সূরা আল-ফাতিহা কুরআনের সূচনা। কিন্তু এর গুরুত্ব কি কেবল এতটুকুই যে এটি একটি বহুলপাঠ্য সূরা?
‘ফাতিহা’ শব্দটি আরবি فَاتِحَةٌ (Fātiḥah)। এর মূল ধাতু ف-ت-ح (ফা-তা-হা)। এই ধাতুর মৌলিক অর্থের মধ্যে রয়েছে খোলা, উন্মুক্ত করা, দ্বার উন্মোচন করা, কোনো কিছুতে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা। কুরআনেও একই ধাতুর বিভিন্ন রূপ এসেছে।
إِن تَسۡتَفۡتِحُوا۟ فَقَدۡ جَآءَكُمُ ٱلۡفَتۡحُ
এখানে فَتْح (fatḥ) অর্থ উন্মোচন বা বিজয়/ফয়সালার মাধ্যমে কোনো বন্ধ অবস্থা খুলে দেওয়া। অতএব, ফাতিহা নামটি নিজেই ‘উন্মোচন’-এর ধারণার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখান থেকে একটি অর্থবহ প্রশ্ন তৈরি হয়:
“সূরা ফাতিহা কি কেবল পাঠ করার সূচনা, নাকি এটি মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধিরও একটি সূচনা?”
⚠️ এখানে সতর্ক থাকা জরুরি। “ফাতিহা মানেই মনের তালা খোলার সূরা”—এমন সরাসরি সংজ্ঞা কুরআন দেয় না। এটি একটি ব্যাখ্যামূলক প্রয়োগ। তবে সূরা ফাতিহার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রতিটি অংশ মানুষকে নিজের অবস্থান, তার রব, তার জীবনব্যবস্থা এবং তার পথ সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন করে।
১ শুরুটা কোথা থেকে: بِسْمِ ٱللَّهِ
সূরা ফাতিহার সূচনাটি একটি অনন্য ও চিরন্তন বাক্য দিয়ে:
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
প্রচলিতভাবে ism-এর অর্থ ‘নাম’। কিন্তু কুরআনিক ব্যবহারে শুধু কোনো ব্যক্তিকে ডাকার শব্দ হিসেবে এর ভূমিকা সীমাবদ্ধ নয়। ইসম কোনো সত্তা বা বিষয়ের পরিচায়ক চিহ্ন, পরিচয় এবং নামকরণগত প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
হলো সেই নির্দিষ্ট সত্তার নাম, যাঁকে কুরআন সমগ্র অস্তিত্বের একক কর্তৃত্ব, স্রষ্টা ও রব হিসেবে উপস্থাপন করে।
এর পরেই আসে পরম দয়ার ঘোষণা: الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ (ar-Raḥmāni r-Raḥīm)। দুটি শব্দই ر-ح-م (রা-হা-মীম) ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই ধাতুর সঙ্গে করুণা, দয়া, সুরক্ষা ও পরিচর্যার অর্থগত সম্পর্ক রয়েছে। رَحِم (raḥim) শব্দটি মাতৃগর্ভকেও নির্দেশ করে। ফলে রহম-এর মধ্যে শুধু আবেগগত দয়া নয়, জীবনকে ধারণ ও পূর্ণ বিকাশের একটি অর্থগত সম্পর্কও দেখা যায়।
২ আলহামদু লিল্লাহ: প্রশংসার চেয়েও বিস্তৃত একটি ধারণা
এরপর ঘোষিত হয় সমগ্র সৃষ্টির মূল সুর:
ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ
হামদ সাধারণ প্রশংসার চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট। কোনো সত্তার পূর্ণ গুণ, যোগ্যতা বা উৎকর্ষ উপলব্ধি করে তার সচেতন স্বীকৃতির ধারণা এতে রয়েছে। তাই الْحَمْدُ لِلَّهِ-কে শুধু “আল্লাহর প্রশংসা” বললে এর জ্ঞানগত দিকটি আড়াল হয়; এটি আসলে আল্লাহর অনন্য বৈশিষ্ট্য ও সার্বভৌম কর্তৃত্বকে স্বজ্ঞানে স্বীকৃতি দেওয়া।
রব-এর অর্থকে শুধু ‘মালিক’ দিয়ে সীমাবদ্ধ করলে কুরআনিক ব্যবহার সংকুচিত হয়ে যায়। রবের মধ্যে প্রতিপালন, লালন, বিকাশ, সুশৃঙ্খল পরিচালনা এবং কোনো সৃষ্টিকে তার পূর্ণতার দিকে ধাপে ধাপে নিয়ে যাওয়ার সুগভীর ধারণা রয়েছে।
এ কারণেই رَبِّ ٱلْعَالَمِينَ একটি গভীর দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক নির্দেশ করে: সমগ্র অস্তিত্বের ক্রমবিকাশ ও পরিচালনার একমাত্র কর্তৃত্ব।
৩ “আল-আলামীন” কারা?
