“আমি একজন চোর।
আমি খাবারে ভেজাল দিই।
নকল ওষুধ তৈরি করে অসহায় মানুষের হাতে তুলে দিই।
ওজনে কম দিই।
মিথ্যা বলি, প্রতারণা করি, মানুষের হক নষ্ট করি।
তারপরও আমি চাই, আমার দেশটা এমন হোক যেখানে দুর্নীতি নেই, অন্যায় নেই, প্রতারণা নেই। আমি চাই দেশ পরিচালনা করুক মালাইকা।”
কিন্তু এই নির্মম প্রশ্নটা কি কখনো নিজেকে করেছি?
যে সমাজের মানুষ নিজেরা প্রতিটি পদে অন্যায় সৃষ্টি করে, সেই সমাজের জন্য আকাশ থেকে কি আলাদা কোনো জাতের শাসক এসে রাতারাতি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে দেবে?
আমার জীন (gene) থেকে কি কখনো কোনো মালাক বা ফেরেশতা পয়দা হতে পারে?
কুরআনের সার্বিক বক্তব্যের আলোকে এই প্রশ্নগুলোকে কোনো রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে পরীক্ষা করতে হয়।
১. মানুষ কেমন ব্যবস্থা তৈরি করে?
আদমকে পৃথিবীতে স্থাপন করার প্রসঙ্গে কুরআনে একটি গভীর ও চিন্তাশীল সংলাপ এসেছে:
وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَٰٓئِكَةِ إِنِّى جَاعِلٌ فِى ٱلْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوٓا۟ أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ ٱلدِّمَآءَ
পরবর্তী হওয়া, স্থলাভিষিক্ত হওয়া, ঐশী আমানত ও দায়িত্বভার স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে গ্রহণ করা।
ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা, কোনো সুস্থ ব্যবস্থার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করা, বিনষ্ট ও কলুষিত করা।
অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে একটি নির্মম সম্ভাবনা প্রথম থেকেই পরিষ্কার: মানুষ পৃথিবীকে সুগঠিতও করতে পারে, আবার নিজের লোভ ও স্বেচ্ছাচারিতায় বিনষ্টও করতে পারে।
২. আজকের চোর কি কাল মালাইকা চাইতে পারে?
অবশ্যই চাইতে পারে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চাওয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে: নিজের আচরণ পরিবর্তন না করে কেবল শাসকের পরিবর্তন চাইলে কি সমাজের মূল সমস্যার সমাধান হয়?
বাজারে ওজনে কম
দোকানদার থেকে আড়তদার—প্রতিটি কেজিতে গ্রাহককে ঠকানো
খাবারে বিষাক্ত ভেজাল
দুধে কেমিক্যাল, ফলে ফরমালিন, মাছে বিষাক্ত রং
নকল ওষুধের বাণিজ্য
মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর অসহায়ত্ব নিয়ে মুনাফা লোটা
ঘুষ ও ফাইল আটকে রাখা
টেবিলের নিচে হাত পাতা, অন্যায়কে 'ব্যবসার বুদ্ধি' বলা
তারপর আমরা সবাই মিলে রাজপথে বা চায়ের টেবিলে সমস্বরে বলি: “দেশটা ঠিক করে দাও!”
তাহলে প্রশ্নটা হবে: দেশটা কে নষ্ট করছে? শুধু সিংহাসনে বসা এক ব্যক্তি? নাকি বাজারের প্রতিটি স্তরে, অফিসের প্রতিটি ফাইলে, ব্যবসার প্রতিটি লেনদেনে, ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতিটি স্তরে আমাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডই এই নষ্ট ব্যবস্থাকে জন্ম দিচ্ছে?
৩. সূরা আর-রূম ৩০:৪১ — মানুষের হাতের অর্জন
কুরআন বিষয়টি কোনো ধোঁয়াশায় রাখেনি; অত্যন্ত নির্মম সত্যে উন্মোচিত করেছে:
ظَهَرَ ٱلْفَسَادُ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِى ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ ٱلَّذِى عَمِلُوا۟ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
কুরআনিক রাজনৈতিক সূত্র:
কুরআন সামাজিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকটকে কেবল একজন দূরবর্তী শাসকের ঘাড়ে চাপিয়ে দায়মুক্তি দেয়নি। بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ—মানুষের হাত যা অর্জন করে, সমাজের প্রতিটি স্তরের যৌথ কর্মই তার সামষ্টিক পরিণতি তৈরি করে।
৪. তাহলে মালাইকা কি দেশ চালাবে?
এখানে আরেকটি রাজনৈতিক রূপকথা পরিষ্কার হওয়া দরকার। কোনো রাষ্ট্রে নাগরিকরা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রতারক হয়ে জীবনযাপন করবে, আর তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য আকাশ থেকে “মালাইকা” বা ফেরেশতা নেমে এসে দেশ চালাবে—কুরআন এমন কোনো রাজনৈতিক কল্পনা শেখায় না।
وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ مِن دَآبَّةٍ وَٱلْمَلَٰٓئِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ
মালাইকা আল্লাহর মহাজাগতিক বিধানের এক নিখুঁত ও অহংকারহীন বাস্তবায়নকারী শক্তি। মানুষের সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব স্বয়ং মানুষের ওপর—খলিফাহ হিসেবে তার স্বাধীন সদিচ্ছা ও নৈতিক আমানতের ওপর অর্পিত।
৫. আমার জীন কি কখনো মালাক তৈরি করতে পারে?
