আল্লাহ কি তাঁর সৃষ্টির কসম করেন?

আলম এম.আলম এম.৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
“কুরআনের কিছু আয়াতের প্রচলিত অনুবাদ পড়লে মনে হয়, আল্লাহ তাঁর নিজের সৃষ্টির বিভিন্ন বস্তুর কসম করেছেন। কোথাও নক্ষত্রের অবস্থান, কোথাও কিয়ামতের দিন, কোথাও নফস, কোথাও নগর, কোথাও পূর্ব ও পশ্চিমের রবের কসম করার কথা বলা হয়েছে।”

কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়:

তাত্ত্বিক প্রশ্ন ০১

আল্লাহ কি সত্যিই তাঁর নিজের সৃষ্টির কসম করেন?

স্রষ্টা কি তাঁর নিজের সত্যতা প্রমাণে তাঁরই সৃষ্ট কোনো নশ্বর বস্তুকে সাক্ষী বা শপথের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করেন?

ভাষাতাত্ত্বিক প্রশ্ন ০২

নাকি আরবি لَا أُقْسِمُ ও فَلَا أُقْسِمُ-এর অনুবাদে কেবল একটি অনুমান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

যা আরবি বাক্যটির একমাত্র সম্ভাব্য অর্থ নয়, বরং ব্যাকরণবিদদের একটি বিশেষ ব্যাখ্যামূলক মত মাত্র।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রচলিত অনুবাদ দিয়ে শুরু না করে কুরআনের আরবি ভাষার দিকে ফিরে যেতে হবে।


১ “কসম” শব্দটির মূল কী?

কুরআনে ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের বিভিন্ন রূপ পাওয়া যায়।

এই মূল থেকে এসেছে তিনটি প্রধান শব্দরূপ:

অতীতকাল (Verb) أَقْسَمَ
আকসামা

সে শপথ করেছিল বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিল।

বর্তমান/ভবিষ্যৎ (Verb) أُقْسِمُ
উকসিমু

আমি শপথ করছি বা আমি শপথ করি।

বিশেষ্য (Noun) قَسَمٌ
কাসামুন

শপথ, অঙ্গীকার বা বণ্টনকৃত অংশ।

প্রচলিত আরবি অভিধানগত ব্যবহারে أَقْسَمَ (আকসামা)-এর অর্থ শপথ করা বা কোনো কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা। মানুষের ক্ষেত্রে কুরআনে এর ব্যবহার খুব স্পষ্ট।

📖 সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৫৩) মানুষের শপথ ও আকসামা

أَهَٰٓؤُلَآءِ ٱلَّذِينَ أَقْسَمُوا۟ بِٱللَّهِ جَهْدَ أَيْمَٰنِهِمْ

A-hā’ulā’illadhīna aqsamū billāhi jahda aymānihim...
“এরা কি তারাই, যারা আল্লাহর নামে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে শপথ করেছিল?”

এখানে أَقْسَمُوا (আকসামূ)-এর সঙ্গে بِاللَّهِ (বিল্লাহ) রয়েছে এবং প্রসঙ্গটি মানুষের শপথের কথা বলছে। অতএব أَقْسَمَ (আকসামা) শব্দটির সঙ্গে “শপথ করা” অর্থের সম্পর্ক কুরআনে অবশ্যই আছে।

💡 কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারণ আল্লাহর বক্তব্যে যে নির্মাণটি বারবার এসেছে তা সাধারণ مثبت (ইতিবাচক) “আকসামা” নয়, বরং তা হলো:
لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) অথবা فَلَا أُقْسِمُ (ফালা উকসিমু)

এখানেই মূল ভাষাতাত্ত্বিক প্রশ্নের সূচনা হয়।


২ لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) আসলে কী বলছে?

