মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাধিগুলোর একটি হলো—পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ। সমাজে যখনই কোনো সত্যের বার্তা বা আল্লাহর ওহী এসেছে, কায়েমী স্বার্থান্বেষী ও অসচেতন গোষ্ঠী সবার আগে যে ঢালটি ব্যবহার করেছে তা হলো: “আমরা তো আমাদের বাপ-দাদাদের এই পথেই পেয়েছি!”
পবিত্র কুরআন মানবজাতিকে এই অন্ধ আনুগত্য ও পৈতৃক দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য এক বিপ্লবী ঘোষণা দিয়েছে। কুরআন বারবার প্রশ্ন তুলেছে—পূর্বপুরুষরা যদি অজ্ঞ, পথভ্রষ্ট কিংবা বিবেকহীন হয়ে থাকে, তবে তাদের অন্ধ অনুকরণে নিজের জীবন ও আখেরাত ধ্বংস করার চেয়ে বড় বোকামি আর কী হতে পারে? এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের পাঁচটি অত্যন্ত গভীর ও সুস্পষ্ট আয়াতের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হলো:
“কুরআন মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস বা বংশপরম্পরায় চলে আসা রীতি-নীতির পেছনে না ছুটে নিজের বুদ্ধি, আকল ও বিবেক খাটিয়ে আল্লাহর নাযিলকৃত সত্য গ্রহণ করার দ্ব্যর্থহীন আহ্বান জানায়।”
১. সূরা আল-বাকারা (২:১৭০) — বিবেকশূন্য অনুকরণ ও হেদায়েতের সংকট
যখন সত্যের দাওয়াত মানুষের সামনে আসে, তখন অন্ধ অনুকরণকারীরা আল্লাহর দলিলের চেয়ে পৈতৃক অভ্যাসকে বড় মনে করে। আল্লাহ তাআলা এই মানসিকতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ٱتَّبِعُوا۟ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ قَالُوا۟ بَلْ نَتَّبِعُ مَآ أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ءَابَآءَنَآ ۗ أَوَلَوْ كَانَ ءَابَآؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْـًۭٔا وَلَا يَهْتَدُونَ
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা তো তারই অনুসরণ করব যার ওপর আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি।’ যদি তাদের বাপ-দাদারা কিছুই না বুঝে থাকে এবং তারা হেদায়েতপ্রাপ্তও না হয়, তবুও কি (তারা তাদেরই অনুসরণ করবে)?”— সূরা আল-বাকারা, ২:১৭০
আকল বা বোধশক্তিহীনতা (لَا يَعْقِلُونَ): আয়াতে বলা হয়েছে, পূর্বপুরুষদের হয়তো আকল বা কার্যকর বোধশক্তিই ছিল না। তবুও তাদের অনুসরণ করা মানুষের নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে বন্ধক রাখার নামান্তর।
২. সূরা আল-মায়িদাহ (৫:১০৪) — "বাপ-দাদার আমলই যথেষ্ট" ভাবার আত্মঘাতী দম্ভ
অন্ধ অনুসারীদের অন্যতম রোগ হলো আত্মতুষ্টি। তারা মনে করে বাপ-দাদার রীতিনীতিই জীবনের জন্য চূড়ান্ত সনদ, এর বাইরে ওহী বা রাসুলের কোনো প্রয়োজন নেই:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا۟ إِلَىٰ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَإِلَى ٱلرَّسُولِ قَالُوا۟ حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ ءَابَآءَنَآ ۚ أَوَلَوْ كَانَ ءَابَآؤُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ شَيْـًۭٔا وَلَا يَهْتَدُونَ
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসুলের দিকে এসো’, তখন তারা বলে, ‘আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের যাতে পেয়েছি তা-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট।’ যদি তাদের বাপ-দাদারা কিছুই না জেনে থাকে এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত না হয়, তবুও কি?”— সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১০৪
৩. সূরা আল-আ'রাফ (৭:২৮) — অপকর্মের পক্ষে বংশীয় দোহাই ও আল্লাহর নামে অপবাদ
অন্ধ অনুকরণের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় হলো যখন মানুষ কোনো অশ্লীল কাজ বা অন্যায়কে পূর্বপুরুষদের অভ্যাস দিয়ে জায়েজ করতে চায় এবং এমনকি দাবি করে যে স্বয়ং আল্লাহই তাদেরকে এমন নির্দেশ দিয়েছেন:
وَإِذَا فَعَلُوا۟ فَـٰحِشَةًۭ قَالُوا۟ وَجَدْنَا عَلَيْهَآ ءَابَآءَنَا وَٱللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا ۗ قُلْ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِٱلْفَحْشَآءِ ۖ أَتَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
“আর যখন তারা কোনো অশ্লীল বা অপকর্ম করে, তখন বলে, ‘আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের এ কাজ করতে দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদের এটার নির্দেশ দিয়েছেন।’ বলুন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কথা বলছ যা তোমরা জানো না?’”— সূরা আল-আ'রাফ, ৭:২৮
জাহিলি যুগে মক্কার মুশরিকরা উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার মতো জঘন্য অশ্লীলতাকে পূর্বপুরুষদের রীতি ও আল্লাহর বিধান বলে প্রচার করত। আজও বহু কুসংস্কার ও অনৈসলামিক প্রথাকে "পূর্বপুরুষরা করে গেছেন, তাই সওয়াবের কাজ" বলে সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়—যা স্পষ্টত ৭:২৮ আয়াতের সরাসরি লঙ্ঘন।
