নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানানো

আলম এম.আলম এম.১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কুরআনিক • মানব প্রবৃত্তি, কর্তৃত্ব ও নৈতিক দায়িত্ব

কুরআনের আলোকে মানুষের অন্তর্গত কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব

মানুষের জীবনে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, তার সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত নিয়ামক কী? সে কি নিজের আকাঙ্ক্ষা, পছন্দ ও প্রবণতাকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি তার নিজের ইচ্ছারও ঊর্ধ্বে একটি সত্য ও নির্দেশনা থাকবে, যার সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তকে মিলিয়ে দেখতে হবে?

কুরআন এই প্রশ্নটিকে সরাসরি মানুষের অন্তর্গত অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেখানে এমন একজন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যে কোনো দৃশ্যমান মূর্তিকে উপাস্য বানায়নি, কিন্তু নিজের হাওয়াকেই তার ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

📖 কুরআন ২৫:৪৩ (সূরা আল-ফুরকান)
আয়াত ৪৩

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

উচ্চারণ: “Afara’ayta manittakhadha ilāhahu hawāhu”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“তুমি কি পর্যবেক্ষণ করেছ তাকে, যে তার নিজস্ব প্রবণতাকেই তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে?”

🔍 শব্দতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: إِلَٰه (ilāh) এবং هَوَىٰ (hawā)

এখানে কুরআনের বক্তব্য বোঝার জন্য দুটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: إِلَٰه (ilāh) এবং هَوَىٰ (hawā)।

إِلَٰه (Ilāh)

এমন একটি কর্তৃত্ব বা সত্তার ধারণা বহন করে, যার প্রতি মানুষ নির্ভরতা, আনুগত্য ও কর্তৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে।

هَوَىٰ (Hawā)

মানুষের এমন প্রবণতা বা আকর্ষণকে নির্দেশ করে, যা তাকে কোনো নির্দিষ্ট পছন্দ বা আকাঙ্ক্ষার দিকে টেনে নেয়।

তাই আয়াতটির বক্তব্যকে শুধু “নিজের কামনার উপাসনা” হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে এর কাঠামোগত অর্থটি আড়ালে চলে যায়।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো: মানুষের ইচ্ছা কি সত্যের অধীন, নাকি মানুষের ইচ্ছাই সত্য নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে গেছে?

📜 একই বিষয় আরও স্পষ্টভাবে: সূরা আল-জাসিয়া (৪৫:২৩)

কুরআন একই প্রশ্ন আবার আরও বিস্তারিত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি সহকারে উত্থাপন করেছে:

📖 কুরআন ৪৫:২৩ (সূরা আল-জাসিয়া)
আয়াত ২৩

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

উচ্চারণ: “Afara’ayta manittakhadha ilāhahu hawāhu wa-aḍallahu Allāhu ʿalā ʿilmin wa-khatama ʿalā samʿihi wa-qalbihi wa-jaʿala ʿalā baṣarihi ghishāwatan fa-man yahdīhi min baʿdillāh, afalā tadhakkarūn”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“তুমি কি পর্যবেক্ষণ করেছ তাকে, যে তার নিজস্ব প্রবণতাকেই তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে? আর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে পথচ্যুত অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছেন; তার শ্রবণ-ব্যবস্থা ও হৃদয়ের ওপর সিলমোহর স্থাপন করেছেন এবং তার দৃষ্টির ওপর একটি আবরণ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর পরে কে তাকে পথনির্দেশ করবে? তবু কি তোমরা উপলব্ধি করবে না?”

এখানে ২৫:৪৩-এর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য আরও বিস্তৃত হয়েছে:

১
اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

তার হাওয়াকে তার ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা।

২
وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍ

জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আত্মঘাতীভাবে পথচ্যুত হওয়া।

৩
খাতামা ও গিশাওয়া (সিলমোহর ও প্রতিবন্ধকতা)

শ্রবণ, হৃদয় ও দৃষ্টির ওপর জৈব-মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হওয়া।

অর্থাৎ নিজের প্রবণতাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্বে বসানো কেবল একটি আচরণগত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সত্য গ্রহণ ও বাস্তবতা উপলব্ধির সক্ষমতারও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

