْأَرْضِ لِيُرِيَهُۥ كَيْفَ يُوَٰرِى سَوْءَةَ أَخِيهِ ۚ قَالَ يَٰوَيْلَتَىٰٓ أَعَجَزْتُ أَنْ أَكُونَ مِثْلَ هَٰذَا ٱلْغُرَابِ فَأُوَٰرِىَ سَوْءَةَ أَخِى ۖ فَأَصْبَحَ مِنَ ٱلنَّٰدِمِينَ

উচ্চারণ: ফাবা‘আছাল্লাহু গুরাবাইঁ ইয়াবহাছু ফিল আরদি লিউরিয়াহূ কাইফা ইউওয়ারী সাওআতা আখীহ; ক্বালা ইয়া ওয়াইলাতা আ‘আঝাযতু আন আকূনা মিছলা হাযাল গুরাবি ফাউওয়ারিয়া সাওআতা আখী, ফাআছবাহা মিনান নাদিমীন।
“অতঃপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যা মাটিতে অনুসন্ধান করছিল, যাতে তাকে দেখাতে পারে কীভাবে সে তার ভাইয়ের সাওআহ (سَوْءَة) আড়াল করবে। সে বলল, ‘হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভাইয়ের সাওআহ আড়াল করতে পারি?’ অতঃপর সে অনুতপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।”

আয়াতটির নিখুঁত শব্দতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ:

১

يَبْحَثُ (ইয়াবহাসু) — মূল: ب ح ث

অর্থ: অনুসন্ধান করা, খুঁড়ে দেখা, তল্লাশি করা। কাকটি فِي الْأَرْضِ অর্থাৎ মাটির গভীরে খুঁড়ে অনুসন্ধান করছিল।

২

لِيُرِيَهُ (লিউরিয়াহু) — ক্রিয়া: أَرَى (আরা)

অর্থ: তাকে দেখানো, তাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করানো। এখানে উদ্দেশ্যসূচক لِـ (লি) যুক্ত হয়ে কাকের এই অনুসন্ধানী কাজের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে।

৩

كَيْفَ (কৈফা) — প্রশ্নবোধক অব্যয়

অর্থ: কীভাবে, কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে। এটি সরাসরি يُوَارِي ক্রিয়ার পদ্ধতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

৪

يُوَارِي (ইউওয়ারী) — মূল: و ر ي

অর্থের ক্ষেত্র: আড়াল করা, আবৃত করা, দৃষ্টির আড়ালে রাখা, আচ্ছাদিত করা।

৫

سَوْءَةَ أَخِيهِ (সাওআতা আখীহি) — মূল: س و أ

এখানে سَوْءَةَ হলো ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ কর্ম (object)। অর্থাৎ যে জিনিসটিকে আড়াল করা হচ্ছে সেটি হলো মৃত ভাইয়ের সাওআহ। আধুনিক “গোপনীয়তার অধিকার” কথাটি হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শব্দ, কিন্তু কুরআনের সরাসরি বক্তব্য হলো: ভাইয়ের যে অংশটি আবৃত রাখা অপরিহার্য, তা দৃষ্টির আড়ালে লুকানো।

৫. ৫:৩১-এর সঙ্গে ৭:২৬-এর ভাষাগত ও আদর্শিক সংযোগ

এই দুটি আয়াত পাশাপাশি রাখলে কুরআনের একটি অভিন্ন কাঠামোগত সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

সূরা আল-আ‘রাফ (৭:২৬) — জীবিত অবস্থা পোশাকের মূল লক্ষ্য

لِبَاسًا يُوَٰرِى سَوْءَٰتِكُمْ

লিবাসান ইউওয়ারী সাওআতিকুম

“এমন পোশাক, যা তোমাদের সাওআহ আবৃত করে।” — এখানে জীবিত মানুষের মর্যাদা ও শালীনতা রক্ষার জন্য সার্বক্ষণিক আবরণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩১) — মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থা সৎকারের মূল লক্ষ্য

كَيْفَ يُوَٰرِى سَوْءَةَ أَخِيهِ

কৈফা ইউওয়ারী সাওআতা আখীহি

“কীভাবে সে তার ভাইয়ের সাওআহ আড়াল করবে।” — এখানে মৃত্যুর পরও দেহের আবৃত অংশকে অনাবৃত না রেখে আড়াল করার দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে।

