বিজ্ঞানের পরিভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে যাতে আল্লাহর একক আদি স্রষ্টা হওয়া (Creation ex nihilo) এবং সূরা আন-নিসা-এর ৮২ নম্বর আয়াতের মর্মার্থ - অর্থাৎ কোরআনে কোনো বৈপরীত্য বা অসঙ্গতি নেই - তা অক্ষুণ্ণ থাকে, সে অনুযায়ী নিবন্ধটি সাজানো হলো।
একটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে, বিগ ব্যাং-এর আদি বিন্দুটি আল্লাহর পাশাপাশি আগে থেকে বিদ্যমান কোনো উপাদান ছিল না, বরং তা আল্লাহর "কুন ফায়াকুন" আদেশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ শূন্য থেকে সৃষ্ট প্রথম মহাজাগতিক অবস্থা।
মহাজাগতিক তরঙ্গ এবং মহাবিশ্বের জীবনচক্র: কোরআনের আয়াতের সমন্বিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
ভূমিকা
পবিত্র কোরআন বিশ্বজগতের স্রষ্টার অবিকৃত বাণী। সূরা আন-নিসা-এর ৮২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, "তারা কি কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে না? এটা যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে বহু বৈপরীত্য (অসঙ্গতি) পেত।" এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, কোরআনের কোনো বক্তব্যই বাস্তব সত্য ও প্রকৃতির অকাট্য নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।
১৪০০ বছর আগে বিজ্ঞানহীন এক মরুময় সমাজে মানুষের বোঝার সুবিধার্থে যে ঘটনাগুলোকে তৎকালীন পরিচিত শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার অগ্রগতির ফলে আজ তার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা ও সঙ্গতি প্রকাশ পাচ্ছে। সৃষ্টিজগতের সূচনা থেকে শুরু করে এর চূড়ান্ত সমাপ্তি এবং পুনরুত্থান নিয়ে কোরআনের বিবরণগুলো কোনো রূপকথা বা রূপান্তর নয়, বরং তা শূন্য থেকে সৃষ্টির এক পরম ঐশ্বরিক শৃঙ্খলার বহিঃপ্রকাশ।
১. মহাবিশ্বের সূচনা: সম্পূর্ণ শূন্য থেকে আদি সৃষ্টি (Creation ex nihilo)
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে "স্থান" (Space), "কাল" (Time) কিংবা "পদার্থ" (Matter) বলতে কিছুরই কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আল্লাহ তা'আলা কোনো পূর্ব-বিদ্যমান উপাদানের কেবল 'রূপান্তর' ঘটাননি, বরং তিনি সম্পূর্ণ শূন্যতা (Absolute Nothingness) থেকে সৃষ্টির সূচনা করেছেন।
প্রচলিত অনুবাদ (Surface Meaning):
"যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসাথে মিশে (বন্ধ অবস্থায়) ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম? তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০)
- সমন্বিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:
আয়াতে ব্যবহৃত 'রাত্বকান' (رَتْقًا) শব্দের অর্থ একসঙ্গে সেঁটে থাকা বা একক ঘনীভূত অবস্থা। আধুনিক কসমোলজি বলে, সৃষ্টির শুরুর মুহূর্তে স্থান-কাল ও সমস্ত পদার্থ এক পরম শূন্যতা থেকে একটি অতি ক্ষুদ্র ও অতি ঘন বিন্দুতে (Singularity) আবির্ভূত হয় এবং বিস্ফোরণের (Big Bang) মাধ্যমে আলাদা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের এই 'আদি বিন্দু' আল্লাহর পাশাপাশি অনন্তকাল ধরে টিকে ছিল না। বরং আল্লাহ যখনই "কুন ফায়াকুন" (হও, অমনি হয়ে গেল) বলে আদেশ দিলেন, তখনই শূন্য থেকে এই আদি ঘনীভূত অবস্থার সৃষ্টি হলো এবং তা থেকে স্থান, কাল ও পদার্থের জন্ম হলো।
২. মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থা: ক্রমাগত সম্প্রসারণ (Expanding Universe)
মহাবিশ্বকে স্থির বা জড় বস্তু হিসেবে সৃষ্টি না করে, আল্লাহ একে একটি গতিশীল শৃঙ্খলায় সচল রেখেছেন। ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল প্রমাণ করেন যে, মহাশূন্য প্রতিনিয়ত চারদিকে প্রসারিত হচ্ছে।
প্রচলিত অনুবাদ (Surface Meaning):
"আর আকাশ, আমি তা নির্মাণ করেছি ক্ষমতা বলে এবং নিশ্চয়ই আমি এর সম্প্রসারণকারী।" (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭)
- সমন্বিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:
আয়াতে 'মুউসিঊন' (مُوسِعُونَ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট অর্থ হলো "আমরা ক্রমাগত এর পরিধি বৃদ্ধি করছি।" বিজ্ঞান আবিষ্কার করার বহু আগেই কোরআনের এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে, আদি সৃষ্টির পর থেকে মহাবিশ্বের স্থান (Space) ক্রমাগত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, যা বর্তমান কসমোলজির অন্যতম প্রধান সত্য।
৩. মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি: চূড়ান্ত সংকোচন (Big Crunch)
পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণ আজীবন চলবে না। মহাকর্ষীয় বল এবং ব্ল্যাকহোলের প্রভাবে একসময় এই প্রসারণ থেমে যাবে এবং সবকিছু আবার পেছনের দিকে সংকুতির হতে শুরু করবে, যাকে বিজ্ঞান বলে 'বিগ ক্রাঞ্চ' (Big Crunch)।
প্রচলিত অনুবাদ (Surface Meaning):
"সেই দিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে লিখিত কাগজপত্র গুটিয়ে রাখা হয়। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই আমি পুনরায় তার পুনরাবৃত্তি করব। এটি আমার ওয়াদা, আর আমি তা পূরণ করবই।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৪)
- সমন্বিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:
একটি স্ক্রোল বা খাতা যেভাবে মুড়িয়ে ছোট করে ফেলা হয়, বিগ ক্রাঞ্চের সময় ঠিক তেমনিভাবে ত্রিমাত্রিক স্থান (Space) নিজের ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে সংকুচিত হয়ে যাবে। আয়াতটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, সৃষ্টির শুরুর বিন্দুতে মহাবিশ্বকে যেভাবে শূন্য থেকে একটি ঘনীভূত অবস্থায় আনা হয়েছিল, ধ্বংসের সময়ও তা আবার সেই আদি অবস্থায় ফিরে যাবে। এতে কোরআনের আদি সৃষ্টি ও ধ্বংসের বিবরণে পরম সঙ্গতি প্রকাশ পায়।
৪. মহাজাগতিক তরঙ্গে ধ্বংস ও পুনর্গঠন: সূরা আয-যুমারের ৬৮ নম্বর আয়াত
মহাবিশ্বের এই চূড়ান্ত সংকোচন বা কিয়ামত কীভাবে ঘটবে এবং এরপর কীভাবে আবার নতুন সৃষ্টিজগৎ শুরু হবে, তার চূড়ান্ত বিবরণ রয়েছে এই আয়াতে।
প্রচলিত অনুবাদ (Surface Meaning):
"আর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, ফলে আসমানসমূহ ও যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুঁশ হয়ে (মৃত্যুবরণ করে) পড়বে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তারা ব্যতীত। অতঃপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন তারা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।"
বিজ্ঞানভিত্তিক ভাবার্থ অনুবাদ (Scientific Reflection):
