সুন্নাত

আলম এম.আলম এম.২৮ আগস্ট, ২০২৬

সুন্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ, পথ’।

সুন্নাহ (السنة) শব্দটি يسن ـ سن থেকে ক্রিয়ামূল। যার অর্থ তরীকা বা পন্থা, পদ্ধতি, রীতিনীতি, হুকুম ইত্যাদি। এই পদ্ধতি ও রীতিনীতি নন্দিত বা নিন্দিত কিংবা প্রশংসিত বা ধিকৃত উভয়ই হতে পারে। যেমন- الله من السنة (আল্লাহর নীতি)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনার পূর্বে আমি যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তাদের ক্ষেত্রে এরূপ নিয়ম চালু ছিল। আপনি আমার নিয়মের কোন ব্যতিক্রম পাবেন না’। (ঈসরা ১৭/৭৭; আবু নাফিয লিলাবার আল-বারাদী; আত-তাহরীক)।
কোরআন মাজীদে এই ‘সুন্নাত’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। এবং এটাই ‘সুন্নাতুল্লাহ বা ‘আল্লাহর সুন্নাত’। আর এটি ব্যবহৃত হয়েছে পথ, পন্থা, নিয়ম, পদ্ধতি অর্থে। এক কথায় আল্লাহর সুনির্দিষ্ট করণ বিধানকে আল্লাহর সুন্নাত বলা হয়।
আর এ বিধান (আল্লাহর সুন্নাত) কোরআন মাজীদের মাধ্যমে তার বান্দার জন্য সুনির্ধারিত হয়েছে। (সূরা আযহাব-৩৮)।
(আল্লাহর সুন্নাত) এটিই আল্লাহর বিধান, যা প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে; তুমি আল্লাহর এ বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না। (সূরা ফাতহ-২৩, সূরা আযহাব-৬২)।
তুমি আল্লাহর (সুন্নাতে) বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না এবং আল্লাহর বিধানের কোন ব্যতিক্রমও দেখবে না। (সূরা ফাতির-৪৩)।
নবী(স.)এর সুন্নাত: শারঈ পরিভাষায় সুন্নাত হল রাসূলুল্লাহ (স.) এর ঐ সকল বাণী, যা দ্বারা তিনি কোন বিষয়ে আদেশ-নিষেধ, বিশ্লেষণ, মৌণ সম্মতি ও সমর্থন দিয়েছেন এবং কথা ও কর্মের মাধ্যমে অনুমোদন করেছেন, যা সঠিকভাবে জানা যায় তাকে সুন্নাহ বলা হয়। {শাইখ যাকারিয়া আল-আনছারী, ফাতহুল বাকী আলা আলাফিল ইরাকী (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইসলামিয়্যাহ, তা. বি.) পৃ: ১২}।
সুন্নাতের প্রকারভেদ: অনুসরণ ও বর্জনের মাধ্যমে রাসূল (স.) এর অনুসরণের ক্ষেত্রে সুন্নাত দুই প্রকারঃ
১. সুন্নাতেফে’লিয়্যাহঃ (তথা কর্মে সুন্নাত)।সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলের প্রত্যেকটি আমল প্রতি পদে মেনে চলেছেন। আবু বকর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) যা আমল করতেন, আমি তাই আমল করব, আমি তার কোন কিছুই ছেড়ে দিতে পারি না। কেননা আমি আশঙ্কা করি যে, তার জন্য কোন নির্দেশ ছেড়ে দিয়ে আমি যেন পথভ্রষ্ট হয়ে না যায়। (বুখারী হা/৩০৯৩, মুসলিম হা/১৭৫৯)।
২. সুন্নাতে তারকিয়্যাহঃ(তথা বর্জনে সুন্নাত)। রাসূল (স.) যে ইবাদত করেননি, করতে বলেননি এবং সম্মতি প্রদান করেননি এমন ইবাদত বর্জন করাই সুন্নাত।
ইমাম শাতেবী (রহঃ) সুন্নাতের পারিভাষিক অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সুন্নাত হলো নবী (ছাঃ) এর কথা, কর্ম ও মৌন সম্মতি থেকে যা বর্ণিত হয়েছে এবং যা সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পক্ষ থেকে এসেছে।
আল্লামা ফয়সাল ইবনে আব্দুল আযিয আলে মুবারক (রহঃ) বলেন, সুন্নাত হলো যা নবী (স.) এর কথা, কর্ম ও মৌন সম্মতি থেকে যা বর্ণিত হয়েছে। (মুকামুর রাশাদ ১/২৫ পৃষ্ঠা)।
আল্লামা মুহাম্মদ বশীর শাহসোয়ানীর ভাষায় : যেই বিশেষ পথ, পন্থা ও পদ্ধতি, যা নবী করীম (স.) এর সময় থেকেই দ্বীন ও ইসলামের ব্যাপারে কোন কাজ করার বা না করার দিক দিয়ে বাস্তবভাবে অনুসরণ করা হয়Ñ যার ওপর দিয়ে চলাচল করা হয়।
আল্লামা সফিউদ্দীন আল হাম্বলী লিখেছেন: কোরআন ছাড়া রাসূলের যে কথা, যে কাজ বা অনুমোদন বর্ণনার সুত্রে পাওয়া গেছে- তাই সুন্নাত।
