স্ত্রী প্রহার কি জায়েজ?

আলম এম.আলম এম.২৮ আগস্ট, ২০২৬

মুসলিম দেশগুলোতে অতি সামান্য কারনে (রান্না কেন ভাল হয়নি, এইরকম তুচ্ছ কোন বিষয়) বউ পেটানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও বউ পেটায়, যার অহরহ নজীর আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে থাকি কিন্তু সেটা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। কারন মুসলমানরা বউ পেটায় ধর্মীয়ভাবে জায়েজ করে। আমাদের ধর্মগুরুরা গত হাজার বছর ধরে বউ পেটানোর সমর্থনে কোরানের ৪:৩৪ নং আয়াত নিয়ে খাড়া হয়ে যান। এখন আমি যদি বলি এই আয়াতটির ভুল মানে করা হচ্ছে গত হাজার বছর ধরে , তাহলে আস্তিক নাস্তিক ও কোরান স্কেপ্টিক সকলেই একবাক্যে প্রতিবাদ করে উঠবে , হাজার বছর ধরে কেউ কিছু বুঝলো না, তুমি কোথাকার দিগপাল এলে যে, তোমার চোখেই এই ভুল ধরা পড়লো!! দেখুন কপের্নিকাসের আগ পর্যন্ত আবহমানকাল ধরে মানুষ বিশ্বাস করতো , সূর্য পৃথিবীর চার দিকে ঘোরে। তাই বলে কি এটা সত্য? গত হাজার বছর ধরে কোরানের আয়াতকে ভুল ব্যাখ্যা করলে, ব্যাখ্যাটা সত্য হয়ে যায় না। তাই সকলের কাছে অনুরোধ খোলামন নিয়ে (অর্ধেক খালি নয়, অর্ধেক ভর্তি চিন্তা নিয়ে) পোস্টের বাকি অংশ পড়ুন তাহলেই কোরানের মহিমা বুঝতে পারবেন।

৪:৩৪ "পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে ('নুশুয' نُشُوزَ)অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং ('ইদরিবুহুন্না'وَاضْرِبُوهُنَّপ্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।"
যদি আল্লাহ সত্যি সত্যিই অবাধ্যতার জন্য স্ত্রী প্রহার করতে বলে থাকেন , তাহলে মুসলমানদের জন্য বউ পেটানো অবশ্য করনীয়। মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ মানতে বাধ্য। আসলেই কি আল্লাহ বউ পেটাতে বলেছেন ? চলুন দেখি কোরান থেকেই এর কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কিনা।

কোরানের কোন শব্দের সঠিক মানে জানতে হলে , ঐ একি শব্দ দিয়ে কোরানের অন্য আয়াতে কি বোঝানো হয়েছে , সেটা জানা জরুরী। এই পদ্ধতিকে বলে 'তারতীল' , যার কথা বলা হয়েছে ৭৩:৪ নং আয়াতে।

বউ পেটানোর আয়াতটির সঠিক মানে জানতে হলে ২ টা শব্দের মানে জানা জরুরী , যা আমি আরবিতে দিয়েছি।

১) নুশুয (যার মানে করা হয়েছে অবাধ্যতা)

২) ইদরিবুহুন্না (মানে করা হয়েছে প্রহার কর)

'নুশুয'এর সঠিক মানে জানলে আয়াতটি কি নিয়ে তা জানা যাবে এবং সে কালের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ শ্রেষ্ঠ, এই চিন্তা মাথায় রেখেই যে আমাদের আলিম ও ইমামরা ঐ রকম অনুবাদ করেছিলেন, তা পরিস্কার হবে।

'নুশুয' এর অর্থ - উঠে যাওয়া / `to rise / go above'

কোন স্থান থেকে উঠে যাওয়াই যে 'নুশুয'এর মানে , তা পরিস্কার হবে ৫৮:১১ নং আয়াত পড়লে।
"মুমিনগণ, যখন তোমাদেরকে বলা হয়ঃ মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। আল্লাহর জন্যে তোমাদের জন্য প্রশস্ত করে দিবেন। যখন বলা হয়ঃ ('এনশুযু'انشُزُو উঠে যাও, তখন উঠে যেয়ো। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর।"
৪:৩৪ আয়াতে স্ত্রী কতৃক স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়া বা উপেক্ষার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, অবাধ্যতার কথা বলা হয় নি। এখনো যদি এটা বিশ্বাস না হয় তাহলে ৪:১২৮ নং আয়াত দেখুন, যেখানে স্বামী কতৃক স্ত্রীকে উপেক্ষার কথা বলা হয়েছে ও একি শব্দ 'নুশুয' ব্যবহৃত হয়েছে।
"যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে (نُشُوزً)অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।"
একি কাজের জন্য তো আর দুই রকম নির্দেশ হতে পারে না। স্বামী উপেক্ষা করলে মিমাংসা আর স্ত্রী উপেক্ষা করলে প্রহার। এখন দেখি 'ইয়াদরিবুহুন্না' মানে কি?

