“কুরআনের কিছু আয়াতের প্রচলিত অনুবাদ পড়লে মনে হয়, আল্লাহ তাঁর নিজের সৃষ্টির বিভিন্ন বস্তুর কসম করেছেন। কোথাও নক্ষত্রের অবস্থান, কোথাও কিয়ামতের দিন, কোথাও নফস, কোথাও নগর, কোথাও পূর্ব ও পশ্চিমের রবের কসম করার কথা বলা হয়েছে।”
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়:
আল্লাহ কি সত্যিই তাঁর নিজের সৃষ্টির কসম করেন?
স্রষ্টা কি তাঁর নিজের সত্যতা প্রমাণে তাঁরই সৃষ্ট কোনো নশ্বর বস্তুকে সাক্ষী বা শপথের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করেন?
নাকি আরবি لَا أُقْسِمُ ও فَلَا أُقْسِمُ-এর অনুবাদে কেবল একটি অনুমান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
যা আরবি বাক্যটির একমাত্র সম্ভাব্য অর্থ নয়, বরং ব্যাকরণবিদদের একটি বিশেষ ব্যাখ্যামূলক মত মাত্র।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রচলিত অনুবাদ দিয়ে শুরু না করে কুরআনের আরবি ভাষার দিকে ফিরে যেতে হবে।
১ “কসম” শব্দটির মূল কী?
কুরআনে ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের বিভিন্ন রূপ পাওয়া যায়।
এই মূল থেকে এসেছে তিনটি প্রধান শব্দরূপ:
সে শপথ করেছিল বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিল।
আমি শপথ করছি বা আমি শপথ করি।
শপথ, অঙ্গীকার বা বণ্টনকৃত অংশ।
প্রচলিত আরবি অভিধানগত ব্যবহারে أَقْسَمَ (আকসামা)-এর অর্থ শপথ করা বা কোনো কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করা। মানুষের ক্ষেত্রে কুরআনে এর ব্যবহার খুব স্পষ্ট।
أَهَٰٓؤُلَآءِ ٱلَّذِينَ أَقْسَمُوا۟ بِٱللَّهِ جَهْدَ أَيْمَٰنِهِمْ
এখানে أَقْسَمُوا (আকসামূ)-এর সঙ্গে بِاللَّهِ (বিল্লাহ) রয়েছে এবং প্রসঙ্গটি মানুষের শপথের কথা বলছে। অতএব أَقْسَمَ (আকসামা) শব্দটির সঙ্গে “শপথ করা” অর্থের সম্পর্ক কুরআনে অবশ্যই আছে।
এখানেই মূল ভাষাতাত্ত্বিক প্রশ্নের সূচনা হয়।
২ لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) আসলে কী বলছে?
لَا (লা) আরবি ভাষায় সাধারণত অস্বীকৃতি বা নাকারা (نَفْي) বোঝায়। যেমন সূরা আল-বাকারাহ ২:২-এ:
এখানে لَا (লা)-কে বাদ দেওয়া যায় না। এটি সরাসরি বাক্যের মূল অর্থকে ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক করে।
সরাসরি কাঠামোগত সমীকরণ
অথচ প্রচলিত অনুবাদে অনেক জায়গায় لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-কে অনুবাদ করা হয়েছে:
অর্থাৎ لَا (লা)-এর স্বাভাবিক নাকারা অর্থটি অনুবাদে রাখা হয়নি! এটি কেন করা হয়েছে?
৩ সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৮-৩৯-এর ব্যবচ্ছেদ
এখন সরাসরি মূল আয়াতে ফিরে আসি:
فَلَآ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ وَمَا لَا تُبْصِرُونَ
| আরবি অংশ | উচ্চারণ | শব্দগত অর্থ |
|---|---|---|
| فَـ | ফা | অতএব / ফলে / সুতরাং |
| لَا | লা | না (নেতিবাচক/অস্বীকৃতি) |
| أُقْسِمُ | উকসিমু | আমি শপথ করি |
| بِمَا | বিমা | যা / যা কিছুর দ্বারা |
| تُبْصِرُونَ | তুবসিরূন | তোমরা প্রত্যক্ষ করো / দেখতে পাও |
| وَمَا لَا تُبْصِرُونَ | ওয়া মা লা তুবসিরূন | এবং যা তোমরা প্রত্যক্ষ করো না / দেখতে পাও না |
এখানে একটি অসাধারণ ও নিখুঁত ভাষাগত সমান্তরালতা (Linguistic Parallelism) রয়েছে:
অর্থাৎ কুরআন একই সঙ্গে সৃষ্টির দুটি সামগ্রিক ক্ষেত্রকে সামনে এনেছে: যা প্রত্যক্ষ করা যায় এবং যা প্রত্যক্ষ করা যায় না।
এখন যদি لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-এর لَا (লা)-কে তার স্বাভাবিক নাকারা অর্থে রাখা হয়, তাহলে একটি সতর্ক ও শব্দঘনিষ্ঠ পাঠ দাঁড়ায়:
এটি প্রচলিত “আমি যা তোমরা দেখতে পাও তার শপথ করছি” এর চেয়ে অর্থগতভাবে সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত ও আলাদা!
৪ “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন” ধারণাটি কোথা থেকে এলো?
প্রচলিত অনুবাদের প্রক্রিয়াটি লক্ষ করলে দেখা যায় কীভাবে অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে:
'লা' (না)-কে অকার্যকর বা বাক্যালংকার ধরে নেওয়া হয়।
সৃষ্টির সাথে শপথকে সরাসরি সংযুক্ত করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ semantic step নেওয়া হয়েছে: لَا (লা)-কে অর্থগতভাবে সম্পূর্ণ অকার্যকর ধরা হয়েছে। যদি لَا (লা)-কে স্বাভাবিক অর্থে রাখা হয়, তাহলে বাক্যটি আর “আমি শপথ করছি” থাকে না।
তাই “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেছেন” সরাসরি আরবি শব্দের অনুবাদ নয়। এটি لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু)-এর একটি বিশেষ grammatical interpretation-এর ফল।
৫ সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:৭৫-৭৭-এর গভীর পর্যালোচনা
কুরআনের আরও একটি অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্যাসেজ হলো সূরা আল-ওয়াকিয়াহ:
فَلَآ أُقْسِمُ بِمَوَٰقِعِ ٱلنُّجُومِ
وَإِنَّهُۥ لَقَسَمٌ لَّوْ تَعْلَمُونَ عَظِيمٌ
إِنَّهُۥ لَقُرْءَانٌ كَرِيمٌ
“আমি নক্ষত্রসমূহের অবস্থানের শপথ করছি। আর যদি তোমরা জানতে, নিশ্চয়ই এটি এক মহাশপথ। নিশ্চয়ই এটি সম্মানিত কুরআন।”
কিন্তু আবারও প্রথম শব্দটি লক্ষ করুন: فَلَا أُقْسِمُ (ফালা উকসিমু)—এখানে لَا (লা) স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।
- ✦ ৭৬ নং আয়াতে এসেছে: لَقَسَمٌ (লাকাসামুন)—এখানে কাসাম নাউন এসেছে। অর্থাৎ একই প্যাসেজে ক্রিয়া উকসিমু এবং বিশেষ্য কাসাম-এর সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।
- ✦ কিন্তু ৭৭ নং আয়াতে এসেই বলা হয়েছে: إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ — “নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত কুরআন।”
৬ সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:১-৪ আরও বড় প্রশ্ন তোলে
لَآ أُقْسِمُ بِيَوْمِ ٱلْقِيَٰمَةِ
وَلَآ أُقْسِمُ بِٱلنَّفْسِ ٱللَّوَّامَةِ
أَيَحْسَبُ ٱلْإِنسَٰنُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُۥ
بَلَىٰ قَٰدِرِينَ عَلَىٰٓ أَن نُّسَوِّىَ بَنَانَهُۥ
এখানে প্রথম দুই আয়াতেই لَا (লা) দুবার এসেছে: لَا أُقْسِمُ (লা উকসিমু) এবং وَلَا أُقْسِمُ (ওয়া লা উকসিমু)।
যদি দুটোকেই সরাসরি নাকারা হিসেবে পড়ি:
এর মূল হলো ل و م (লাম-ওয়াও-মীম)। এই মূলের অর্থক্ষেত্রে রয়েছে নিন্দা, অনুযোগ, ভর্ৎসনা, দোষারোপ ইত্যাদি। কিন্তু আয়াতটি নিজে এটিকে কোনো নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে না।
অন্যদিকে لَا (লা)-কে rhetorical particle ধরে নিলে অর্থ দাঁড়ায়: “আমি কিয়ামতের দিনের শপথ করছি। আমি অনুযোগশীল নফসের শপথ করছি।”
দুটি পাঠের মধ্যে ব্যবধান পর্বতপ্রমাণ। তাই 'লা'-এর প্রকৃত ব্যাকরণগত ভূমিকা বিবেচনা না করে প্রচলিত অনুবাদকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া সমীচীন নয়।
৭ সূরা আল-মা‘আরিজ ৭০:৪০-৪১ বিষয়টি পরিষ্কার করে দেয়
এবার সেই আয়াতটি দেখি যা আলোচনাটিকে শতভাগ স্বচ্ছ করে দেয়:
فَلَآ أُقْسِمُ بِرَبِّ ٱلْمَشَٰرِقِ وَٱلْمَغَٰرِبِ إِنَّا لَقَٰدِرُونَ
প্রচলিত অনুবাদ অবশ্য এটিকে “আমি পূর্ব ও পশ্চিমসমূহের রবের শপথ করছি” করেছে, কিন্তু এখানেও لَا (লা)-কে সম্পূর্ণ অর্থহীন ও নীরব ধরে নেওয়া হয়েছে।
৮ কুরআনে কি “أَقْسَمَ (আকসামা)” অবশ্যই শপথ বোঝায়?
