নবুয়ত কি সাধনায় অর্জিত হয়? সূরা হাজ্জের ৭৫ নম্বর আয়াতের মহাজাগতিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ
⏳ পঠন সময়: ৫ মিনিট | 📝 গভীর তত্ত্ব ও তাফসীর বিশ্লেষণ
ইসলামী আকীদা ও দর্শনের অন্যতম একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—নবুয়ত ও রিসালাতের ভিত্তি কী? সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই একটি সংশয় উঁকি দেয় যে, আল্লাহর শেষ রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.) কি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত হেরা গুহায় কঠোর ইবাদত ও ধ্যান করতে করতে একপর্যায়ে নবী হয়েছিলেন? নাকি তিনি জন্মগতভাবে এবং সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী হিসেবে মনোনীত ছিলেন? পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাজ্জের ৭৫ নম্বর আয়াত এবং মুসলিম দার্শনিকদের গভীর ব্যাখ্যার আলোকে এই নিবন্ধে আমরা বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করব।
🔹 পবিত্র কুরআনের ঘোষণা:
اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
"আল্লাহ ফেরেশতাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেন রাসূল এবং মানুষের মধ্য থেকেও; নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।" — সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৫
১. 'মালাইকা' শব্দের আভিধানিক ও মহাজাগতিক রূপক অর্থ
প্রচলিত বা বাহ্যিক তাফসীর অনুযায়ী 'মালাইকা' বলতে আমরা নূর দ্বারা তৈরি ডানা বিশিষ্ট ফেরেশতাদের বুঝি। তবে আরবি ভাষার বুৎপত্তি এবং বাতেনী (অন্তর্নিহিত) দর্শন অনুযায়ী, 'মালাক' শব্দের মূল ধাতু ‘লা-আ-কা’ (لأك), যার আভিধানিক অর্থ বার্তা বা অদৃশ্য চালিকাশক্তি।
ইসলামী ইতিহাসের প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনা, আল-ফারাবী এবং প্রাজ্ঞ সুফী চিন্তাবিদদের মতে, মালাইকা হলো মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক ও আত্মিক নিয়মাবলী (Universal Forces)। এই ধারার ব্যাখ্যায়, ওহী নিয়ে আগমনকারী প্রধান ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ.) হলেন 'আকলুল ফায়াল' (Active Intellect বা মহাজাগতিক পরম বুদ্ধি)। অর্থাৎ, আল্লাহ যখন বলেন তিনি মালাইকা থেকে রাসূল মনোনীত করেন, তার গভীর অর্থ হলো—তিনি মহাজাগতিক অদৃশ্য শক্তি ও পরম জ্ঞানকে উম্মতের কাছে বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম বা ডাউনলিংক হিসেবে নির্ধারণ করেন।
২. 'ইছতফা' বা আল্লাহর একক চয়ন: মানুষ কেন নবী হতে পারে না?
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা 'ইয়াছতাফি' (يَصْطَفِي) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন। আরবি ভাষায় 'ইছতফা' শব্দের অর্থ হলো কোনো মিশ্রিত উপাদানের ভেতর থেকে ময়লা-আবর্জনা দূর করে সবচেয়ে খাঁটি, নিখাদ ও সর্বোত্তম অংশটিকে বেছে নেওয়া।
নবুয়ত কোনো 'কাসবী' বা মানুষের উপার্জিত কোনো পদ বা সম্মান নয়। একজন মানুষ সারাজীবন দিন-রাত ইবাদত করে, সিজদায় পড়ে থেকে বা কঠোর জিকির-আসকার করে নিজের চেষ্টায় নবী হতে পারেন না। নবুয়ত হলো সম্পূর্ণ 'ওয়াহবী' বা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া বিশেষ রাজকীয় মনোনয়ন। আল্লাহ মানবজাতির রূহ বা আত্মার মধ্য থেকে সবচেয়ে নিখাদ, নিষ্পাপ এবং পবিত্রতম আত্মাকে নবুয়তের গুরুভার বহনের জন্য সৃষ্টিগতভাবেই বেছে নেন।
💡 তবে হেরা গুহায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইবাদতের রহস্য কী ছিল?
নবুয়ত প্রকাশের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কার সমাজব্যবস্থার পাপাচার থেকে দূরে থাকতে হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যান করতেন। তাঁর এই ইবাদত কোনো "নবী হওয়ার প্রিপারেশন বা সাধনা" ছিল না। বরং, সৃষ্টির শুরু থেকেই তাঁর ভেতরে যে নবুয়তের মহাসত্তা আমানত রাখা হয়েছিল, বাহ্যিক কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সেই পবিত্র মানবীয় চেতনার সাথে মহাজাগতিক পরম বুদ্ধির (জিব্রাইল বা ওহী) সংযোগ ঘটার জন্য এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক প্রস্তুতি পর্ব।
পরিশেষ ও সারকথা
সুতরাং, কুরআনের গভীর দার্শনিক তত্ত্ব এবং সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণ আমাদের এই সিদ্ধান্তেই উপনীত করে যে—আল্লাহ তাআলা বিশ্বজগতের সমস্ত শক্তি ও মানুষের মধ্য থেকে মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বোত্তম ও নিখাদ সত্ত্বা হিসেবে "মনোনীত করে" (ইছতফা) এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তিনি ইবাদতের মাধ্যমে নবুয়ত অর্জন করেননি, বরং সৃষ্টির সূচনা থেকেই তিনি নবী ছিলেন এবং ৪০ বছর বয়সে এসে কেবল সেই ঐশী মনোনয়নের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ও ওহী ডাউনলোডের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল মাত্র।