⚖️ ইচ্ছা থাকা এবং ইচ্ছার অধীন হয়ে যাওয়া এক নয়

কুরআন মানুষের ইচ্ছাকে অস্বীকার করে না। বরং সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে হাওয়ার অনুসরণকে। আল্লাহ বলেন:

📖 কুরআন ৩৮:২৬ (সূরা সাদ)
আয়াত ২৬

وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ

উচ্চারণ: “Wa-lā tattabiʿi al-hawā fa-yuḍillaka ʿan sabīli Allāh”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“তুমি সেই প্রবণতার অনুসরণ করো না, যা তোমাকে আল্লাহর নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে।”

এখানে تَتَّبِعِ (tattabiʿ) অর্থ অনুসরণ করা, আর الْهَوَىٰ (al-hawā) হলো সেই অভ্যন্তরীণ প্রবণতা যা মানুষকে নিজের পছন্দের দিকে টেনে নেয়।

ফলে কুরআনের বক্তব্যকে এভাবে বোঝা যায়:

মৌলিক সূত্র ১

মানুষের ইচ্ছা থাকবে, কিন্তু ইচ্ছা সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হবে না।

মৌলিক সূত্র ২

মানুষ কোনো কিছু চাইতে পারে, কিন্তু তার চাওয়াই সত্যের প্রমাণ নয়।

মৌলিক সূত্র ৩

মানুষ কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ করতে পারে, কিন্তু পছন্দের কারণে সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়ে যায় না।

এই পার্থক্যটিই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

👤 যখন “আমি চাই” দায়িত্বের জায়গা দখল করে

এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় মানুষের পারিবারিক জীবনে। একজন মানুষ বলতে পারে:

“আমার জীবন, তাই আমি যেভাবে চাই সেভাবেই চলব।”
“আমার অর্থ, তাই কারও প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব নেই।”
“আমি চাইলে পরিবারকে সময় দেব।”
“চাইলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখব।”
“চাইলে সন্তান নেব।”
“চাইলে কোনো দায়িত্ব নেব না।”

বাক্যগুলো আলাদা আলাদা করে দেখলে এগুলো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু কুরআনের কাঠামোতে প্রশ্নটি অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়:

❓ কুরআনিক কাঠামোর মৌলিক প্রশ্ন:

“একজন মানুষের ইচ্ছা কি তার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য মানুষের অধিকার ও দায়িত্বকে বাতিল করে দিতে পারে?”

কুরআনের উত্তর হলো: না। কারণ মানুষকে কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়নি। তার সঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং অন্য মানুষের সম্পর্কও কুরআনের নৈতিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ।

🏡 পরিবার: নিজের হাওয়ার সবচেয়ে বাস্তব পরীক্ষা

পিতা-মাতার প্রসঙ্গে কুরআন যে অকাট্য নৈতিক বিধান দেয়:

📖 কুরআন ১৭:২৩ (সূরা বনি ইসরাঈল)
আয়াত ২৩

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

উচ্চারণ: “Wa-qaḍā rabbuka allā taʿbudū illā iyyāhu wa-bil-wālidayni iḥsānan. Immā yablughanna ʿindaka al-kibara aḥaduhumā aw kilāhumā falā taqul lahumā uffin wa-lā tanharhumā wa-qul lahumā qawlan karīman”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“আর তোমার প্রতিপালক নির্ধারণ করেছেন: তোমরা তাঁর ছাড়া অন্য কোনো কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি উৎকৃষ্ট আচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে পৌঁছে যায়, তবে তাদের প্রতি বিরক্তির প্রকাশ ঘটিও না, তাদের প্রত্যাখ্যান করো না এবং তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় কথা বলো।”

আয়াতের শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো দেখা যায়:

প্রথম স্তর:

أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ

আল্লাহ ছাড়া কারো দাসত্ব নয় (সর্বোচ্চ আনুগত্য)।

দ্বিতীয় স্তর:

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

পিতা-মাতার প্রতি উৎকৃষ্ট আচরণ (পারিবারিক দায়বদ্ধতা)।

অর্থাৎ মানুষের সর্বোচ্চ আনুগত্যের প্রশ্নের পরই পারিবারিক দায়িত্বের প্রশ্ন এসেছে। এটি কাকতালীয় নয়। যে মানুষ নিজের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বানিয়ে নেয়, তার কাছে দায়িত্ব প্রায়ই ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু কুরআনের কাঠামোতে দায়িত্ব কেবল তখনই পালনযোগ্য নয় যখন তা আমার ইচ্ছার সঙ্গে মিলে যায়।

🛡️ পরিবারকে রক্ষা করা: ব্যক্তিস্বাধীনতার বিপরীত নয়

📖 কুরআন ৬৬:৬ (সূরা আত-তাহরীম)
আয়াত ৬

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

উচ্চারণ: “Yā ayyuhalladhīna āmanū qū anfusakum wa-ahlīkum nārā”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“হে যারা ঈমানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছ, তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে সুরক্ষিত রাখো।”

এখানে قُوا (qū) এসেছে و ق ي (wa-qā-yā) মূল থেকে। এর মধ্যে সুরক্ষা, প্রতিরোধ এবং ক্ষতিকর পরিণতি থেকে রক্ষার ধারণা রয়েছে।

আর লক্ষ্য করুন: أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ — “তোমাদের নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার।” অর্থাৎ মানুষের দায়িত্বের পরিসর নিজের সত্তার মধ্যে শেষ হয়ে যায় না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেও তার দায়িত্ব রয়েছে।

যদি কোনো ব্যক্তি নিজের হাওয়াকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বানায়, তাহলে সে বলতে পারে: “আমি যা চাই, সেটাই করব।” কিন্তু কুরআন তাকে মনে করিয়ে দেয়:

✓ তুমি একা নও।
✓ তোমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য মানুষের জীবনও যুক্ত।
✓ তোমার পরিবার আছে।
✓ তোমার ওপর দায়িত্ব আছে।

সুতরাং নিজের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্বে বসানো মানে শুধু নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা নয়; এর প্রভাব সম্পর্ক ও দায়িত্বের ক্ষেত্রেও পড়ে।

🌱 মানুষ কেন দায়িত্ব গ্রহণ করবে?

কুরআন মানুষের সৃষ্টির একটি মৌলিক দিক এভাবে প্রকাশ করেছে:

📖 কুরআন ৫১:৫৬ (সূরা আয-যারিয়াত)
আয়াত ৫৬

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

উচ্চারণ: “Wa-mā khalaqtul-jinna wal-insa illā li-yaʿbudūn”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করিনি, শুধু এজন্য যে তারা আমার প্রতি দায়িত্বশীল আনুগত্যের অবস্থানে থাকবে।”

يَعْبُدُونَ (yaʿbudūn) এসেছে ع ب د (ʿa-ba-da) মূল থেকে। এই মূলের সঙ্গে ʿabd বা বান্দা ধারণাটিও যুক্ত।

এখানে মানুষের অবস্থানকে স্বেচ্ছাচারী স্বয়ংসম্পূর্ণতার অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং মানুষ এমন একটি সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে, যেখানে তার ওপর একটি উচ্চতর কর্তৃত্ব রয়েছে এবং তার জীবন সেই কর্তৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কথা।

তাই “আমি যা চাই তাই করব” এবং “আমি সত্যের অধীন” — এই দুই অবস্থান কুরআনের আলোচনায় এক নয়।

🌊 মানুষ কি সত্যিই স্বয়ংসম্পূর্ণ?

নিজের হাওয়াকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে বসানোর পেছনে একটি ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে: “আমি নিজের জন্য যথেষ্ট।”

📖 কুরআন ৩৫:১৫ (সূরা ফাতির)
আয়াত ১৫

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ

উচ্চারণ: “Yā ayyuhan-nāsu antumul-fuqarā’u ilā Allāh, wallāhu huwa al-ghaniyyul-ḥamīd”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“হে মানুষ, তোমরাই আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল; আর আল্লাহই অমুখাপেক্ষী, সকল প্রশংসার অধিকারী।”

فُقَرَاء (fuqarāʾ) এসেছে ف ق ر (fa-qa-ra) মূল থেকে, যার মধ্যে প্রয়োজন, নির্ভরতা ও অভাবের ধারণা রয়েছে। মানুষ নিজের অস্তিত্বের ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়:

