“মানুষের পরিচয় অনেকভাবে তৈরি হয়। কেউ নিজেকে কোনো মতবাদ, কোনো গোষ্ঠী, কোনো মাজহাব বা কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করে পরিচিত করেন। কিন্তু আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য কোন পরিচয় নির্ধারণ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মানুষের তৈরি পরিচয়ের তালিকার দিকে নয়, সরাসরি কুরআনের দিকে তাকাতে হয়। কুরআনে যে পরিচয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার এসেছে, তা হলো ‘মুসলিম’—একমাত্র আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী।”
মানুষের সমাজব্যবস্থায় পরিচয়ের সংকট এক চিরন্তন সংকট। ইতিহাসের পরতে পরতে মানুষ নিজেদের বিভক্ত করেছে ভৌগোলিক সীমারেখায়, বংশপরম্পরায়, সাংস্কৃতিক বলয়ে এবং ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করে তৈরি করা নানা ফিরকা ও উপদলে। অথচ সৃষ্টিজগতের পরম মালিক, বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর অবতীর্ণ কিতাবে মানুষের জন্য এক সার্বজনীন, চিরকালীন ও নিষ্কলুষ পরিচয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে পরিচয় কোনো বংশের নয়, কোনো আঞ্চলিক গোষ্ঠীর নয়, কোনো মানুষের তৈরি মাজহাব বা ফিরকারও নয়; সে পরিচয় হলো—‘মুসলিম’ (আল্লাহর সার্বভৌম বিধানের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকারী)।
১ মুসলিম শব্দের অর্থ কী? শব্দমূল س ل م-এর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
‘মুসলিম’ শব্দটি কোনো পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা ধর্মীয় রাজনৈতিক লেবেল বা বংশগত উপাধি নয়। আরবি ভাষাতত্ত্বের মানদণ্ডে শব্দটি এসেছে ত্রি-বর্ণবিশিষ্ট মূলধাতু س ل م (সীন-লাম-মীম / sa-li-ma) থেকে।
এই মূলধাতুর গভীরে রয়েছে নিরাপত্তা, ত্রুটিমুক্ত থাকা, অক্ষত থাকা, শান্তি এবং নিজের ইচ্ছাকে পরম কর্তৃপক্ষের কাছে সমর্পণ করার অবিচ্ছেদ্য ধারণা। এই মূল থেকে أَسْلَمَ (আস্লামা) ক্রিয়াটি গঠিত, যার মৌলিক অর্থ নিজেকে সঁপে দেওয়া, আনুগত্যে মাথা নত করা বা আত্মসমর্পণ করা। আর ব্যাকরণগতভাবে مُسْلِم (মুসলিম) হলো সেই ব্যক্তির পরিচয়—যে স্রষ্টার বিধানের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে।
📊 সারণি ১: শব্দমূল س ل م (S-L-M)-এর ভাষাতাত্ত্বিক রূপ ও কুরআনিক প্রয়োগ
শব্দমূল ম্যাট্রিক্স| শব্দের রূপ | ব্যাকরণগত শ্রেণি | মৌলিক ভাষাগত অর্থ | কুরআনিক প্রয়োগ ও তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| سَلِمَ (salima) | অকর্মক ক্রিয়া (মৌলিক ধাতু) | নিরাপদ থাকা, কলুষমুক্ত হওয়া, অক্ষত থাকা | ‘কলবুন সালীম’—শিরক ও ব্যাধিমুক্ত নির্মল অন্তঃকরণ (সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:৮৯)। |
| أَسْلَمَ (aslama) | বাব ইফ‘আল (সকর্মক রূপ) | আত্মসমর্পণ করা, নিজের স্বাধীনতা আল্লাহর অধীনে সঁপে দেওয়া | ‘আসলামতু লিরব্বিল আলামীন’—ইবরাহীমের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ (সূরা আল-বাকারা ২:১৩১)। |
| إِسْلَام (islām) | ক্রিয়া-বিশেষ্য (মাসদার) | আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ | ‘ইন্নাদ দীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম’—আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দীন (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯)। |
| مُسْلِم (muslim) | কর্তাবাচক বিশেষ্য (ইসম ফা‘ইল) | যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও পূর্ণ সচেতনতায় আত্মসমর্পণ করে | ‘মুসলিমীন’ / ‘মুসলিমূন’—বিশ্বাসীদের চিরন্তন কুরআনিক পরিচয় (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৮)। |
| سَلَام (salām) | বিশেষ্য | শান্তি, নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণ | জান্নাতীদের সম্ভাষণ এবং আল্লাহর অন্যতম পবিত্র নাম ‘আস-সালাম’ (সূরা আল-হাশর ৫৯:২৩)। |
অতএব কুরআনিক ব্যবহারে ‘মুসলিম’ কোনো পরবর্তী দলীয় পরিচয়ের নাম নয়। এটি আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী মানুষের অস্তিত্বশীল পরিচয়। কুরআন এই পরিচয়কে কীভাবে উপস্থাপন করেছে, তা আয়াতগুলো পাশাপাশি রাখলেই বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণই পরিচয়: সূরা আলে ইমরান ৩:৬৪
