“খতনা বা খিতান (خِتَان, khitān) মুসলিম সমাজে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত একটি শারীরিক প্রথা। কিন্তু কুরআনের পাঠের ভেতরে এই প্রথার অবস্থান কী, তা নির্ধারণ করতে হলে প্রথমে দেখতে হয় কুরআন মানুষ ও তার সৃষ্টিগত গঠন সম্পর্কে কী বলছে এবং ধর্মীয় বিধান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুমতির বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপন করছে।”
একটি বিষয় শুরুতেই ভাষাগতভাবে পরিষ্কার করা যায়: خِتَان (খিতান) শব্দটি কুরআনের কোনো আয়াতে নেই। কুরআনে খতনা করার সরাসরি কোনো নির্দেশও নেই। তবে শুধু কোনো শব্দের অনুপস্থিতি দিয়ে একটি প্রথা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কুরআনের সংশ্লিষ্ট শব্দ, সৃষ্টিতত্ত্বের মূলনীতি ও দ্বীনি বিধান প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো একসঙ্গে অনুপুঙ্খ পাঠ করা প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য: খিতান (خِতَان) প্রত্যয়টি কুরআনের ৬,২৩৬টি আয়াতের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। অথচ অজু, গোসল, পবিত্রতা (তাহারাত) কিংবা শারীরিক শুদ্ধতার অন্যান্য বিধি অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রত্যক্ষ ভাষায় কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
১. মানুষকে কী গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে? — সূরা আত-তীন ৯৫:৪
এই আলোচনার কেন্দ্রে প্রথম যে আয়াতটি আসে, তা সূরা আত-তীন ৯৫:৪:
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ
উচ্চারণ: Laqad khalaqnā al-insāna fī aḥsani taqwīm.
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি।”
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ দুটি হলো أَحْسَنِ (আহসানি) এবং تَقْوِيمٍ (তাকওয়ীম)।
أَحْسَنِ — আহসানি
এই মূলের কেন্দ্রীয় অর্থের মধ্যে রয়েছে ভালো, সুন্দর, উত্তম ও পরিপূর্ণ হওয়া। أَحْسَن (আহসান) হলো حَسَن (হাসান)-এর superlative (সর্বোচ্চ স্তরীয়) রূপ:
- অধিক উত্তম
- সর্বোত্তম / পরম শ্রেষ্ঠ
- সবচেয়ে সুন্দর ও ত্রুটিহীন
تَقْوِيم — তাকওয়ীম
এই মূলের সঙ্গে দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, সোজা হওয়া, ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং কোনো কিছুকে একটি যথাযথ অবস্থায় বিন্যস্ত করার অর্থগত সম্পর্ক রয়েছে। এটি قَوَّمَ ક્રিয়ার ভাববাচ্য বা مصدر (Verbal noun)।
- সর্বোত্তম শারীরিক গঠন
- যথাযথ কাঠামো ও বিন্যাস
- সুসংগঠিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সত্তা
সুতরাং أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ (আহসানি তাকওয়ীম)-কে কেবল বাহ্যিক “সুন্দর মুখশ্রী” হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের সামগ্রিক জৈবিক গঠন, প্রতিটি অঙ্গের নিখুঁত বিন্যাস ও সুসংগঠিত ভারসাম্য হিসেবে পাঠ করা আবশ্যক। কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা: মানুষকে কোনো জন্মগত ত্রুটি বা অপূর্ণতা দিয়ে নয়, বরং সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে।
২. শুধু মানুষ নয়, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি বিষয়কে উত্তম করেছেন — সূরা আস-সাজদাহ ৩২:৭
ٱلَّذِيٓ أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُۥ ۖ وَبَدَأَ خَلْقَ ٱلْإِنسَٰنِ مِن طِينٍ
উচ্চারণ: Alladhī aḥsana kulla shay'in khalaqahū, wa bada'a khalqa al-insāni min ṭīn.