• সে নিজের জন্ম নির্ধারণ করেনি।
• নিজের মৃত্যুও নির্ধারণ করে না।
• প্রকৃতির সব শর্ত সে নিয়ন্ত্রণ করে না।
• নিজের শরীরের প্রতিটি প্রক্রিয়াও নিজে পরিচালনা করে না।

তার জ্ঞানও সীমাবদ্ধ। অতএব “আমি-ই আমার সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব” ধারণাটি কুরআনের মানুষের বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

🌍 পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান: দায়িত্বের ধারণা

📖 কুরআন ২:৩০ (সূরা আল-বাকারা)
আয়াত ৩০

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً

উচ্চারণ: “Wa-idh qāla rabbuka lil-malā’ikati innī jāʿilun fī al-arḍi khalīfah”
🔬 Modern / Scientific Translation:

“আর যখন তোমার প্রতিপালক মালাইকাদের বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত উত্তরসূরি স্থাপন করতে যাচ্ছি।’”

خَلِيفَة (khalīfah) এসেছে خ ل ف (kha-la-fa) মূল থেকে। এর সঙ্গে পরবর্তীকরণ, স্থলাভিষিক্ত হওয়া এবং একের পর এক অবস্থান গ্রহণের ধারণা সম্পর্কিত।

এখানে মানুষের অবস্থানকে সীমাহীন স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে পড়ার প্রয়োজন নেই। বরং কুরআনের সামগ্রিক কাঠামোতে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। এই কারণে মানুষের পরিবার, সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ এবং সিদ্ধান্তের বিষয়গুলোও তার নৈতিক দায়িত্বের অংশ হয়ে ওঠে।

🎯 নিজের হাওয়ার বিপরীতে সত্যকে গ্রহণ করা

কুরআন মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পার্থক্য তৈরি করে:

ইচ্ছা থাকা অপরাধ নয়। কিন্তু ইচ্ছাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সেটিই সত্য ও সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে যায়, সেটিই সমস্যার জায়গা।

মানুষ চাইতে পারে। মানুষ পছন্দ করতে পারে। মানুষ কোনো সিদ্ধান্তের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। কিন্তু তাকে নিজের ইচ্ছাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাও রাখতে হবে।

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

“তুমি কি পর্যবেক্ষণ করেছ তাকে, যে তার নিজস্ব প্রবণতাকেই তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে?”

এখানে هَوَاهُ শুধু কোনো একটি কামনা নয়। এটি তখন একটি বিকল্প কর্তৃত্বের অবস্থানে পৌঁছে যায়।

⚡ পরিবারে এই প্রশ্নটি সবচেয়ে স্পষ্ট

একজন বাবা যদি বলেন, “আমার জীবন, তাই সন্তানের প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব নেই” — তাহলে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা অন্য একটি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে।

একজন সন্তান যদি বলেন, “আমার জীবন, তাই বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব নেই” — সেখানেও ব্যক্তিগত ইচ্ছা একটি সম্পর্কগত দায়িত্বকে অস্বীকার করছে।

একজন স্বামী যদি বলেন, “আমার উপার্জন, তাই পরিবারের প্রতি আমার কোনো দায়িত্ব নেই” — সেখানেও একই সমস্যা।

অর্থাৎ পরিবার এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে “আমার ইচ্ছা” এবং “আমার দায়িত্ব” সরাসরি মুখোমুখি হয়।

এই কারণেই কুরআনে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের আলোচনার সঙ্গে পরিবার ও পিতা-মাতার দায়িত্ব বারবার পাশাপাশি এসেছে। মানুষের ইচ্ছা যদি সর্বোচ্চ হয়, দায়িত্ব হয়ে যায় ঐচ্ছিক। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ যদি সর্বোচ্চ হয়, তাহলে দায়িত্ব ব্যক্তিগত সুবিধা বা অসুবিধার ওপর নির্ভর করে না।

এখানেই হাওয়ার কর্তৃত্ব এবং সত্যের কর্তৃত্বের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।

🕊️ কুরআনিক কাঠামোয় স্বাধীনতার অর্থ

কুরআন মানুষকে ইচ্ছাহীন সত্তা বানায় না। মানুষ নির্বাচন করে, মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, মানুষ গ্রহণ করে কিংবা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু মানুষের নির্বাচনকে একটি নৈতিক ও বাস্তব কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

ভ্রান্ত ধারণা:

“স্বাধীনতা মানে: আমি যা চাই তাই করব।”

কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি:

“আমি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, সেটি কি সত্য, ন্যায় ও দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?”