৪. সূরা লুকমান (৩১:২১) — অন্ধ অনুকরণের পরিণতি: জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নি
পিতৃপুরুষদের ভুল পথের মোহে আটকে রাখা শয়তানের অন্যতম প্রধান কৌশল। যারা বাপ-দাদার ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করে, তারা প্রকৃতপক্ষে শয়তানের আহ্বানে জাহান্নামের পথ বেছে নিচ্ছে:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ٱتَّبِعُوا۟ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ قَالُوا۟ بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ ءَابَآءَنَآ ۚ أَوَلَوْ كَانَ ٱلشَّيْطَـٰنُ يَدْعُوهُمْ إِلَىٰ عَذَابِ ٱلسَّعِيرِ
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা তো তারই অনুসরণ করব যার ওপর আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি।’ শয়তান যদি তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তির দিকেও ডাকে, তবুও কি (তারা তাদের অনুসরণ করবে)?”— সূরা লুকমান, ৩১:২১
৫. সূরা আস-সাফফাত (৩৭:৬৯-৭০) — অন্ধ উন্মাদনায় পিতৃপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ
কুরআনে মানুষকে এই মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি করা হয়েছে যে, বংশপরম্পরায় চলে আসা অভ্যাসগুলো বহু ক্ষেত্রেই ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত থাকে। তা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজন্ম বিচার-বিবেচনা ছাড়াই তার পেছনে পাগলের মতো ছুটতে থাকে:
إِنَّهُمْ أَلْفَوْا۟ ءَابَآءَهُمْ ضَآلِّينَ فَهُمْ عَلَىٰٓ ءَاثَـٰরِهِمْ يُهْرَعُونَ
“নিশ্চয়ই তারা তাদের পিতৃপুরুষদের পথভ্রষ্ট পেয়েছিল। অতঃপর তারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে দ্রুত ছুটে চলেছিল।”— সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:৬৯-৭০
আরবি ভাষায় ‘ইউহরা‘ঊন’ শব্দটি এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে কেউ তীব্র আবেগে, যুক্তিহীন তাড়নায় বা যেন কারো তাড়া খেয়ে উন্মত্তের মতো দৌড়ে চলেছে। অর্থাৎ অন্ধ অনুকরণকারী ব্যক্তি নিজে থামে না, ভাবে না, যাচাই করে না—বরং পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত পথের ওপর উন্মাদ গতিতে ছুটে চলে।
৬. শব্দতত্ত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: অন্ধ অনুকরণ বনাম বিবেক
কুরআন বলে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে ব্যবহার করতে। বাপ-দাদার দোহাই মূলত আকলকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার মানসিক দাসত্ব।
কুরআনে অনুসরণ বা 'ইতিবা' করতে বলা হয়েছে ওহীর (আল্লাহ ও রাসুলের)। অন্যায়ের বা ঐতিহ্যের অন্ধ ইতিবা সরাসরি নিষিদ্ধ।
ঐতিহ্যের সঙ্গে অভ্যস্ততা বা মায়া। মানুষ যা দেখে বড় হয়, তা ভুল হলেও অভ্যাসবশত তাকে সত্য ভেবে আঁকড়ে ধরে রাখে।
৭. জাহেলিয়াতের অন্ধ অনুকরণ বনাম কুরআনের আলোকিত পথ
তুলনামূলক পর্যালোচনা
- যুক্তি ও দলিলের চেয়ে পৈতৃক অভ্যাস ও প্রথাকে বড় মনে করা।
- অন্যায়, কুসংস্কার ও অশ্লীলতার সমর্থনে ঐতিহ্যের ঢাল ব্যবহার করা।
- নিজের আকল, বিবেক ও চিন্তাশক্তিকে সম্পূর্ণ অকেজো করে রাখা।
- পরিণতি: শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়ে জাহান্নামের প্রজ্বলিত অগ্নির মুখোমুখি হওয়া (৩১:২১)।
- আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুস্পষ্ট প্রমাণের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
- বংশ ও ঐতিহ্যের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে যাচাই ও অনুধাবন করার জন্য আকল খাটানো।
- ভুল ও অমূলক ঐতিহ্যকে বর্জন করে হেদায়েতের পথে অবিচল থাকা।
- পরিণতি: আত্মিক মুক্তি, সত্যের দিশা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
৮. শিক্ষণীয় মূল বিষয় ও উপসংহার
কুরআন মানুষকে কোনো অন্ধ অন্ধবিশ্বাসী প্রাণী হিসেবে সৃষ্টি হতে শেখায় না। বরং কুরআন মানুষকে বংশপরম্পরায় চলে আসা ভুল প্রথা বা সামাজিক রীতির পেছনে না ছুটে নিজের বুদ্ধি ও বিবেক খাটিয়ে সত্য—অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের আদর্শকে আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানায়।
১. যুক্তিহীন আনুগত্য জাহেলিয়াত: বাপ-দাদার দোহাই দিয়ে অন্যায়, শিরক, বিদআত বা সামাজিক কুসংস্কারকে সমর্থন করা নিরেট জাহেলিয়াতের স্বভাব।
২. ওহী-ই চূড়ান্ত মানদণ্ড: কোনো প্রথা যতই পুরোনো হোক না কেন, তা যদি আল্লাহর নাযিলকৃত ওহীর বিপরীত হয়, তবে তা সাথে সাথেই বর্জনীয়।
৩. ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা: কেয়ামতের ময়দানে পিতা বা পূর্বপুরুষ কারও কোনো উপকারে আসবে না; প্রত্যেকের নিজের ঈমান ও কর্মের হিসাব নিজেকেই দিতে হবে।
অতএব আমাদের কর্তব্য হলো—পারিবারিক ও সামাজিক প্রথাকে অন্ধভাবে লালন না করে সর্বদা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে নিজেদের জীবন, বিশ্বাস ও কর্মকে সংশোধন করে নেওয়া।