لَا (লা) আরবি ভাষায় সাধারণত অস্বীকৃতি বা নাকারা (نَفْي) বোঝায়। যেমন সূরা আল-বাকারাহ ২:২-এ:

সূরা আল-বাকারাহ ২:২ لَا رَيْبَ فِيهِ
Lā rayba fīh
অর্থ: “এতে কোনো সন্দেহ নেই।”

এখানে لَا (লা)-কে বাদ দেওয়া যায় না। এটি সরাসরি বাক্যের মূল অর্থকে ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক করে।

সরাসরি কাঠামোগত সমীকরণ

لَا (লা) = না (অস্বীকৃতি) + أُقْسِمُ (উকসিমু) = আমি শপথ করি ➔ “আমি শপথ করি না”

অথচ প্রচলিত অনুবাদে অনেক জায়গায় لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-কে অনুবাদ করা হয়েছে:

“আমি শপথ করছি...”

অর্থাৎ لَا (লা)-এর স্বাভাবিক নাকারা অর্থটি অনুবাদে রাখা হয়নি! এটি কেন করা হয়েছে?

ঐতিহ্যগত আরবি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এখানে لَا (লা) বিশেষ rhetorical function-এ এসেছে এবং একে কখনো زَائِدَة (যায়িদাহ) বা অর্থগতভাবে অতিরিক্ত particle হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
⚠️ সতর্ক পর্যবেক্ষণ: কিন্তু একটি শব্দকে “অতিরিক্ত” বলা একটি grammatical interpretation বা মানুষের ব্যাখ্যামূলক অনুমান। আরবি মূল আয়াতে শব্দটি যে শারীরিকভাবে উপস্থিত আছে, সেটি একটি সরাসরি অনস্বীকার্য ভাষাগত তথ্য।

৩ সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৮-৩৯-এর ব্যবচ্ছেদ

এখন সরাসরি মূল আয়াতে ফিরে আসি:

📖 সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯:৩৮-৩৯) দৃশ্য ও অদৃশ্য জগৎ

فَلَآ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ ۝ وَمَا لَا تُبْصِرُونَ ۝

Fa-lā uqsimu bimā tubṣirūn. Wa mā lā tubṣirūn.
আরবি অংশ উচ্চারণ শব্দগত অর্থ
فَـ ফা অতএব / ফলে / সুতরাং
لَا লা না (নেতিবাচক/অস্বীকৃতি)
أُقْسِمُ উকসিমু আমি শপথ করি
بِمَا বিমা যা / যা কিছুর দ্বারা
تُبْصِرُونَ তুবসিরূন তোমরা প্রত্যক্ষ করো / দেখতে পাও
وَمَا لَا تُبْصِرُونَ ওয়া মা লা তুবসিরূন এবং যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো না / দেখতে পাও না

এখানে একটি অসাধারণ ও নিখুঁত ভাষাগত সমান্তরালতা (Linguistic Parallelism) রয়েছে:

مَا تُبْصِرُونَ মা তুবসিরূন যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো
مَا لَا تُبْصِرُونَ মা লা তুবসিরূন যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো না

অর্থাৎ কুরআন একই সঙ্গে সৃষ্টির দুটি সামগ্রিক ক্ষেত্রকে সামনে এনেছে: যা প্রত্যক্ষ করা যায় এবং যা প্রত্যক্ষ করা যায় না।

এখন যদি لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-এর لَا (লা)-কে তার স্বাভাবিক নাকারা অর্থে রাখা হয়, তাহলে একটি সতর্ক ও শব্দঘনিষ্ঠ পাঠ দাঁড়ায়:

“অতএব, তোমরা যা প্রত্যক্ষ করো তার শপথ আমি করি না, এবং যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো না তারও নয়।”

এটি প্রচলিত “আমি যা তোমরা দেখতে পাও তার শপথ করছি” এর চেয়ে অর্থগতভাবে সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত ও আলাদা!


৪ “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন” ধারণাটি কোথা থেকে এলো?

প্রচলিত অনুবাদের প্রক্রিয়াটি লক্ষ করলে দেখা যায় কীভাবে অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে:

পদক্ষেপ ০১ (Semantic Shift)
فَلَا أُقْسِمُ ➔ “আমি শপথ করছি”

'লা' (না)-কে অকার্যকর বা বাক্যালংকার ধরে নেওয়া হয়।

➕
পদক্ষেপ ০২ (Object Linking)
بِمَا تُبْصِرُونَ ➔ “যা তোমরা দেখতে পাও”

সৃষ্টির সাথে শপথকে সরাসরি সংযুক্ত করা হয়।

➔
প্রচলিত ফলাফল
“আমি যা তোমরা দেখতে পাও তার শপথ করছি।”

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ semantic step নেওয়া হয়েছে: لَا (লা)-কে অর্থগতভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর ধরা হয়েছে। যদি لَا (লা)-কে স্বাভাবিক অর্থে রাখা হয়, তাহলে বাক্যটি আর “আমি শপথ করছি” থাকে না।

তাই “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেছেন” সরাসরি আরবি শব্দের অনুবাদ নয়। এটি لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-এর একটি বিশেষ grammatical interpretation-এর ফল।


৫ সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:৭৫-৭৭-এর গভীর পর্যালোচনা

কুরআনের আরও একটি অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্যাসেজ হলো সূরা আল-ওয়াকিয়াহ:

📖 সূরা আল-ওয়াকিয়াহ (৫৬:৭৫-৭৭) নক্ষত্র, কাসাম ও সম্মানিত কুরআন
আয়াত ৭৫

فَلَآ أُقْسِمُ بِمَوَٰقِعِ ٱلنُّجُومِ ۝

Fa-lā uqsimu bimawāqi‘in-nujūm
আয়াত ৭৬

وَإِنَّهُۥ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ ۝

Wa innahū laqasamul-law ta‘lamūna ‘aẓīm
আয়াত ৭৭

إِنَّهُۥ لَقُرْءَانٌ كَرِيمٌ ۝

Innahū la-qur’ānun karīm
প্রচলিত অনুবাদ:

“আমি নক্ষত্রসমূহের অবস্থানের শপথ করছি। আর যদি তোমরা জানতে, নিশ্চয়ই এটি এক মহাশপথ। নিশ্চয়ই এটি সম্মানিত কুরআন।”

কিন্তু আবারও প্রথম শব্দটি লক্ষ করুন: فَلَا أُقْسِمُ (ফালা উকসিমু)—এখানে لَا (লা) স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

  • ✦ ৭৬ নং আয়াতে এসেছে: لَقَسَمٌ (লাকাসামুন)—এখানে কাসাম নাউন এসেছে। অর্থাৎ একই প্যাসেজে ক্রিয়া উকসিমু এবং বিশেষ্য কাসাম-এর সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।
  • ✦ কিন্তু ৭৭ নং আয়াতে এসেই বলা হয়েছে: إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ — “নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত কুরআন।”
📌 সিদ্ধান্ত: ৭৫-৭৭ আয়াত তিনটি একসঙ্গে পড়া অপরিহার্য। শুধু ৭৫-কে বিচ্ছিন্ন করে “নক্ষত্রের শপথ” বললে প্যাসেজের পরবর্তী বক্তব্যের সঙ্গে তার সুসংহত সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয় না।

৬ সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:১-৪ আরও বড় প্রশ্ন তোলে

📖 সূরা আল-কিয়ামাহ (৭৫:১-৪) কিয়ামত, নফস ও অস্থির পুনর্গঠন
আয়াত ১

لَآ أُقْسِمُ بِيَوْمِ ٱلْقِيَٰمَةِ ۝

Lā uqsimu bi-yawmil-qiyāmah
আয়াত ২

وَلَآ أُقْسِمُ بِٱلنَّفْسِ ٱللَّوَّامَةِ ۝

Wa lā uqsimu bin-nafsil-lawwāmah
আয়াত ৩

أَيَحْسَبُ ٱلْإِنسَٰنُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُۥ ۝

Ayahsabul-insānu allan najma‘a ‘iẓāmah
অর্থ: “মানুষ কি মনে করে যে আমরা তার অস্থিসমূহ একত্র করব না?”
আয়াত ৪

بَلَىٰ قَٰدِرِينَ عَلَىٰٓ أَن نُّسَوِّىَ بَنَانَهُۥ ۝

Balā qādirīna ‘alā an nusawwiya banānah
অর্থ: “অবশ্যই। আমরা তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।”

এখানে প্রথম দুই আয়াতেই لَا (লা) দুবার এসেছে: لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) এবং وَلَا أُقْسِمُ (ওয়া লা উকসিমু)।

যদি দুটোকেই সরাসরি নাকারা হিসেবে পড়ি:

“আমি কিয়ামতের দিনের শপথ করি না, এবং অনুযোগশীল নফসেরও শপথ করি না।”
শব্দমূল বিশ্লেষণ ٱللَّوَّامَةِ (আল-লাওয়ামাহ)

এর মূল হলো ل و م (লাম-ওয়াও-মীম)। এই মূলের অর্থক্ষেত্রে রয়েছে নিন্দা, অনুযোগ, ভর্ৎসনা, দোষারোপ ইত্যাদি। কিন্তু আয়াতটি নিজে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে না।

💡 তাই প্রচলিত “তিরস্কারকারী নফস / আত্মা”-র পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অনুবাদ হলো: “অনুযোগশীল নফস”। এখানে নফস (نَفْس)-কেও কোনো অলৌকিক metaphysical সত্তা হিসেবে সরাসরি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে لَا (লা)-কে rhetorical particle ধরে নিলে অর্থ দাঁড়ায়: “আমি কিয়ামতের দিনের শপথ করছি। আমি অনুযোগশীল নফসের শপথ করছি।”

দুটি পাঠের মধ্যে ব্যবধান পর্বতপ্রমাণ। তাই 'লা'-এর প্রকৃত ব্যাকরণগত ভূমিকা বিবেচনা না করে প্রচলিত অনুবাদকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া সমীচীন নয়।


৭ সূরা আল-মা‘আরিজ ৭০:৪০-৪১ বিষয়টি পরিষ্কার করে দেয়

এবার সেই আয়াতটি দেখি যা আলোচনাটিকে শতভাগ স্বচ্ছ করে দেয়:

📖 সূরা আল-মা‘আরিজ (৭০:৪০-৪১) উদয় ও অস্তের রব

فَلَآ أُقْسِمُ بِرَبِّ ٱلْمَشَٰرِقِ وَٱلْمَغَٰرِبِ إِنَّا لَقَٰدِرُونَ ۝

Fa-lā uqsimu birabbil-mashāriqi wal-maghāribi innā laqādirūn.
فَـ অতএব
لَا না
أُقْسِمُ আমি শপথ করি
بِرَبِّ রবের দ্বারা / রবের শপথ
ٱلْمَشَٰرِقِ উদয়স্থানসমূহ
وَٱلْمَغَٰرِبِ এবং অস্তস্থানসমূহ
إِنَّا নিশ্চয়ই আমরা
لَقَٰدِرُونَ অবশ্যই সক্ষম
🔍 লক্ষণীয় ভাষাগত সত্য: এখানে “কসম” নামে কোনো বিশেষ্য (Noun) নেই। আছে أُقْسِمُ (উকসিমু) = একটি ক্রিয়া, এবং তার ঠিক পূর্বে রয়েছে لَا (লা)।
সরাসরি পাঠ: “অতএব, আমি পূর্বসমূহ ও পশ্চিমসমূহের রবের শপথ করি না... নিশ্চয়ই আমরা সক্ষম।”

প্রচলিত অনুবাদ অবশ্য এটিকে “আমি পূর্ব ও পশ্চিমসমূহের রবের শপথ করছি” করেছে, কিন্তু এখানেও لَا (লা)-কে সম্পূর্ণ অর্থহীন ও নীরব ধরে নেওয়া হয়েছে।


৮ কুরআনে কি “أَقْسَمَ (আকসামা)” অবশ্যই শপথ বোঝায়?

না, বিষয়টিকে এত সরলীকরণ করা যায় না। কারণ ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের অন্যান্য রূপগুলোতে বিভাজন, অংশ নির্ধারণ বা তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ধারণের ধারণাও পাওয়া যায়।

সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩) وَأَن تَسْتَقْسِمُوا۟ بِٱلْأَزْلَٰمِ
Wa an tastaqsimū bil-azlām
এখানে تَسْتَقْسِمُوا (তাসতাকসিমূ)-কে “শপথ করা” অনুবাদ করা যায় না; এখানে তীরের মাধ্যমে ভাগ্যবণ্টন বা ভাগ্য নির্ধারণের প্রাচীন আরব পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলটির অর্থজগৎ (Semantic Field) কেবল একটি সংকীর্ণ “শপথ” শব্দের ভেতর আবদ্ধ নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে আকসামা-র শপথের অর্থ নেই—মানুষের ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট। মূল প্রশ্ন হলো:

“لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) নির্মাণে এই ক্রিয়াটি ঠিক কী ধরনের rhetorical function পালন করছে?”

৯ “لَا (লা)”কে অতিরিক্ত বলা কি বাধ্যতামূলক?

না, এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। এটি প্রাচীন ব্যাকরণবিদদের একটি বিশেষ মতমাত্র। ক্লাসিক্যাল আরবি ব্যাখ্যার ধারায় লা উকসিমু নিয়ে বহু মতভেদ রয়েছে। কেউ লা-কে অতিরিক্ত বলেছেন, আবার কেউ এটিকে মূল অস্বীকৃতির অর্থে বহাল রেখেছেন।

আমাদের নিরপেক্ষ গবেষণার ৫টি পদ্ধতিগত স্তর:

১ প্রথমে আরবি শব্দটিকে সরাসরি স্বীকার করা (টেক্সটকে অগ্রাহ্য না করা)।
২ শব্দটির স্বাভাবিক ও স্বভাবসিদ্ধ অর্থ (নাকারা/না) পরীক্ষা করা।
৩ একই ধরনের বাক্যগঠনের অন্যান্য কুরআনিক ব্যবহারের সাথে তুলনা করা।
৪ পুরো প্যাসেজের পূর্বাপর প্রসঙ্গ (Socio-Linguistic Context) অনুধাবন করা।
৫ সামগ্রিক কুরআনের কেন্দ্রীয় তাওহীদ ও স্রষ্টা-সৃষ্টির দূরত্বের সাথে সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা।

শুরুতেই “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন” এই পূর্বধারণা মাথায় নিয়ে لَا (লা)-কে অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টা কোনো সৎ ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি হতে পারে না।


১০ ৬৯:৪০-৪৩-এ আসলে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?

সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৮-৩৯-এর পরপরই আয়াতগুলোর বক্তব্য লক্ষ করুন:

আয়াত ৪০

إِنَّهُۥ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ ۝

“নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত রাসূলের বক্তব্য।”
আয়াত ৪১

وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ ۝

“এবং এটি কোনো কবির বক্তব্য নয়; তোমরা খুব অল্পই বিশ্বাস করো।”
আয়াত ৪২

وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ ۝

“এবং কোনো গণক বা কাহিনের বক্তব্যও নয়; তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ করো।”
আয়াত ৪৩

تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ ۝

“এটি সৃষ্টিজগতসমূহের রবের পক্ষ থেকে অবতারণ।”

প্যাসেজের চিন্তার ক্রমধারা:

ধাপ ১ যা প্রত্যক্ষ করো ও যা প্রত্যক্ষ করো না
ধাপ ২ বক্তব্যটির প্রকৃত স্বরূপ
ধাপ ৩ কবির নয়, কাহিনের নয়
ধাপ ৪ রব্বুল আলামীনের ওহী

অতএব ৬৯:৩৮-৪৩-এর পুরো প্যাসেজের কেন্দ্রবিন্দু কেবল কোনো বস্তুর কসম খাওয়া নয়। বরং বক্তব্যটির ঐশী উৎস, এর প্রকৃতি এবং মহাসত্যতা।


১১ তাহলে “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করেন” কথাটি কতটা নিশ্চিত?