এই পার্থক্যটি বোঝা গেলে ২৫:৪৩-এর বক্তব্যও আরও স্পষ্ট হয়। নিজের ইচ্ছা থাকা সমস্যা নয়। নিজের ইচ্ছাকে ইলাহ বানানোই সমস্যা।

🩺 অন্তরের রোগটি কোথায়?

৪৫:২৩-এ আবার ফিরে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়:

اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ

সে নিজের হাওয়াকে তার ইলাহ বানিয়েছে।

এখানে কোনো মূর্তির প্রয়োজন নেই। কোনো বাহ্যিক প্রতিমার প্রয়োজন নেই। মানুষ মুখে নিজেকে “ঈশ্বর” ঘোষণা না করেও বাস্তব জীবনে এমন অবস্থায় যেতে পারে যেখানে তার নিজের ইচ্ছাই চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে কাজ করে।

সে তখন সত্যকে নিজের ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য করাতে চায়। নিজের পছন্দকে প্রশ্ন করতে চায় না। নিজের সুবিধার বিপরীতে কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায় না। পরিবারের ক্ষেত্রেও সে বলে:

“আমি চাইলে করব” “চাইলে করব না” “আমার জীবন” “আমার সিদ্ধান্ত” “আমার অর্থ” “আমার ইচ্ছা”

কুরআনের প্রশ্ন হলো: এই ‘আমার’ কি শেষ পর্যন্ত কোনো উচ্চতর সত্যের অধীন, নাকি এটিই সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে পরিণত হয়েছে?

🪞 সার্বজনীন আয়না

কুরআনের দৃষ্টিতে আত্মপরীক্ষা

এই আলোচনাকে কোনো নির্দিষ্ট সভ্যতা, দেশ বা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বক্তব্য হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। কুরআনের প্রশ্নটি সার্বজনীন। প্রত্যেক মানুষ নিজের কাছে প্রশ্ন করতে পারে:

?

আমি কি সত্যের কারণে নিজের ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারি?

?

আমার কোনো আকাঙ্ক্ষা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সত্যের চেয়েও সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?

?

আমি কি দায়িত্বকে কেবল সুবিধাজনক হলে গ্রহণ করি?

?

আমার পরিবার ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কি আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছাই শেষ কথা?

?

আমি কি নিজের পছন্দকে সত্যের অধীন রাখি, নাকি সত্যকে নিজের পছন্দের অধীন করি?

💡 উপসংহার (Core Reflection)

এই প্রশ্নগুলোই ২৫:৪৩-এর আয়াতকে একটি জীবন্ত আত্মপরীক্ষায় পরিণত করে—
“أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ” (তুমি কি পর্যবেক্ষণ করেছ তাকে, যে তার নিজস্ব প্রবণতাকেই তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে?)

কুরআনের আলোচনায় মানুষের মর্যাদা সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতায় নয়। মানুষের মর্যাদা হলো সত্যকে চিনতে পারা, নিজের প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এবং নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে গ্রহণ করা। তার ইচ্ছা আছে, কিন্তু ইচ্ছাই তার ইলাহ নয়। তার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু স্বাধীনতাই তার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব নয়। তার পরিবার আছে, তার ওপর দায়িত্ব আছে। তার জীবন আছে, কিন্তু সেই জীবনও তার নিজের তৈরি নয়।

“মানুষ কি নিজের হাওয়ার দ্বারা পরিচালিত হবে, নাকি নিজের হাওয়াকে সত্যের অধীন রাখবে?”

কুরআন এই প্রশ্নের উত্তর মানুষের বাইরের জগতে নয়, তার নিজের অন্তরের মধ্যেই খুঁজতে বলে।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।