সাহাবাদের সুন্নাত: রাসূল (স.) এর কথা, কাজ, সম্মতি ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যা সাহাবাগণ অনুসরণ করেছেন যেভাবে করতে বলেছেন সে ভাবে আমল করেছেন। এবং সাহাবগণ একত্রে কোন বিষয়ে কোন রকম বিরোধীতা ব্যতিরেকে ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন সেটাই সাহাবগণের সুন্নাত।
সাধারণ মানুষের সুন্নাত: সাধারণ মানুষের পূর্ব প্রচলিত রীতি পদ্ধতি ও ‘সুন্নাত’ নামে পরিচিত। যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন আমার দাদা হুজুর এ রকম চুল রাখতেন এবং আমাদেরকে চুল রাখতে বলতেন। এটা তার দাদা হুজুরের সুন্নাত (প্রচলিত রীতি) যেমন, ইসলাম গ্রহণের পূর্ব যুগের মানুষেরা তাদের দেবীর জন্য হজ্জের ইহরাম বাঁধত। এটা তাদের বাপ-দাদাদের ‘সুন্নাত’ ছিল। (মুসলিম হা/১২৭৭)।
মাওলানা আব্দুর রহিম (রহঃ) সুন্নাত সম্বন্ধে যেভাবে আলোচনা করেছেন অনুরূপই বলতে হয় (সুন্নাত ও বিদ’আত ১৪/১৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন): সুন্নাতের সেই অর্থ আলোচ্য নয়, যা হাদীস বিজ্ঞানীরা পরিভাষা হিসেবে গ্রহন করেছেন; সেই অর্থও নয়, যা ফিকাহ শাস্ত্রে গ্রহন করা হয়েছে। হাদীস-বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় সুন্নাত’ হচ্ছে রাসূলে করীম (স.) এর মুখের কথা, কাজ ও সমর্থন অনুমোদনের বর্ণনা-যাকে, প্রচলিত কথায় বলা হয় ‘হাদীস’। আর ফিকাহ শাস্ত্রে সুন্নাত’ বলা হয় এমন কাজকে, যা ফরয বা ওয়াজিব নয় বটে; কিন্তু নবী করীম(স.) তা প্রায়ই করেছেন। এখানে দুটো সুন্নাতের কোনটিই আলোচ্য নয়। এখানে আলোচ্য হচ্ছে সুন্নাত’ তার মূলগত অর্থের দিক দিয়ে যা মৌলিক আদর্শ রীতি-নীতি, পথ, পন্থা ও পদ্ধতি বোঝায়। বস্তুত এ হিসেবে সুন্নাত হলো সেই মূল আদর্শ, যা আল্লাহ তা’আলা বিশ্ব-মানবের জন্যে নাযিল করেছেন, যা রাসূলে করীম (স.) নিজে তার বাস্তব জীবনে দ্বীনি দায়িত্ব পালনের বিশাল ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন; অনুসরণ করার জন্যে পেশ করেছেন দুনিয়ার মানুষের সামনে। মূল ইসলামেরই বিকল্প শব্দ হচ্ছে সুন্নাত, যা আমরা এখানে আলোচনা করছি। তার উৎস হলো ওহীÑ যা আল্লাহর নিকট থেকে তিনি লাভ করেছেন। এ ওহী’ দু’ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে, আল্লাহর জানিয়ে দেওয়া বিধান ও নির্দেশ। রাসূলে করীম (স.) এর বাস্তব কর্মজীবনে এ দুটোরই সমন্বয়, সেখানে এ সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে পুরোপুরিভাবে। রাসূলের বাস্তব জীবন বিশ্লেষণ করলে এ সব কয়টিরই প্রকটভাবে সন্ধান লাভ করা যাবে। আর তাই হচ্ছে সুন্নাত’, তাই হচ্ছে পরিপূর্ণ দ্বীন-ইসলাম। কোরআন মাজীদে রাসূলের এ বাস্তব জীবনের সত্যিকার রূপ সুস্পষ্ট করে তুলবার জন্যেই তাঁর জবানীতে বলা হয়েছেঃ আমি কোন আদর্শই অনুসরণ করি না; করি শুধু তাই যা আমার নিকট ওহীর সুত্রে নাযিল হয়।
ওহীর সুত্রে নাযিল হওয়ার আদর্শই রাসূলে করীম (স.) বাস্তব কাজে ও কর্মে অনুসরণ করেছেন, তা-ই হচ্ছে এই গ্রন্থের আলোচ্য সুন্নাত’। এই সুন্নাতেরই অপর নাম দ্বীন ইসলাম।
কোরআন মাজীদে এই সুন্নাতকেই সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূলের জবানীতে কোরআন মাজীদে ঘোষণা করা হয়েছে: নিশ্চয় এ হচ্ছে আমার সঠিক সরল দৃঢ় পথ। অতএব তোমরা এ পথই অনুসরণ করে চলবে, এ ছাড়া অন্যান্য পথের অনুসরণ তোমরা করবে না। তা করলে তা তোমাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দুরে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তোমাদের এরূপ-ই নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা ভয় করে চলো। (সূরা আনআম-১৫৩)।
এ আয়াতে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলতে সেই জিনিসকেই বোঝানো হয়েছে, যা বোঝায় সুন্নাত’ শব্দ থেকে।
পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত

সম্পর্কিত গবেষণা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ

এই বিষয়ের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গভীর আলোচনা ও কুরআনভিত্তিক অনুসন্ধান

সকল প্রবন্ধ দেখুন

একীভূত সার্বভৌম ম্যাট্রিক্স

প্রচলিত লোকজ ধারণার বাইরে গিয়ে আরবির মূল শব্দার্থ ও তাওহীদের একক সার্বভৌমত্বের আলোকে মালাইকা (নির্বাহী আইন), ওহী (প্রশাসনিক কোড) এবং রুহ (লাইভ এক্সিকিউটিভ কমান্ড)-এর পুনর্মূল্যায়ন ও সূরা নিসার ৪:৮২ ফিল্টারে মহাজাগতিক বিচারবিজ্ঞানের অনন্য বিশ্লেষণ। লেখক: আলম এম.।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐশ্বরিক শিক্ষা ও অক্ষরজ্ঞান

রাসূলুল্লাহ (সা.) কি নিরক্ষর ছিলেন? ‘বলো’ (কুল) বনাম ‘পড়ো’ (ইকরা)-এর মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য, জিবরাঈল (আল্লাহর রূপান্তরকারী শক্তি) ও কলমের শিক্ষা, ‘উম্মী’ শব্দের মূল ধাতু এবং নবুয়ত-পূর্ব বনাম নবুয়ত-পরবর্তী অবস্থার গভীর কুরআনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

লওহে মাহফুজ

সূরা আন-নিসার ৮২ নম্বর আয়াতের কষ্টিপাথরে লওহে মাহফুজ সংক্রান্ত আয়াতসমূহের দ্বন্দ্বহীন পাঠ, মূল শব্দসমূহের (লওহ, মাহফুজ, কিতাব, নাবরাআহা) আরবী রুট বিশ্লেষণ এবং লওহে মাহফুজ (মহাজাগতিক নিয়ম ও ওহী) বনাম আমলনামার (ব্যক্তিগত কর্মের খাতা) মৌলিক পার্থক্য।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

ঐশ্বরিক আলোর উপমা-রহস্য: সূরা আন-নূর, আয়াত ৩৫

সূরা আন-নূরের ৩৫ নম্বর আয়াত ('আয়াহ আল-নূর')-এর প্রচলিত আক্ষরিক, দেহতাত্ত্বিক-মরমী ও কোয়ান্টাম বৈজ্ঞানিক অনুবাদ, সূরা আত-তীন (৯৫:১) ও আহসানি তাকউইমের সংযোগ, ৫টি মূল শব্দের আরবী রুট বিশ্লেষণ এবং আলোর সর্বব্যাপী উপস্থিতি বনাম গতির দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

কুরআনের আয়াত ৫:৬ - অজু কি কেবল শারীরিক, নাকি একটি সমন্বিত পরিশুদ্ধি?

সূরা আল-মায়েদা ৫:৬ আয়াতের ভাষাগত গঠন, শর্তীয় কাঠামো এবং শব্দমূল (Root) বিশ্লেষণ—যেখানে ওয়াজহ, আইদী, রুউস, আরজুল, জুনুব, সাফার, নিসা, মা এবং তায়াম্মুমের মাধ্যমে ব্যক্তি, নেতৃত্ব, দল ও মানসিক অবস্থার সমন্বিত পরিশুদ্ধি ব্যবস্থা উন্মোচিত হয়েছে।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন