দ্বীনের বিধান কার হাতে? কুরআনের আলোকে তাওহীদের সার্বভৌমত্ব
মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: মানুষ কাকে অনুসরণ করবে? কার কথা চূড়ান্ত? দ্বীনের নামে হালাল-হারাম নির্ধারণ করার অধিকার কার?
এটি শুধু ‘কে সম্মান পাওয়ার যোগ্য’ তার প্রশ্ন নয়; বরং প্রশ্ন হলো ‘বিধান কার কাছ থেকে গ্রহণ করব’। কোরআন বারবার দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করে: দ্বীনের বিধান, বিচার ও হালাল-হারাম নির্ধারণ একমাত্র আল্লাহর নিরঙ্কুশ অধিকার। কোনো ব্যক্তিগত মত, ইমাম, আলেম, বর্ণনাকারী বা ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল্লাহর কিতাবের সমকক্ষ হতে পারে না।
প্রথম মূলনীতি: বিধান একমাত্র আল্লাহর (১২:৪০)
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“বিধান তো আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য নয়।”
হুকম (حكم) ধাতু থেকে প্রভুত্ব, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও শাসন কর্তৃত্ব। আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত এখতিয়ার কেবল আল্লাহর — কেউ এই এখতিয়ারে শরিক হতে পারে না।
💡 Underlying Meaning: তাওহীদের বিচারিক দিকটি এখানে পরিষ্কার। দ্বীনের চূড়ান্ত আইন, বাধ্যতামূলক হুকুম, হালাল-হারাম নির্ধারণ কোনো মানুষের এখতিয়ার নয়। কেউ যদি আল্লাহর কিতাবের বাইরে আরেকটি স্বতন্ত্র বাধ্যতামূলক বিধান ব্যবস্থা দাঁড় করায়, তবে সে সরাসরি এই আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কুরআনের পরিপূর্ণতা ও আত্মস্বয়ংসম্পূর্ণতা
مَّا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِن شَيْءٍ
“আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি।”
রুট ف-ر-ط (ছেড়ে দেওয়া/উপেক্ষা করা)। দ্বীনের মূলনীতির জন্য কিতাব স্বয়ংসম্পূর্ণ।
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا
“তোমার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে পরিপূর্ণ।”
আল্লাহর বাণীতে কোনো অপূর্ণতা নেই যা পূরণ করতে মানবীয় বিধান লাগে।
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا...
“তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য বিচারক খুঁজব? অথচ তিনিই বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন।”
মুফাসসাল কিতাবের পর অন্য কোনো আইনগত বিচারক গ্রহণ করা নিষিদ্ধ।
অননুমোদিত বিধান ও আলেমদের ‘রব’ বানানো (৪২:২১, ৯:৩১)
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُم مِّنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَن بِهِ اللَّهُ (সূরা আশ-শূরা ৪২:২১)
“তাদের কি এমন শরীক আছে যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?”
💡 কেউ যদি দ্বীনের নামে এমন নতুন বিধান বানায় যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, আর মানুষ তা বাধ্যতামূলক মানে — তবে সেখানেই শিরকের সৃষ্টি হয়।
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)
“তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে ‘রব’ হিসেবে গ্রহণ করেছে।”
💡 তারা আলেমদের সিজদা করত না; বরং আলেমরা মনগড়া কিছু হালাল বা হারাম বললে অন্ধভাবে মেনে নিত। মানুষের বিধানকে আল্লাহর বিধানের স্তরে তোলা — তাকে কার্যত রবের আসনে বসানোর মতো অপরাধ।
📜 আল্লাহর আয়াতের পর আর কোন হাদিস?
فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَ اللَّهِ وَآيَاتِهِ يُؤْمِنُونَ (৪৫:৬)
হাদীছ (ح-د-ث) মানে মূল বক্তব্য বা বিবরণ। ঈমান, হিদায়াত ও বাধ্যতামূলক দ্বীনি সত্যের চূড়ান্ত কেন্দ্রবিন্দু কেবল আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত।
🛤️ অন্ধ ঐতিহ্য বনাম একক সরল পথ
وَأَنَّ هَٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ... (৬:১৫৩)
লক্ষ্য করুন: ‘সরল পথ’ একবচন (সিরাত), আর ‘অন্য পথ’ বহুবচন (সুবুল)। পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ (২:১৭০) নয়; মুমিনের নিরাপত্তা সরাসরি আল্লাহর একক পথ আঁকড়ে ধরায়।
🏁 সারকথা ও আমাদের সুস্পষ্ট অবস্থান
প্রশ্ন উঠতে পারে: সব ঐতিহাসিক বর্ণনা বা হাদিস কি বাতিল? উত্তর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক: ইতিহাস হিসেবে, ভাষাগত প্রেক্ষাপট হিসেবে ও গবেষণার উপাদান হিসেবে সেগুলো পড়া যায়। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন কুরআনের বাইরে কোনো উৎসকে স্বতন্ত্র, বাধ্যতামূলক ও চূড়ান্ত দ্বীনি আইন বানানো হয়।