"এবং (মহাবিশ্বের স্থান-কালে) এক প্রচণ্ড মহাজাগতিক তরঙ্গ বা শক্তির কম্পন (Energy Blast) ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যার ফলে মহাকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমস্ত শক্তির উৎস ও জীবজগৎ স্থবির ও ধ্বংস হয়ে পড়বে (System Collapse); তবে আল্লাহ যাকে রক্ষা করতে চান সে ব্যতিরেকে। অতঃপর আবার সেই তরঙ্গের (Vibration) বিপরীতমুখী পুনরাবৃত্তি ঘটানো হবে, তখন মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু পুনর্গঠিত হয়ে (Re-structured) বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে যাবে।"
সমন্বিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:
1. 'সূর' বা মহাজাগতিক তরঙ্গ (Cosmic Wave): শূন্য মাধ্যমে সাধারণ শব্দ ভ্রমণ করতে পারে না। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, 'ফুঁক দেওয়া' হলো তীব্র শক্তির একটি প্রবাহ বা মহাজাগতিক কম্পন তরঙ্গ (Cosmic Vibration Wave)। আধুনিক 'স্ট্রিং থিওরি' (String Theory) অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা এক একটি নির্দিষ্ট কম্পনে টিকে আছে। প্রথম ফুঁকটি হবে এমন এক উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ, যা পদার্থের পরমাণুর ভেতরের বন্ধন (Atomic Bonds) এবং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যকার মহাকর্ষীয় ভারসাম্য এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
2. 'সা’ইকা' বা স্থবিরতা (Total Collapse): আয়াতে ব্যবহৃত 'সা’ইকা' (فَصَعِقَ) শব্দের অর্থ 'বেহুঁশ বা স্তব্ধ হওয়া'। বৈজ্ঞানিক নিয়মে, চরম তাপ, চাপ বা বিকিরণের মুখোমুখি হলে যেকোনো জীবন্ত কোষ বা বস্তুর গাঠনিক সাম্যাবস্থা ভেঙে পড়ে। এই প্রচণ্ড মহাজাগতিক তরঙ্গের আঘাতে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা এন্ট্রপির চরম বিপর্যয় ঘটবে এবং সব শক্তি স্তব্ধ হয়ে যাবে।
3. দ্বিতীয় ফুঁক বা পুনর্গঠন (Reverse Cosmic Process): আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, "অতঃপর আবার ফুঁক দেওয়া হবে"। এটি মূলত শক্তির এক বিপরীতমুখী প্রবাহ বা এন্ট্রপি বিপরীতকরণ (Entropy Reversal) প্রক্রিয়া। প্রথম তরঙ্গে যেখানে সবকিছু ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিল, দ্বিতীয় তরঙ্গের সুশৃঙ্খল কম্পন সেই ছড়িয়ে থাকা উপাদান ও কণাগুলোকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মানুষের কঙ্কাল, পেশী এবং ডিএনএ (DNA) আকারে পুনরায় জোড়া লাগিয়ে (Reconstruct) সজাগ করে তুলবে।
উপসংহার ও পাঠকের ভাবনার খোরাক:
সূরা আন-নিসা-এর ৮২ নম্বর আয়াতের আলোকেই কোরআনের এই মহাজাগতিক জীবনচক্রটি আবর্তিত হয়:
{শূন্য থেকে আদি সৃষ্টি (২১:৩০)} >
{সম্প্রসারণ (৫১:৪৭)} >
{সংকোচন (২১:১০৪)} >
{তরঙ্গে ধ্বংস ও পুনর্গঠন (৩৯:৬৮)}
এখানে কোনো বৈপরীত্য নেই, কোনো অসঙ্গতি নেই। আল্লাহ তা'আলা কোনো পূর্ব-বিদ্যমান কাঁচামালের মুখাপেক্ষী রূপান্তরকারী নন; তিনি স্থান, কাল ও পদার্থের আদি স্রষ্টা। তিনি যেভাবে পরম শূন্যতা থেকে প্রথমবার সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই দ্বিতীয়বার সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন।
আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো কোরআনের এই সুশৃঙ্খল বর্ণনাকে খণ্ডন তো করেই না, বরং এর ঐশ্বরিক সত্যতা এবং নির্ভুলতাকে আরও বেশি প্রদীপ্ত করে তোলে।
©আলম - ২৯ জুন ২০২৬ইং
#BIGBANG #BigCrunch #Quran #science

