“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা করে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে প্রচুর বৈপরীত্য ও অসঙ্গতি পেত।” — সূরা আন-নিসা (৪:৮২)
পবিত্র কুরআনের এই শাশ্বত মূলনীতি নিশ্চিত করে যে, কুরআনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাঝে কোনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকা অসম্ভব। অথচ, সূরা আত-তাওবাহর ৫ নম্বর (৯:৫) আয়াতের বহুল প্রচলিত আক্ষরিক অনুবাদটি লক্ষ্য করুন।
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلْقُرْءَانَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ ٱللَّهِ لَوَجَدُواْ فِيهِ ٱخْتِلَٰفًا كَثِيرًا
এই আয়াতটি নিশ্চিত করে যে, কুরআনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মাঝে কোনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকা অসম্ভব। অথচ, সূরা আত-তাওবাহর ৫ নম্বর (৯:৫) আয়াতের বহুল প্রচলিত আক্ষরিক অনুবাদটি লক্ষ্য করুন:
“অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
মানুষের তৈরি কোনো কাহিনীর আশ্রয় না নিয়ে, শুধুমাত্র কুরআনের নিজস্ব টেক্সট এবং এর গভীর আলঙ্কারিক ও রূপক ভাষার মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে এই প্রচলিত আক্ষরিক অনুবাদটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
১ মূল ভিত্তি: ৯:১-৪ আয়াতের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
৯:৫ আয়াতের কঠোরতাকে বুঝতে হলে তার ঠিক আগের ১ থেকে ৪ নম্বর আয়াতের শব্দ ও ভাবের গভীরতা বিবেচনা করা অনিবার্য। আসুন কোনো মনগড়া কাহিনী ছাড়া সরাসরি কুরআনের সেই বাণীগুলো পর্যালোচনা করি:
بَرَاءَةٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦٓ إِلَى ٱلَّذِينَ عَٰهَدتُّم مِّنَ ٱلْمُشْرِكِينَ فَسِيحُواْ فِي ٱلْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ
إِلَّا ٱلَّذِينَ عَٰهَدتُّم مِّنَ ٱلْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْـًٔا وَلَمْ يُظَٰهِرُواْ عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوٓاْ إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ
২ আক্ষরিক অনুবাদের বড় বিপদ: আল্লাহর হাত ও চেহারা সংক্রান্ত বিভ্রান্তি
কুরআনের রূপক ও অলঙ্কারিক ভাষাগুলোকে যদি আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করা হয়, তবে তা অত্যন্ত বিপদজনক এবং কুফরির সমতুল্য বিকৃতি ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত এই আয়াতগুলো লক্ষ্য করুন:
إِنَّ ٱلَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ ٱللَّهَ يَدُ ٱللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ
উচ্চারণ: ইন্নাল্লাযীনা ইয়ুবায়িঊনাকা ইন্নামা ইয়ুবায়িঊনাল্লাহ; ইয়াদুল্লাহি ফাওকা আইদীহিম।
كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُۥ ۚ لَهُ ٱلْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
উচ্চারণ: কুল্লু শাইয়িন হালিকুন ইল্লা ওয়াজহাহ; লাহুল হুকমু ওয়া ইলাইহি তুরজাঊন।
স্পষ্ট প্রমাণ: অতএব, এটি প্রমাণিত যে কোরআনের বহু আয়াত আক্ষরিক অনুবাদের ঊর্ধ্বে। ঠিক একইভাবে, ৯:৫ আয়াতের মতো যুদ্ধকালীন বা মনস্তাত্ত্বিক পরিভাষাকে আক্ষরিক অর্থে আটকে রাখলে তা মানুষের মাঝে হিংসা ও ধর্মের বিকৃতি ছড়ায়, যা অত্যন্ত বিপদজনক।
৩ শব্দবিন্যাসের অলৌকিক প্রজ্ঞা: যেখানে সাধারণ লজিক স্তব্ধ হয়
আল্লাহ যেভাবে কুরআনে বর্ণিত শব্দগুলো উপস্থাপন করেন, সেটার পেছনে আমাদের গভীর চিন্তা করার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ মানুষের জাগতিক লজিককে চ্যালেঞ্জ করে সূরা আল-মুলকের ২ নম্বর আয়াতে মৃত্যুকে আগে এনেছেন:
ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلْمَوْتَ وَٱلْحَيَوٰةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِٱللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَٰتًا فَأَحْيَٰكُمْ ۖ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
“তোমরা কীভাবে আল্লাহর সাথে কুফরি করো? অথচ তোমরা ছিলে মৃত (নির্জীব), অতঃপর তিনি তোমাদের জীবিত করেছেন; আবার তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন ও পুনরায় জীবিত করবেন।”
আমরা এই পৃথিবীতে আসার আগে একটি দীর্ঘ সময় নিথর, প্রাণহীন জড় উপাদান (মাটি) হিসেবে ছিলাম, যা ছিল আমাদের প্রথম ‘মৃত’ অবস্থা। এই পরম সত্যটি আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন ২:২৮ আয়াতে। পরীক্ষার ডেডলাইন বা সমাপ্তির ঘণ্টা (মৃত্যু) মাথায় রাখলে মানুষ যেমন সৎপথে চলে, এটি বোঝানোর জন্যই আল্লাহ ‘জীবন’-এর আগে ‘মৃত্যু’ শব্দটিকে উপস্থাপন করেছেন।
৪ বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও নবীর দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিকতা
প্রচলিত ৯:৫ অনুবাদে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার যে রূপ দেখা যায়, তা কুরআনের মূল ও শাশ্বত আয়াতগুলোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক:
لَا إِكْرَاهَ فِي ٱلدِّينِ
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা জোর খাটানো নেই।”
فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ
“যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক এবং যার ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান (কুফরি) করুক।”
وَمَا أَنتَ عَلَيْهِم بِجَبَّارٍ
“তুমি তাদের উপর কোনো জোর-জবরদস্তিকারী নও।”
فَذَكِّرْ إِنَّمَا أَنتَ مُذَكِّرٌ لَّسْتَ عَلَيْهِم بِمُصَيْطِرٍ
“সুতরাং তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো কেবল একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের ওপর কোনো দারোগা নও।”
مَن قَتَلَ نَفْسًۢا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي ٱلْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ ٱلنَّاسَ جَمِيعًا
“...যে ব্যক্তি কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।”
৫ ৯:৫ নম্বর আয়াতের সঠিক ও অবৈপরীত্যহীন ভাবানুবাদ
কুরআনের ৯:১-৪ আয়াতের গভীর সংযোগ, শব্দ চয়নের অলৌকিক প্রজ্ঞা এবং আল্লাহর হাত ও চেহারার মতো শব্দের রূপক গভীরতার ওপর ভিত্তি করে ৯:৫ নম্বর আয়াতের সঠিক ও অবৈপরীত্যহীন ভাবানুবাদটি নিম্নরূপ:
فَإِذَا ٱنسَلَخَ ٱلْأَشْهُرُ ٱلْحُرُمُ فَٱقْتُلُواْ ٱلْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَٱحْصُرُوهُمْ وَٱقْعُدُواْ لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍۢ ۚ فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ فَخَلُّواْ سَبِيلَهُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ
৬ উপসংহার
নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখিত ৯:৫ আয়াতের প্রচলিত আক্ষরিক অনুবাদটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বিপদজনক।
কিন্তু যখনই আমরা ৯:১-৪ আয়াতের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আল্লাহর হাত, চেহারা কিংবা জীবনের আগে মৃত্যু আনার মতো অলৌকিক শব্দ চয়নের প্রজ্ঞাকে অনুধাবন করি, তখন সমস্ত বৈপরীত্য দূর হয়ে যায়। তখন প্রতিটি আয়াতের সুর এক সুতোয় গেঁথে মানুষের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিকে পরাস্ত করে পরম শান্তি ও আত্মশুদ্ধির মূল বার্তাটি ফুটিয়ে তোলে।