না, বিষয়টিকে এত সরলীকরণ করা যায় না। কারণ ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের অন্যান্য রূপগুলোতে বিভাজন, অংশ নির্ধারণ বা তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ধারণের ধারণাও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলটির অর্থজগৎ (Semantic Field) কেবল একটি সংকীর্ণ “শপথ” শব্দের ভেতর আবদ্ধ নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে আকসামা-র শপথের অর্থ নেই—মানুষের ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট। মূল প্রশ্ন হলো:
৯ “لَا (লা)”কে অতিরিক্ত বলা কি বাধ্যতামূলক?
না, এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। এটি প্রাচীন ব্যাকরণবিদদের একটি বিশেষ মতমাত্র। ক্লাসিক্যাল আরবি ব্যাখ্যার ধারায় লা উকসিমু নিয়ে বহু মতভেদ রয়েছে। কেউ লা-কে অতিরিক্ত বলেছেন, আবার কেউ এটিকে মূল অস্বীকৃতির অর্থে বহাল রেখেছেন।
আমাদের নিরপেক্ষ গবেষণার ৫টি পদ্ধতিগত স্তর:
শুরুতেই “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন” এই পূর্বধারণা মাথায় নিয়ে لَا (লা)-কে অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টা কোনো সৎ ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি হতে পারে না।
১০ ৬৯:৪০-৪৩-এ আসলে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?
সূরা আল-হাক্কাহ ৬৯:৩৮-৩৯-এর পরপরই আয়াতগুলোর বক্তব্য লক্ষ করুন:
إِنَّهُۥ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ
প্যাসেজের চিন্তার ক্রমধারা:
অতএব ৬৯:৩৮-৪৩-এর পুরো প্যাসেজের কেন্দ্রবিন্দু কেবল কোনো বস্তুর কসম খাওয়া নয়। বরং বক্তব্যটির ঐশী উৎস, এর প্রকৃতি এবং মহাসত্যতা।
১১ তাহলে “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করেন” কথাটি কতটা নিশ্চিত?
এই গবেষণায় তিনটি স্পষ্ট স্তরকে আলাদাভাবে দেখতে হবে:
এটি সরাসরি কুরআনের আরবি পাঠ। এখানে 'না' (لَا) দ্ব্যর্থহীনভাবে উপস্থিত।
'লা' কে অলংকারিক ধরে ইতিবাচক শপথ অনুবাদ। ফলস্বরূপ দাবি ওঠে: “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করছেন”।
'লা'-এর স্বভাবসিদ্ধ অস্বীকৃতি বহাল। তখন স্রষ্টার সৃষ্টির শপথ করার ধারণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
১২ ৬৯:৩৮-৩৯-এর একটি সতর্ক অনুবাদ
فَلَآ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ وَمَا لَا تُبْصِرُونَ
তবে এটিকে একমাত্র চূড়ান্ত অনুবাদ বলা এখনই যুক্তিসঙ্গত হবে না; কারণ লা উকসিমু-র rhetorical function নিয়ে আরবি ব্যাকরণে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু অন্তত একটি ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত:
১৩ কুরআনের সঙ্গে কুরআনের বিচার
কুরআন নিজেই পাঠকদের চিন্তার গভীরতায় প্রবেশের আহ্বান জানায়:
“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?”
“আর এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অবশ্যই বহু অসঙ্গতি পেত।”
এই কুরআনিক মূলনীতির আলোকে কোনো একটি আয়াতের প্রচলিত অনুবাদকে অন্ধভাবে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার পরিবর্তে একই শব্দের অন্যান্য ব্যবহার, বাক্যগঠন এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রত্যেক সত্যান্বেষী পাঠকের কর্তব্য।
১৪ শেষ কথা
কুরআনে ق س م (ক্বাফ-সীন-মীম) মূলের সঙ্গে শপথের অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে أَقْسَمُوا (আকসামূ)-এর ব্যবহার তার দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ। কিন্তু আল্লাহর বক্তব্যে বারবার যে বিশেষ নির্মাণটি এসেছে:
সেখানে لَا (লা)-কে উপেক্ষা করে সরাসরি “আমি শপথ করছি” অনুবাদ করা একটি বিশেষ ব্যাকরণগত মত (Grammatical Interpretation)। আর সেই ব্যাখ্যার ফলেই জন্ম নেয় বহুল প্রচলিত বিশ্বাস: “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেছেন।”
কুরআন সরাসরি কোথাও বলেনি, “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কসম করেন।”
বরং কুরআনের বহু জায়গায় আমরা পাই لَا أُقْسِمُ অথবা فَلَا أُقْسِمُ। সুতরাং অনুবাদের আগে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত:
এই প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা না করে “আল্লাহ সৃষ্টির কসম করেন” কথাটিকে ধ্রুব কুরআনিক সত্য হিসেবে প্রচার করা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সতর্ক অবস্থান নয়। কুরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে অনুবাদকে মানদণ্ড না বানিয়ে কুরআনের মূল আরবি ভাষা, বাক্যগঠন, প্রেক্ষাপট এবং কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যকেই মানদণ্ড করা অপরিহার্য।