যদি জীন (gene) বলতে জীববিজ্ঞানের জিন বোঝানো হয়, তবে উত্তর দ্ব্যর্থহীন: না। মানুষের ক্রোমোজোম থেকে মানুষই জন্ম নেয়, মালাইকা নয়।
কিন্তু এই প্রশ্নের ভেতর একটি তীব্র রূপক সত্য লুকিয়ে আছে:
⚠️ কর্মের বিষাক্ত উত্তরাধিকার
- সন্তান দেখে বাবা ওজনে কম দেওয়াকে 'ব্যবসার লাভ' বলে।
- পরিবারে শেখানো হয় ঘুষ দেওয়া ছাড়া চাকরি অসম্ভব।
- নকল পণ্য বেঁচে বড়লোক হওয়াকে 'সাফল্য' বলে হাততালি দেওয়া হয়।
- অন্যের হক মেরে খাওয়ায় কোনো লজ্জা বা অনুশোচনা থাকে না।
🌱 এর অনিবার্য সামাজিক ফসল
আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কোষে কোনো মালাইকাসুলভ চরিত্র ঢেলে দিচ্ছি না। আমরা তাদের ভেতরে রোপণ করছি আমাদের নিজের অপরাধ ও প্রতারণার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা। কাল যখন এই প্রজন্ম বড় হয়ে পুলিশ, আমলা, বিচারক, ডাক্তার বা মন্ত্রী হবে—তারা ঠিক সেই সমাজটাই উপহার দেবে যা তারা ঘরে ও বাজারে শিখে বড় হয়েছে।
৬. মানুষ যেমন, তার তৈরি ব্যবস্থাও তেমন
কুরআনের চিরন্তন অপরিবর্তনীয় সমাজবিজ্ঞান ঘোষণা করে:
ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا۟ مَا بِأَنفُسِهِمْ
শব্দটি খেয়াল করুন: حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ—যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতরের অবস্থাকে পরিবর্তিত করে। পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি কোনো বাহ্যিক রাজনৈতিক স্লোগান বা নতুন কোনো দলীয় ব্যানার নয়; ভেতরের নৈতিক মানুষটির রূপান্তরই রাষ্ট্র ও সমাজের রূপান্তরের সূচনাপত্র।
৭. আমার চাওয়া আর আমার কাজের দ্বিমুখী বিভাজন
কুরআন এই তীব্র দ্বিমুখী কপটতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُوا۟ مَا لَا تَفْعَلُونَ
আমাদের সামষ্টিক দ্বিমুখী চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ
৮. দেশ বদলানোর আগে “মানুষ” কে বদলাবে?
দেশ কোনো বিমূর্ত কল্পনা নয়। দেশ মানে মানুষ। বাজার মানে মানুষ। প্রশাসন মানে মানুষ। ব্যবসা মানে মানুষ। আইন প্রয়োগও করে মানুষ, আবার ঘুষ খেয়ে আইন ভাঙেও মানুষ।
كُلُّ ٱمْرِئٍۭ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ
رَهِين (রাহীন) এসেছে রা-হা-নুন (ر ه ن) মূল থেকে। এর মূল অর্থক্ষেত্রে রয়েছে: বন্ধক থাকা, কোনো কিছুর শর্তে আটকে থাকা, দায়বদ্ধ থাকা। অর্থাৎ নিজের কর্মের ফল থেকে মানুষ কোনোভাবেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
৯. তাই প্রশ্নটা বদলে ফেলি — নিজের দিকে তাকাও
“দেশ কেন ভালো হচ্ছে না?”—এই অলস বিলাপ বন্ধ করে আসুন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ৬টি প্রশ্ন করি:
আমি কি দোকানে বা ব্যবসায় পরিমাপে শতভাগ সঠিক ওজন দিই?
আমি কি খাবারে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল না মিশিয়ে পণ্য বিক্রি করি?
আমি কি নকল ও নিম্নমানের পণ্যকে আসল বলে গ্রাহকের হাতে তুলে দিই না?
আমি কি মানুষের রোগ ও অসহায়ত্বকে গলাকাটা মুনাফার হাতিয়ার বানাই না?
আমি কি কারও ন্যায্য পাওনা ও আমানত পুরোপুরি ফিরিয়ে দিই?
আমি কি নিজের সুবিধার জন্য ট্রাফিক বা নাগরিক নিয়ম ভাঙা বন্ধ করেছি?
যদি উত্তর “না” হয়, তাহলে শুধু শাসকের পরিবর্তন চেয়ে কী লাভ? কারণ যে মানুষটি আজ নিজের ছোট দোকানে বসে ৫ টাকার ভেজাল দেয়, সে কাল রাষ্ট্রক্ষমতায় বসলে ৫ হাজার কোটির দুর্নীতি করার সুযোগ খুঁজবে। আর যে মানুষটি নিজের ছোট কাজেও অবিচল সততা রক্ষা করে, সে যেকোনো অবস্থানেই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর।
শেষ প্রশ্ন
“আমি যে ন্যায়ভিত্তিক দেশের স্বপ্ন দেখি, সেই দেশের প্রথম নাগরিক হিসেবে আমার নিজের আচরণই তার প্রথম পরীক্ষা।”
মালাইকা আমার জীন থেকে জন্মাবে কি না, কুরআন এমন কোনো রূপকথা বলে না। কিন্তু আমার কর্মের ধারাবাহিকতা যে আমার পরবর্তী প্রজন্ম ও সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গ্রাস করবে—এ বিষয়ে কুরআনের ঘোষণা অকাট্য:
“স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে মানুষের হাত যা অর্জন করেছে তার কারণে।” (৩০:৪১)
অতএব দেশকে বদলানোর পূর্বে শুধু সিংহাসনের দিকে তাকিয়ে না থেকে একবার নিজের হাতের দিকে তাকান।