ٱلْعَٰلَمِينَ (al-ʿālamīn) শব্দটি ع-ل-م (ʿayn-lām-mīm) ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে রয়েছে জ্ঞান ও চিহ্নের মৌলিক ধারণা:
অতএব ʿālamīn-কে কেবল কোনো একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা মানুষের সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। এটি বহুবচনধর্মী একটি ব্যাপক মহাজাগতিক ধারণা, যা বিভিন্ন জগত ও সমগ্র সৃষ্টিসমষ্টিকে নির্দেশ করে। কুরআনের অন্যত্র স্বয়ং মূসা (আ.) ও ফিরআউনের সংলাপে এর চমৎকার সংজ্ঞা পাওয়া যায়:
قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا
এখানে রব্বুল আলামীন-এর ব্যাপ্তি স্পষ্টতই মানুষের ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র সৃষ্টি ও মহাজাগতিক অস্তিত্বের প্রতি নির্দেশ করে।
৪ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ: করুণা কি শুধু অনুভূতি?
সূরা ফাতিহায় দ্বিতীয়বার উচ্চারিত হয়: الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ (পরম দয়াময়, পরম করুণাময়)। এখানে ر-ح-م ধাতুর এই পুনরাবৃত্তি আমাদের একটি অতীব মৌলিক কুরআনিক ধারণার দিকে নিয়ে যায়। কুরআনে আল্লাহর রহমতকে অস্তিত্বের এক পরম ও সর্বব্যাপী বাস্তবতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে:
وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ
অতএব রহমতকে শুধু মানুষের সাময়িক আবেগগত ‘দয়া’ হিসেবে দেখলে কুরআনিক ধারণার মূল ব্যাপ্তি হ্রাস পায়; রহমত হলো আল্লাহর সেই মহাজাগতিক সংরক্ষণ ও প্রতিপালনের বিধান যা সমস্ত অস্তিত্বকে ধারণ করে রেখেছে।
৫ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ: মালিকানা ও জবাবদিহি
সূরা ফাতিহার পরবর্তী আয়াত মানুষের অন্তরে চূড়ান্ত জবাবদিহিতার চেতনা জাগ্রত করে:
مَٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ
মালিকানা, নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব, অখণ্ড কর্তৃত্ব এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকার।
দীন-কে কেবল প্রথাগত ‘ধর্ম’ হিসেবে অনুবাদ করলে কুরআনের বহু আয়াতের অর্থ সংকুচিত হয়ে যায়। ধাতুটির মধ্যে ঋণ, প্রতিদান, প্রতিফল, সুনির্দিষ্ট বিচার, চূড়ান্ত জবাবদিহি ও জীবনব্যবস্থার মতো গভীর অর্থক্ষেত্র জড়িয়ে রয়েছে।
যেমন সূরা আল-মাউনের শুরুতে বলা হয়েছে:
أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ
একই সূরায় দীন অস্বীকারের পরিণতি হিসেবে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্য প্রদানে অনীহার কথা এসেছে। ফলে দীন-কে শুধু বাহ্যিক আচারগত ‘ধর্ম’ হিসেবে পড়লে আয়াতটির বাস্তব সামাজিক ও নৈতিক দাবি সম্পূর্ণরূপে আড়াল হয়ে যায়।
৬ إِيَّاكَ نَعْبُدُ: মুখের ঘোষণা বনাম জীবনের বাস্তবতা
এরপর আসে সূরা ফাতিহার সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ও আমূল পরিবর্তনকারী অঙ্গীকার:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
দাসত্ব, পরম অধীনতা, শর্তহীন আনুগত্য এবং জীবনের সর্বাবস্থায় সেবার ধারণা। তাই ইবাদত-কে শুধু নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; এটি জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আল্লাহর ইচ্ছার অধীন করার নাম।
সাহায্য, শক্তি, পরিপূরকতা ও আশ্রয় গ্রহণের ধারণা। মানুষ নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে চূড়ান্ত সক্ষমতার একমাত্র উৎসের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে।
সাধারণ আরবি বাক্যক্রমের তুলনায় إِيَّاكَ (Iyyāka)-কে ক্রিয়ার পূর্বে আনা হয়েছে (তাকদীমুল মাফ'উল)। এই অগ্রাধিকার এককত্ব ও নিরঙ্কুশ বিশিষ্টতার (তাওহীদ) ওপর চূড়ান্ত জোর সৃষ্টি করে:
“একমাত্র তোমাকেই আমরা...”