অনুবাদ: “যিনি তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি বিষয়কে উত্তম করেছেন এবং মানুষের সৃষ্টির সূচনা করেছেন মাটি থেকে।”
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: ক্রিয়াপদ ও ব্যাপকতা
এখানে أَحْسَنَ (আহসানা) ক্রিয়াপদটি এসেছে সম্পন্ন ক্রিয়া (فعل ماضٍ) হিসেবে: “তিনি উত্তম করেছেন”, “সুন্দর ও সুনিপুণ করেছেন”। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে كُلَّ شَيْءٍ (কুল্লা শাই'ইন):
প্রত্যেক, সকল, সম্যক—যা কোনো ব্যতিক্রমকে অনুমোদন করে না।
বিষয়, বস্তু, অঙ্গ, সত্তা বা অস্তিত্বশীল যেকোনো বাস্তবতা।
বাক্যটির গাণিতিক ও কাঠামোগত রূপ: أَحْسَنَ + كُلَّ شَيْءٍ — অর্থাৎ “তিনি প্রতিটি উপাদানকে নিখুঁত ও উত্তম করেছেন।” এই ঘোষণা প্রমাণ করে, আল্লাহর মূল সৃষ্টিতে কোনো অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় বা সংশোধনযোগ্য অসম্পূর্ণ অংশ রেখে সৃষ্টি করা হয়নি।
৩. মানুষের আকৃতি সম্পর্কে সরাসরি ঘোষণা — সূরা গাফির ৪০:৬৪
ٱللَّهُ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلْأَرْضَ قَرَارًا وَٱلسَّمَاءَ بِنَاءً وَصَوَّرَكُمْ فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ وَرَزَقَكُم مِّنَ ٱلطَّيِّبَٰتِ ۚ ذَٰلِكُمُ ٱللَّهُ رَبُّكُمْ ۖ فَتَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ
উচ্চারণ: Allāhu alladhī jaʿala lakumu al-arḍa qarāran was-samā'a binā'an wa-ṣawwarakum fa-aḥsana ṣuwarakum wa-razaqakum minaṭ-ṭayyibāt. Dhālikumullāhu rabbukum fa-tabārakallāhu rabbul-ʿālamīn.
অনুবাদ: “আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে স্থির আবাস করেছেন এবং আকাশকে নির্মাণ করেছেন; আর তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন, অতঃপর তোমাদের আকৃতিকে উত্তম করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম বিষয়সমূহ থেকে রিজিক দিয়েছেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। অতএব বরকতময় আল্লাহ, জগতসমূহের রব।”
صَوَّرَ (ṣawwara)-এর ধাতু ص و ر (ṣ-w-r)। এর অর্থ রূপ দেওয়া, আকৃতি দেওয়া, কাঠামোতে স্থাপন করা। আর صُوَر (ṣuwar) হলো صُورَة (ṣūrah)-এর বহুবচন, যার অর্থ সামগ্রিক গঠন ও বাহ্যিক-অভ্যন্তরীণ রূপ।
কুরআন এখানে জোর দিয়ে বলছে যে, মানুষের শারীরিক অবয়ব আকৃতি দেওয়ার পর আল্লাহ নিজেই তাকে সর্বোত্তম হিসেবে সিলমোহর করেছেন।
৪. গঠন, সমতা ও ভারসাম্য — সূরা আল-ইনফিতার ৮২:৭–৮
ٱلَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّىٰكَ فَعَدَلَكَ فِيٓ أَيِّ صُورَةٍ مَّا شَاءَ رَكَّبَكَ
উচ্চারণ: Alladhī khalaqaka fa-sawwāka fa-ʿadalak, fī ayyi ṣūratin mā shā'a rakkabak.
