পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার: ‘উহ্’ না বলার কুরআনিক দর্শন ও আত্মিক মর্যাদা
মানব জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর সম্পর্ক হলো পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। শৈশবে সন্তান যখন থাকে সম্পূর্ণ নিঃসহায়, তখন পিতামাতা নিজের ঘুম, আরাম ও জীবনের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে তাকে গড়ে তোলেন। কিন্তু কালের আবর্তে জীবনের চাকা যখন ঘুরে যায়, সন্তানের যৌবন যখন প্রস্ফুটিত হয় আর পিতামাতা উপনীত হন নিঃসহায় বার্ধক্যে — ঠিক তখনই মানুষের আসল নৈতিকতা ও মানবিকতার চরম পরীক্ষা শুরু হয়।
📖 এক অভূতপূর্ব ঐশী সংযোগ:
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা প্রায় প্রতিটি স্থানে নিজের তাওহিদ ও একক ইবাদতের ঘোষণার সাথে পিতামাতার প্রতি ‘ইহসান’ (সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার)-কে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে মেনে নেওয়ার পরেই মানুষের ওপর আরোপিত প্রথম সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব হলো পিতামাতার সেবা।
সূরা আল-ইসরা (১৭:২৩) — চূড়ান্ত নির্দেশ ও ‘উহ্’ শব্দের গভীর মনস্তত্ত্ব
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَٰنًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ ٱلْكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
“তোমার পালনকর্তা চূড়ান্ত আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করো। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না; বরং তাঁদের সাথে পরম সম্মান ও শিষ্টাচারপূর্ণ নরম কথা বলো।”
(সূরা আল-ইসরা / বনি ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)
এই আয়াতটিতে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণিক দর্শন নিহিত রয়েছে:
‘উহ্’ হলো মানুষের কণ্ঠনালী থেকে নির্গত বিরক্তি, অনীহা বা অস্বস্তির ক্ষুদ্রতম বহিঃপ্রকাশ। কুরআন শারীরিক আঘাত তো দূরের কথা, মুখ দিয়ে ক্লান্তি বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপ্রসন্নতা প্রকাশ করাকেও অপরাধ গণ্য করেছে।
বার্ধক্যে মানুষ যখন বারবার এক কথা বলেন, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন বা হাত-পা কাঁপতে থাকে — তখন মেজাজ হারিয়ে উচ্চবাচ্য বা ধমক দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
শুধুমাত্র চুপ থাকাই যথেষ্ট নয়; ইতিবাচকভাবে তাঁদের সাথে এমন শব্দ ও ভঙ্গিতে কথা বলতে হবে যাতে তাঁদের আত্মসম্মান ও মর্যাদা সর্বোচ্চ সমুন্নত থাকে।
সূরা আল-ইসরা (১৭:২৪) — বিনয়ের ডানা ও শৈশবের কৃতজ্ঞতায় দোআ
২৩ নম্বর আয়াতে আচরণের নেতিবাচক সীমানা (কী করা যাবে না) নির্ধারণের পর, ২৪ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইতিবাচক মানসিক অবস্থা ও আল্লাহর কাছে দোয়ার পদ্ধতি:
وَٱخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِى صَغِيرًا
“এবং তাঁদের উভয়ের সামনে ভালোবাসার সাথে নম্রতার ডানা অবনমিত করো এবং বলো: ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন’।”
(সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৪)
পাখি যখন তার দুর্বল বাচ্চাদের মমতা ও ভালোবাসায় আগলে রাখে, তখন সে তার পালক ও ডানা নিচু করে দেয়। একইভাবে সন্তান যতই সামাজিক পদমর্যাদা, জ্ঞান বা বিত্তের অধিকারী হোক না কেন — পিতামাতার সামনে তাকে সম্পূর্ণ অহংকারমুক্ত, অনুগত ও দয়ার্দ্র হতে হবে।
আর দোয়ার ভাষায় কুরআন স্মরণ করিয়ে দেয়: “তাঁরা শৈশবে আমাকে যেভাবে লালন করেছিলেন”। আজ আপনি পূর্ণবয়স্ক ও শক্তিশালী, কিন্তু একদিন আপনিও এই বৃদ্ধ পিতামাতার চেয়েও দুর্বল ও অসহায় ছিলেন।
সূরা লোকমান (৩১:১৪-১৫) — মায়ের অতুলনীয় কষ্ট ও দ্বৈত কৃতজ্ঞতার বিধান
وَوَصَّيْنَا ٱلْإِنسَٰنَ بِوَٰلِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُۥ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَٰلُهُۥ فِى عَامَيْنِ أَنِ ٱشْكُرْ لِى وَلِوَٰلِدَيْكَ إِلَىَّ ٱلْمَصِيرُ
“আর আমি মানুষকে তার পিতামাতার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি এবং তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও; অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে।”
(সূরা লোকমান, আয়াত: ১৪)
এখানে وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ (কষ্টের ওপর কষ্ট) শব্দযুগল মায়ের শারীরিক ও মানসিক আত্মত্যাগের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে। এর পরেই আল্লাহ একটি ঐতিহাসিক সমান্তরাল বিধান ঘোষণা করেন:
কুরআন ঘোষণা করে — পিতামাতা যদি সন্তানকে আল্লাহর সাথে শিরক করতে বা কোনো পাপকাজে বাধ্য করতে তীব্র চাপও দেয়, তবুও তাদের সেই নির্দেশ মানা যাবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও পার্থিব জীবনে তাদের সাথে সদাচরণ ও ভালোবাসাপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে হবে (وَصَاحِبْهُمَا فِى ٱلدُّنْيَا مَعْرُوفًا)। অর্থাৎ আদর্শিক পার্থক্যও পিতামাতার পার্থিব সেবার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
সূরা আল-আহকাফ (৪৬:১৫) — জীবনের চল্লিশ বছর ও পরম পরিণত দোয়া
সূরা আল-আহকাফে গর্ভধারণ ও স্তন্যদানের ৩০ মাসের ক্লান্তি উল্লেখ করার পর একজন মানুষের পরিণত বয়সের এক অভাবনীয় আধ্যাত্মিক দোআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে:
رَبِّ أَوْزِعْنِىٓ أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ ٱلَّتِىٓ أَنْعَمْتَ عَلَىَّ وَعَلَىٰ وَٰلِدَىَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَٰلِحًا تَرْضَىٰهُ وَأَصْلِحْ لِى فِى ذُرِّيَّتِىٓ ۖ إِنِّى تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّى مِنَ ٱلْمُسْلِمِينَ
“হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে দান করেছেন; এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন; এবং আমার সন্তানদেরও সৎকর্মপরায়ণ করে দিন। নিশ্চয় আমি আপনার কাছে তওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”
(সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ১৫-এর একাংশ)
এই দোআটিতে তিনটি প্রজন্ম একত্রিত হয়েছে — অতীত প্রজন্ম (পিতামাতা), বর্তমান প্রজন্ম (সন্তান নিজে) এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম (নিজের সন্তান-সন্ততি)। নিজের জন্য দোয়া করার আগে পিতামাতার প্রতি নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা কুরআনিক শিষ্টাচারের এক অনুপম শিক্ষা।
নবীগণের অনুপম আদর্শ: অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্যমুক্ত জীবন
কুরআনে আল্লাহর প্রিয় নবীগণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে পিতামাতার প্রতি ভক্তি ও আনুগত্যকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
وَبَرًّۢا بِوَٰلِدَيْهِ وَلَمْ يَكُن جَبَّارًا عَصِيًّا
“এবং তিনি ছিলেন তাঁর পিতামাতার প্রতি পরম অনুগত এবং তিনি উদ্ধত বা অবাধ্য ছিলেন না।” (সূরা মারইয়াম ১৯:১৪)
وَبَرًّۢا بِوَٰلِدَتِى وَلَمْ يَجْعَلْنِى جَبَّارًا شَقِيًّا
“এবং তিনি আমাকে আমার মায়ের অনুগত করেছেন, আর আমাকে করেননি উদ্ধত ও দুর্ভাগা।” (সূরা মারইয়াম ১৯:৩২)
উভয় আয়াতেই جَبَّار (উদ্ধত/অহংকারী) শব্দের বিপরীত গুণ হিসেবে পিতামাতার প্রতি আনুগত্যকে আনা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি পিতামাতার সামনে অহংকার প্রকাশ করে বা অবাধ্য হয়, সে স্বভাবগতভাবেই অত্যাচারী ও উদ্ধত।
দৈনন্দিন জীবনে কুরআনিক শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন
পিতামাতার বার্ধক্যে একজন মুমিনের ব্যবহারিক আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
উপসংহার: বার্ধক্য হলো দ্বিতীয় শৈশব
বার্ধক্য মূলত মানুষের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার এমন এক পর্যায়, যা মানুষের প্রথম শৈশবেরই হুবহু প্রতিচ্ছবি। শৈশবে আপনি যখন কাপড় নোংরা করতেন, গভীর রাতে কান্না জুড়ে দিতেন, খাবার ফেলে দিতেন — তখন মা-বাবা কোনো বিরক্তি প্রকাশ করেননি; বরং পরম স্নেহে আপনাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছেন।
আজ বার্ধক্যে তাঁরা যখন দুর্বল, অসুস্থ বা একটু খিটখিটে — তখন আপনার একটু বিরক্তি বা ‘উহ্’ শব্দ তাঁদের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ ঘটায়, তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
رَّبِّ ٱرْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِى صَغِيرًا
“হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন।”
পিতামাতাকে সেবা করার সুযোগ কোনো বোঝা নয়, বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জনের জন্য এক অপূর্ব সুযোগ। পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের সকলকে পিতামাতার প্রতি সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারকারী সন্তান হিসেবে কবুল করুন।