উভয় আয়াতেই سَوْأَة (সাওআহ) এবং يُوَارِي (ইউওয়ারী) একই অর্থক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। জীবিত মানুষের জন্য যেমন পোশাকের মাধ্যমে সাওআহ আবৃত রাখা জরুরি, তেমনি মৃত্যুর পরও ভাইয়ের সাওআহ আড়াল করাই ছিল ঐশী শিক্ষার মূল শিক্ষা। এই ভাষাগত সংযোগটি মৃতদেহের পরিচর্যার ক্ষেত্রে দেহের আবৃত অংশের মর্যাদা রক্ষার এক অটুট কুরআনিক ভিত্তি তৈরি করে।

৬. কুরআন বনাম প্রচলিত ধর্মীয় প্রথা

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হলো: কুরআনিক নির্দেশ এবং পরবর্তী যুগের প্রচলিত প্রথা কখনোই সমার্থক নয়। বিষয়টি অনুধাবন করতে নিচের তুলনামূলক ছকটি প্রণিধানযোগ্য:

কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ বনাম প্রচলিত প্রথাগত পদ্ধতির তুলনা

Quranic Principles vs. Customary Practice
বিষয় কুরআনে সরাসরি যা আছে প্রচলিত রেওয়াজে যা দেখা যায় কুরআনিক ভারসাম্য ও নীতি
গোসলের নির্দিষ্ট বিধান মৃতদেহের গোসলের কোনো নির্দিষ্ট ধাপ বা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নেই নির্দিষ্ট বার পানি ঢালা, কুলপাতা ও কর্পূরের বিস্তারিত নিয়মাবলি প্রচলিত প্রথাকে সরাসরি ঐশী বিধান হিসেবে দাবি না করা
লজ্জাস্থান ও সাওআহ সর্বাবস্থায় يُوَارِي سَوْءَةَ (সাওআহ আড়াল ও গোপন করা) আবশ্যিক কখনো কখনো অসতর্কতায় দৃষ্টিগোচর হওয়া বা অতিরিক্ত স্পর্শ মৃতের কাপড় সরিয়ে দেখা বা অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
মানবদেহের মর্যাদা وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ — মানুষের চিরন্তন মর্যাদা অক্ষুণ্ণ অনেক সময় যান্ত্রিক বা অনুভূতিহীন সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা জীবিত মানুষের মতোই স্পর্শকাতর সম্মান ও বিনম্র আচরণ প্রদর্শন
সৎকার ও ব্যবস্থাপনা মাটিতে আচ্ছাদিত ও দৃষ্টির আড়াল করা (সূরা ৫:৩১) বহু স্তরের আনুষ্ঠানিক আচার ও সামাজিক দাবি সহজ, শালীন, সম্মানজনক ও গোপনীয়তা রক্ষার অগ্রাধিকার

৭. মৃত মানুষ নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারে না

জীবিত মানুষ নিজের দেহ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে আপত্তি জানাতে পারে, বলতে পারে—তার কোনো অংশ যেন কেউ না দেখে, তাকে যেন এভাবে স্পর্শ করা না হয়, কিংবা তার ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখা হোক।

কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়। সে আর নিজের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিরোধ করতে পারে না, কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে না।

🛡️ জীবিত মানুষের নৈতিক আমানত:

কেউ যখন সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় নিক্ষিপ্ত হয়, তখন তার সেই অসহায়ত্বকে সম্মান জানানো মানবিকতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। মৃতদেহের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় উন্মুক্ততা, প্রদর্শন বা অনধিকার স্পর্শ এড়িয়ে চলা পরম শালীনতার পরিচায়ক। এটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কুরআনে প্রতিষ্ঠিত মানুষের মর্যাদা, আত্মসম্মান ও সাওআহ আড়াল করার নৈতিক মূলনীতির প্রতি বিশ্বস্ততা।

৮. শব্দতাত্ত্বিক ও ধারণাগত কাঠামোর সারসংক্ষেপ

কুরআনের ব্যবহৃত মূল শব্দগুলোর অর্থব্যাপ্তি এক নজরে অনুধাবনের জন্য নিচের ছকটি সহায়ক:

কুরআনের মূলশব্দ ও গোপনীয়তা রক্ষার ভাষাতত্ত্ব

Quranic Semantic Root Analysis
কুরআনিক পরিভাষা মূলধাতু আভিধানিক ও মৌলিক অর্থ মৃতদেহের ক্ষেত্রে নৈতিক তাৎপর্য
سَوْأَة (সাওআহ) س و أ যা প্রকাশিত হলে লজ্জা বা অস্বস্তি হয়; আবৃত রাখার উপযোগী লজ্জাস্থান মৃত ব্যক্তির আবৃত অংশকে কোনো অবস্থাতেই অনাবৃত বা উন্মোচিত না করা
يُوَارِي (ইউওয়ারী) و ر ي দৃষ্টির আড়ালে রাখা, আচ্ছাদিত করা, গোপন করা পরিচর্যার সময়ও চাদর বা কাপড় দিয়ে দৃষ্টির সম্পূর্ণ আড়াল রক্ষা করা
حِفْظ (হিফয/ইয়াহফাযূ) ح ف ظ সংরক্ষণ করা, হেফাজত করা, সীমা লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করা গোপন অঙ্গের সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষা করা; অপ্রয়োজনীয় স্পর্শ বর্জন
تَكْرِيم (কাররামনা) ك ر م মর্যাদাবান করা, সম্মান দেওয়া, শ্রেষ্ঠত্ব দান মৃত্যুর পরেও মানুষের মরদেহকে সর্বোচ্চ সম্মান ও বিনম্রতায় বরণ করা

৯. মানবিক মর্যাদা রক্ষার ৫টি সংযত নীতি

কুরআনের মূল শিক্ষার আলোকে মৃতদেহের পরিচর্যার ক্ষেত্রে যে মৌলিক নৈতিক নীতিগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য:

১

মরদেহের পূর্ণ সম্মান রক্ষা:

মৃত মানুষের দেহকে কোনো অবস্থাতেই অবহেলা বা অসম্মান করা উচিত নয়; জীবিতের মতোই মর্যাদাপূর্ণ আচরণ কাম্য।

২

সাওআহ অনাবৃত না করা:

মৃতদেহের লজ্জাস্থান বা ব্যক্তিগত আবৃত অংশ অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ বা দৃষ্টিগোচর করা কোনোভাবেই সঙ্গত নয়।

৩

পরিচর্যায় সার্বক্ষণিক আচ্ছাদন:

কোনো ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা প্রয়োজনীয় পরিচর্যার সময় যতটা সম্ভব সুদৃঢ় আচ্ছাদন ও চাদরের আড়াল বজায় রাখা উচিত।

৪

অযাচিত স্পর্শ ও প্রদর্শন বর্জন:

প্রয়োজনের বাইরে মৃতদেহের অঙ্গ স্পর্শ করা, উন্মুক্ত প্রদর্শন বা অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার নামে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা উচিত।

৫

ঐশী বিধান ও প্রথার পার্থক্য নিরূপণ:

যেকোনো প্রচলিত সামাজিক বা শাস্ত্রীয় রীতিকে কুরআনের বিধান হিসেবে দাবি করার আগে তার প্রত্যক্ষ কুরআনিক প্রমাণ যাচাই করা আবশ্যক।

১০. উপসংহার

কুরআন মৃতদেহ গোসল করানোর কোনো বিস্তারিত বা যান্ত্রিক পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি। তাই প্রচলিত গোসলের প্রতিটি ধাপকে সরাসরি কুরআনের বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, কুরআন অত্যন্ত জোরালোভাবে তিনটি মৌলিক দিক প্রতিষ্ঠা করেছে:

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِىٓ ءَادَمَ সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০

“নিশ্চয়ই আমরা আদমসন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি।” — মানুষের মৌলিক সম্মান প্রতিষ্ঠা।

لِبَاسًا يُوَٰرِى سَوْءَٰتِكُمْ সূরা আল-আ‘রাফ ৭:২৬

“পোশাক, যা তোমাদের সাওআহ আবৃত করে।” — লজ্জাস্থান ও গোপনীয়তা রক্ষার সার্বক্ষণিক বিধান।

كَيْفَ يُوَٰرِى سَوْءَةَ أَخِيهِ সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩১

“কীভাবে সে তার ভাইয়ের সাওআহ আড়াল করবে।” — মৃত্যুর পরেও সাওআহ আড়াল করার ঐশী দৃষ্টান্ত।

অতএব, কুরআনভিত্তিকভাবে যতটুকু নিশ্চিতভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় তা হলো:

কুরআনিক মূল সিদ্ধান্ত

কুরআনে মৃতদেহ গোসল করানোর কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই; কিন্তু মৃত মানুষের সাওআহ আড়াল করার একটি সুস্পষ্ট ঐশী দৃষ্টান্ত বিদ্যমান।

তাই মৃতদেহের প্রয়োজনীয় বাহ্যিক পরিচর্যা করা হলেও তার মর্যাদা ও আবৃততা যতটা সম্ভব কঠোরভাবে রক্ষা করা উচিত।

“মৃত মানুষ আর নিজের সম্মান রক্ষা করতে পারে না।
তাই তার দেহের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করার দায়িত্ব জীবিত মানুষের।”
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।