আহলে কিতাবদের সঙ্গে সংলাপের ক্ষেত্রে এবং সার্বজনীন তাওহীদের ঘোষণার ক্ষেত্রে আল্লাহ মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজেদের সুস্পষ্ট পরিচয় জানিয়ে দেওয়ার জন্য। সূরা আলে ইমরান ৩:৬৪-এ আল্লাহ বলেন:
فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
“তোমরা বলো, ‘সাক্ষী থাকো, আমরা মুসলিম (আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী)।’”
এখানে مُسْلِمُونَ (মুসলিমূন) হলো مُسْلِم (মুসলিম)-এর বহুবচন। অর্থাৎ পরিচয়টি হচ্ছে আত্মসমর্পণকারীদের পরিচয়।
এটি কোনো বিশেষ ব্যক্তির নাম নয়, কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উপজাতির নামও নয়। বরং আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণের অবস্থাকে নির্দেশ করে।
৩ নবী মুহাম্মদ-এর নিজের পরিচয়: প্রথম আত্মসমর্পণকারী
নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যে পরিচয় ধারণ করার সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কুরআন তা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
“বলুন, নিশ্চয় আমার সালাত, আমার নিবেদন, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর অধীন। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর এভাবেই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।”
এখানে أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ (আওয়ালুল মুসলিমীন) বাক্যংশটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। أَوَّل (আওয়াল) অর্থ প্রথম, আর مُسْلِمِينَ (মুসলিমীন) অর্থ আত্মসমর্পণকারীগণ।
অর্থাৎ নবীকে এমন কোনো নতুন দলীয় পরিচয় গ্রহণের কথা বলা হয়নি যার নাম তাঁর নিজের সঙ্গে বা অন্য কোনো ঐতিহাসিক উপদলের সঙ্গে যুক্ত হবে। বরং তাঁর নিজের পরিচয়ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারীর পরিচয়।
একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করে সূরা আয-যুমারে ঘোষণা করা হয়েছে:
وَأُمِرْتُ لِأَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“আর আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হই।”
এখানে مِنَ الْمُسْلِمِينَ (মিনাল মুসলিমীন) অর্থ মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত—অর্থাৎ চিরন্তন আত্মসমর্পণকারীদের মহামিছিলে শামিল থাকা।
৪ এই পরিচয় শুধু মুহাম্মদের জন্য নয়: ইবরাহীম (আ.)-এর মূলধারা
কুরআনে ‘মুসলিম’ পরিচয়কে কোনো অবস্থাতেই কেবল শেষ নবীর অনুসারীদের জন্য সীমাবদ্ধ একটি ভৌগোলিক বা সমসাময়িক পরিচয়ে আবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং অতীত যুগের সমস্ত নবী, তাঁদের অনুসারী এবং এক আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী পুণ্যবানদের ক্ষেত্রেও এই একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
তাওহীদের মূল পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত এক চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে লক্ষ্য করুন:
إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ ۖ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
“যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁকে বললেন, ‘আত্মসমর্পণ করো।’ তিনি বললেন, ‘আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।’”
এখানে একই শব্দমূলের দুটি রূপ পাশাপাশি এসে মূল তত্ত্বকে সুস্পষ্ট করেছে:
আর সেই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পরিচয়ই পরবর্তী আয়াতগুলোতে مُسْلِم (মুসলিম) শব্দের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে।
৫ ইয়াকুব ও তাঁর সন্তানদের পরিচয়: মৃত্যুকালীন অসিয়ত
ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হলেন, তখন তিনি তাঁর বংশধরদের কোনো বিশেষ উপজাতীয় বা বর্ণবাদী লেবেলে আবদ্ধ করেননি। কুরআন সেই দৃশ্যকে এভাবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে:
أَمْ كُنتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِن بَعْدِي ۖ قَالُوا نَعْبُدُ إِلَٰهَكَ وَإِلَٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
“তোমরা কি উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের কাছে মৃত্যু উপস্থিত হয়েছিল? যখন তিনি তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, ‘আমার পরে তোমরা কিসের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে?’ তারা বলেছিল, ‘আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহের প্রতি দায়বদ্ধ থাকব, এক ইলাহের প্রতি; আর আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।’”
এখানে আবারও ধ্বনিত হয়েছে সেই অমোঘ বাক্য: وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ (ওয়া নাহনু লাহু মুসলিমূন) — “আর আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।” অর্থাৎ আত্মসমর্পণের পরিচয়টি কোনো একটি নির্দিষ্ট যুগের বা কোনো বিশেষ রক্তধারার মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল না; বরং এটি এক আল্লাহর বিশ্বাসীদের চিরন্তন ঐক্যসূত্র।
৬ ঈসার অনুসারীরাও নিজেদের ‘মুসলিম’ বলেছে
ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অনুসারী হাওয়ারীগণ যখন সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তখন তাঁরা কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক লেবেল আঁকড়ে ধরেননি। আল্লাহ বলেন:
فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَىٰ مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ ۖ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
“অতঃপর ঈসা যখন তাদের মধ্যে অস্বীকার ও কুফরির ভাব প্রত্যক্ষ করলেন, তখন বললেন, ‘আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী কে?’ হাওয়ারীগণ বলল, ‘আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আর আপনি সাক্ষী থাকুন যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।’”
এখানেও مُسْلِمُونَ (মুসলিমূন) পরিচয়টি আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের স্মারক হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে।
৭ আল্লাহ নিজেই এই নামের ঘোষণা দিয়েছেন: সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৮
কুরআনে মানবজাতির পরিচয়ের প্রশ্নে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা এসেছে সূরা আল-হাজ্জে। আল্লাহ বলেন:
هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ ۚ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَٰذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ
“তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি। এটি তোমাদের পিতা ইবরাহীমের আদর্শ। তিনিই পূর্বে তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ এবং এই কিতাবেও; যাতে রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হন এবং তোমরা সাক্ষী হও মানবজাতির ওপর।”
এই আয়াতে অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি শব্দভাণ্ডার লক্ষ্যণীয়:
আয়াতটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য নির্ধারিত একমাত্র বৈধ নাম হলো ‘মুসলিম’।
📜 সারণি ২: নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদের অভিন্ন ‘মুসলিম’ পরিচয় (ঐতিহাসিক মেলবন্ধন)
ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা| ব্যক্তিত্ব / প্রজন্ম | কুরআনের সূত্র | কুরআনিক অভিব্যক্তি | ঘোষিত পরিচয়ের তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| ইবরাহীম (আ.) | সূরা আল-বাকারা ২:১৩১ | أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ | কোনো সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি নয়; সরাসরি বিশ্বজাহানের রবের কাছে আত্মসমর্পণ। |
| ইয়াকুব (আ.) ও সন্তানগণ | সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩ | وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ | বংশমর্যাদার পরিবর্তে তাওহীদের অঙ্গীকার ও মুসলিম পরিচয়ের অসিয়ত। |
| ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীগণ | সূরা আলে ইমরান ৩:৫২ | وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ | ঈসার মুখে কুফরের লক্ষণ দেখে হাওয়ারীদের ঈমান ও মুসলিম সাক্ষ্য প্রদান। |