এটি নিছক মুখের স্তুতি নয়; এটি মানুষের জীবনের সমস্ত সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব কার হাতে সমর্পিত হবে, সেই চূড়ান্ত বৈপ্লবিক প্রশ্নটি উত্থাপন করে।
৭ ইবাদত ও জীবনের দ্বৈততা
একজন মানুষ হয়তো মুখে উচ্চারণ করছে: إِيَّاكَ نَعْبُدُ (আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি)। কিন্তু বাস্তব জীবনে যদি তার সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি হয় অর্থলিপ্সা, ক্ষমতার মোহ, আত্মম্ভরিতা, অবৈধ লাভ কিংবা সামাজিক অন্ধ প্রথা—তাহলে তার ঘোষিত অঙ্গীকার ও বাস্তব কর্মের মাঝে তৈরি হয় বিপজ্জনক দূরত্ব। কুরআন এই রূপ আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেয়:
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ
এখানে هَوَى (hawā)-এর সঙ্গে প্রবৃত্তি, অন্ধ বাসনা ও আত্মকেন্দ্রিক ইচ্ছার আনুগত্য জড়িত। অর্থাৎ কুরআনের গভীর দর্শনে ‘ইলাহ’ কেবল কোনো মাটির বা পাথরের পুতুল নয়; মানুষের ভেতরের লাগামহীন ইচ্ছাও এমন অলঙ্ঘনীয় কর্তৃত্বে রূপ নিতে পারে, যা তাকে আল্লাহর বিপরীতে পরিচালিত করে।
৮ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ: কোন পথ?
সূরা ফাতিহার মূল প্রার্থনা ও আর্তি:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
ধাতু: ه-د-ي
পথ দেখানো, দিকনির্দেশনা দেওয়া, আলোকিত করা।
শব্দার্থ
সুস্পষ্ট মহাসড়ক, চলার অটুট পথ বা অভিমুখ।
ধাতু: ق-و-م
সোজা হয়ে দাঁড়ানো, প্রতিষ্ঠিত হওয়া, স্থির ও সুদৃঢ় থাকা।
এখানে মুস্তাকীম-কে কেবল জ্যামিতিক ‘সোজা’ বললে শব্দটির গঠনগত বিশালত্ব কিছুটা আড়ালে পড়ে যায়। এটি এমন এক ব্যবস্থার কথা বলে যা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সুদৃঢ়, স্থির এবং কোনো ধরনের বক্রতা বা কম্পনমুক্ত।
৯ সেই পথের পরিচয় কী?