এই গবেষণায় তিনটি স্পষ্ট স্তরকে আলাদাভাবে দেখতে হবে:

স্তর ০১: সরাসরি পর্যবেক্ষণ
لَا أُقْسِمُ / فَلَا أُقْسِمُ

এটি সরাসরি কুরআনের আরবি পাঠ। এখানে 'না' (لَا) দ্ব্যর্থহীনভাবে উপস্থিত।

স্তর ০২: প্রচলিত ব্যাখ্যা
“আমি শপথ করছি”

'লা' কে অলংকারিক ধরে ইতিবাচক শপথ অনুবাদ। ফলস্বরূপ দাবি ওঠে: “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন”।

স্তর ০৩: বিকল্প ভাষাতাত্ত্বিক পাঠ
“আমি শপথ করি না”

'লা'-এর স্বভাবসিদ্ধ অস্বীকৃতি বহাল। তখন স্রষ্টার সৃষ্টির শপথ করার ধারণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।


১২ ৬৯:৩৮-৩৯-এর একটি সতর্ক অনুবাদ

فَلَآ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ ۝ وَمَا لَا تُبْصِرُونَ ۝

Fa-lā uqsimu bimā tubṣirūn. Wa mā lā tubṣirūn.
“অতএব, তোমরা যা প্রত্যক্ষ করো তার শপথ আমি করি না, এবং যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো না তারও নয়।”

তবে এটিকে একমাত্র চূড়ান্ত অনুবাদ বলা এখনই যুক্তিসঙ্গত হবে না; কারণ লা উকসিমু-র rhetorical function নিয়ে আরবি ব্যাকরণে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু অন্তত একটি ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত:

“আমি যা দেখতে পাই তার শপথ করছি” বা “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করছেন”—এটি আরবি মূলের অবিকল অনুবাদ নয়। এটি একান্তই একটি ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ (Interpretive Translation)।

১৩ কুরআনের সঙ্গে কুরআনের বিচার

কুরআন নিজেই পাঠকদের চিন্তার গভীরতায় প্রবেশের আহ্বান জানায়:

সূরা মুহাম্মাদ (৪৭:২৪) أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلْقُرْءَانَ
A-falā yatadabbarūnal-qur’ān

“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?”

সূরা আন-নিসা (৪:৮২) وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُوا۟ فِيهِ ٱخْتِلَٰفًا كَثِيرًا
Wa law kāna min ‘indi ghayrillāhi la-wajadū fīhikh-tilāfan kathīrā

“আর এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অবশ্যই বহু অসঙ্গতি পেত।”

এই কুরআনিক মূলনীতির আলোকে কোনো একটি আয়াতের প্রচলিত অনুবাদকে অন্ধভাবে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার পরিবর্তে একই শব্দের অন্যান্য ব্যবহার, বাক্যগঠন এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রত্যেক সত্যান্বেষী পাঠকের কর্তব্য।


১৪ শেষ কথা

কুরআনে ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের সঙ্গে শপথের অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে أَقْسَمُوا (আকসামূ)-এর ব্যবহার তার দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ। কিন্তু আল্লাহর বক্তব্যে বারবার যে বিশেষ নির্মাণটি এসেছে:

لَا أُقْسِمُ ও فَلَا أُقْسِمُ

সেখানে لَا (লা)-কে উপেক্ষা করে সরাসরি “আমি শপথ করছি” অনুবাদ করা একটি বিশেষ ব্যাকরণগত মত (Grammatical Interpretation)। আর সেই ব্যাখ্যার ফলেই জন্ম নেয় বহুল প্রচলিত বিশ্বাস: “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেছেন।”

💡 গবেষণার মূল নির্যাস

কুরআন সরাসরি কোথাও বলেনি, “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেন।”

বরং কুরআনের বহু জায়গায় আমরা পাই لَا أُقْسِمُ অথবা فَلَا أُقْسِمُ। সুতরাং অনুবাদের আগে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত:

“'লা' (لَا) কি সত্যিই ‘না’, নাকি এখানে বিশেষ অলংকারিক অর্থে ব্যবহৃত?”

এই প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা না করে “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করেন” কথাটিকে ধ্রুব কুরআনিক সত্য হিসেবে প্রচার করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সতর্ক অবস্থান নয়। কুরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে অনুবাদকে মানদণ্ড না বানিয়ে কুরআনের মূল আরবি ভাষা, বাক্যগঠন, প্রেক্ষাপট এবং কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যকেই মানদণ্ড করা অপরিহার্য।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।