| মুহাম্মদ (স.) | সূরা আল-আনআম ৬:১৬৩ | وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ | কোনো নতুন ধর্মের পত্তন নয়; বরং পূর্বাপর সত্যের প্রথম আত্মসমর্পণকারী হওয়া। |
| মুহাম্মদ (স.) | সূরা আয-যুমার ৩৯:১২ | مِنَ الْمُسْلِمِينَ | আল্লাহর নির্দেশে সমর্পিত বান্দাদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত থাকার বাধ্যবাধকতা। |
| আহলে কিতাবের সাথে সংলাপ | সূরা আলে ইমরান ৩:৬৪ | اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ | বিতর্ক ও বিভাজন ভুলে তাওহীদ ও মুসলিম পরিচয়ে একতাবদ্ধ হওয়ার ডাক। |
| সমগ্র বিশ্বাসী উম্মত | সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৮ | هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ | আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক, চিরন্তন ও সার্বজনীন পরিচয়। |
৮ দলাদলি ও বিভাজন সম্পর্কে কুরআনের কঠোর সতর্কতা
এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মৌলিক বিষয় অনুধাবন করা জরুরি। আল্লাহর দেওয়া সার্বজনীন পরিচয়ের বাইরে মানুষ যখন নিজেদের আলাদা আলাদা দল, ফিরকা, মাজহাব বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে, তখন কুরআন সে বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্কতা উচ্চারণ করেছে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ ۚ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
“নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে পরিণত হয়েছে, তাদের কোনো বিষয়েই তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি তো কেবল আল্লাহর কাছেই। অতঃপর তারা যা করত, সে সম্পর্কে তিনি তাদের অবহিত করবেন।”
এই আয়াতের শব্দচয়ন প্রতিটি বিবেকবান মানুষের চিন্তা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো:
- ⚠ فَرَّقُوا (ফাররাকূ): এসেছে ف ر ق (ফা-রা-ক্বাফ) মূলধাতু থেকে। এর অর্থ টুকরো টুকরো করা, আলাদা করা বা একতাকে বিনষ্ট করে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা।
- ⚠ شِيَعًا (শিয়া‘আন): এসেছে ش ي ع (শীন-ইয়া-আইন) মূল থেকে। এর অর্থ অন্ধ অনুসারী দল, ফিরকা, পক্ষ বা উপদল।
- ⚠ لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ (লাস্তা মিনহুম ফী শাই): রাসূলকে সরাসরি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—যারা দ্বীনে দলাদলি করে, তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই নেই!
অতএব কুরআন দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে কোনো দলীয় কিংবা ফিরকাগত পরিচিতি গ্রহণকে মুমিনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে অনুমোদন করে না; বরং তা থেকে স্পষ্ট সতর্ক করে।
⚖️ সারণি ৩: আল্লাহর দেওয়া ‘মুসলিম’ পরিচয় বনাম মানবসৃষ্ট ‘দলীয়/সাম্প্রদায়িক’ পরিচয়
প্যারাডাইম তুলনা| বিবেচ্য বিষয় | আল্লাহর দেওয়া ‘মুসলিম’ পরিচয় | মানবসৃষ্ট দলীয় / সাম্প্রদায়িক পরিচয় |
|---|---|---|
| পরিচয়ের উৎস | সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক অহীর মাধ্যমে ঘোষিত (২২:৭৮)। | ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, মাজহাব, ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক উপদল। |
| আনুগত্যের কেন্দ্র | একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর নাযিলকৃত অকাট্য কিতাব। | নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ইমাম, দলনেতা বা দলীয় নিজস্ব সংবিধান। |
| বিশ্বাসের ভিত্তি | চিন্তা, তাদাব্বুর, তাফাক্কুর ও সত্যের প্রতি সমর্পণ। | বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণ এবং নিজস্ব দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। |
| উম্মাহর ওপর প্রভাব | বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সার্বিক নিরাপত্তা। | পরস্পর কাদা-ছোড়াছুড়ি, তাকফির (ফতোয়াবাজি) ও বিভেদ। |
| আল্লাহর সন্তুষ্টির মানদণ্ড | একনিষ্ঠ তাকওয়া ও হক অনুসরণ (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩)। | নির্দিষ্ট দলের সদস্যপদ ও দলীয় লেবেল আঁকড়ে থাকা। |
৯ আল্লাহর দেওয়া পরিচয়ের বাইরে কোনো পরিচয় কি টেকসই?
কুরআনের সমগ্র বক্তব্যকে এক সূত্রে বাঁধলে দেখা যায়, ‘মুসলিম’ পরিচয়টি কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলের নাম হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমগ্র বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের প্রতি আত্মসমর্পণকারী মানুষের চিরন্তন ও একমাত্র পরিচয়।
সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৪৬-এ আল্লাহ তায়ালা আবারও এই অভিন্ন বিশ্বাসের ভিত্তি তুলে ধরেছেন:
وَقُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ
“আর তোমরা বলো, ‘আমরা ঈমান এনেছি আমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি। আমাদের ইলাহ এবং তোমাদের ইলাহ এক ও অভিন্ন। আর আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।’”
এখানেও শেষ কথা এসে ঠেকেছে: وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ। পরিচয়ের কেন্দ্র হলো একক আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব স্বীকার ও তাঁর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
১০ কুরআনিক পরিচয় ও মানদণ্ড: কার্যপ্রণালীর ৪টি মূল স্তম্ভ
কুরআনের সামগ্রিক আয়াতগুলো গভীরভাবে পাঠ করলে একটি চমৎকার যৌক্তিক ও কার্যপ্রণালীভিত্তিক ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
নিজের অহংকার, ব্যক্তিগত মনগড়া খেয়ালখুশি এবং মানবসৃষ্ট নিয়মকানুনের চেয়ে আল্লাহর বিধানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে হৃদয়ে গ্রহণ করা।
আল্লাহ যে নাম আমাদের জন্য পছন্দ ও নির্ধারণ করেছেন (২২:৭৮), কোনো প্রকার হীনমন্যতা ছাড়া সেই একক নামে পরিচিত হওয়া।
নামের সঙ্গে বাস্তব কর্মের মিলন ঘটানো; জীবনের প্রতিটি পদে কুরআনের অকাট্য নির্দেশ ও উপদেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
উম্মাহকে টুকরো টুকরো করা কোনো ফিরকা, দল বা সংকীর্ণ উপদলের অংশ না হয়ে বৃহত্তর তাওহীদী ঐক্যে অবিচল থাকা (৬:১৫৯)।
আল্লাহ আমাদের যে পরিচয় দিয়েছেন, তা কুরআন নিজেই অমোঘ ভাষায় ঘোষণা করেছে:
هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ
“তিনিই তোমাদের নাম দিয়েছেন ‘মুসলিম’।” — সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৮
আর সেই পরিচয়ের মৌলিক অর্থও কুরআনের ভাষায় দ্ব্যর্থহীন: “আমরা একমাত্র তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৩৩)
তাই কুরআনের ভাষায় পরিচয়ের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র শব্দের ওপর এসে সুদৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়:
مُسْلِم — মুসলিম
✨ গবেষণার মূল নির্যাস ও সারসংক্ষেপ (Key Takeaways)
- ✓ শব্দমূলের বাস্তব রূপ: ‘মুসলিম’ শব্দটি এসেছে س ل م (নিরাপত্তা, শান্তি ও আত্মসমর্পণ) মূল থেকে। এটি কোনো পারিবারিক বা রাজনৈতিক পদবি নয়, বরং আল্লাহর কাছে নিজ ইচ্ছাকে সঁপে দেওয়ার অবস্থা।
- ✓ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা: ইবরাহীম (আ.), ইয়াকুব (আ.), ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীগণ এবং শেষ নবী মুহাম্মদ (স.)—প্রত্যেকেরই অভিন্ন ঘোষিত পরিচয় ছিল ‘মুসলিম’।
- ✓ আল্লাহর দেওয়া আনুষ্ঠানিক নাম: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা স্বয়ং সূরা আল-হাজ্জ ২২:৭৮-এ পূর্বাপর সমস্ত কিতাবের বিশ্বাসীদের নাম দিয়েছেন ‘আল-মুসলিমীন’ (هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ)।
- ✓ দলাদলির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি: দ্বীনকে বিভক্ত করে বিভিন্ন ফিরকা বা উপদলে পরিণত হওয়া কুরআন অনুযায়ী সরাসরি নিন্দনীয় অপরাধ (৬:১৫৯)।
- ✓ একমাত্র মানদণ্ড: মানুষের তৈরি হাজারো লেবেল পরিত্যাগ করে আল্লাহর কিতাবকে জীবনের মাপকাঠি বানিয়ে একমাত্র আল্লাহর প্রতি সমর্পিত হওয়াই কুরআনিক মুক্তির পথ।
— গবেষণা ও পর্যালোচনা: শফিকুল ইসলাম (Shafiqul Islam)