পথটির পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা ফাতিহার সমাপ্তি টানা হয়েছে তিনটি দলের তুলনামূলক চিত্রের মাধ্যমে:
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
অনুগ্রহ, কল্যাণ, শান্তি, নিরাপত্তা ও পূর্ণ নিয়ামতের অবিরাম স্রোত।
লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া, পথ হারিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া, সত্যের অভিমুখ থেকে ছিটকে পড়া।
এখানে পথভ্রষ্টতা কেবল কোনো তাত্বিক দর্শন ভুলের বিষয় নয়; কুরআনের সামগ্রিক বয়ানে এটি সত্য ও স্রষ্টার সরল পথ থেকে বাস্তবিক জীবনে বিচ্যুত হওয়ার সার্বিক অবস্থাকে বোঝায়।
১০ কুরআন কি শুধু উচ্চারণের জন্য?
এই মৌলিক প্রশ্নটি সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াতের সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কুরআন নিজেই মানুষকে অন্ধ উচ্চারণের গণ্ডি পেরিয়ে অতল ভাবনার আহ্বান জানায়:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
৪:৮২-এর এই নীতিটি কুরআন অধ্যয়নের এক শক্তিশালী পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেয়। কোনো একটি শব্দ বা আয়াতকে প্রসঙ্গহীন ও বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ না করে সমগ্র কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যের সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।
এ কারণেই সূরা ফাতিহার হামদ, রব, আলামীন, দীন, ইবাদত, হুদা, সিরাত ইত্যাদি কেন্দ্রীয় শব্দের অর্থ নির্ধারণে শুধু প্রচলিত সামাজিক ধারণা যথেষ্ট নয়—কুরআনের ভেতরেই এদের শিকড় খুঁজতে হবে।
১১ আকল ব্যবহার: কুরআনের অপরিহার্য আহ্বান
কুরআন সেই মানুষদের তীব্র ভাষায় তিরস্কার করে যারা তাদের অর্জিত বোধ ও চিন্তাশক্তিকে রুদ্ধ করে রাখে:
إِنَّ شَرَّ الدَّوَابِّ عِندَ اللَّهِ الصُّمُّ الْبُكْمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ
ʿaql-এর মূল ধাতব অর্থের মধ্যে বাঁধা, সংযত করা, ধারণ করা এবং বুদ্ধি ও বিচারবোধ প্রয়োগের সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল তোতাপাখির মতো মুখে উচ্চারণে সীমাবদ্ধ থাকে না; উপলব্ধি, গভীর চিন্তা ও বিচারবুদ্ধির অবিচ্ছেদ্য সক্রিয়তাই এর মূল প্রাণ।
১২ নিজের ভেতরের ‘মূর্তি’
প্রচলিত বক্তৃতায় বা লোককথায় ‘মানুষের ভেতরে ৩৬০টি মূর্তি থাকে’—এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন যে কুরআনে মানুষের অন্তরে ৩৬০টি মূর্তি থাকার মতো কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার বক্তব্য নেই। তাই এটিকে সরাসরি কুরআনিক তথ্য মনে করা সঠিক নয়।
তবে কুরআন মানুষের প্রবৃত্তিকে এমন এক অন্ধ কর্তৃত্বে পরিণত হওয়ার বাস্তব রূপ তুলে ধরেছে, যা কার্যত ইলাহ-এর স্থানে আসীন হয়:
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ
এখানে রূপকটি কুরআনিক ভিত্তি পায়। মানুষের ভেতরের অন্ধ ইচ্ছা, লোভ, অহংকার বা ক্ষমতালিপ্সা যদি তার জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল চালক হয়ে যায়, তবে প্রশ্নটি আর কেবল উপাসনালয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়ায় জীবনের প্রকৃত প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের।
১৩ ফাতিহার প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়?