'ইয়াদরিবুহুন্না' র মূল হলো 'দারাবা"। দারাবা অনেক আয়াতে আছে , এবং এর ভিন্ন ভিন্ন মানে করা হয়েছে। নিম্নের আয়াত থেকে দারাবার মানে আমরা নিতে পারি।

২:২৭৩ "খয়রাত ঐ সকল গরীব লোকের জন্যে যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে-জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র (ضَرْبًا) ঘোরাফেরা করতে (যেতে) সক্ষম নয়। "

এখান থেকে আমরা ইয়াদরিবুহুন্নার মানে নিতে পারি যেতে দেয়া। তাহলে ৪:৩৪ এর মানে দাড়ায় -

"পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে ('নুশুয' نُشُوزَ)চলে যাওয়ার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং ('ইদরিবুহুন্না'وَاضْرِبُوهُنَّযেতে দাও যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।"

দেখুন তো আল্লাহর আইন কত সুন্দর। স্বামী , স্ত্রী উভয়ের সমাধিকার।
৩৯:১৮ যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।

পাঠক প্রতিক্রিয়া

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? অনুভূতি প্রকাশ করুন

একটি ক্লিকেই লাইক, লাভ বা আপনার মতামত প্রদান করতে পারেন

মোট প্রতিক্রিয়া: 0
আপনার যেকোনো প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বেনামী ও সুরক্ষিত
শেয়ার করুন:
FacebookWhatsAppXTelegram
পোস্ট ভিজিটর পরিসংখ্যানপাঠক এনগেজমেন্ট ও পরিসংখ্যান
মোট পাঠক
০ জন
০ টি ভিজিট সেশন
মোট পঠন সময়
০ সেকেন্ড
পাঠকদের ব্যয়কৃত মোট সময়
গড় পঠন সময়
০ সেকেন্ড
প্রতি পাঠক গড়ে অবস্থান
পেজ ভিউ
০ বার
আর্টিকেল পড়ার সংখ্যা
আলম এম.

কুরআনের শব্দ ও সংখ্যা গভীর চিন্তার আহ্বান জানায়। আমি সেই চিহ্নগুলো অনুসরণ করি। আমি আলম, পাঠ্যের কাছে নম্র, বিশ্লেষণে কঠোর। লিখি নিজের বোধ থেকে; চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে।

আপনার জন্য নির্বাচিত

সম্পর্কিত গবেষণা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ

এই বিষয়ের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আরও কিছু গভীর আলোচনা ও কুরআনভিত্তিক অনুসন্ধান

সকল প্রবন্ধ দেখুন

নামাজ কি কুরআনের বিষয়? সালাত, সালাওয়াত এবং প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় প্রার্থনার একটি তুলনামূলক পাঠ

কুরআনের আরবি পাঠে “নামাজ” শব্দটি একবারও নেই; রয়েছে صَلَاة ও صَلَوَات। সালাত কি কেবল নির্দিষ্ট শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, নাকি এক সামগ্রিক কুরআনিক বিধান? প্রাচীন জরথুস্ত্রীয় (Avesta) ৫টি গাহের প্রার্থনা, শুদ্ধিকরণ ও সিজদার বিশ্বজনীন তাৎপর্যের আলোকে আলম এম.-এর তুলনামূলক গবেষণা নিবন্ধ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও কল্যাণমুখী আচরণ

🟩 আল-বাকারাহ 2:223 - স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ও কল্যাণমুখী আচরণ❌ অনুগ্রহ করে যে যার মতো গবেষণা করবেন। এই লেখাটির কথা চূড়ান্ত ধরে নেবেন না, প্লীজ।আয়াত (আর

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

একীভূত সার্বভৌম ম্যাট্রিক্স

প্রচলিত লোকজ ধারণার বাইরে গিয়ে আরবির মূল শব্দার্থ ও তাওহীদের একক সার্বভৌমত্বের আলোকে মালাইকা (নির্বাহী আইন), ওহী (প্রশাসনিক কোড) এবং রুহ (লাইভ এক্সিকিউটিভ কমান্ড)-এর পুনর্মূল্যায়ন ও সূরা নিসার ৪:৮২ ফিল্টারে মহাজাগতিক বিচারবিজ্ঞানের অনন্য বিশ্লেষণ। লেখক: আলম এম.।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐশ্বরিক শিক্ষা ও অক্ষরজ্ঞান

রাসূলুল্লাহ (সা.) কি নিরক্ষর ছিলেন? ‘বলো’ (কুল) বনাম ‘পড়ো’ (ইকরা)-এর মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য, জিবরাঈল (আল্লাহর রূপান্তরকারী শক্তি) ও কলমের শিক্ষা, ‘উম্মী’ শব্দের মূল ধাতু এবং নবুয়ত-পূর্ব বনাম নবুয়ত-পরবর্তী অবস্থার গভীর কুরআনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন

লওহে মাহফুজ

সূরা আন-নিসার ৮২ নম্বর আয়াতের কষ্টিপাথরে লওহে মাহফুজ সংক্রান্ত আয়াতসমূহের দ্বন্দ্বহীন পাঠ, মূল শব্দসমূহের (লওহ, মাহফুজ, কিতাব, নাবরাআহা) আরবী রুট বিশ্লেষণ এবং লওহে মাহফুজ (মহাজাগতিক নিয়ম ও ওহী) বনাম আমলনামার (ব্যক্তিগত কর্মের খাতা) মৌলিক পার্থক্য।

কুরআনিক
~৩ মিনিট পাঠ
পড়ুন