অনুবাদ: “যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুষম করেছেন, তারপর তোমাকে ভারসাম্যপূর্ণ করেছেন; যে আকৃতিতে তিনি ইচ্ছা করেছেন, তাতে তোমাকে সংযোজিত করেছেন।”
এখানে সৃষ্টিগত পরিপূর্ণতার তিনটি ধারাবাহিক পর্যায় পরপর এসেছে:
خَلَقَكَ
খালাকাকা
তোমাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে সৃষ্টি করেছেন।
فَسَوَّاكَ
ফাসাওয়াকা
ধাতু: س و ي — তোমাকে সুষম, পরিমিত ও সুবিন্যস্ত করেছেন।
فَعَدَلَكَ
ফা'আদালাকা
ধাতু: ع د ل — নিখুঁত ভারসাম্য ও সমানুপাতিকতা দান করেছেন।
পরের আয়াতে বলা হয়েছে: فِيٓ أَيِّ صُورَةٍ مَّا شَاءَ رَكَّبَكَ (যে আকৃতিতে ইচ্ছা করেছেন, সংযোজিত করেছেন)। এখানে رَكَّبَ (রাক্কাবা)-এর মূল ধাতু ر ك ب (র-কাফ-বা), যার অর্থ বিভিন্ন উপাদানকে সুশৃঙ্খলভাবে পরস্পরের সাথে যুক্ত করা ও সমন্বিত বায়োলজিক্যাল কাঠামোতে স্থাপন করা।
৫. সৃষ্টি পরিবর্তনের প্রসঙ্গে সূরা আন-নিসা ৪:১১৯
আলোচনাটি এখন আরও গভীর একটি স্তরে প্রবেশ করে। সূরা আন-নিসা ৪:১১৯-এ মানবজাতিকে বিপথগামী করার শয়তানি ষড়যন্ত্রের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে:
وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا
উচ্চারণ: Wa la-uḍillannahum wa la-umanniyannahum wa la-āmurannahum fa-layubattikunna ādhāna al-anʿām, wa la-āmurannahum fa-layughayyirunna khalqa Allāh. Wa man yattakhidhi ash-shayṭāna waliyyan min dūni Allāhi faqad khasira khusrānan mubīnā.
অনুবাদ: “আর আমি অবশ্যই তাদের পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আকাঙ্ক্ষায় প্রলুব্ধ করব এবং তাদেরকে নির্দেশ দেব; ফলে তারা অবশ্যই গবাদিপশুর কান ছিন্ন করবে। আর আমি তাদেরকে নির্দেশ দেব; ফলে তারা অবশ্যই আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করবে। আর যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে শয়তানকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে, সে তো স্পষ্ট ক্ষতির মধ্যে পড়েছে।”
يُغَيِّرُنَّ — ইউগাইয়্যিরুন্না
ধাতু: غ ي ر (gha-ya-ra) — পরিবর্তন করা, কাটছাঁট করা, রূপান্তর ঘটানো, স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিকৃত করা।
خَلْقَ اللَّهِ — খালক আল্লাহ
ধাতু: خ ل ق (kha-la-qa) — আল্লাহর প্রাকৃতিক সৃষ্টি, নিখুঁত সৃষ্টিগত গঠন ও জীবদেহের স্বাভাবিক শারীরিক অবয়ব।
তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ: আয়াতে পৌত্তলিকদের দ্বারা গবাদিপশুর কান ছিদ্র বা কর্তন করার মতো বাহ্যিক শারীরিক অঙ্গচ্ছেদের কথা উল্লেখের পরপরই এসেছে “আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করা”-র সাধারণ মূলনীতি। অতএব, শরীরের স্বাভাবিক, সুস্থ ও জন্মগত সৃষ্টিকে চিরতরে কেটে বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করা কি فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ-এর আওতায় পড়ে কি না—গবেষণার জগতে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত।
৬. ধর্মীয় বিধান কে নির্ধারণ করেন? — সূরা আশ-শূরা ৪২:২১
কোনো প্রথা ধর্মীয় বিধান (দ্বীন) কি না, এই মৌলিক প্রশ্নে কুরআন সূরা আশ-শূরা ৪২:২১-এ এক চূড়ান্ত মানদণ্ড ঘোষণা করেছে:
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ ۚ وَلَوْلَا كَلِمَةُ الْفَصْلِ لَقُضِيَ بَيْنَهُمْ ۗ وَإِنَّ الظَّالِمِينَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
উচ্চারণ: Am lahum shurakā'u sharaʿū lahum mina ad-dīni mā lam ya'dhan bihi Allāh. Wa lawlā kalimatu al-faṣli la-quḍiya baynahum, wa innaẓ-ẓālimīna lahum ʿadhābun alīm.
অনুবাদ: “নাকি তাদের এমন অংশীদার রয়েছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন কিছু বিধান নির্ধারণ করেছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? আর ফয়সালার বাণী না থাকলে তাদের মধ্যে ফয়সালা হয়ে যেত। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
شَرَعُوا — শারা'ঊ
বিধান তৈরি করা, শরীয়তের রূপ দেওয়া, কোনো প্রথাকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান হিসেবে আরোপ করা।
يَأْذَن — ইয়া'যান
অনুমতি দেওয়া, অনুমোদন করা, কর্তৃত্ব প্রদান করা।
مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ = “যার কোনো অনুমতি আল্লাহ তাঁর কিতাবে দেননি।”
সুতরাং কুরআন এখানে একটি মৌলিক সীমানা টেনে দিচ্ছে: দ্বীনের মধ্যে কোনো কিছুকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় নির্দেশ হিসেবে দাবি করতে হলে সেখানে আল্লাহর সরাসরি অনুমতি ও নির্দেশ থাকতে হবে। মানবসৃষ্ট কোনো সামাজিক সংস্কার বা পূর্ববর্তী ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আল্লাহর অননুমোদিত কোনো প্রথাকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করা কুরআন সমর্থিত নয়।
৭. মানুষকে মর্যাদাবান করার ঘোষণা — সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
উচ্চারণ: Wa laqad karramnā banī Ādama wa-ḥamalnāhum fil-barri wal-baḥri wa-razaqnāhum minaṭ-ṭayyibāti wa-faḍḍalnāhum ʿalā kathīrin mimman khalaqnā tafḍīlā.
অনুবাদ: “আর অবশ্যই আমরা আদম-সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, স্থল ও সমুদ্রে তাদের বহন করেছি, তাদেরকে উত্তম বিষয়সমূহ থেকে রিজিক দিয়েছি এবং আমাদের সৃষ্ট অনেকের ওপর তাদেরকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছি।”
এখানে كَرَّمْنَا (কাররামনা)-এর মূল ধাতু ك ر م (ক-রা-ম), যার অর্থ মহিমান্বিত করা, সম্মানিত করা ও পূর্ণ মর্যাদা দান করা। আর بَنِي آدَم (বনী আদম) বলতে সামগ্রিক মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে।
গবেষণাধর্মী মৌলিক প্রশ্ন:
মানুষের সৃষ্টিগত মর্যাদা ও গঠন সম্পর্কে যখন কুরআন এমন ইতিবাচক ও দ্ব্যর্থহীন সম্মানসূচক ভাষা ব্যবহার করছে, তখন মানুষের কোনো স্বাভাবিক জন্মগত অঙ্গকে ধর্মীয়ভাবে “অসম্পূর্ণ”, “ত্রুটিযুক্ত”, “অপরিষ্কার” বা “অপবিত্র” হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি কোথায়? একজন মানুষ কি জন্মগতভাবেই অপবিত্র হয়ে পৃথিবীতে আসে, যার জন্য তাকে অস্ত্রোপচার করে পবিত্র করতে হবে? কুরআনিক তাত্ত্বিক কাঠামোর নিরিখে এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
৮. কুরআনে খতনার শব্দ নেই, অথচ অন্যান্য বিধানে স্পষ্ট ভাষা বিদ্যমান
কুরআনে خِتَان (খিতান) বা খতনা সংক্রান্ত কোনো ধাতু বা পরিভাষা নেই। এটি একটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য বিষয়। কারণ কুরআনে শরীরের সূক্ষ্মাতীত বিষয়েও বিস্তারিত ও স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে:
অজুর ক্ষেত্রে মুখ, হাত, মাথা মোছাহ ও পা ধোয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬)।
হজের ক্ষেত্রে চুল মুণ্ডন (হালক) ও ছাঁটার (তাকসীর) সুস্পষ্ট বিধান (সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৭)।
রক্ত, মৃত পশু ও শূকরের মাংস বর্জনের সুস্পষ্ট তালিকা (সূরা আল-বাকারা ২:১৭৩)।
অতএব, শারীরিক কর্তনের মতো একটি স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি ইসলামে কোনো মৌলিক দ্বীনি বা ধর্মীয় আবশ্যিকতা হতো, তবে তা কুরআনে অনুচ্চারিত থাকার কোনো যৌক্তিক অবকাশ থাকত না। এখানে আবার সূরা আশ-শূরা ৪২:২১-এর সাবধানবাণী স্মরণীয়:
“যার কোনো অনুমতি আল্লাহ দেননি।”
৯. চারটি আয়াতের ভাষাগত সাদৃশ্য: সমন্বিত শব্দার্থিক ক্ষেত্র
মানুষের সৃষ্টি ও গঠন সম্পর্কিত কুরআনের চারটি প্রধান আয়াত পাশাপাশি রাখলে একটি চমৎকার অর্থগত ঐক্য ও সুসংহত ধারা দৃশ্যমান হয়:
أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ
আহসানি তাকওয়ীম
أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ
আহসানা কুল্লা শাই'ইন খালাকাহু
فَأَحْسَنَ صُوَرَكُمْ
ফা-আহসানা সুওয়ারাকুম
فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ
ফাসাওয়াকা ফা'আদালাকা
শব্দার্থিক কনভার্জেন্স (Semantic Convergence)
এই শব্দগুলো আলাদা আলাদা আয়াতে ব্যবহৃত হলেও তাদের সমন্বিত অর্থধারা অভিন্ন:
১০. তাহলে আলোচ্য দাবিটির কাঠামো কী? — ১০-দফা যৌক্তিক ফ্রেমওয়ার্ক
পুরো আলোচনাটি কুরআনের অকাট্য বক্তব্যগুলোকে একটি ধারাবাহিক যৌক্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে:
মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে
সূরা আত-তীন ৯৫:৪ — মানুষের কোনো অঙ্গই সৃষ্টিগতভাবে অপূর্ণাঙ্গ নয়।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি উপাদানকে উত্তম করেছেন
সূরা আস-সাজদাহ ৩২:৭ — সৃষ্টির সামগ্রিক ডিজাইনে কোনো খুঁত নেই।
মানুষের আকৃতি তিনি দিয়েছেন এবং নিজেই তাকে উত্তম ঘোষণা করেছেন
সূরা গাফির ৪০:৬৪ — সুরত ও অঙ্গসংস্থান পরম উত্তম রূপ লাভ করেছে।
মানুষকে সৃষ্টি, সুষম এবং ভারসাম্যপূর্ণ করা হয়েছে
সূরা আল-ইনফিতার ৮২:৭–৮ — অঙ্গের সংযোজন নিখুঁত সমানুপাতিকতায় বিন্যস্ত।
আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তনের কথা শয়তানের বক্তব্যের মধ্যে এসেছে
সূরা আন-নিসা ৪:১১৯ — জন্মগত শারীরিক গঠন স্থায়ী পরিবর্তন করা শয়তানি প্ররোচনার নিদর্শন।
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া দ্বীনের বিধান নির্ধারণের বিরুদ্ধে কুরআন প্রশ্ন তুলেছে
সূরা আশ-শূরা ৪২:২১ — যার কোনো অনুমতি আল্লাহ দেননি, তা দ্বীনের অপরিহার্য অংশ হতে পারে না।
আদম-সন্তানকে সৃষ্টিগতভাবে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার অকাট্য ঘোষণা
সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০ — জন্মগত কোনো শারীরিক অঙ্গকে অপবিত্র বা অশুদ্ধ গণ্য করার অবকাশ নেই।
কুরআনে ‘খিতান’ শব্দের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি
কুরআনে খতনা সংক্রান্ত কোনো নির্দেশ বা পরোক্ষ ইঙ্গিতও নেই।
কুরআনিক পদ্ধতির অখণ্ড সামঞ্জস্য (সূরা ৪:৮২ ফিল্টার)
যদি আল্লাহ মানুষকে আহসান তাকওয়ীমে সৃষ্টি করে থাকেন, তবে সৃষ্টিতে ছুরি চালানোর হুকুম আল্লাহর বাণীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উপসংহার: দ্বীনি আবশ্যিকতা বনাম প্রাচীন সামাজিক রেওয়াজ
খতনা একটি প্রাচীন আঞ্চলিক বা সেমিটিক সাংস্কৃতিক প্রথা হতে পারে, কিন্তু এটি আল্লাহর নির্ধারিত কুরআনিক দ্বীন নয়।
গবেষণার সারবত্তা
কুরআন মানুষের শারীরিক গঠনকে এক চরম নৈপুণ্যময় ও সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কোনো ঐতিহাসিক প্রথা বা প্রচলিত সংস্কার সমাজে কত দীর্ঘকাল ধরে বহাল আছে, তা কোনো প্রথাকে ঐশী ধর্মের অঙ্গ বানানোর মাপকাঠি হতে পারে না। চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো: আল্লাহ কি তাঁর কিতাবে এর অনুমতি দিয়েছেন? কুরআনের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য এই যে, খতনা কোনো কুরআনিক আদেশ নয়, বরং সৃষ্টিগত পূর্ণতার কুরআনিক মূলনীতির আলোকে এটি একটি বহিরাগত প্রথা।