সূরা ফাতিহাকে যদি আয়াতের ধারাবাহিকতায় গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করা যায়, তবে মানুষের অস্তিত্বের এক সুস্পষ্ট ও সুসংহত ক্রমবিকাশ উন্মোচিত হয়:
পরম দাতা ও করুণাময় হিসেবে আত্মপ্রকাশ
সমগ্র অস্তিত্বের পরিচালনা ও প্রতিপালন
মহাজাগতিক লালন ও সুরক্ষা
কর্মফলের দিনের একক কর্তৃত্ব
একমাত্র আনুগত্য ও দাসত্বের ঘোষণা
চূড়ান্ত শক্তির ওপর আস্থা স্থাপন
প্রতিষ্ঠিত সরল পথের আবেদন
নিয়ামতপ্রাপ্তদের পথ বনাম বিভ্রান্তদের পরিণতি
এই সুবিন্যস্ত কাঠামো প্রমাণ করে যে, ফাতিহাকে কেবল একটি ‘পাঠ্য সূরা’ মনে করে মুখস্থ আবৃত্তি করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। এটি মানুষের সঙ্গে তার স্রষ্টার সম্পর্ক, নিজস্ব অবস্থান, জীবনপথ এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার এক সুসংহত মহাসনদ।
১৪ ফাতিহা পড়া আর ফাতিহাকে উপলব্ধি করা
কেউ হয়তো সূরা ফাতিহা জীবনে সহস্রবার উচ্চারণ করতে পারেন। কিন্তু সেই উচ্চারণের সঙ্গে যদি তার চিন্তা, সিদ্ধান্ত, কর্ম ও জীবনযাত্রার কোনো সেতুবন্ধন তৈরি না হয়, তাহলে কয়েকটি অনিবার্য প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়:
“إِيَّاكَ نَعْبُدُ” বলার পর আমার জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব কর্তৃত্ব কার?
“مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ” বলার পর আমি কি প্রতিটি কাজের আন্তরিক জবাবদিহি স্বীকার করছি?
“إِيَّاكَ نَسْتَعِينُ” বলার পর আমি কি ন্যায় ও কল্যাণের পথে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছি, নাকি অসৎ প্রবৃত্তির তৃপ্তিতে নির্ভরতা খুঁজছি?
“اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ” প্রার্থনার পর আমার যাপিত জীবন কি সত্যিই সেই সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে?
আর “الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ” ঘোষণার পর আমি কি সত্যিই আল্লাহকে আমার সমগ্র অস্তিত্বের একমাত্র প্রতিপালক ও পরিচালক মেনে নিতে প্রস্তুত?
এই আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্নগুলোর উত্তর বাইরে থেকে অন্য কেউ প্রস্তুত করে দিতে পারে না; প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষকে নিজেই নিজের জীবনের আয়নায় এর উত্তর খুঁজতে হবে।
১৫ শেষ কথা
ফাতিহা মানে ‘খোলা’ বা ‘উন্মোচন’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত এক অনুপম নাম। সেই অর্থকে কুরআনের সামগ্রিক বার্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সূরা ফাতিহাকে কেবল একটি প্রথাগত আনুষ্ঠানিক পাঠ হিসেবে না দেখে কুরআন বোঝার মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কুরআন বলেছে, “ফাতিহা হলো মনের তালা খোলার চাবি।” সেটি একটি রূপক ব্যাখ্যামূলক ভাষা। কুরআনের প্রত্যক্ষ আহ্বান হলো—মানুষ যেন চিন্তা করে, অনুধাবন করে, আল্লাহর বিধানকে অন্তরে ধারণ করে এবং সত্যের সরল পথে চলার অবিচল আকুতি জানায়।
তাই ফাতিহার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন হয়তো:
“আমি কতবার ফাতিহা পড়েছি?”
তার চেয়েও শতগুণ গভীর ও অর্থবহ প্রশ্ন:
“ফাতিহা পড়ার পর আমার চিন্তা, কর্তৃত্ববোধ, জীবনপথ এবং কাজের মধ্যে কী পরিবর্তন এসেছে?”
কুরআনকে শুধু পাঠ করে যাওয়া যায়; আবার কুরআন নিয়ে অতল সাগরে ডুব দিয়ে ভাবাও যায়। সূরা ফাতিহা সেই চিন্তার জগতের বন্ধ দুয়ার খুলে দেয় কি না, তা অনুধাবন করার সবচেয়ে খাঁটি উপায় হলো তার প্রতিটি শব্দ ও ধাতুকে কুরআনের নিজস্ব আলোতেই পাঠ করা।
কারণ কুরআনকে বোঝার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত মানদণ্ড কোনো মানবীয় মতবাদ নয়—
কুরআন নিজেই কুরআনের চূড়ান্ত মানদণ্ড।

